বিভাগ: অন্যান্য

ইলিশের জীবনরহস্য আবিষ্কার : বাড়বে উৎপাদন

PMরাজিয়া সুলতানা: সুস্বাদু রুপালি ইলিশ বাংলাদেশের জিআই বা ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য। ইলিশ বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক গৌরবের অংশীদার। অথচ এতদিন অজানাই ছিল ইলিশের জীবনরহস্য। ইলিশ নিয়ে; ইলিশের জীবনরহস্য নিয়ে এন্তার গবেষণা চলছে দীর্ঘদিন। অবশেষে সুপার মুন খ্যাত সেই ইলিশ মাছের পূর্ণাঙ্গ জীবনরহস্য বা জেনোম সিকুয়েন্স আবিষ্কৃত হয়েছে। বাকৃবি’র ফিশারিজ বায়োলজি অ্যান্ড জেনেটিক্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. সামছুল আলম ও তার সহযোগী গবেষকরা উন্মোচন করেছেন ইলিশের জীবনরহস্য। এরই মাধ্যমে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশের মৎস্য সেক্টর প্রবেশ করল গবেষণার এক নতুন যুগে।
ইলিশ একটি পরিযায়ী মাছ। এরা ডিম ছাড়ার জন্য সাগর থেকে নদীতে আসে। বিচরণ করে পদ্মা, মেঘনা ও যমুনার মোহনায়। মৎস্য অধিদফতরের তথ্যানুযায়ী পৃথিবীর মোট ইলিশ উৎপাদনের প্রায় ৬০ শতাংশ বাংলাদেশে হয়। তাই এর উৎপাদন আরও বাড়াতে পারলে অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধশালী এবং লাভবান হবে দেশ। জিনোমই জীবের সব জৈবিক বৈশিষ্ট্য নিয়ন্ত্রণ করে। আর এ কারণেই বাংলাদেশে ২০১৫ সাল থেকে এই জিনোম সংক্রান্ত গবেষণা শুরু হয়। দুই বছর গবেষণাকালে তারা দেশের বঙ্গোপসাগর ও মেঘনা থেকে পূর্ণবয়স্ক ইলিশ সংগ্রহ করেন। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিস জেনেটিক্স অ্যান্ড বায়োটেকনোলজি এবং পোল্ট্রি বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জিনোমি ল্যাবরেটরি থেকে সংগৃহীত ইলিশের উচ্চ গুণগত মানের জিনোমিক ডিএনএ প্রস্তুত করেন। প্রসংগত, ডিএনএ প্রধানত দুই প্রকার। প্লাজমিড ডিএনএ ও জিনোমিক ডিএনএ। পরে যুক্তরাষ্ট্রের জিনউইজ নামের জিনোম সিকুয়েন্সিং সেন্টার থেকে সংগৃহীত ইলিশের পৃথক প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহ করেন। এরপর বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন কম্পিউটারে বিভিন্ন বায়োইনফরম্যাটিক্স প্রোগ্রাম ব্যবহার করে সংগৃহীত প্রাথমিক তথ্য থেকে ইলিশের পূর্ণাঙ্গ জীবনরহস্য এবং ডি নোভো অ্যাসেম্বলি সম্পন্ন করেন। ইলিশের জিনোমে ৭৬ লাখ ৮০ হাজার নিউক্লিওটাইড রয়েছে, যা মানুষের জিনোমের প্রায় এক-চতুর্থাংশ। এছাড়াও ইলিশের জিনোম সিকোয়েন্স বিশ্লেষণ করে ২১ হাজার ৩২৫টি মাইক্রোস্যাটেলাইট (সিম্পল সিকুয়েন্স রিপিট সংক্ষেপে এসএসআর) ও ১২ লাখ ৩ হাজার ৪০০টি সিঙ্গেল নিউক্লিওটাইড পলিমরফিজম (এসএনপি) পাওয়া  গেছে। তবে পূর্ণাঙ্গ জিনোম সিকোয়েন্স বিশ্লেষণ করে ইলিশ জিনোমে জিনের সংখ্যা জানা যায়নি। প্রক্রিয়াটি অব্যাহত রয়েছে। গবেষণা চলাকালে ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত তথ্যভা-ার যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল সেন্টার ফর বায়োটেকনোলজি ইনফরমেশনের (এনসিবিআই) স্বীকৃতি পায়। ২০১৭ সালের ২৯ ও ৩০ ডিসেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনে এবং ২০১৮ সালের ১৩-১৮ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দুটি আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক সম্মেলনে ড. মো. সামছুল আলম এবং তার সহযোগীরা গবেষণার বিষয় উপস্থাপন করেন।
জেনোম সিকুয়েন্স একটি বৈজ্ঞানিক পরিভাষা। জীবের জিনোম (Genome) অর্থাৎ, জীবের জীবন রহস্য হলো এর সমস্ত বংশগতিক তথ্যের সামষ্টিক রূপÑ যা ডিএনএ (কোনো কোনো ভাইরাসের ক্ষেত্রে আরএনএ) দ্বারা সংকেতাবদ্ধ। সাধারণভাবে কোনো জীবের এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে স্থানান্তরিত বৈশিষ্ট্যগুলো জিনোমে লুকায়িত থাকে। জিন হলো জীবের ক্রোমোসোমের অন্তর্গত একক, যা ব্যক্তির কোনো নির্দিষ্ট বংশানুক্রমিক বৈশিষ্ট্যকে নিয়ন্ত্রণ করে।
