আম্রপালির ঘ্রাণ

Posted on by 0 comment

44স্বকৃত নোমান: এবং তখন পারভিনের মনে পড়ে আম্রপালি আমের কথা। আ¤্রপালি, না আমরুপালি? সে ঠিক জানে না সঠিক নাম কোনটি। জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ় মাসে তার বাবা প্রায়ই হাট থেকে কিনে আনতো। বাড়ি ফেরার সঙ্গে সঙ্গে থলেটা বাবার হাত থেকে কেড়ে নিয়ে আমের ঠোঙাটা বের করে একটা আম হাতে নিয়ে সে চামড়া ছিলতে শুরু করত। তার মা বকতো, ‘শকুনের লাগান ইংকা শুরু করলু ক্যা? বিষ না ধুয়ে খাচ্চু, মরবু তো!’ তার হাতের তালু তো তখন মিষ্টি রসে ভরা, চোখ বন্ধ করে চুষছে―মরার কথা কি কানে ঢোকে!
আ¤্রপালি হোক বা আমরুপালি―কৈশোরের সেই আমের কথা মনে পড়ার পরমুহূর্তে মনে পড়ে গেল তার বুড়ো দাদির মুখখানা। দাদির মুখখানাও ছিল ঠিক আ¤্রপালি বা আমরুপালির মতো। লম্বা। আমের রং হলুদ, দাদির শ্যামলা―পার্থক্য শুধু এটুকু। সে চোখ বন্ধ করে আ¤্রপালি বা আমরুপালির ঘ্রাণ শোঁকে। তখন শুনতে পায় বাতাসে ভেসে আসা গান, ‘এখানে আম কুড়াবার ধুম লেগেছে চলো না অন্য কোথাও যাই।’ কোত্থেকে ভেসে আসছে এই সুর? আকরামউল্লাহর মতো কোনো আইসক্রিমঅলা বুঝি কাস্টমার আকৃষ্ট করতে সিডি প্লেয়ারে গানটা বাজাচ্ছে।
পারভিন তখন ভাবে, জান্নাতে কি আ¤্রপালি বা আমরুপালি খেতে দেওয়া হবে? আকরামউল্লাহ, মোফাজ্জেল হোসেন বা তার স্বামী শফিউল আযম তো কখনও বলেনি জান্নাতে আম-কাঁঠাল পাওয়া যায়। ভাবনাটি সহসা তলিয়ে গেল এই প্রশ্নের নিচে―আচ্ছা, জান্নাতে তো পুরুষেরা সত্তুর হাজার হুর পাবে, বেশুমার গেলমান পাবে, আমি তো নারী, আমি কী পাব? নারীরাও কি সত্তুর হাজার সুপুরুষ পাবে? আকরামউল্লাহ বেঁচে থাকলে জিজ্ঞেস করা যেত। সে মুখ থুবড়ে পড়ে আছে আলের ধারে শুকাতে দেওয়া খড়ের ওপর। বোমার স্পিøন্টারের আঘাতে তার নাড়িভুঁড়ি বেরিয়ে গেছে। কোরবানির গরুর মতো রক্ত বেরুচ্ছে, মাটি শুষে নিচ্ছে সেই রক্ত। তার সিথানের দিকে একটি গর্ত থেকে মস্ত একটি ইঁদুর মাথা বের করে রক্ত শোঁকে, তার লাশের চারদিকে চক্কর দিয়ে লেজ নাড়াতে নাড়াতে আবার গর্তে ঢুকে পড়ে।
নিশ্চয় রহমতের ফেরেশতা! পারভিন ভাবে। ইঁদুরের রূপ ধরে রহমতের ফেরেশতা বুঝি আকরামউল্লাহর লাশ পাহারা দিচ্ছে। আকরামউল্লাহ প্রায়ই বলতো, ‘আল্লার পতত যারা শইদ হয় তাগেরে লাশ পচেনা, রহমতের ফেরেসতারা কেয়ামত পর্যুন্ত তাগেরে লাশ পওর দ্যায়।’ হতেও তো পারে। নইলে এত বড় ইঁদুর এলো কোত্থেকে? গত তিন মাসে তো এ বাড়ির আশপাশে এত বড় ইঁদুর দেখা যায়নি।
