বিভাগ: আন্তর্জাতিক

‘আমরা অনেক যুদ্ধ দেখেছি, এখন শান্তি চাই’

59সাইদ আহমেদ বাবু: বিশ্বের শীর্ষ ক্ষমতাধর দেশ আমেরিকা স্বাধীনতা লাভ করে ১৭৭৬ সালে। ২ জুলাই ব্রিটেনের শাসন থেকে আলাদা হওয়ার জন্য ভোট দেয় দেশটির দ্বিতীয় কন্টিনেন্টাল কংগ্রেস। দুদিন পর স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে চূড়ান্ত অনুমোদন দেয় কংগ্রেস। কিন্তু আলাদা হতে ব্রিটেনের সাথে চূড়ান্ত সই ২ আগস্টে অনুষ্ঠিত হলেও প্রত্যেক বছর ৪ জুলাই স্বাধীনতা দিবস উদযাপন করে দেশটি। এরপর গেল ২৪০ বছরের ইতিহাসে জর্জ ওয়াশিংটন থেকে বারাক ওবামা পর্যন্ত ৪৪ জন প্রেসিডেন্টের নেতৃত্ব পেয়েছে দেশটি।
আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্রীয় প্রজাতান্ত্রিক সরকার বিদ্যমান। দেশটির আইনসভা দু’কক্ষের। নিম্নকক্ষের নাম হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস এবং এর সদস্য সংখ্যা ৪৩৫। উচ্চকক্ষের নাম সিনেট এবং এর সদস্য সংখ্যা ১০০। ভোট দেওয়ার যোগ্যতা অর্জনের বয়স ১৮। ১৭৮৭ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর দেশটির সংবিধান প্রণয়ন করা হয় এবং ১৭৮৯ সালের ৪ মার্চ থেকে এটি কার্যকর করা হয়। সুপ্রিমকোর্ট দেশের সর্বোচ্চ বিচারালয়।
প্রায় ২৩০ শতাব্দী আগে প্রণীত আমেরিকার সরকার ব্যবস্থা সারাবিশ্বের প্রশংসা লাভ করেছে। মার্কিনীদের জীবনের সাথে এটি অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। মার্কিন সরকারব্যবস্থা শুরু থেকেই গণতন্ত্রকে শাসনব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করেছে। মার্কিন সরকার ব্যবস্থা যুক্তরাষ্ট্রীয়, প্রাদেশিক ও স্থানীয় আইন এবং এগুলোকে নির্বাহকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সমন্বয় গঠিত। ফেডারেল যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকারের কেন্দ্র ওয়াশিংটন ডিসি।
আমেরিকা সরকারের একটি মূলনীতি হলো প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্র। এ ব্যবস্থায় লোকরা তাদের নিজেদের নেতা নির্বাচনের মাধ্যমে নিজেদের শাসন করে। মার্কিন গণতন্ত্র বেশ কিছু আদর্শের ওপর প্রতিষ্ঠিত। শীর্ষ ক্ষমতাধর দেশ হওয়ায় এখানে গণতন্ত্র ও নির্বাচন নিয়ে সারাবিশ্বের মানুষেরই আগ্রহ রয়েছে। তা ছাড়া ৪৪ জনের প্রত্যেকেই বিশ্বের সামগ্রিক রাজনীতি ও অর্থনীতির পালাবদলের ভূমিকায় আলোচিত এবং সমালোচিত। এদের অনেকেই দেশের সীমানা পেরিয়ে, পৃথিবীর ইতিহাসে স্বমহিমায় উজ্জ্বল-আলোচিত-সমালোচিত। বিশ্বজুড়ে বিতর্কিতও হয়েছেন অনেক প্রেসিডেন্ট। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ঘিরে রয়েছে নানারকম ঘটনা।
জনগণকে সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামত মেনে নিতে হবে। সংখ্যালঘুদের অধিকার সংরক্ষণ করতে হবে। নাগরিকদের আইনি শাসনব্যবস্থায় বাস করার জন্য সম্মত হতে হবে। মতামত ও ধারণার মুক্ত আদান-প্রদানে কোনো বাধার সৃষ্টি করা যাবে না। আইনের চোখে সবাই সমান। সরকার জনগণের সেবায় নিয়োজিত হবে এবং এর ক্ষমতা জনগণের কাছ থেকেই আসবে।
