বিভাগ: অভিমত

অথঃ নাম পরিবর্তন সমাচার

49মো. শাহজাহান মিয়া: যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লার নামটি এখন সর্বজন পরিচিত। গত ২০১৩ সালের ১২ ডিসেম্বর মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের জন্য দেশের সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে তার মৃত্যুদ- কার্যকর হয়। এই কাদের মোল্লা ‘মুহাম্মদ’ বা ‘মোহাম্মদ’ নামের সংক্ষিপ্ত রূপ ‘মো.’ লিখলে বিরক্ত হতেন। কোনো শিক্ষার্থী যদি তাদের নামের বানানে ‘মো.’ ব্যবহার করত তবে তিনি ক্ষিপ্ত হতেন। শিক্ষার্থীদের উপদেশ দিতেনÑ ‘মোহাম্মদ অতি পবিত্র নাম, এ নামের সংক্ষিপ্ত রূপ হয় না। নামের সংক্ষিপ্ত রূপ ব্যবহার করেন হিন্দুরা, তোমরা তা কখনও করবে না।’
ব্যাপারটা জানতে পারি বন্ধু প্রফেসর শৈলেন কুমার দাসের কথায়। তিনি ও আমার অন্য এক বন্ধু মাওলানা মুহাম্মদ শোয়াইব ১৯৭৭ সালে একই সাথে বিডিআর হেড কোয়ার্টারে অবস্থিত রাইফেলস পাবলিক স্কুলে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। কিছুকাল পরে বিজ্ঞান শিক্ষক হিসেবে কাদের মোল্লাও যোগদান করেন। কাদের মোল্লা তিন-চার বছর তাদের সহকর্মী ছিলেন। তিনি তখন জামাতে ইসলামের সক্রিয় কর্মী।
এবার আরেক বিচারাধীন যুদ্ধাপরাধী মাওলানা সুবহানের একটি আচরণের কথা। আমি ২০০৩ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত পাবনা সরকারি মহিলা কলেজে বাংলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক পদে কর্মরত ছিলাম। অধ্যক্ষ ছিলেন প্রফেসর মো. আবদুল করিম। ওই সময়ে পাবনা এলাকার সংসদ সদস্য ছিলেন মাওলানা আবদুস সুবহান। তিনি জামাতে ইসলাম থেকে নির্বাচিত হয়েছিলেন। আমি ছিলাম কলেজের শিক্ষক পরিষদের সম্পাদক। কলেজের নানা প্রয়োজনে অধ্যক্ষ আমাকে নিয়ে মাওলানার কাছে যেতেন। মাওলানা তখন হেম সাগর লেনে চিত্রনায়িকা সুচিত্রা সেনদের ফেলে যাওয়া বাড়িতে ইমাম গায্যালী নাম সম্বলিত একটি কিন্ডার গার্টেন স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছেন। অনেক সন্ধ্যায় আমার সহকর্মীদের নিয়ে সুচিত্রা সেনদের বাড়ি দেখানোর জন্য ইমাম গায্যালী স্কুলে যেতাম। সহকর্মীরা অনেকেই বলতেন, ‘প্রতিষ্ঠানটির নামের সাথে সুচিত্রা সেনের নামটি যুক্ত থাকলেই মানানসই হতো।’ অনেকে আবার দুঃখ করে বলতেন, ‘মাওলানা হিন্দু নাম কিছুতেই মেনে নেবেন না।’ আমাদের হায় আফসোস ওই পর্যন্তই ঠেকে থাকত।
মাওলানা যে হিন্দু নাম মেনে নেবেন না তার একটি প্রমাণের কথা আমি জানি। যতদূর মনে পড়ে ২০০৪ সালে কলেজের শিক্ষক পরিষদের এক ইফতার পার্টিতে প্রধান অতিথি হিসেবে মাওলানা সুবহানকে দাওয়াত করা হয়েছিল। এডওয়ার্ড কলেজ, শহীদ বুলবুল কলেজের শিক্ষক পরিষদ এবং শহরের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গকে দাওয়াত করা হয়। অনুষ্ঠানটির সঞ্চালকের দায়িত্বে ছিলেন দর্শন বিভাগের প্রভাষক সেলিনা জামান।
আমন্ত্রিত অতিথিবর্গের উপস্থিতিতে মিলনায়তন পরিপূর্ণ। যথাসাধ্য হরেক রকমের ইফতারির প্লেট তাদের সামনে রাখা হয়েছে। সেলিনা জামান মাইকের স্পিকার হাতে নিয়ে ঘোষণা দিলেন, ‘সুধিম-লী, আজ আমাদের মাঝে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত আছেন, পাবনার মাননীয় সাংসদ মাওলানা আবদুস সুবহান।’ তার এই ঘোষণা শেষ হতে না হতেই মাওলানা আসন ছেড়ে উঠে সেলিনার কাছ থেকে স্পিকারটি হাতে নিয়ে বললেন, ‘আমি সাংসদ শব্দটির তীব্র আপত্তি জানাই, সাংসদ হিন্দুদের শব্দ, এ শব্দ ওরা ব্যবহার করে, আমরা কেন করব? এই প্রতিবাদে আমি এই অনুষ্ঠান বর্জন করলাম।’ এ কথা বলে তিনি সত্যি সত্যি সিঁড়ি বেয়ে দোতলা থেকে নিচে নেমে কালো রঙের জিপে চড়ে কলেজ ত্যাগ করলেন। অধ্যক্ষ প্রফেসর আবদুল করিম বহু সাধ্য সাধনা করেও ফেরাতে পারলেন না। অগত্যা সংসদ সদস্য বিবর্জিত হয়েই আমাদের ইফতার পার্টি শেষ করতে হলো।