তিন মাস, না তারও বেশি? আঙুলের কড়া গুনে সে হিসাব করে―মার্চের তের তারিখ থেকে মে-র এগার তারিখ। কতদিন হয়? তের থেকে তের তিন মাস, দুই বাদ দিলে দুই মাস আটাশ দিন। অর্থাৎ প্রায় তিন মাস। তিন মাস! পারভিনের অবাক লাগে। চোখের পলকেই এতগুলো দিন কেটে গেল! অথচ তার মনে হয় এই সেদিন সে স্বামী-সন্তানের সঙ্গে এখানে, এই মাছমারা গ্রামে আসে। তারা আসে বাগমারা থেকে। গ্রামের নাম শুনে পারভিনের হাসি পেয়েছিল। বাগমারা থেকে মাছমারা! আকরামউল্লাহ বলেছিল, একটা সময় এখানে বিল ছিল। বেশিদিন আগের কথা নয়, তার দাদার আমলে। তার পৈতৃক বাড়ি তো মাছমারার উত্তরের গ্রাম বেনীপুরে। বেনীপুরের লোকেরা তখন এই বিলে মাছ মারতে আসতো। কত রকমের মাছ যে পাওয়া যেত! মাছ মারতে মারতে বিলের নামই রেখে দিল মাছমারা বিল। পরে যখন বিল ভরাট হয়ে বসতি গড়ে উঠল, মাছমারা বিলের ‘বিল’ বাদ পড়ে থাকল শুধু মাছমারা।
বাগমারা থেকে এসে স্বামী-সন্তানের সঙ্গে পারভিন প্রথমে আকরামউল্লাহর বেনীপুরের বাড়িতেই উঠেছিল। ছিল এক সপ্তাহ। বেনীপুরে ঘনবসতি। বাড়ির পাছায় বাড়ি, ঘরের পাছায় ঘর, লেট্রিনের পাছায় লেট্রিন। এই ঘরে পাদ দিলে ওই ঘরে শোনা যায়। এত মানুষের দঙ্গলে তো আর জেহাদের গোপনীয়তা রক্ষা করা যায় না। মোফাজ্জেল হোসেন বলেছিল, জেহাদের কাজ করতে হয় নিরালায়, লোকচক্ষুর অন্তরালে। রমজান মাসের শেষ দশ দিন মুসল্লিরা যেভাবে মসজিদে এতেকাফে বসে নির্জনে আল্লাহ তায়ালার এবাদত-বন্দেগি করে ঠিক সেভাবে। বেনীপুর নামটাই তো তাগুতি। গ্রামে তাগুতিরা গিজগিজ করছে। প্রকৃত মুসলমান আছে কজন? সবাই তো নামে মুসলমান। তাদের বাপ-দাদা মুসলমান ছিল, সেই সুবাদে তারাও মুসলমান। বাপ-দাদা নামাজ-রোজা করত, সেই সুবাদে তারাও করে। তারা নামাজ পড়ে, আবার হিন্দি সিনেমার নাচ-গানও দেখে। রোজা রাখে, আবার দুর্গাপূজা-যাত্রাপালাও দেখে। তার উপর ভোট দেয় তাগুতি পার্টিকে। তাদের ওসব এবাদত যে আল্লাহর দরবারে কবুল হয় না, আখেরাতে যে তাদের স্থান হবে জাহান্নামে, তা তারা বুঝতে পারে না।
প্রায় মাস ছয় আগে মোফাজ্জেল হোসেনের কথামতো মাছমারা গ্রামের দক্ষিণে পৈতৃকসূত্রে পাওয়া আবাদি ভরাট করে বাড়িভিটা তৈরি করে আকরামউল্লাহ। জায়গাটা নির্জন। গ্রামের সর্বশেষ বাড়িটা ভিটা থেকে প্রায় আধ মাইল উত্তরে। দক্ষিণে বিস্তীর্ণ আবাদি। বর্ষায় ডুবে থাকে গলা পানির নিচে। ধানের মৌসুম ছাড়া গ্রামের কেউ এদিকে আসে না তেমন। পারভিনরা আসার পর তাড়াহুড়ো করে একটা ঘর তুলে নিল আকরামউল্লাহ। উপরে টিনের দোচালা, চারদিকে বাঁশের বেড়া। ভেতরে চারটি কামরা। একটিতে থাকে আকরামউল্লাহর বড় ছেলে চিশতি, একটিতে তার শ্যালক সাফাত, একটিতে বউ আবিদাকে নিয়ে আকরামউল্লাহ এবং বাকি একটিতে গাদাগাদি করে পারভিন, তার স্বামী শফিউল এবং তাদের চার ও সাত বছর বয়সী দুই ছেলে। ঘরের সামনের বারান্দায় শন দিয়ে ছোট্ট যে কামরাটি করা হয় সেটি মোফাজ্জেল হোসেনের জন্য বরাদ্দ। মোফাজ্জেল আসে শহর থেকে। সপ্তাহে একবার। দুদিনের বেশি থাকে না। জামায়াতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের সামরিক শাখার বিভাগীয় প্রধান সে। আকরামউল্লাহর দূরসম্পর্কের মামাতো ভাই। জেএমবিতে আকরামউল্লাহর যোগদান তার হাত ধরেই।
