বিভাগ: ইতিহাস : প্রবন্ধ

আওয়ামী লীগবিরোধী প্রচারের ৬ দশক ‘ঢেউয়ের ওপর দিয়ে যেন পালের নৌকো’

aaশেখর দত্ত:

(পূর্ব প্রকাশের পর)
সামরিক শাসনবিরোধী সংগ্রাম : ১৯৬২ সাল
১৯৬০ সালের শুরুতেই মৌলিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় প্রতিদ্বন্দ্বী ছাড়া হ্যাঁ ভোট না ভোট করে স্বৈরশাসক আইয়ুব খান প্রেসিডেন্ট হয়ে ভাবলেন, ক্ষমতাকে আরও নিরঙ্কুশ পাকাপোক্ত ও দীর্ঘস্থায়ী করতে হবে। এই লক্ষ্যে তিনি একদিকে পূর্ব পাকিস্তানের ভাষা সংস্কৃতিকে ধ্বংস করা, শিক্ষাব্যবস্থাকে কায়েমি স্বার্থে ঢেলে সাজানো প্রভৃতির সাথে আওয়ামী লীগ ও কমিউনিস্ট পার্টি এবং ছাত্র আন্দোলন ও সংগঠনকে দমন-পীড়ন ও অপপ্রচারের মাধ্যমে নস্যাৎ করা ষড়যন্ত্র-চক্রান্তে মেতে ওঠে।
প্রসঙ্গত, ভাষা আন্দোলন থেকে সামরিক শাসন পর্যন্ত সময়কালে আওয়ামী লীগের সাথে বাম ও কমিউনিস্টদের রাজনীতির বিভিন্ন প্রশ্নে বিভেদ, আওয়ামী লীগ বিভক্ত হয়ে ন্যাপের সৃষ্টি এবং পরস্পর কাদা ছোড়াছুড়ি হলেও মূলত নবোত্থিত বাঙালি জাতীয়তাবাদী শক্তি ও বাম কমিউনিস্টরা একত্রেই পাকিস্তানের শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে আন্দোলন-সংগ্রামের মাঠে ছিল। এ কারণ ছাড়াও কমিউনিস্ট নেতারা ছিল মূলত হিন্দু সম্প্রদায়ের। তাই কমিউনিস্ট বিরোধী প্রচারের সাথে হিন্দুবিরোধী প্রচার করে দেশের ধর্মপ্রাণ মানুষদের বিভ্রান্ত করা সহজ ছিল। তাই দুই দলকে টার্গেট করে সামরিক সরকার অগ্রসর হয়।
নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি হয়েই আইয়ুব খান ‘ব্যুরো অব ন্যাশনাল রিকনস্ট্রাকশন-বিএনআর’ ও ‘পাকিস্তান লেখক শিবির’ নামে দুটো সংস্থা গঠন করে। এই দুই সংগঠনের কাজ হয়ে দাঁড়ায় বুদ্ধিজীবীদের টোপ দিয়ে সংগঠিত করে পাকিস্তানি তমুদ্দুন ও মৌলিক গণতন্ত্রের পক্ষে এবং নবোত্থিত বাঙালি জাতীয়তাবাদকে অঙ্কুরে বিনষ্ট করা এবং কমিউনিস্ট জুজুর ভয় দেখিয়ে বিভ্রান্ত ও বিপথগামী করে জনগণকে সেনাশাসনের পক্ষে রাখা। এ সময়ে উর্দু-বাংলার সংমিশ্রণে রোমান হরফে নতুন ভাষা ‘লিঙ্গুয়া ফ্রাঙ্কা’ এবং জাতীয় শিক্ষা কমিশন কীভাবে পাকিস্তানকে রক্ষা করার সহায়ক হবে, তা নিয়ে প্রচার জোরদার করা হয়। পরোক্ষ সামরিক শাসনের তীব্র দমন-পীড়ন, বাক-ব্যক্তি ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতাহীন অবস্থার মধ্যে তখন প্রচার হতে থাকে আইয়ুব খান আল্লাহ-এর প্রেরিত পুরুষ, রাজনীতিকদের হাত থেকে পাকিস্তানকে রক্ষা করতে তিনি পাকিস্তানের রাজনীতিতে ও ক্ষমতায় এসেছেন।
এতসব করেও সেনাশাসক আইয়ুব খান গণতন্ত্র ও জাতীয় স্বাধিকার আন্দোলনকে গলা টিপে হত্যা করতে পারল না। ১৯৬১ সালে প্রথমে একুশে ফেব্রুয়ারি শহিদ দিবস এবং পরে এপ্রিল-মে মাসে রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী পালনকে কেন্দ্র করে আবারও আন্দোলন-সংগ্রাম জেগে ওঠে। ফলে শুরু হয় বাংলা ভাষা ও রবীন্দ্রবিরোধী প্রচারণা এবং হুমকি-ধমকি। কবিগুরুকে ‘মুসলিমবিদ্বেষী হিন্দু’ এবং তার সাহিত্য ও সংগীত ‘বিজাতীয়’, ‘ইসলাম তথা পাকিস্তানের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ববিরোধী’, তাকে নিয়ে মাতামাতির অর্থ ‘অখ- রাম রাজত্ব প্রতিষ্ঠার’ তৎপরতা এবং মুসলমানদের জন্য তা ‘হারাম’ ও ‘নিশ্চিত মৃত্যু’ প্রভৃতি বলে প্রচার জোরদার করা হয়।
একপর্যায়ে গণজাগরণের ভয়ে ভীত হয়ে সেনাশাসক আইয়ুব খান ১৯৬২ সালে শুরুতে ক্ষমতার রাজনীতিতে তার প্রতিদ্বন্দ্বী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে গ্রেফতার করে। সাথে সাথেই তিনি ‘রাষ্ট্রবিরোধী কাজে লিপ্ত’, ‘কখনও পাকিস্তানের অস্তিত্বকে স্বীকার করেননি’, ‘পূর্ব বাংলাকে বিচ্ছিন্ন করা প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন’, ‘ঘৃণা ছড়াচ্ছেন’, ‘বিদেশি চরদের সাথে তার যোগাযোগ রয়েছে’ প্রভৃতি ধরনের প্রচার সামনে আনা হয়। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো সরকার একদিকে প্রচার করতে থাকে তিনি ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী আবার অন্যদিকে প্রচার করতে থাকে যে, সোহরাওয়ার্দী পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের বিভিন্ন শহরে ‘গোপন সেল’ প্রতিষ্ঠা করছেন। বলাই বাহুল্য যদি বিচ্ছিন্নতাবাদীই হবেন তবে দুই পাকিস্তানে গোপন সেল প্রতিষ্ঠা করতে গেলেন কেন? বাস্তবে তিনি কখনও গোপন কাজের সাথে জড়িত ছিলেন না এবং এই শব্দ দুটি ছিল গোপন কমিউনিস্ট পার্টির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। তবুও এটা বলার কারণ হলো, গণতান্ত্রিক ও জাতীয় অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামকে কমিউনিস্টদের কারসাজি হিসেবে চিহ্নিত করে সোহরাওয়ার্দী ও আওয়ামী লীগকে গণবিচ্ছিন্ন করা।