শেষ করব পাকিস্তানপ্রেমী খালেদা জিয়ার একটা মন্তব্য প্রসঙ্গ দিয়ে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন বানচালের আন্দোলনকে ইস্যু করে দেশব্যাপী জ্বালাও পোড়াও ও হত্যার নারকীয় পরিবেশ সৃষ্টি করল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল ও তাদের মদতপুষ্ট জামাতে ইসলাম। দেশের মানুষ এ অপ্রত্যাশিত দৃশ্য দেখে হতবিহ্বল হয়ে পড়লেন। তারা চিন্তা করলেন দেশকে যারা এমন ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে আর যাই হোক তাদের হাতে রাষ্ট্রক্ষমতা দেয়া যাবে না। তারা নির্লিপ্তভাবে ঘরে বসে রইলেন, পথে নামলেন না। জনসমর্থন বিবর্জিত আন্দোলন ব্যর্থ হয়ে গেল। বিরোধীদলীয় নেত্রীর ব্যর্থ আক্রোশ বর্ষিত হলো একজন নারী পুলিশ কর্মীর ওপর : ‘দেশ কোথায়? গোপালি? গোপালগঞ্জ জেলার নামটাই বদলে যাবে। গোপালগঞ্জ আর থাকবে না।’
সুযোগ পেলে তিনি যে এ কাজটি করবেন তা ভাবার যথেষ্ট কারণ আছে।   গোপাল-গঞ্জ হিন্দু নাম। যারা এ দেশকে পাকিস্তান বানানোর স্বপ্নে আজও বিভোর, তারা কেন হিন্দু নাম রাখবেন?
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৫৫ সালে পাকিস্তান গণপরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি ২৫ আগস্ট করাচিতে পাকিস্তান গণপরিষদে এক ঐতিহাসিক ভাষণ দেন। ভাষণটি দিয়েছিলেন ইংরেজিতে। প্রাসঙ্গিক বিবেচনায় বঙ্গানুবাদসহ অংশবিশেষ তুলে দেওয়া হলো ‘Sir, you will see that they want to place the word East Pakistan instead of East Bengal. We have demanded So many times that you should use Bengal instead of Pakistan. The word Bengal has a history, has a tradition of its own. You can change it only after the people have been consulted. If you want to change it then we have to go back to Bengal and ask them whether they accept it” [অনুবাদ : স্যার, আপনি দেখবেন ওরা ‘পূর্ব বাংলা’ নামের পরিবর্তে ‘পূর্ব পাকিস্তান’ নাম রাখতে চায়। আমরা বহুবার দাবি জানিয়েছি যে, আপনারা এটাকে বাংলা নামে ডাকেন। ‘বাংলা’ শব্দটার একটা নিজস্ব ইতিহাস আছে, আর আছে এর একটা ঐতিহ্য। আপনারা এই নাম আমাদের জনগণের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে পরিবর্তন করতে পারেন। আপনার যদি ওই নাম পরিবর্তন করতে চান, তা হলে আমাদের বাংলায় আবার যেতে হবে এবং সেখানকার জনগণের কাছে জিজ্ঞেস করতে হবে তারা নাম পরিবর্তনকে মেনে নেবে কিনা।]
স্বপ্ন দেখা ভালো। স্বপ্ন না দেখলে স্বপ্ন পূরণ হয় না। প্রশ্ন, তারা কাদের নিয়ে স্বপ্ন পূরণ করতে চান? বঙ্গবন্ধুর পরামর্শমতো তারা যদি জনগণের কাছে জিজ্ঞেস করেন, জনগণ নাম পরিবর্তন চান কিনা। কী জবাব পাবে তারা?
গায়ের জোরে বলা যত সহজ নাম পরিবর্তন তত সহজ নয়। সেখানে জনগণের জোর থাকা চাই। যে মাটিতে জাতির পিতা ঘুমিয়ে আছেন সেই মাটির নাম বদলাতে জনসমর্থন পাওয়া যাবে কি? জনগণ কখনও ভুল করে না।

পাঠকের মন্তব্য:

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না। তারকাচিহ্নযুক্ত (*) ঘরগুলো আবশ্যক।

*