সংগঠনিক কাজে বাগমারা এলাকায় প্রায় চার মাস থাকতে হয়েছিল আকরামউল্লাহকে। ফেরি করে আইসক্রিম বিক্রি করত এবং গোপনে সংগঠনের সদস্য সংগ্রহ করত। থাকত শফিউল আযমের বাড়িতে। থাকা-খাওয়া বাবদ দিতে হতো মাসে এক হাজার টাকা। শফিউলের পেশা ছিল ফেরি করে শাড়ি-কাপড় বিক্রি। সারাদিন গ্রাম-গঞ্জে ঘুরে সন্ধ্যায় উঠানে পাটি পেতে বসতো দুজন। রান্নাবান্না শেষ করে পারভিনও যোগ দিত। তখন জেহাদের ফজিলত বিষয়ে বয়ান শুরু করে দিত আকরামউল্লাহ। শফিউল ও পারভিন মুগ্ধ হয়ে শুনতো।
চার মাস পর আকরামউল্লাহ যখন চলে গেল, যে শফিউল দুই ঈদের নামাজ ছাড়া সারাবছর মসজিদে যেত না, যে পারভিন বিয়ের পর কোনোদিন এক অক্ত নামাজ পড়েনি, এভাবে কিনা বদলে গেল! পাস করা মাওলানার মতো গ্রামের লোকজনের কাছে ওয়াজ-নসিহত শুরু করে দিল। শফিউলের বাবা-মা নামাজের ধার ধারত না। গাঁ-গ্রামের চাষাভুষা মানুষ তার বাবা, সারাদিন ক্ষেতে-খামারে খেটে মরে, তার মায়েরও দিন যায় সংসার সামলাতেই, ধর্মকর্ম নিয়ে মাথা ঘামানোর এত সময় কই। জেএমবিতে যোগ দিয়ে বাবা-মাকে শফিউল নামাজের তাগাদা দেওয়া শুরু করল, বোরকা ছাড়া মাকে বাড়ির বাইরে বেরোতে বারণ করে দিল। এসব নিয়ে সংসারে শুরু হলো ঝগড়া-ফ্যাসাদ। তার বাবা-মা যখন প্রায় অতীষ্ঠ, মোজাজ্জেল হোসেনের নির্দেশে সপরিবারে হিযরতে বেরিয়ে পড়ল শফিউল।
মাছমারায় থাকা তো আকরামউল্লাহর বাড়িতে, কিন্তু খাওয়া? আকরামউল্লাহ বলল, ‘প্যাট দেচে যাই খাবেরও দিবি তাই। বাগমারায় যা করিচ্চিলে এটিউ তাই করবে। সেগলে ছাড়াও সংগঠনের কাজ তো আচেই।’ মোফাজ্জেল এসে শফিউল ও পারভিনকে বোমা তৈরির প্রশিক্ষণ দিয়ে যায়। বোমা বানানো শিখতে তাদের এক সপ্তাহর বেশি লাগল না। আকরামউল্লাহ ও শফিউল সারাদিন গ্রামফেরি করে সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে হাত-মুখ ধুয়ে বসে যায় বোমা তৈরির কাজে। রাত দশটা-এগারোটা পর্যন্ত চলে বোমা তৈরির কাজ। সপ্তাহ শেষে মোফাজ্জেল এসে নিয়ে যায়। এত বোমা মোফাজ্জেল কোথায় নিয়ে যায় কেউ জানে না। আকরামউল্লাহ হয়তো জানে, কিন্তু মুখ খোলে না। বউ আবিদার কাছেও না। শফিউল একবার জানতে চেয়েছিল, সে মুখ খোলেনি। দ্বিতীয়বার প্রশ্ন করেনি শফিউল। কেন করবে? আকরামউল্লাহ তার নেতা, সে যা হুকুম করবে তাকে তাই করতে হবে―সংগঠনের এই নিয়ম। প্রশ্ন করা বারণ।