ইতোমধ্যে সোহরাওয়ার্দীকে গ্রেফতার করার সাথে সাথে সামরিক শাসনের মধ্যেই শুরু হয়ে যায় ছাত্র আন্দোলন। সাথে সাথেই আইয়ুব খান সাংবাদিকদের কাছে বলেন যে, ‘কলকাতা পূর্ব পাকিস্তানকে তার পশ্চাৎভূমি বানাতে চায়’, ‘প্রকৃত হুমকি আসছে কলকাতা ও আগরতলার কমিউনিস্টদের কাছ থেকে’ ইত্যাদি ইত্যাদি। প্রবাদ বলে, বজ্র আঁটুনি ফসকা গেরো অথবা ঢিল দিলে পাটকেল খেতে হয়। এই দিনগুলোতে পূর্ব বাংলার রাজনীতির মধ্যমণি শেখ মুজিব ‘স্বাধীন বাংলা’ নিয়ে তৎপরতা শুরু করেন এবং এ বিষয়টি নিয়ে তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়াকে নিয়ে কমিউনিস্ট নেতা মণি সিংহ ও খোকা রায়ের সাথে গোপনে কয়েকবার আলোচনা করেন। এসব বৈঠকেই গণতন্ত্র ও স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে দুই পার্টির মধ্যে আন্দোলন-সংগ্রাম প্রশ্নে সমঝোতা হয়। এই সমঝোতাই নানা চড়াই-উৎরাইয়ের ভেতর দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের দিকে অগ্রসর হয়। এই আন্দোলনের ভেতর দিয়ে সোহরাওয়ার্দী জেল থেকে মুক্তিলাভ করেন। পরবর্তীতে সামরিক শাসন প্রত্যাহার ও শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট স্থগিত করা হয়।
এভাবে আন্দোলনের বিজয় সূচিত হলেও সেনাশাসক আইয়ুব খান ১৯৬২ সালেই মোনায়েম খানকে পূর্ব পাকিস্তনের গভর্নর নিয়োগ করেন। তখন থেকেই শুরু হয় আইয়ুব-মোনায়েমের যুগ, যা কালিমাময় অধ্যায় হিসেবে আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। আইনকানুনের তোয়াক্কা না করে পুলিশ ও গু-াবাহিনী দিয়ে আন্দোলন দমন, বাক-ব্যক্তি স্বাধীনতা হরণ, সংবাদপত্রের কণ্ঠরোধ, দলীয়করণ, দুর্নীতি, সাম্প্রদায়িক ও অন্ধ ভারতবিরোধী প্রচার ছিল এই আমলের বৈশিষ্ট্য।

প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ঘিরে জনতার জাগরণ : ১৯৬৪ সাল
১৯৬৩ সালে পূর্ব বাংলায় আন্দোলন ছিল স্তিমিত। এ অবস্থায় ডিসেম্বরে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যু হলে আওয়ামী লীগে সোহরাওয়ার্দী যুগের পরিসমাপ্তি ঘটে এবং শেখ মুজিব যুগের আর্বিভাব ঘটে। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সোহরাওয়ার্দী ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (এনডিএফ)-এর মাধ্যমে গণতন্ত্রের আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার পক্ষপতি ছিলেন। কিন্তু সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুর পরপরই শেখ মুজিব ১৯৬৪ সালের ২৫ জানুয়ারি আওয়ামী লীগ পুনরুজ্জীবিত করেন এবং গণতন্ত্র ও পূর্ব বাংলার স্বাধিকার আন্দোলনকে একসূত্রে গ্রথিত করে সংগঠন ও আন্দোলন গড়ে তোলার কাজে অগ্রসর হন। যা পূর্ব বাংলার জনগণের আন্দোলন-সংগ্রামে যুগান্ত সৃষ্টিকারী মোড় পরিবর্তনের সূচনা করে।
তবে ১৯৬৪ সালের শুরুটা ছিল পূর্ব বাংলার জনগণের জন্য দুর্ভাগ্যজনক। ভারতের কাশ্মীরে হযরত বাল মসজিদ থেকে মহানবীর স্মৃতিবিজড়িত সংরক্ষিত দাড়ি চুরি হলে প্রথমে ভারতের বিভিন্ন স্থানে আর পরে পূর্ব পাকিস্তানের খুলনা, ঢাকা, নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন জায়গায় হিন্দু-মুসলমান ভ্রাতৃঘাতি দাঙ্গা লেগে যায়। সরকার প্রকাশ্যভাবে এতে উসকানি দেয় এবং সহযোগিতা করে। এই সময় পাকিস্তান সরকার ‘হিন্দু কাফেরদের’ বিরুদ্ধে প্রচারণা তুঙ্গে তোলে। বর্বরতা ও নৃশংসতা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে।