এই আদর্শগুলো বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আমেরিকার সরকারব্যবস্থা ৪টি উপাদান দিয়ে গঠন করা হয়েছে। ১. জনগণের সার্বভৌমত্ব ২. প্রতিনিধিত্বমূলক সরকার ৩. ক্ষমতার পরীক্ষা ও ভারসাম্য (ঈযবপশং ধহফ ইধষধহপবং) এবং ৪. ফেডারেলবাদ, যেখানে সরকারের বিভিন্ন স্তরে বিভিন্ন ধরনের ক্ষমতার অংশীদারিত্ব হয়।
ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তির হাত থেকে স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনার পর ১৭৮৯ সালে আমেরিকার প্রথম প্রেসিডেন্ট হন জর্জ ওয়াশিংটন। যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রবাদপুরুষ জর্জ ওয়াশিংটন দুই দফায় ছিলেন দেশের প্রেসিডেন্ট।
ক্রীতদাস প্রথা উচ্ছেদের কারণে আব্রাহাম লিঙ্কন এখনও জগদ্বিখ্যাত, তেমনি টমাস জেফারসন বর্ণবাদের বিরুদ্ধে কথা বলা প্রথম প্রেসিডেন্ট। তিন দফায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট থাকাদের তালিকায় সবার আগে ফ্রাঙ্কলিন ডি রুজভেল্টের নাম; এ ছাড়া জন এফ কেনেডি, রোনাল্ড রিগ্যান এখনও অনুসরণীয় আদর্শ।
কুখ্যাত হয়ে আছেন এমন প্রেসিডেন্টের সংখ্যাও কম নয়। রিচার্ড নিক্সন, যিনি কি-না কেলেঙ্কারির জন্য পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। গৃহযুদ্ধের জন্য দায়ী ফ্রাঙ্কলিন পিয়ের্স, আর আব্রাহাম লিঙ্কনের অমর কীর্তি ধ্বংস করার কুখ্যাতি রয়েছে অ্যান্ড্রু জনসনের। এ ছাড়া বিতর্কিত নীতিসহ বিভিন্ন কারণে সবচেয়ে আগ্রাসী ও যুদ্ধবাজ হিসেবে নাম জর্জ ডব্লিউ বুশের।
পাশ্চাত্যের ভোট ব্যবস্থা বিশ্বজুড়ে রোল মডেল হলেও প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে বেশ কয়েকবার। ১৮০০, ১৮২৪, ১৮৭৬, ১৮৮৮ সালের নির্বাচনসহ ২০০০ সালেও অভিযোগ উঠে কারচুপির।
এবারের নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও হিলারি ক্লিনটনের মধ্যে জনমত জরিপের ব্যবধান বেশ আলোচিত শেষ বেলায়। এ ধরনের ঘটনা অবশ্য এবারই প্রথম নয়। এর আগেÑ ১৮৭৬, ১৯১৬, ১৯৪৮, ১৯৭৬ সালের মূল নির্বাচনে মাত্র কিছু ভোটের ব্যবধানে হেরে যেতে হয়েছে একজনকে। এমনকি ২০০০ সালের নির্বাচনে বুশের সাথে তার প্রতিদ্বন্দ্বীর মধ্যে ব্যবধান ছিল মাত্র ৫টি ইলেক্টোরাল কলেজ।
কংগ্রেসের যৌথ সেশনে ট্রাম্পের প্রথম ভাষণ
মার্কিন প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেওয়ার পর, প্রথমবারের মতো কংগ্রেসের যৌথ সেশনে ভাষণ দিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, বিশ্বকে প্রতিনিধিত্ব করা আমার কাজ নয়। আমার কাজ হলো যুক্তরাষ্ট্রকে প্রতিনিধিত্ব করা। যুক্তরাষ্ট্রকে মহান করে তুলতে আগের প্রতিশ্রুতিরই পুনরাবৃত্তি করেন তিনি। আর যুক্তরাষ্ট্র সকল দেশের অধিকারকে সম্মান করে। যুক্তরাষ্ট্রকে এগিয়ে নিতে প্রয়োজনে আরও বেশি কঠোর হওয়ার হুঁশিয়ারি দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