শেষবার মোফাজ্জেল এসে দুটি বন্দুক, পাঁচটি চাপাতি, বোমা তৈরির দশ কেজি সরাঞ্জাম এবং আটটি সুইসাইড ভেস্ট রেখে যায়। সেদিনই শফিউল প্রথম জানতে পারে মোফাজ্জেলকে পুলিশ খুঁজছে। জেএমবির শীর্ষ নেতাদের যে তালিকা তৈরি করেছে পুলিশ সেখানে তার নাম চার নম্বরে। যাওয়ার সময় মোফাজ্জেল বলে গেল, ‘হামি আর নাই আসপের পারি। পুলিশ হামাক পাগলা হয়ে খুঁজিচ্চে। এক জাগাত লিত্তিদিন আলে ধরা পরে যামো। হামার বদলে আবুবকর আসে মালপত্র লিয়ে যাবি। এটি তোমাগেরে কুনু ঝামেলা হবির লয়। জাগাটা লিরাপদ।’
আকরামউল্লাহও নিজের বাড়িকে নিরাপদ ভেবেছিল। কোথায় অজগ্রাম মাছমারা! বগুড়া শহর থেকে কত দূরে! রাস্তাঘাটের যে হাল, পুলিশ কি এখানে মরতে আসবে? কিন্তু তার ভাবনা ভুল প্রমাণিত করে, যেদিন মোফাজ্জেল চলে গেল সেদিন রাতেই বাড়ি ঘেরাও করল পুলিশ। রাতভর বন্দুক তাক করে রাখল বাড়ির দিকে, অথচ বাড়ির কেউ একটিবার টের পেল না। কীভাবে পাবে? অমাবস্যার ঘুটঘুটে অন্ধকার রাত। পুলিশ তো আর জানান দেয়নি যে তারা বাড়ি ঘেরাও করেছে। একটা টুঁ শব্দ পর্যন্ত করেনি।
ফজরের নামাজের অজু করতে দুয়ার খুলে আকরামউল্লাহ যখন উঠানে দাঁড়াল তখন মানুষের গলার আওয়াজ শুনতে পেল। গায়ে কাঁটা দিল তার। সন্তর্পণে কুয়ার পাড়ে কলমিঝোঁপের আড়ালে দাঁড়িয়ে সে ভালো করে ঠাওর করল। বাড়ির চারদিকে নীল পোশাকের বিস্তর মানুষ। নিশ্চয়ই পুলিশ! কলিজার পানি শুকিয়ে গেল তার। পেশাবের বেগ পেয়েছিল খুব। আর ধরে রাখতে পারল না, লুঙ্গিটা ভিজিয়ে দিতে লাগল নিজের অজান্তেই। লুঙ্গি ভেজাতে ভেজাতে একদৌড়ে ঘরে ঢুকে দরজাটা বন্ধ করে দিল। ডাকাডাকি করে সবার ঘুম ভাঙাল। সে বুঝতে পারছিল না কী করা উচিত। শফিউল বলল, ‘মোফাজ্জেল ভাইওক ফোন দ্যান।’ ফোন দিলো আকরামউল্লাহ। মোফাজ্জেল হোসেন বলল, ‘সুইসাইডাল ভেস্ট পরে ল্যাও। তোমাগেরে জন্যি অপেক্ষা করিচ্চে দুদ আর মদুর নওর, অগুনতি হুর আর গেলমান। ফি আমানিল্লে। জান্নাতুল ফেরদৌসোত তোমাগেরে সাতে দেকা হবি।’
হঠাৎ গাড়ির শব্দ উঠল দক্ষিণের মাঠে। চমকে উঠল সবাই। আকরামউল্লাহ বলল, ‘পুলিশের গাড়ি মনে হচ্চে।’ তার কথা শেষ হওয়ার আগেই বেড়ার ফাঁক দিয়ে পানির ছটা ঢুকতে লাগল ভেতরে। এমনই দমকা ঝাপটা, বেড়াটা ভেঙে পড়ার উপক্রম। আকরামউল্লাহ দ্বন্দ্বে পড়ে গেল। বাইরে গিয়ে তো সে আকাশে মেঘ দেখেনি, হঠাৎ বৃষ্টি শুরু হলো কোত্থেকে? সন্ত্রস্ত গলায় আবিদা বলল, ‘আল্লাহু আকবার! সবই তার কুদরোত। ঝড়-বিষ্টি দিয়ে তিনি তাগুতি শক্তিক হোটে দবার ব্যবচতা করিচেন।’ শফিউলের চোখ ঘোলা। পরওয়ারদিগারের অসীম কুদরত দেখে তার হুঁশ হারাবার দশা। পাশের কামরায় গিয়ে বেড়ার বড় একটা ফুটোয় চোখ রাখল সে। ট্রাকের মতো বড় বড় দুটি গাড়ি দেখতে পেল। দুই গাড়ি থেকেই পানি মারা হচ্ছে। গাড়ির আশপাশে দাঁড়ানো লোকগুলোর পোশাক দেখে তাদের চিনতে অসুবিধা হলো না তার। চাপা গলায় বলল, ‘সব্বোনাশ! এরা তো দমকল বাহিনীর লোক!’