এ সময়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষার কাজে আওয়ামী লীগ ও ন্যাপ এবং ছাত্র ও বুদ্ধিজীবী সমাজ এগিয়ে আসে। বাম ছাত্র সংগঠন প্রথম থেকেই দাঙ্গা প্রতিরোধে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। গঠিত হয় দাঙ্গা প্রতিরোধ কমিটি। এই কমিটি সরকারি মদদে দাঙ্গা ও সাম্প্রদায়িক প্রচারণার বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলে ‘পূর্ব বাংলা রুখিয়া দাঁড়াও’। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দাঙ্গা থামাতে এবং এই সেøাগান সামনে আনার ক্ষেত্রে শেখ মুজিবের ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য।
ইতোমধ্যে শুরু হয়ে যায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তোড়জোড়। সরকারি দল কনভেনশন মুসলিম লীগের প্রার্থী হন সেনাশাসক আইয়ুব খান আর সম্মিলিত বিরোধী দল (কপ)-এর প্রার্থী হন পাকিস্তানের ‘জাতির পিতার’ বোন ফাতেমা জিন্নাহ। নির্বাচনকে সামনে রেখে সরকারের পক্ষ থেকে ভারতবিরোধী ও সাম্প্রদায়িক প্রচারণা তুঙ্গে তোলা হয়। ফাতেমা জিন্নাহকে ভোট দেওয়া মানে ভারতের দালাল পূর্ব বাংলায় শেখ মুজিবকে এবং উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে আবদুল গফফার খান (সীমান্ত গান্ধী)-কে ভোট দেওয়া হবে বলে প্রচার তীব্র করা হয়।
ভারতীয় টাকা-পয়সা ও মদদেই ইসলামি রাষ্ট্র পাকিস্তানে ইসলামকে অবমাননা করার জন্য মহিলা প্রার্থী দেওয়া হয়েছে বলে বিষোদগার চলতে থাকে। মহিলাকে ভোট দেওয়া ধর্মীয় দৃষ্টিতে ‘হারাম’ এবং বাঙালি মুসলমানদের ‘নিচু জাত’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। পূর্ব বাংলার জনগণকে অসম্মান ও হেয় প্রতিপন্ন করতে আইয়ুব খান পল্টন ময়দানের জনসভায় জনগণকে ‘তুমি’ বলে সম্বোধন করেন। ফলশ্রুতিতে তার প্রতি জুতা ও ইটপাটকেল নিক্ষেপ করা হয়। এই দিনগুলোতে শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে উপর্যুপরি ‘রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা’ দেওয়া হতে থাকে। উল্লিখিত ধরনের অপপ্রচার, দমন-পীড়ন ও কারচুপির নির্বাচনে পূর্ব বাংলার জনগণের জাগরণ সত্ত্বেও ফাতেমা জিন্নাহ্ পরাজিত হন। তবে এই পরাজয় গণতন্ত্র ও জাতীয় স্বাধিকারের আন্দোলনকে নতুন পথের সন্ধান দেয়।

৬-দফা আন্দোলন ও আগরতলা মামলা
১৯৬৫ সালের সেপ্টেম্বরে পাক-ভারত যুদ্ধের সময় পাকিস্তান সরকারের ধারণা ছিল, এর ফলে পূর্ব বাংলার জনসাধারণের মধ্যে ভারত-বিরোধী ও সাম্প্রদায়িক মনোভাব জোরদার হবে এবং অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক বাঙালি জাতীয়তাবাদী শক্তির প্রভাব ক্ষুণœ হবে। কিন্তু ধর্মভিত্তিক সাম্প্রদায়িক দলগুলোর সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ও যুদ্ধোন্মদনার প্রচারণা সত্ত্বেও ফল হয় উল্টো। ‘পূর্ব পাকিস্তান অরক্ষিত কেন?’ সেøাগান নিয়ে শেখ মুজিবের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ এগিয়ে আসে এবং অসাম্প্রদায়িক বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলন নবপর্যায়ে উত্থানের পথ খুঁজে পায়।
যুদ্ধের পরপর আওয়ামী নেতা শেখ মুজিব বাঙালির ‘মুক্তি সনদ’ ৬-দফা ঘোষণা করেন। সাথে সাথে গণতন্ত্র ও স্বাধিকার আন্দোলন নবপর্যায়ে উন্নীত হয়। আইয়ুব-মোনায়েম চক্র ৬-দফা উত্থাপনকারীদের পাকিস্তানের ‘স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের শত্রু’ হিসেবে আখ্যায়িত করে। প্রচার করা হয় যে, ৬-দফা ‘হিন্দু আধিপত্যাধীন যুক্ত বাংলা গঠনের ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত ছাড়া আর কিছু নয়’ এবং তা বাস্তবায়িত হলে ‘মুসলমানেরা বর্ণ হিন্দুদের গোলামে’ পরিণত হবে। মোনায়েম খান বলেন, ‘আমি যতদিন গভর্নর থাকব, ততদিন শেখ মুজিবকে জেলে পচতে হবে।’ এদিকে ৬-দফা জনপ্রিয় হতে থাকলে শেখ মুজিবকে ‘রাষ্ট্রদ্রোহী’ আখ্যায়িত করে জেলে নেওয়া হয় এবং পরবর্তীতে ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’ দায়ের করা হয়।