জিনের রহস্য নিয়ে গবেষণার সূত্রপাত ১৮০০ সাল থেকেই। কিন্তু তখন এটা গবেষণার ধরন ছিল ভিন্ন। তবে ১৯২০ সালে জার্মানির হামবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞানের অধ্যাপক হান্স ভিংক্লার জিন ও ক্রোমোজোম শব্দ দুটির অংশবিশেষ জুড়ে দিয়ে জিনোম শব্দটি উদ্ভাবন করেন। আর জেনোম সিকুয়েন্স হলো কোষের সম্পূর্ণ ডিএনএ বিন্যাসের ক্রম, যার মাধ্যমে জিনোমের সম্পূর্ণ তথ্য জানা যায়। জীবদেহে বহুসংখ্যক কোষ থাকে। প্রতিটি কোষে থাকে ক্রোমোজোম। যাতে থাকে সুসজ্জিত ডিএনএ। ডিএনএ হচ্ছে ডি-অক্সিরাইবোনিউক্লিক এসিড। এটি বংশগতির ধারক ও বাহক। অর্থাৎ পিতামাতা থেকে বৈশিষ্ট্য ডিএনএ ধারণ ও বহন করে। একইভাবে, পিতামাতাও তাদের ডিএনএ-তে তাদের পিতামাতার বৈশিষ্ট্য ধারণ ও বহন করে। এক কথায় ডিএনএ, যা বংশগতির মৌলিক তথ্য বহন করে। যা কোষ বিভাজনের মাধ্যমে সরল অণুবীক্ষণ যন্ত্রে দেখা যায়। বংশগতির একক হলো জিনÑ যা  ডিএনএ দিয়ে তৈরি। ডিএনএ প্রতিটি জীবের জন্য স্বতন্ত্র আর জিন হচ্ছে বৈশিষ্ট্য, যা বংশানুক্রমে স্থানান্তরিত হয়। ডিএনএ নিউক্লিওটাইড দিয়ে তৈরি। এই নিউক্লিওটাইড আবার ক্ষার দিয়ে তৈরি। ক্ষারগুলো হলো- এডেনিন (A), গুয়ানিন (G), সাইটোসিন (C) ও থাইমিন (T)। ডিএনএ-এর আকার হলো দ্বৈত-সর্পিলাকার (ডাবল-হেলিক্স)। আসলে জীবের ক্রোমোজোমে এই ৪টি ক্ষার ঘুরে-ফিরে সাজানো থাকে। এদের কম্বিনেশন ও বিন্যাসের ওপরেই নির্ভর করে জীবের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য। তাই কোনো জীবের এই জিনোম ডিকোড অথবা উন্মোচন বলতে এই ATGC-এর পারস্পরিক বিন্যাসটা আবিষ্কার করাকেই বোঝায়। আর এর মাধ্যমে সেই জীবের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য নিয়ন্ত্রণকারী জিনগুলোর অবস্থান ও কার্যক্রম সম্বন্ধে একটা ধারণা পাওয়া যায়।
জিনোম সিকুয়েন্স সাধারণভাবে একটি জীবের যাবতীয় বৈশিষ্ট্য ও কার্যাবলী নিয়ন্ত্রণ করে। জীবের বিন্যাস ও যাবতীয় তথ্য জানা যায় জিনোম সিকুয়েন্সিং করে। ফলে ভবিষ্যতে জিন সংযোজন-বিয়োজন বা বিন্যাস পরিবর্তন করে আরও উন্নত প্রজাতির জীব উৎপাদন করা সম্ভব। যা হবে রোগবালাই মুক্ত ও প্রতিকূল পরিবেশে খাপ খাওয়াতে সক্ষম। এভাবে যদি ধীরে ধীরে সকল জীব তথা উদ্ভিদ, প্রাণী, রোগ জীবাণুর জিনের বৈশিষ্ট্যগুলো জেনে নেওয়া যায়। তবে এর মাধ্যমে উন্নত প্রজাতি উদ্ভাবন করা সম্ভব। বিজ্ঞানীরা ডিএনএ বিন্যাস বা জিনোম সিকুয়েসিং বের করে এবং কম্পিউটারের বিশেষ সফটওয়্যার তাদের মিল বের করে। পরবর্তীতে গবেষণা কার্যক্রম পরিচালিত হয়।
জীবনরহস্য আবিষ্কারের ফলে জাতীয় মাছ ইলিশের ক্ষেত্রে যা পাবে বলে আশা করছেন গবেষকরা; তা হলোÑ
*    বিস্তারিতভাবে জানা যাবে ইলিশের জন্ম, বৃদ্ধি, প্রজননসহ বিভিন্ন বিষয়;
*    জানা যাবে ইলিশ মাছ কখন ও কোথায় ডিম দেবে;
*    বছরে দুবার ইলিশ প্রজনন করে থাকে। এই দুই সময়ের ইলিশ জিনগতভাবে পৃথক কি না;
*    কোনো নির্দিষ্ট নদীতে জন্ম নেওয়া পোনা সাগরে যাওয়ার পর বড় হয়ে প্রজননের জন্য আবার একই নদীতেই ফিরে আসে কি না;
*    ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধি এবং টেকসই রাখার জন্য গৃহীত কর্মসূচি ফলপ্রসূ করতে মাছের জৈবিক বৈশিষ্ট্য ও ব্যবস্থাপনা কার্যকলাপের মধ্যে সমন্বয় সাধন করবে;
*   বাংলাদেশের জলসীমার মধ্যে ইলিশের মোট সংখ্যা-পরিমাণ;
*    বিভিন্ন মোহনায় প্রজননকারী ইলিশ কি ভিন্ন ভিন্ন; না-কি মোট ইলিশের একটি অংশ;
*    বাংলাদেশের ইলিশ পৃথিবীর অন্যান্য দেশের (ভারত, মিয়ানমার, পাকিস্তান, মধ্যপ্রাচ্য) ইলিশ থেকে জেনেটিক্যালি স্বতন্ত্র কি না অর্থাৎ স্টক একই কি না;
*   অভয়াশ্রম প্রতিষ্ঠা, নির্দিষ্ট সময়ে ইলিশ আহরণ নিষিদ্ধ ঘোষণা ইত্যাদি সঠিক সময়ে সঠিক স্থানে হচ্ছে কি না;
*    ইলিশ সাগর থেকে নদীতে কেন আসে, আবার প্রজননের পর আদৌ সাগরে ফিরে যায় কি না;
*    বাংলাদেশের ইলিশের একটি রেফারেন্স জিনোম প্রস্তুত করা এবং
*    ইলিশের জিনোমিক ডাটাবেস স্থাপন করা।