আবিদার শরীরে ভয়ের কাঁপুনি উঠল। আকরামউল্লাহ বলল, ‘মর্দে মুজাহিদিনেগেরে ইংকা করেই পরীক্কে দেওয়া লাগে, ভয়ের কুনু কারণ নাই।’ স্বামীর কথা শুনে বুকে বল পায় আবিদা। কাঁপুনিটা থেমে আসে। আল্লাহু আকবার ধ্বনি দিয়ে বলে, ‘আল্লার আস্তাত জিহাদে ঝাঁপে পড়ার এডেই তো সময়। হামি জিহাদ করবের চাই।’ আকরামউল্লাহর চেহারা উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। বউয়ের কপালে চুমু খেয়ে বলে, ‘সুবহানাল্লাহ! হামি লেককার বউ পাচি। আকিরাত লিয়ে হামার আর কুনু চিন্তে নাই। একটা কাফেরের কল্লার বদলে যুদি জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব হয়, তা’লে আর লেট করিচ্চো ক্যা আবিদা?’
আবিদার পরনে ছিল ঢোলা মেক্সি। আগে শাড়ি পরত। জেএমবিতে যোগ দেওয়ার পর মেক্সি পরা ধরেছে। কেননা মোফাজ্জেল হোসেন বলেছে, শাড়ি হিন্দুয়ানি পোশাক, মেক্সি সুন্নতি। কিন্তু মেক্সি পরে দৌড়ানো যায় না, দৌড়ের জন্য সেলোয়ার-কামিজ যুুতসই। কাপড়ের বস্তায় তুলে রাখা দুই জোড়া সেলোয়ার-কামিজের এক জোড়া নামিয়ে দ্রুত পরে নিল আবিদা। মোফাজ্জেলের রেখে যাওয়া সবচেয়ে ধারালো চাপাতিটা হাতে নিয়ে দরজার সামনে দাঁড়াল। বউয়ের কপালে আবারও চুমু খেল আকরামউল্লাহ, ‘তোমার মুক নূরের আলোত জ্বলজ্বল করিচ্চে বউ। যাও, নারায়ে তাকবির কয়ে ঝাঁপে পড়ো।’
দরজা খুলে বুভুক্ষু বাঘিনীর মতো জেহাদি জোশে ছুট লাগাল আবিদা। দমকল বাহিনীর কর্মীরা কিছু বুঝে উঠার আগেই সে একজনের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। প্রথম আঘাতটা করল লোকটার বাহুতে। লোকটা চিৎকার করে উঠল। দ্বিতীয় আঘাতটা করল তার ঘাড়ে। লোকটা হাঁটুগেড়ে বসে পড়ল। তৃতীয় আঘাতটা করল তার মাথায়। লোকটা উপুড় হয়ে পড়ে গেল। আত্মঘাতী হামলার আশঙ্কায় ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ল পুলিশ-বাহিনী। ফোর্সের দায়িত্বপ্রাপ্ত এএসপির কমান্ডে সবাই আবার অস্ত্র তাক করে দাঁড়াল। আবিদাকে লক্ষ করে গুলি ছুঁড়লেন এএসপি। লক্ষ্যভ্রষ্ট হলো। এক দৌড়ে ঘরে ঢুকে পড়ল আবিদা।
তখন সকাল প্রায় সাড়ে নয়টা। পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিট, পুলিশ সদর দফতরের এলআইসি শাখার সদস্যরা, জেলা পুলিশ সুপার এবং আরও দুই প্লাটুন পুলিশ এলো অকুস্থলে। আকরামউল্লাহর ঘর থেকে তখন শুরু হলো মুহুর্মুহু বোমা নিক্ষেপ। জবাবে পুলিশের গুলি। বোমা ও গুলির শব্দে কেঁপে উঠতে লাগল মাছমারা গ্রাম। শত শত মানুষ জড়ো হতে লাগল বাড়িটার চারদিকে। পুলিশের বাধা মানছে না কেউ। হাতমাইকে পুলিশ যতই সাবধান করে মানুষের ভিড় ততই বাড়ে। বাড়বে না? কে কবে এই অজগ্রামে বোমা-গুলির শব্দ শুনেছে? কেউ তো কখনও ধারণাও করতে পারেনি গ্রামের শেষ মাথায় এমন একটা জঙ্গি আস্তানা থাকতে পারে। আদনা আইসক্রিমঅলা আকরামউল্লাহ কিনা তলে তলে এত দূর পৌঁছে গেল!