এ অবস্থায় ধর্মভিত্তিক সাম্প্রদায়িক দলগুলো সরকারের সাথে সুর মিলিয়ে ৬-দফা, শেখ মুজিব ও আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাতে থাকে। এখানে উল্লেখ্য যে, এই দিনগুলোতে বাম কমিউনিস্টদের মধ্যে রুশ-চীন দ্বন্দ্ব প্রকট হয়ে প্রকাশ্য রূপ নেয়। রুশপন্থিরা ৬-দফা ও আওয়ামী লীগের পক্ষে এবং চীনপন্থিরা বিপক্ষে অবস্থান নেয়। রুশপন্থি অংশের বক্তব্য ছিল : ৬-দফা পূর্ণাঙ্গ নয়। তবুও এই দাবি নিয়ে আন্দোলনের পক্ষে অবস্থান নিতে হবে এবং শ্রমিক কৃষকের দাবি ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী দাবি যুক্ত করে আন্দোলনকে অগ্রসর করে নিতে হবে। আর চীনপন্থিদের বক্তব্য ছিল : বাঙালি-অবাঙালি পুঁজিপতিদের বিরোধের ফল হচ্ছে ৬-দফা। এটা সিআইএ প্রণীত। তাই ৬-দফাকে তারা সমর্থন না করে বিরোধিতা করে তীব্র অপপ্রচারে নামে। মওলানা ভাসানী জনসভায় বলতে থাকেন যে, ‘সিআইএ ৬-দফা রচনা করে আমাদের বোকা ছেলেদের হাতে তা তুলে দিয়েছে।… ৬-দফায় এ দেশের ধর্মপ্রাণ মানুষের কোনো লাভ হবে না।’ চীনপন্থিরা তখন ‘ডোন্ট ডিস্টার্ব আইয়ুব’ এই সেøাগান নিয়ে অগ্রসর হয়।
এ অবস্থায় রক্তস্নাত ৭ জুনকে কেন্দ্র করে যে আন্দোলন গড়ে ওঠে, তাতে রুশপন্থিরা ছাড়া আর কোনো দল তখন আওয়ামী লীগের সাথে ছিল না। ইতোমধ্যে ১৯৬৭ সালের এপ্রিল মাসে আওয়ামী লীগও বিভক্ত হয়ে যায় এবং বিভক্ত অংশ পাকিস্তান ডেমোক্রেটিক মুভমেন্টে যোগ দিয়ে ৬-দফা, শেখ মুজিব ও আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। পূর্ব বাংলার রাজনৈতিকদের মধ্যে বিভেদ ও ৬-দফা বিরোধিতার সুযোগে দমন-পীড়ন, অপপ্রচার ও হুমকি-ধমকি চালিয়ে পরিস্থিতিকে নিজেদের পক্ষে নেওয়ার চেষ্টা করে আইয়ুব-মোনায়েম চক্র। তবে তা সম্ভব ছিল না। একুশে ফেব্রুয়ারি ভাষা শহিদ দিবস পালন, এপ্রিলে নবরূপে বাংলা নববর্ষ পালন, মে মাসে রবীন্দ্র জন্মজয়ন্তী পালন, মে দিবস পালন এবং দুই অর্থনীতি তথা বৈষম্য নিয়ে প্রচার প্রভৃতির ভেতর দিয়ে অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক জাতীয়তাবাদী আন্দোলন আবারও মাথা তুলে দাঁড়াতে থাকে। এ অবস্থায় শঙ্কিত হয়ে তীব্র রবীন্দ্রবিরোধী প্রচার জোরদার করা হয় এবং রেডিওতে রবীন্দ্রসংগীত প্রচার প্রায় বন্ধ করে দেওয়া হয়। সরকারের পক্ষ থেকে কবিগুরুকে হেয় প্রতিপন্ন করে প্রচার করা হয় যে, পহেলা বৈশাখ ও রবীন্দ্রজয়ন্তী উদযাপনের নামে ‘বিদেশি সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে ইসলামি জীবনাদর্শের ভিত্তিতে সৃষ্ট পাকিস্তানের মূলে আঘাত’ হানা হচ্ছে।
এই পটভূমিতে ১৯৬৮ সালের জানুয়ারিতে শেখ মুজিবকে প্রধান আসামি করে সরকার ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’ দায়ের করে। এই মামলা প্রদানের সাথে সাথে পূর্ব বাংলায় রাজনৈতিক মেরুকরণ হয় এবং রুশপন্থি গোপন কমিউনিস্ট পার্টি, ন্যাপ (মোজাফফর) ও ছাত্র ইউনিয়ন (মতিয়া) ছাড়া আর কোনো রাজনৈতিক দল ৬-দফা পক্ষে অবস্থান গ্রহণ করে না। এ বছরে বিরোধী অবস্থান সত্ত্বেও ১৯৬৮ সালের ৭ জুন পালনের মধ্য দিয়ে ছাত্র ইউনিয়ন (মেনন) ‘ডোন্ট ডিস্টার্ব আইয়ুব’ এই নীতি থেকে সরে আসতে শুরু করে। এদিকে আগরতলা মামলার কৌঁসুলি হিসেবে ৬-দফাবিরোধী অ্যাডভোকেট নেতাদের যোগদান বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে অগ্রসর হতে সহায়তা করে। এদিকে স্বৈরশাসক প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের ভিত্তি পশ্চিম পাকিস্তানেও সরকারবিরোধী ক্ষোভ দানা বেঁধে উঠতে থাকে। ইতোমধ্যে জুলফিকার আলী ভুট্টো সরকারি দল থেকে বের হয়ে এসে ভারতবিরোধী উন্মাদনা জোরদার করে ‘পাকিস্তান পিপলস পার্টি’ গঠন করে। শুরুতেই এই দল পশ্চিম পাকিস্তানে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। তবে পূর্ব পাকিস্তানে সমর্থন পায় না।

ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান
১৯৬৯ সালের শুরুতেই গঠিত হয় ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়ন (মতিয়া), ছাত্র ইউনিয়ন (মেনন) ও এনএসএফের ভুট্টোপন্থি অংশ নিয়ে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ এবং ১১-দফা প্রণীত হয়। রাজনৈতিক দলগুলো ঐক্যবদ্ধ হয়ে গঠন করে গণতান্ত্রিক সংগ্রাম পরিষদ (ডাক)। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ডাকে আন্দোলন ক্রমেই দানা বেঁধে উঠতে থাকে এবং আসাদ-মতিউরসহ শহিদের রক্তে রঞ্জিত হয়ে ২৪ জানুয়ারি আন্দোলন গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নেয়। গণ-অভ্যুত্থান শুরু হওয়ার পর থেকে সরকার হুমকি-ধমকির সাথে ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন’, ‘পাকিস্তানকে ধ্বংস করার ষড়যন্ত্র’, ‘ভারতের কারসাজি’, ‘কমিউনিস্টদের চক্রান্ত’, ‘কমিউনিজমের বিপদ’ প্রভৃতি ভাঙা রেকর্ডের মতো প্রচার করতে থাকে। কিন্তু ওই প্রচার কিছু দালাল ও অন্ধ মানুষ বাদে বাঙালিদের মধ্যে কোনো প্রভাব বিস্তারে সক্ষম হয় না।
গণ-অভ্যুত্থানের জোয়ারে এই সময় পাকিস্তানি শাসক ও শোষকরা কোণঠাসা ও ভীত হয়ে পড়ে। আইয়ুব খান মাথা নত করে ‘দায়িত্বশীল’ বিরোধী দলের নেতাদের সাথে শাসনতন্ত্র বিষয়ে ফয়সালার জন্য গোলটেবিল বৈঠক আহ্বান করে। ‘দায়িত্বশীল’ শব্দটা উচ্চারিত হয়েছিল শেখ মুজিবকে গোলটেবিল আলোচনা থেকে বাদ দেওয়ার উদ্দেশ্যে। কিন্তু কিছুতেই কিছু হয় না। গণ-অভ্যুত্থান এগিয়ে যায় এবং সরকার আগরতলা মামলা প্রত্যাহার করে শেখ মুজিবকে মুক্তি দেয়। গণজাগরণের ভেতর দিয়ে শেখ মুজিব পূর্ব বাংলার অবিসংবাদিত নেতা রূপে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যান। ছাত্রসমাজের পক্ষ থেকে ডাকসুর সহ-সভাপতি তোফায়েল আহমেদ রেসকোর্সের ময়দানে সদ্য কারামুক্ত নেতার গণসম্বর্ধনা সমাবেশে তাকে বঙ্গবন্ধু উপাধিতে ভূষিত করেন। গোলটেবিলে যোগ দিতে শেখ মুজিব যখন পশ্চিম পাকিস্তান যান, তখন সেখানে বিপুল সম্বর্ধনা পান এবং সেøাগান উচ্চারিত হয় ‘পূর্ব পাকিস্তান’ এসেছে।
এই দিনগুলোতে বিশেষত বামপন্থি মহলে এমন প্রচার জোরদার হয় যে, শেখ মুজিব পাকিস্তানি শাসক-শোষকগোষ্ঠী তথা ক্ষমতাসীনদের সাথে আপস করবেন এবং ১১-দফা সম্পর্কে নিশ্চুপ থাকবেন। এসব গুজব মিথ্যা প্রমাণিত হয়। এদিকে সম্বর্ধনা সভার জমায়েত এবং জনগণের আক্রমণাত্মক মনোভাবকে শান্ত এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার জন্য রেডিও পাকিস্তানে শেখ মুজিবের শান্তির বাণী প্রচার করা হতে থাকে। আইয়ুব-মোনায়েম চক্র ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় এই প্রচার ছিল ‘ঠেলার নাম বাবাজি’র সমতুল্য। গোলটেবিলে যোগ দিতে শেখ মুজিব যখন পশ্চিম পাকিস্তান যান, তখন সেখানে বিপুল সম্বর্ধনা লাভ করেন এবং সেøাগান উচ্চারিত হয় ‘পূর্ব পাকিস্তান’ এসেছে।
প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান আহূত গোলটেবিল বৈঠক যে ব্যর্থ হবে, তা আগেই অনুমান করা গিয়েছিল। কেননা ডাক-এ অন্তর্ভুক্ত রাজনৈতিক দলগুলোর শাসনতান্ত্রিক প্রশ্নে একমত হওয়া সম্ভব ছিল না। আওয়ামী লীগ ও ন্যাপের সাথে ধর্মভিত্তিক সাম্প্রদায়িক দক্ষিণপন্থি দলগুলোর মতামতের পার্থক্য ছিল আকাশ-পাতাল। আর পিপলস পার্টির নেতা ভুট্টো ও চীনপন্থি ন্যাপ নেতা মওলানা ভাসানী গোলটেবিল বৈঠক বয়কট করেন। মওলানা ভাসানী তখন পশ্চিম পাকিস্তান গেলে ভুট্টোর সমর্থকরা বিমানবন্দরে অভ্যর্থনা জানায় এবং ‘ভাসানী-ভুট্টো ভাই ভাই’ সেøাগান তোলে। গোলটেবিলের বাইরে থেকে দুই নেতাই গরম গরম কথা বলতে থাকেন। এই সময়ে জামায়াতে ইসলাম ও চীনপন্থি ন্যাপ মুখোমুখি দাঁড়ায় এবং পশ্চিম পাকিস্তানের বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটতে থাকে।
চরম প্রতিক্রিয়াশীল জামায়াত নেতা মওলানা মওদুদী বলেন যে, ‘সমাজতন্ত্র শব্দ উচ্চারণ করিলে জিহ্বা কাটিয়া ফেলা হইবে।’ আর মওলানা ভাসানী বাঙালির স্বাধিকারের প্রশ্নে বাড়তি কথা বলে ‘জ্বালাও-পোড়াও’, ‘ঘেরাও’, ‘মার-কাট’ প্রভৃতি ধরনের বক্তব্য দিতে থাকলে এবং ভুট্টো গোলটেবিলের বিরুদ্ধে কথা বলতে থাকলে পরিস্থিতি ঘোলাটে হয়ে ওঠে। মওলানা ভাসানী জামাতের বিরুদ্ধে ‘গৃহযুদ্ধের’ আহ্বান জানায়। এর মধ্যে গ্রামাঞ্চলে বিডি সদস্যদের পদত্যাগ, শ্রমিকাঞ্চলে ঘেরাও প্রভৃতির ভেতর দিয়ে এক ধরনের বিশৃঙ্খল অবস্থার সৃষ্টি হয়। এসবই ছিল নতুন করে সামরিক শাসন আনার নীলনকশা। ইতোমধ্যে প্রথমে ছাত্রনেতা তোফায়েল আহমেদ বলেন, ‘যদি তিনি (মওলানা ভাসানী) সত্যি সত্যিই ১১-দফা সমর্থন করেন, তাহলে তার গোলটেবিলে যাওয়া উচিত এবং শেখ মুজিবের সঙ্গে মিলে ১১-দফা তোলা উচিত।’ একপর্যায়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব দীর্ঘদিনের নীরবতা ভেঙে তার একসময়ের নেতা সম্পর্কে বলেন, ‘মওলানা ভাসানীর কথাবার্তার মধ্যে কোনো সামঞ্জস্য নাই। তাই তাঁর রাজনীতি ত্যাগ করা উচিত। তাঁর বয়স এখন ৮৬ হইয়াছে।’
