বিভাগ: অন্যান্য

অশুভ রাজনৈতিক চর্চা করে বিএনপির পরিত্রাণ মিলবে না

Mfdআশরাফ সিদ্দিকী বিটু: একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিপুল বিজয় হয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী দেশরতœ শেখ হাসিনা টানা চতুর্থবারের মতো বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছেন। দেশে নির্বাচনের মাধ্যমে একটি নির্বাচিত সরকার আরেকটি নির্বাচিত সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করল, যা সাংবিধানিকভাবে স্বতঃসিদ্ধ। নির্বাচন নিয়ে নানা ষড়যন্ত্র হয়েছে, যা দেশবাসী নানাভাবে প্রত্যক্ষ করেছে। বিএনপি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা নিয়ে নানা ধরনের বক্তব্য প্রদান করেছে, শেষমেশ ড. কামাল হোসেন, জামায়াতে ইসলামীসহ সমমনা কয়েকটি দল নিয়ে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠন করে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কামাল সাহেবদের দাবিকে সম্মান জানিয়ে সংলাপে অংশ নিয়েছেন এবং গণভবনে নিমন্ত্রণ জানিয়ে তাদের সকল কথা শুনেছেন। ড. কামাল ও বিএনপি নেতৃবৃন্দের দাবির কারণে পুনরায় তফসিল ঘোষণা করে নির্বাচনের তারিখ ৩০ ডিসেম্বর নির্ধারণ করা হয়।
বিএনপি নির্বাচনে তাদের দলীয় প্রার্থিতা বাছাই প্রক্রিয়ায় ব্যাপকভাবে মনোনয়ন বাণিজ্য করেছে। মনোনয়ন নিয়ে দলের ভিতরে-বাইরে বিক্ষোভ হয়েছে, দলের চেয়ারপারসনের কার্যালয় ভাঙচুর করা হয়েছে। এতে দলের নেতাকর্মীসহ কয়েকজন সাংবাদিকও আহত হয়েছে। বিদেশে আমাদের দূতাবাসে মনোনয়ন প্রত্যাশীরা ফরম জমা দিতে গেছেন এবং মনোনয়ন না পেয়ে দূতাবাসের সামনেই ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। দ-িত অপরাধী তারেক রহমান বিদেশে বসে স্কাইপের মাধ্যমে মনোনয়ন প্রত্যাশীদের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন। প্রায় ৯০০-এর মতো প্রার্থীকে বিএনপি প্রাথমিকভাবে মনোনয়ন দিয়েছিল, পরে অনেকে আবার আদালতে দারস্থ হয়ে ধানের শীষ প্রতীক বরাদ্দ পেয়েছে। কারণ দল ঠিক করে দিতে পারেনি কে চূড়ান্ত মনোনয়ন পেল। জাতি বিএনপির মনোনয়ন নিয়ে নানা নাটকীয়তা দেখেছে। পাশাপাশি জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট মূলত জামায়াত ও যুদ্ধাপরাধীদের নিয়ে চলা বিএনপির সাথে ঐক্য করে; যেখানে ২০ জনের বেশি যুদ্ধাপরাধী বা তাদের বংশধররা বিএনপি থেকে মনোনয়ন পেয়ে নির্বাচন করে। এ বিষয়ে নৈতিক স্খলনের দায় ড. কামাল হোসেনরা এড়াতে পারেন না। এ প্রসঙ্গে প্রশ্ন করায় সাংবাদিকদের দেখে নেওয়ার হুমকিও দিয়েছেন। ঐক্যফ্রন্ট জাতির সামনে ভালো কিছু উপস্থাপন করতেই পারেনি; বরং দ-িত অপরাধীকে নেতা মেনে নেওয়া, যুদ্ধাপরাধী ও তাদের বংশধরদের মনোনয়ন প্রদান এবং জামাতকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে দেওয়ার মাধ্যমে দেশবাসীর সামনে নানাবিধভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছেন; কিন্তু সদুত্তর দিতে পারেনি। তবে জামাত, জঙ্গি মদদদাতা, বিদেশে অর্থপাচারকারী, যুদ্ধাপরাধী, একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলায় দ-িত আসামির আত্মীয়-পরিজনদের ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করার সুযোগ করে দেওয়ার মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা-বিরোধীদের আবারও এদেশের রাজনীতিতে সুযোগ করে দেওয়ার ব্যবস্থাই করে দিয়েছে। সেই বৃত্ত থেকে ড. কামাল হোসেনরা আর বের হতে পারেন নি। নির্বাচনে ঐক্যফ্রন্ট ও বিএনপির ইশতেহারে চাকরিতে প্রবেশের কোনো বয়সসীমা থাকবে না। বিশ্বের কোথাও এমন ব্যবস্থা আছে কি যে সরকারি চাকরিতে প্রবেশে কোনো বয়সসীমা থাকবে না? এমন প্রস্তাব হাস্যকর এবং দেশকে পিছিয়ে দেওয়ার নামান্তর মাত্র। ড. কামাল হোসেন আর বিএনপির ঐক্য আসলে পরিণত হয় স্বাধীনতা-বিরোধী, যুদ্ধাপরাধী, দ-িত আসামি এবং দলছুটদের ঐক্যে, যেখানে নীতিকথার আড়ালে অশুভ শক্তির উত্থান ঘটানোই ছিল মূল উদ্দেশ্য।