এমন অনেক তথ্যই আমরা আবিষ্কৃত জিনোম সিকুয়েন্স থেকে জানতে পারব, যা ইলিশের টেকসই আহরণ এবং উৎপাদন বৃদ্ধি করতে সহায়তা করবে। সার্বিক অর্থে ইলিশ অত্যন্ত পুষ্টিগুণসম্পন্ন একটি মাছ। দেশের পাশাপাশি বিদেশেও এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। তাই সরকারের পাশাপাশি দেশের গবেষকরাও ইলিশ নিয়ে গবেষণা করছেন, এগিয়ে এসেছেন। দেশের বাইরেও ইলিশ নিয়ে কাজ করছে আর একটি টিম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণ রসায়ন ও অণুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক হাসিনা খানের নেতৃত্বে এ দলে রয়েছেন কয়েকজন গবেষক। এর মধ্যে দুজন প্রবাসে রয়েছেন। যদিও জীবনরহস্য উন্মোচনের মাধ্যমে ইলিশ গবেষণার একটি প্রশস্ত দরজা খুলে গেছে। তবে এটি জানতে ও বুঝতে আমাদের আরও সময় লাগবে। এ থেকে সুফল পেতে আরও ধারাবাহিক গবেষণা প্রয়োজন।
লেখক : পিএইচডি গবেষক, উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব বিদ্যা
শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়
raziasultana.sau52@gmail.com

পাঠকের মন্তব্য:

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না। তারকাচিহ্নযুক্ত (*) ঘরগুলো আবশ্যক।

*