এদিকে গোলটেবিল ব্যর্থ হয়ে যায়। আইয়ুব খান পদত্যাগ করেন এবং জেনারেল ইয়াহিয়া খান ক্ষমতা দখল করে সামরিক আইন জারি করেন। বিদায় ভাষণে আইয়ুব খান মূলত বলেন যে, ‘দুই পাকিস্তানের কোনো ভবিষ্যৎ নাই। পূর্বাঞ্চল কয়েক বছর টিকে থাকবে আর পশ্চিম পাকিস্তান কোনো রকমে টিকে থাকবে।… আমরা আশা করি, কোনো যাদু সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্নতা থেকে আমাদের রক্ষা করবে।’ বিদায় বেলায় অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে আইয়ুব খানের এই ভবিষ্যৎবাণী ছিল যথাযথ। আসলে দ্বিজাতিভিত্তিক কৃত্রিম রাষ্ট্র পাকিস্তানকে টিকিয়ে রাখার জন্য কোনো যাদুর কাঠি কারও কাছেই ছিল না। তবে কয়েক বছর নয়, দুই বছরের মধ্যেই শুরু হয়ে যায় পূর্ব বাংলাকে স্বাধীন করার জন্য সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ। তবে এর জন্য প্রয়োজন ছিল জনগণের ম্যান্ডেট।

সত্তরের নির্বাচন
সত্তরের নির্বাচনের আগে দুই পাকিস্তানের অবস্থা ছিল দুই রকম। পূর্বাঞ্চলে জনমত ছিল একতরফাভাবে আওয়ামী লীগের অনুকূলে আর পশ্চিমাঞ্চলে অনেকটাই ভুট্টোর অনুকূলে। ১৯৬৯ সালের ডিসেম্বরে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুবার্ষিকীতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব পূর্ব পাকিস্তানের নাম ‘বাংলাদেশ’ রাখার অভিপ্রায় ব্যক্ত করেন। সেই দিনগুলোতে নির্বাচন সামনে রেখে জনমতের প্রবল জোয়ারে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ তথা জাতীয় মূলধারা-বিরোধী প্রচার দানা বেঁধে উঠতে সক্ষম হয়নি। এমনকি কাউন্সিল মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলাম, নেজামে ইসলাম, পিডিপি একত্র হয়ে ‘ইসলাম পছন্দ ঐক্যজোট’ গঠন করলেও নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়ন দিতে ব্যর্থ হয় এবং ঐক্যজোট ভেঙে যায়। এ অবস্থায় চীনপন্থি বাম কমিউনিস্টরা ও ন্যাপ প্রধান ভাসানী ‘ভোটের আগে ভাত চাই’, ‘ভোটের বাক্সে লাথি মার, সমাজতন্ত্র কায়েম কর’ প্রভৃতি উগ্রবাম সেøাগান দিয়ে মাঠে নামে এবং উগ্র বক্তৃতা-বিবৃতি দিতে থাকেন। একপর্যায়ে তিনি ‘আসাম ব্যতীত পাকিস্তানের মানচিত্র অসম্পূর্ণ’ ঘোষণা দিয়ে ভারত-বিরোধী প্রচারণা শুরু করেন।
ইতোমধ্যে নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়। ফলে আবারও ক্ষোভ-বিক্ষোভ দানা বেঁধে উঠতে থাকে। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে স্বৈরশাসক ইয়াহিয়া খান ১৯৭০ সালের ৫ অক্টোবর জাতীয় পরিষদ নির্বাচন ও ২২ অক্টোবর প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনের তারিখ এবং নির্বাচনের আইনগত কাঠামো-এলএফও ঘোষণা করেন। নির্বাচনের তারিখ ঘোষণাকে জনগণ স্বাগত জানালেও এলএফও-এর আইনগত নানা দিক বিশেষত শাসনতন্ত্রে ‘ইসলামি আদর্শ রক্ষা করা হবে’ এবং ‘পাকিস্তান ইসলামি প্রজাতন্ত্র বলে অভিহিত হবে’ প্রভৃতি সব কথা পূর্ব বাংলার জনগণের চিন্তা-চেতনা ও দাবি-দাওয়ার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। আওয়ামী লীগ ও ন্যাপ এলএফও সংশোধনের আহ্বান জানায়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব এলএফও নিয়ে পরিস্থিতি ঘোলাটে করার পক্ষে ছিলেন না। তবে তিনি দলীয় ফোরামে বলেন, ‘নির্বাচন সমাপ্ত হলে আমি এলএফও টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে ফেলবো।’ তিনি তখন জনগণের প্রতি আস্থা ও বিশ^াস রেখে দ্রুত নির্বাচন চাইছিলেন। কেননা পূর্ব পাকিস্তানে আওয়ামী লীগের পক্ষে নিরঙ্কুশ গণজাগরণ প্রত্যক্ষ করে পাকিস্তানের শাসক ও শোষকগোষ্ঠী এবং দক্ষিণপন্থি ও প্রতিক্রিয়াশীল দলগুলোর পক্ষ থেকে ভেতরে ভেতরে নির্বাচন বানচাল বা পিছিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছিল।