বহু নীতিকথা বিএনপি তথা ঐক্যফ্রন্ট কপচিয়েছে; আসলে নীতিবিবর্জিতদের সামনে আনার চেষ্টা করেছেন এবং শেষতক তারা ব্যর্থ হয়েছেন। পাশাপাশি ২২ জামাত নেতাকে নির্বাচন করার সুযোগ দিয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সাথে প্রতারণা করেছেন। নির্বাচনের আগে ড. কামাল সাহেবরা যেসব দাবি তুলেছিল সেগুলো সংবিধানসম্মত ছিল না এবং সংসদে নারী আসন ১৫ থেকে ১০ শতাংশে কমানোর দাবি খুব দূরভিসন্ধিমূলক ছিল।
বিএনপি ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নানাভাবে চেয়েছে নির্বাচনকে দেশে-বিদেশে প্রশ্নবিদ্ধ করে দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে দুর্বল করতে। কিন্তু বিএনপি-জামাত-ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচন ঘিরে বহু অপকর্মে লিপ্ত ছিল। অথচ ড. কামাল হোসেন ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, জামাতের নেতারা বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকে মনোনয়ন পাবেন জানলে ঐক্যফ্রন্টের দায়িত্ব নিতেন না। এ-কথার মধ্য দিয়ে ড. কামাল যে সত্যের কাছে পরাজিত তা স্বীকার করলেন। ড. কামালরা ঐক্যের নামে গণতন্ত্র ও উন্নয়নকে ব্যাহত করতে চেয়েছে।
শরীয়তপুর-৩ আসনে ধানের শীষের প্রার্থী তারেকের সাবেক এপিএস মিয়া নূরুদ্দীন আহম্মেদ অপুর প্রতিষ্ঠান আমেনা এন্টারপ্রাইজে অভিযান চালিয়ে কোম্পানির এক কর্মকর্তাসহ দুজনকে ৮ কোটি টাকা ও ১০ কোটি টাকার চেকসহ গ্রেফতার করেছিল র‌্যাব। পাশাপাশি পার্শ¦বর্তী বিতর্কিত একটি দেশের গোয়েন্দা সংস্থার সাথে বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতার ফোনালাপ থেকে ষড়যন্ত্রের বিষয়টি পরিষ্কার হয়। ওই গোয়েন্দা সংস্থার সাথে বিএনপির সখ্য বিএনপির জন্মলগ্ন থেকেই। স্যোশাল মিডিয়াতে গুজব ছড়ানোর জন্য ছাত্রশিবিরের আটজন আটক হয়েছিল।
এখানে উল্লেখ করতে চাই, জামাতের রাজনীতি রক্ষা ও বিশ্বে জামাতের পক্ষে জনমত গড়তে ২০১৮ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর জামাতের পক্ষে ‘হাচ ব্ল্যাকওয়েল স্ট্র্যাটেজিস এলএলসি’র সঙ্গে চুক্তি করেছেন ‘অর্গানাইজেশন ফর পিস অ্যান্ড জাস্টিস’-এর মো. জিয়াউল ইসলাম। ২০১৮-এর সেপ্টেম্বর থেকে ২০১৯-এর সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত জামাতের পক্ষে তদবিরের জন্য ‘হাচ ব্ল্যাকওয়েল স্ট্র্যাটেজিস এলএলসি’ ১ লাখ ৩২ হাজার মার্কিন ডলার পাবে। এমনকি ভারতের বর্তমান ক্ষমতাসীন দল বিজেপির সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টাও করেছিল বিএনপি; কিন্তু ব্যর্থ হয়। নির্বাচন দেশে আর যোগাযোগ করে সহযোগিতা কামনা করে ভারতের কাছেÑ এই হলো বিএনপির চরিত্র। ধানের শীষে ভোট দিলে খালেদা জিয়া মুক্তি পাবে, যুদ্ধাপরাধী সাঈদী মুক্তি পাবেÑ এই বার্তার মাধ্যমে আইন লঙ্ঘন করেছে বিএনপি-জামাত। এমন বহু উদাহরণ দেওয়া যাবে যেসব থেকে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় যে বিএনপি ও ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচনকে বানচাল করতে চেয়েছে।