জনতার ভিড় সামাল দিতে না পেরে অকুস্থলের এক মাইল এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করে দিল পুলিশ। তবু মানুষের ভিড় কমত না, যদি না স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান উদ্যোগ নিতেন। তিনি হাতমাইকে কৌতূহলী জনতাকে ঘরে ফিরে যাওয়ার অনুরোধ করলেন। খানিকের মধ্যে জনশূন্য হয়ে পড়ল গোটা এলাকা। অভিযানের চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিতে শুরু করল যৌথবাহিনী। অপারেশন সান ডেভিল।
বেলা তখন প্রায় এগারোটা। কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের প্রধান জাহিদুল ইসলাম হাতমাইকে ঘোষণা করলেন, ‘ভেতরে কে আছেন আত্মসমর্পণ করুন। আপনাদের কোনো ক্ষতি করব না আমরা।’ সঙ্গে সঙ্গে আবার শুরু হলো বোমা নিক্ষেপ। গুলি ছুঁড়ে জবাব দিতে লাগল পুলিশ। গুলি ও বোমার পাল্টাপাল্টি চলতে লাগল। বোমা বিস্ফোরণের ধোঁয়া উড়তে লাগল চারদিকে। টানা আধা ঘণ্টা পাল্টাপাল্টি বোমা-গুলির পর ভেতর থেকে বোমা নিক্ষেপ থামল। হাতমাইকে আবারও আত্মসমর্পণের আহ্বান জানালেন জাহিদুল। ভেতর থেকে কোনো সাড়াশব্দ পেলেন না।
প্রায় কুড়ি মিনিট পর ঘরের সামনের দরজাটা খুলে গেল। বেরিয়ে এলো পারভিনের দুই ছেলে। দুজনের পরনে হাফপ্যান্ট। খালি গা। দুজন হাত ধরাধরি করে উঠান পার হয়। তারপর হাত ছেড়ে দেয়। ধীর গতিতে হাঁটতে থাকে। হাঁটতে হাঁটতে জেলা পুলিশ সুপারের সামনে এসে দাঁড়ায়। এসপি জিজ্ঞেস করলেন, ‘ভিতরে কজন আছে?’ ছোট ছেলেটি বলে, ‘পাঁচজন’। বড় ছেলেটি বলে, ‘না না, ছয়জন।’ এসপির নির্দেশে দুই কনস্টেল দুজনকে নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নিলো।
হাতমাইকে আবারও আত্মসমর্পণের আহ্বান জানালেন জাহিদুল। ভেতর থেকে কোনো সাড়া পেলেন না। প্রায় দশ মিনিট পর আবার খুলে গেল দরজাটা। প্রথমে বেরিয়ে এলো আকরামউল্লাহ, পেছনে সাফাত, তার পেছনে পাশাপাশি আবিদা ও চিশতি এবং সবার পেছনে শফিউল। উঠানে নেমে পাশাপাশি দাঁড়াল সবাই। বন্দুক তাক করল পুলিশ। ট্রিগারে হাত রাখল। দরজার সামনে থমকে দাঁড়াল পারভিন। আকরামউল্লাহর ইশারায় সবাই আবার হাঁটা ধরল। পাশাপাশি। গায়ে গা ঠেকিয়ে। উঠান পেরিয়ে তারা কুয়ার পাড়ে উঠল। পাড় থেকে জমিনে নামল। ভেতরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল পারভিন। মুহূর্তে বিস্ফোরণের ভয়াবহ শব্দে সে কানে আঙুল দিল। শুনতে পেল গুলির শব্দও।
প্রায় পাঁচ মিনিট পর দরজা খুলে আবার বাইরে এসে দাঁড়াল পারভিন। বিস্ফারিত চোখে দেখল কাটা মুরগির মতো ছটফট করছে তার স্বামী শফিউল, আকরামউল্লাহ ও সাফাত গড়াগড়ি খাচ্ছে, আবিদার মাথাটা আলের ওপর, শরীরটা জমিনে, চিশতি গড়াগড়ি খেতে খেতে একটা হাত উঁচিয়ে কী যেন বলতে চাচ্ছে।
পারভিনের দৃষ্টি তখন দূরে, আমগাছটার দিকে, যেখানে তার দুই ছেলে দাঁড়িয়ে। কোমরে হাত রেখে তারা ঘরটার দিকে তাকিয়ে। চোখ সরাতে পারে না পারভিন। দৃষ্টি স্থির রেখে সে দাওয়ায় এসে দাঁড়ায়। শুনতে পায় মাইকের আওয়াজ, ‘ভেতরে আর কে আছেন আত্মসমর্পণ করুন। কোনো ক্ষতি হবে না আপনাদের।’ পারভিন কিছু শুনতে পায় না। আতমলা থেকে তার চোখ সরে না। তাকিয়ে থাকতে থাকতে সে বসে পড়ে। ছোট ছেলেটা বুঝি তাকে দেখতে পায়। ডান হাতটা উঁচু করে কাকে যেন ইশারায় ডাকছে। কাকে ডাকছে? তাকে? কোমরে বাঁধা সুইসাইডাল ভেস্টে হাত বুলায় পারভিন। যেন গর্ভের সন্তানকে আদর করছে। আবারও শুনতে পায় মাইকের আওয়াজ, ‘জলদি আত্মসমর্পণ করুন। নইলে আমরা গুলি চালাতে বাধ্য হবো।’
পারভিন উঠে দাঁড়ায়। ধীর কদমে হাঁটতে হাঁটতে পড়ে থাকা লাশগুলোর দিকে এগোয়। আকরামউল্লাহর লাশের অদূরে একটা আলের উপর দাঁড়ায়। দুই হাতে ভেস্টটা ধরে সাবধানে বসে। আবারও শুনতে পায় মাইকের আওয়াজ, ‘জলদি আত্মসমর্পণ করুন।’ সে নড়ে না। কীভাব নড়বে? সে তো তখন আ¤্রপালি বা আমরুপালির ঘ্রাণে মত্ত। চোখ বন্ধ করে ঘ্রাণ নিচ্ছে। দাদির মুখখানা চোখের সামনে ভেসে উঠেছে। কতদিন হলো মরেছে দাদি, অথচ তার মুখখানা এখনও সে ভুলল না!