এ সময়ে ‘নির্বাচনের পরিবেশ নেই’ বলে নানা ধরনের ষড়যন্ত্র চলতে থাকে। এরই মধ্যে বন্যার অজুহাত দেখিয়ে ইয়াহিয়া খান একতরফাভাবে নির্বাচনের তারিখ পরিবর্তন করেন। ঘোষিত হয় যে, ৭ ডিসেম্বর জাতীয় পরিষদ ও ১৯ ডিসেম্বর প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ডান ও দক্ষিণপন্থি দলগুলো তারিখ পরিবর্তনকে স্বাগত জানালেও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বলেন যে, যদি ডিসেম্বরে নির্বাচন না হয় তাহলে তিনি দুর্বার গণ-আন্দোলন গড়ে তুলবেন। ১২ নভেম্বর দক্ষিণাঞ্চলে স্মরণকালে ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় হলে সরকার আবারও নির্বাচনের তারিখ পরিবর্তনের প্রচেষ্টা নেয়। কেবল দক্ষিণপন্থিরাই নয়, ন্যাপ (মোজাফফর) পর্যন্ত এই পরিবর্তনের পক্ষে অবস্থান নেয়। নির্বাচন বয়কটের পক্ষে অবস্থান করেও চীনপন্থি বাম কমিউনিস্টদের নিয়ে মওলানা ভাসানী ‘ভোটের আগে ভাত চাই’ সেøাগান তুলে নির্বাচন পিছানোর পক্ষে দাঁড়ান।
এ পরিস্থিতিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব নির্বাচনের তারিখ পরিবর্তন প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করে বলেন, নির্বাচন নিয়ে যদি কোনো খেলা শুরু হয়, তাহলে তা আগুন নিয়ে খেলার শামিল হবে। সার্বিক বিচারে বলা যায়, সেই সময়ে সব ধরনের প্রতিকূলতা ও প্রচার মোকাবিলা করে সত্তরের ডিসেম্বরে নির্বাচন অনুষ্ঠিত করার সংগ্রামে আওয়ামী লীগ ছিল একা। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তানের ১৬৯ আসনের মধ্যে ১৬৭টি আসনে জয়লাভ করে ৩০০ আসনের জাতীয় পরিষদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। বাঙালি জনগণের এই বিজয়ে পাকিস্তানের শাসক-শোষকগোষ্ঠীর মাথায় কার্যত আকাশ ভেঙে পড়ে।

অসহযোগ আন্দোলন
নির্বাচনে বিজয়ের সাথে সাথে পাকিস্তানের শাসক-শোষকগোষ্ঠী ও তাদের পূর্ব পাকিস্তানের দালালরা চক্রান্ত চালানোর সাথে সাথে এমন প্রচার শুরু করে, যাতে আওয়ামী লীগ ৬-দফার ভিত্তিতে শাসনতন্ত্র রচনা না করতে পারে। ক্ষমতায় না বসতে দেওয়ারও চক্রান্ত চলতে থাকে। পাবনায় এমপি রফিক আহমদকে রাতের অন্ধকারে খুন করে হত্যার রাজনীতির ইঙ্গিত দেওয়া হয়। বিজয়ের পরপরই তাই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেন, ৬-দফার ভিত্তিতে শাসনতন্ত্র রচিত হবে এবং দ্রুত ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে। এটা সহ্য করার মতো অবস্থা পাকিস্তানের শোষক-শাসকগোষ্ঠীর ছিল না। এদিকে পিপলস পার্টির নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টো বলেন, তিনি পশ্চিম পাকিস্তানে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা, তাই তার কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে। এ নিয়ে শুরু হয় বাকবিত-া। সংকট গভীর হতে থাকে।
এ সময়ে ইয়াহিয়া খান এলএফও এবং ইসলাম ও পাকিস্তানের অখ-তা অক্ষুণœ রাখার বিষয়টি সামনে আনেন। ভুট্টো বলেন, তার দলের সহযোগিতা ছাড়া অন্য দল কেন্দ্রীয় সরকার পরিচালনা কিংবা শাসনতন্ত্র রচনা করতে পারবে না। শেখ মুজিব ৬-দফার ভিত্তিতে শাসনতন্ত্র প্রণয়ন ও ১১-দফা বাস্তবায়নের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান ব্যক্ত করেন। এ সময়ে মওলানা ভাসানী টাঙ্গাইলের সন্তোষে সম্মেলন আহ্বান করেন এবং ওই সম্মেলনে তাকে প্রধান করে একটি কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটিতে চীনপন্থি বাম কমিউনিস্ট নেতারা ছাড়াও আতাউর রহমান খান, শাহ আজিজুর রহমান, আমেনা বেগম প্রমুখরা ছিলেন। সেখানে তিনি পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। দেশের মানুষ এই ঘোষণাকে আমল দেওয়ার মতো অবস্থায় ছিল না। জনগণ তাকিয়েছিল বাংলার অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দিকে।