বিএনপির গত এক দশকের রাজনীতি ও কর্মকা- বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, জোট সরকারের অপকর্ম-জঙ্গি মদদ-বিদেশে অর্থপাচার, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা, নির্বাচনে জয়ী হতে নীল নকশা করে ১ কোটি ২৩ লাখ ভুয়া ভোটার বানানোÑ এমন বহু অপকর্মের কারণে দেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ব্যাহত হয়ে আসে বিতর্কিত সেনা সমর্থিত এক/এগারো-এর সরকার, যারা সময়মতো নির্বাচন দিতে ব্যর্থ হয়ে দেশে জরুরি অবস্থা জারি করে প্রায় দুই বছর পর নির্বাচন দেয়। সেই নির্বাচনে বিএনপি-জামাত জোটের ভয়াবহ ভরাডুবি হয়। এরপর থেকে বিএনপি-জামাত জোট আরও ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। সংসদে গিয়ে খিস্তিখেউর করে। বিএনপি নেত্রী নবম সংসদে মাত্র ১০-১২ দিন উপস্থিত ছিলেন। বিএনপি নেত্রীসহ দলের সবাই সরাসরি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বন্ধে নেমে পড়ে। খালেদা জিয়া যুদ্ধাপরাধীদের মুক্তির জন্য জনসভায় বক্তব্য রাখেন। বিচারকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে নানা কথা বলে এবং কর্মসূচি দেয়। যুদ্ধাপরাধীদের রায়ের দিন হরতাল ডাকত। জামাত এই যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বন্ধ করতে বিদেশে লবিস্ট নিয়োগ করে। যুদ্ধপরাধীদের রক্ষায় মত্ত হয়ে যেন মরণ কামড় দিতে ২০১৩ সাল থেকে দেশে সহিংসতা শুরু করে বিএনপি-জামাত। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে টানা অবরোধ দিয়ে মানুষ পুড়িয়ে হত্যা করে। বাসে-ট্রাকে-রেলে আগুন দেয়। জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের সামনে কোরআন শরিফ পোড়ায়। দেশের বিভিন্ন স্থানে শহিদ মিনারে আগুন লাগায় ও ভাঙচুর করে। নির্বাচনের পরও টানা ১০০ দিন তারা সারাদেশে অবরোধের নামে হত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে যায়। যার পরিণতিতে বিএনপি আরও জনবিচ্ছিন্ন হয়। রাজনীতিতে তাদের পিছনের দিকে হাঁটা চলতে থাকে দ্রুতগতিতে। মানুষের সামনে নিজেদের উপস্থাপনের সুযোগ তারা নষ্ট করে। উল্টো দেশের অগ্রযাত্রাকে তারা ব্যাহত করতে চায়। মানুষের জীবন বিপন্ন করে তাদের হীনস্বার্থ হাসিল করতে গিয়ে এহেন কোনো অপকর্ম নেই যে বিএনপি করেনি। পরিফল হলো আজকের এই ব্যর্থতার পাহাড় যেখানে নেতাকর্মী সবাই হতাশ। মানুষের সামনে নতজানু। এতিমের টাকা আত্মসাৎ ও দুর্নীতির মামলায় খালেদা জিয়া জেলে। বিএনপির কিছুই করণীয় নেই। কারণ দলের শীর্ষ নেতৃত্ব আকণ্ঠ দুর্নীতি ও অপকর্মে নিমজ্জিত থাকলে নেতাকর্মীরা হতাশ হবেই। মাথায় পচন ধরলে যে-অবস্থা হয় সে-অবস্থা এখন বিএনপির।
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি-জামাতের হারের অনেক কারণ রয়েছে। এই পরাজয় বিএনপির দিশেহারা অবস্থাকে তীব্রভাবে প্রকাশ করছে। নির্বাচনে প্রমাণ হয়েছে দলের তৃণমূলের সাথে কেন্দ্রের মতানৈক্য অনেক। শীর্ষ নেতৃত্ব সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থ। লন্ডন থেকে এক বার্তা আসে আর জেলখানা থেকে আরেক বার্তা আসে। নির্বাচনে যে কয়টি মাত্র আসনে বিএনপি জয়লাভ করেছে, সেসব প্রার্থীরা সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ না নিয়ে আরও অপরিপক্বতার পরিচয় দিচ্ছে। গণতন্ত্রে বিশ্বাসী হলে তাদের সংসদে গিয়ে কথা বলা উচিত। কিন্তু সংসদে না গেলে জনগণের কাছে তারা অতীতের মতো প্রত্যাখ্যাত হবে। মূলত দলের ভিতরে ও বাইরে দীর্ঘদিন ধরে চলা অচলাবস্থার কারণে এই ব্যর্থ-দিশেহারা অবস্থা আরও প্রলম্বিত হবে। নেতৃত্বের সংকট এখন প্রকট ও প্রবল, যা থেকে বেরিয়ে আসার কোনো পথ বিএনপিই খোলা রাখেনি। খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে নিজেকে না শুধরালে পরিণত কী হবে তা সহজেই অনুমেয়!
ইতিহাস তার নিজস্ব গতিতে চলে, ইতিহাসের মুখোমুখি হতে যারা ভয় পায় তাদের পরিণতি ভয়াবহ। সামনের সময় আরও কঠিন সেখানে ব্যর্থ ও পঙ্কিল মতাদর্শ এবং অশুভ রাজনীতির চর্চাকে কেউ সাধুবাদ জানাবে না।

পাঠকের মন্তব্য:

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না। তারকাচিহ্নযুক্ত (*) ঘরগুলো আবশ্যক।

*