পারভিন ভাবে, আচ্ছা, তার দাদি এখন কী করছে কবরে? জীবনে তো কোনোদিন তাকে নামাজ পড়তে দেখেনি। নিশ্চয়ই গজবের ফেরেশতারা কবরে এখন তার মাথায় মুগুর মারছে! বড় বড় সাপেরা তার শরীর পেঁচিয়ে আছাড় মেরে সত্তুর হাত মাটির নিচে দাবিয়ে দিচ্ছে। লেজে পেঁচিয়ে আবার টেনে তুলছে। আবার মারছে আছাড়। বুড়ির চিৎকারে গোরস্তানের মুর্দারা জেগে উঠছে বারবার।
পারভিন আবারও শুনতে পেল মাইকের আওয়াজ, ‘দ্রুত আত্মসমর্পণ করুন। আমরা কিন্তু গুলি চালাতে বাধ্য হবো।’ সুইসাইডাল ভেস্টে হাত রাখে পারভিন। তাগুতি শক্তির হাতে মৃত্যুর চেয়ে আত্মহত্যা উত্তম। জান্নাত নিশ্চিত। মোফাজ্জেল হোসেন তো আর মিথ্যে বলেনি। কত বড় মুজাহিদ সে। আফগানিস্তানে কাফেরদের বিরুদ্ধে জেহাদ করা মুজাহিদ। জেহাদের ময়দানে নিজচোখে দেখেছে হাজার হাজার রহমতের ফেরেশতা। সে কি মিথ্যা বলতে পারে? প্রত্যেক মুজাহিদের জন্য নিশ্চয়ই জান্নাতুল ফেরদৌস বরাদ্দ করে রেখেছেন দুই জাহানের মালিক।
প্রায় এক ঘণ্টা পর আবার ভেসে এলো মাইকের আওয়াজ। আবারও একই আহ্বান, ‘দ্রুত আত্মসমর্পণ করুন।’ ঘাড় উঁচু করে চারদিকে তাকায় পারভিন। তাগুতি শক্তির গোলাম সৈন্যদের দেখে তার ঠোঁটের কোণে হাসি ফোটে। মনে মনে বলে, ‘তোমরা ভাবিচ্চো ক্যাংকা করে, কাফেরেগেরে কাচে হামি ধরা দিমো?’ তখন তার মনে প্রশ্ন জাগে―আচ্ছা, পৃথিবীতে কাফেরের সংখ্যা কত? মোফাজ্জেল হোসেন একদিন বলেছিল, সারা দুনিয়ায় মোট মানুষের সংখ্যা ৭৪০ কোটি, মুসলমানের সংখ্যা ১৬০ কোটি। তার মানে পৃথিবীতে ৫৮০ কোটি মানুষ কাফের! পারভিনের অবাক লাগে। গোটা দুনিয়াটাই তো কাফেরে ভরা! এত এত কাফের দোযখের আগুনে জ্বলবে! দোযখের মালিক কি এতই নিষ্ঠুর? তিনি কেন এত এত মানুষকে কাফের করে রেখেছেন? তার তো অসীম ক্ষমতা। তিনি তো চাইলেই সবাইকে মুসলমান বানিয়ে দিতে পারেন। তিনি তো চাইলেই তার পেয়ারা মুমিনদেরকে সারা দুনিয়ার মসনদের অধিকারী করে দিতে পারেন। কেন করেন না?