এ দিনগুলোতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে ‘দেশদ্রোহী’ হিসেবে আখ্যায়িত করার প্রচেষ্টা চলে এবং হত্যা বা ভয়ভীতি দেখিয়ে নত করার জন্য ৬-দফা ও ১১-দফা থেকে সরিয়ে নেওয়ার প্রচেষ্টা গ্রহণ করা হয়। পরিস্থিতি বুঝে তিনি ইয়াহিয়ার পিন্ডিতে যাওয়ার আহ্বান প্রত্যাখ্যান করেন। চলতে থাকে ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত। সাথে ভারত-বিরোধী প্রচার। ৩০ জানুয়ারি ‘গঙ্গা’ নামের একটি যাত্রীসহ বিমান কাশ্মীরী মুজাহিদীনরা হাইজ্যাক করে লাহোরে নিয়ে যায়। যাত্রী ও ক্রুদের জিম্মি করে বন্দী মুজাহিদীনদের মুক্তি দাবি করা হয়। ভারত সরকার দাবি অগ্রাহ্য করায় বিমানটি বোমার আঘাতে উড়িয়ে দেওয়া হয়। এ ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়ে বঙ্গবন্ধু বলেন যে, ‘লাহোরে হাইজ্যাককৃত ভারতীয় বিমানটি ধ্বংস করা হয়েছে শুনে বিস্মিত হয়েছি। আমি ঘটনার তদন্তের দাবি জানাচ্ছি।’ ওই বিবৃতিতে তিনি স্বার্থন্বেষীদের শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের বিরোধিতা ও ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত সম্পর্কে জনগণকে সচেতন থাকার আহ্বান জানান।
এসব প্রচার ও ষড়যন্ত্র-চক্রান্তের ধারাবাহিকতায় ১ মার্চ প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ৩ মার্চ অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় পরিষদ অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করেন। শুরু হয় অসহযোগ আন্দোলন। ২ মার্চ ঢাকায় অর্ধদিবস, ৩ মার্চ সারাদেশে পূর্ণ হরতাল ও ৭ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গণসমাবেশ আহ্বান করা হয়। এ কর্মসূচি পালনের সময় প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া ক্ষুব্ধ হয়ে বলেন, প্রেসিডেন্ট ও সামরিক আইন প্রধান হিসেবে ‘আমি পরিপূর্ণ ও নিরঙ্কুশভাবে পাকিস্তানের অখ-তা’ রক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ইতোমধ্যে তিনি নরমপন্থি এসএম আহাসানকে সরিয়ে প্রথমে লে. সাহেজাদা ইয়াকুব ও পরে গরমপন্থি জেনারেল টিক্কা খানকে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর ও সামরিক আইন প্রশাসক নিয়োগ করেন। সংবাদপত্রের ওপর সেন্সরশিপ চালু হয়।
তবে চাপে পড়ে ইয়াহিয়া খান ২৫ মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করেন। ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ ঘোষণা করার পর দেশবাসী বুঝে নেয় স্বাধীনতা সংগ্রাম শুরু হয়ে গেছে। তারপর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ও প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া কিংবা এ দুজনের সাথে জুলফিকার আলী ভুট্টোর যে আলোচনা হয়, তা ব্যর্থ হওয়া ভিন্ন অন্য উপায় ছিল না। ইতোমধ্যে ২৩ মার্চ ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে স্বাধীন দেশের পতাকা ওড়ানো হয় এবং উত্তোলনকালে কবিগুরুর ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি’ গানটি গাওয়া হয়। শুরু হয়ে যায় অস্ত্র ট্রেনিং। এসব ঘটনার ভেতর দিয়ে পাকিস্তান রাষ্ট্রটির কবর রচিত হয় এবং সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ সময়ের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়।
পাকিস্তানি আমলে বাঙালি জাতি ও আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের শাসক-শোষকগোষ্ঠী ও এ দেশীয় দালালদের অপপ্রচার ও মিথ্যাপ্রচার বিবেচনায় নিলে রাখাল বালকের সেই ‘বাঘ এসেছে, বাঘ এসেছে’ গল্পের কথা মনে পড়ে। পূর্ব বাংলার মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ বহু আশা-আকাক্সক্ষা ও স্বপ্ন নিয়ে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। শেষ পর্যায়ে তাদের সাথে সাধারণভাবে হিন্দু তফসিল সম্প্রদায়ের মানুষও সমর্থন জুগিয়েছিল। কিন্তু প্রথম থেকেই গণতন্ত্র ও বাঙালি জাতির অধিকার প্রতিষ্ঠার ন্যায্য দাবির আন্দোলনকে শাসক-শোষকগোষ্ঠী ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’ আখ্যায়িত করে। ‘বাঘ আসছে, বাঘ আসছে’ বলতে বলতে যেমন একদিন সত্যিই বাঘ চলে আসে এবং মিথ্যাবাদী রাখাল বালককে খেয়ে ফেলে, তেমনি মাত্র ২৩ বছরে ‘সাধের পাকিস্তান’কে রয়েল বেঙ্গল টাইগার খেয়ে ফেলে। এই নিবন্ধের দ্বিতীয় পর্ব বাংলাদেশ আমলে আওয়ামী লীগবিরোধী প্রচার বিবেচনায় নিলে দেখা যাবে, সেই মিথ্যাবাদী রাখাল যেন ভূত হয়ে জাতির ঘাড়ে এখনও চেপে আছে।

পাঠকের মন্তব্য:

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না। তারকাচিহ্নযুক্ত (*) ঘরগুলো আবশ্যক।

*