বক্তব্যের শুরুতেই ইহুদি জনগোষ্ঠীর ওপর বিদ্যমান হুমকি ও এক ভারতীয় নাগরিকের বর্ণবাদী হামলায় নিহতের ঘটনার সমালোচনা করেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, সেই শুরু থেকে আজ পর্যন্ত সত্য, স্বাধীনতা ও ন্যায়ের আলো ছিল প্রতিটি মার্কিন প্রজন্মের হাতে। এ আলো এখন আমাদের হাতে। আর এটি আমরা সারাবিশ্বকে আলোকিত করার কাজে ব্যবহার করব। আমি আজ এখানে ঐক্যশক্তির বার্তা নিয়ে হাজির হয়েছি। আর এটি আমার হৃদয় থেকে উৎসারিত।
তিনি বলেন, নীতির কারণে আমরা বিভক্ত জাতি হতে পারি কিন্তু বিদ্বেষ ও খারাপের বিরুদ্ধে আমরা সবাই একতাবদ্ধ। যুক্তরাষ্ট্রের মহত্বের এক নতুন অধ্যায় এখন থেকে শুরু হছে। একটি নতুন জাতীয় অহঙ্কার আমাদের দেশজুড়ে বয়ে যাছে। অসম্ভব স্বপ্নগুলো আমাদের হাতের মুঠোয় আসতে যাছে। আমরা নব আমেরিকান উদ্দীপনা দেখতে পাছি।
তিনি বলেন, আমাদের দেশের ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ধারণে কয়েক দশক ধরে চলে আসা ভুল আমি আর বরদাশত করব না। একের পর এক আমরা বৈশ্বিক বিভিন্ন প্রকল্পে অর্থায়ন করেছি। এর বিপরীতে উপেক্ষা করেছি আমাদের শিশুদের ভবিষ্যৎকে।
যুক্তরাষ্ট্রকে, সন্ত্রাসবাদ থেকে বাঁচাতে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেন ট্রাম্প। এজন্য মুসলিম মিত্র দেশগুলোকে সাথে নিয়ে কাজ করার ঘোষণা দেন।
এ ছাড়া অভিবাসন আইন সংস্কার ও মেক্সিকো সীমান্তে প্রাচীর সুরক্ষায় তার নেওয়া পদক্ষেপের ব্যাখ্যা দেন ট্রাম্প। মার্কিনীদের নতুন কর্মসংস্থান তৈরি, মজুরি বৃদ্ধি আর জাতীয় নিরাপত্তার জন্য অভিবাসন আইনের ইতিবাচকভাবে সংস্কার জরুরি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ট্রাম্প বলেন, কর্মসংস্থান সংকোচনের জন্য দায়ী ট্রান্স-প্যাসিফিক পার্টনারশিপ (টিপিপি) থেকে আমরা এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করেছি। বিনিয়োগে নারীদের আকৃষ্ট করতে কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোর সহায়তায় একটি কাউন্সিল গঠন করা হয়েছে। ট্রাম্প এদিন ন্যাটো সম্পর্কে তুলনামূলক নমনীয় মনোভাব তুলে ধরেন। একই সাথে মুসলিম বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের সাথে একযোগে কাজ করার প্রত্যয়ও ব্যক্ত করেন তিনি।
ট্রাম্প বলেন, আমাদের পররাষ্ট্রনীতি হবে বিশ্বের সাথে আরও সরাসরি, মজবুত ও অর্থবহ সম্পৃক্ততা। বিশ্বে আমাদের মিত্রদের নিরাপত্তার স্বার্থের ভিত্তিতে এই সম্পর্ক গড়ে উঠবে। ন্যাটোর প্রতি আমাদের দৃঢ় সমর্থন রয়েছে। তবে অংশীদারদের অবশ্যই অর্থনৈতিক বাধ্যবাধকতা মেনে চলতে হবে। সামরিক ব্যয়ের ন্যায্য অংশ তাদের দিতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র আজ সাবেক শত্রুর বন্ধু। আমরা শান্তি চাই। এটাই আমাদের লক্ষ্য, গন্তব্য।
তিনি বলেন, ৯ বছর পর যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ২৫০ বছর পালিত হবে। সে দিনটিতে দাঁড়িয়ে আমরা আজকের দিনটাকে ঘুরে দাঁড়ানোর দিন হিসেবে দেখব। আমরা অনেক যুদ্ধ দেখেছি, এখন শান্তি চাই। ২৫০তম স্বাধীনতা দিবসে যুক্তরাষ্ট্রকে শান্তিময় ও ন্যায়ভিত্তিক হিসেবে দেখা যাবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

পাঠকের মন্তব্য:

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না। তারকাচিহ্নযুক্ত (*) ঘরগুলো আবশ্যক।

*