কখনও আকাশের দিকে, কখনও আমতলার দিকে তাকিয়ে, কখনো-বা চোখ বন্ধ করে নিশ্চুপ বসে থাকে পারভিন। বসে থাকে টানা দেড় ঘণ্টা। তারপর হঠাৎ আমতলার দিকে তাকিয়ে দুই ছেলেকে আর দেখতে পায় না। বুকটা মোচড় দিয়ে ওঠে তার। কোথায় গেল তারা? মেরে ফেলল না তো! সুইসাইডাল ভেস্টেটা ধরে সে উঠে দাঁড়ায়। আবার ভেসে এলো মাইকের আওয়াজ। আত্মসমর্পণের আহ্বান। ধীর পায়ে সে আকরামউল্লাহর লাশের দিকে এগোয়। আকরামউল্লাহর শরীর থেকে রক্ত ঝরা থেমে গেছে। এক সারি পিঁপড়া তার পিঠ বেয়ে নাড়িভুঁড়ির দিকে নামছে। থুতু জমে গেল পারভিনের মুখে। নিজের অজান্তেই থুতুর দলাটা নিক্ষেপ করল আকরামউল্লাহর মুখে। দলাটা পড়ল আকরামউল্লাহর কানের ফুটোয়।
পারভিন সামনে এগোয়। কয়েক হাত দূরে আবিদার লাশ। মুখটা হাঁ হয়ে আছে। ভ্রু দুটি কুঁচকানো। কামিজ ছিঁড়ে একটা স্তন বেরিয়ে আছে। বোঁটাটা স্পিøন্টারে উড়ে গেছে। তার লাশ ডিঙিয়ে পারভিন তার স্বামীর লাশের সামনে এসে দাঁড়ায়। চিৎ হয়ে পড়ে আছে শফিউল। নেংটো। লুঙ্গিটা উঠে আছে কোমরে এবং পৌরুষটা কুঁকড়ে আছে। ক্ষতবিক্ষত ডান হাতটা ঝুলে আছে চামড়ার সঙ্গে। বাঁ চোখ থেকে রক্ত গড়াচ্ছে। গলা খাকারি দিয়ে মুখে থুতু জমা করে পারভিন। দলাটা সজোরে নিক্ষেপ করে শফিউলের গালে। শফিউলের হাঁ করা মুখের উপর পড়ল দলাটা। ঠোঁট দুটো কুঁচকে পারভিন বলল, ‘হারামির বাচ্চা!’
আবার হাঁটা ধরে পারভিন। ধীর পায়ে, মাঠের দক্ষিণ দিকে। আবারও ভেসে এলো মাইকের আওয়াজ, ‘আত্মহত্যা মহাপাপ, দ্রুত আত্মসমর্পণ করুন। আমরা আপনার কোনো ক্ষতি করব না।’ পারভিন থামে না। ধীর পায়ে হাঁটতে থাকে। দূর থেকে আবারও ভেসে এলো গানের সুর, ‘এখানে আম কুড়াবার ধুম লেগেছে।’ ভেসে এলো, না তার বুকের ভেতর বাজল? পারভিন কান পাতে। কিন্তু না, গানটা আর শুনতে পায় না।
হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ সে থমকে দাঁড়ায়। ভেস্টে হাত রাখে। দুই হাত বুলায় ভেস্টের ওপর। সেই একইভাবে―গর্ভের সন্তানকে আদর করার ভঙ্গিতে। তারপর দূরের আমগাছটার দিকে তাকাল। দুই হাতের তালুয় মুখ মুছল। আবার ভেস্টে হাত রাখল। সতর্ক হাতে ভেস্টটা খুলে হাতে নিয়ে শফিউলের লাশের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। ভেস্টটা রাখল শফিউলের পেটের ওপর। তারপর দক্ষিণে সরে এসে আমগাছটার দিকে ফিরে দাঁড়াল। দখিনা বাতাসে উড়তে লাগল তার লম্বা চুল। কী শাঁই শাঁই বাতাস! বাতাসে ভেসে আসছে আ¤্রপালি বা আমরুপালির ঘ্রাণ। চোখ বন্ধ করে পারভিন। হাত দুটো ধীরে ধীরে ওপরে উঠতে থাকে। আত্মসমর্পণের ভঙ্গিতে, কিংবা পাখি কিংবা বিমানের ডানার মতো, কিংবা ক্রুশবিদ্ধ যীশুর মতো সে দু-হাত দুদিকে ছড়িয়ে দেয়। তার বুক ভেঙে কান্না আসে। সে কাঁদতে শুরু করে। দুই গাল বেয়ে ঝরে পড়তে থাকে নোনা অশ্রুর ধারা।

Category:

Leave a Reply