বিভাগ: উত্তরণ ডেস্ক

উন্নয়নের জন্য সরকারের ধারাবাহিকতা চাই

9

৭ মার্চের বিশাল জনসভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

৪৭ বছর আগে যেখানে দাঁড়িয়ে তার বাবা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু এ দেশের মানুষের জন্য স্বাধীনতার সংগ্রামের ডাক দিয়েছিলেন, ঠিক সেখানেই লাখো মানুষের জনসমুদ্রের সামনে দাঁড়িয়ে এ দেশের মানুষের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য সরকারের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার আহ্বান জানালেন তার কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পিতা বঙ্গবন্ধু দেশের মানুষকে রাজনৈতিক স্বাধীনতা দিয়ে গেছেন, তার অপর স্বপ্ন মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি এবং ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত সোনার বাংলা বিনির্মাণের অঙ্গীকারের কথাও প্রতিক্ষণে উচ্চারিত হয়েছে আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর দীপ্ত কণ্ঠে।
ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে প্রধানমন্ত্রী দেশবাসীর প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, যারা এতিমের টাকা চুরি করে, যারা আগুন দিয়ে মানুষ পোড়ায়, যারা দেশের টাকা বিদেশে পাচার করে তারা (বিএনপি-জামাত) যেন আর কোনোদিন ক্ষমতায় আসতে না পারে, তারা যেন দেশকে আর ধ্বংসের দিকে নিয়ে যেতে না পারেÑ সেজন্য সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। যুদ্ধাপরাধী, খুনি ও জঙ্গিবাদীরা যেন আর কখনও বাংলাদেশের ক্ষমতায় আসতে না পারে সেজন্য সজাগ ও সতর্ক থাকুন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী এবং দেশের সর্বস্তরের জনতার প্রতি বলব, এই যুদ্ধাপরাধী, স্বাধীনতাবিরোধী, আগুনে পুড়িয়ে যারা মানুষ খুন করে, এতিমের টাকা চুরি করে, দেশের টাকা পাচার করে, এ দেশের স্বাধীনতায় যারা বিশ্বাস করে না, তারা যেন আর ক্ষমতায় আসতে না পারে। যারা স্বাধীনতায় বিশ্বাস করেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাস করেন, দেশের উন্নয়ন-অগ্রগতিতে বিশ্বাস করেন, জনগণের ভাগ্যোন্নয়নে বিশ্বাস করেন, তাদের এ ব্যাপারে সজাগ থাকতে হবে। তারা যেন আর ক্ষমতায় এসে দেশকে ধ্বংস করতে না পারে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় যেন বাংলাদেশ এগিয়ে যায়, বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে তার জন্য সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার জন্য আহ্বান জানাই।
ইউনেস্কো স্বীকৃত বিশ্ব ঐতিহ্যের অমূল্য দলিল ঐতিহাসিক ৭ মার্চ ভাষণ দিবস উপলক্ষে গত ৭ মার্চ ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আওয়ামী লীগ আয়োজিত বিশাল জনসমুদ্রে সভাপতির ভাষণে প্রধানমন্ত্রী দেশবাসীর প্রতি এ আহ্বান জানান।
বর্তমান সরকারের উন্নয়ন-অগ্রগতির সঙ্গে বিগত সরকারগুলোর কর্মকা-ের তুলনামূলক বিচার করার জন্য দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশবাসী আপনারাই একটু বিবেচনা করে দেখুনÑ একমাত্র আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসলেই দেশের উন্নয়ন হয়, দেশ সবদিক থেকে এগিয়ে যায়। আমার প্রশ্নÑ আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসলে দেশের উন্নয়ন হয় কিন্তু তার পূর্বে যারা ক্ষমতায় ছিল সেই জেনারেল জিয়া-এরশাদ-খালেদা জিয়া সরকার তো দেশের উন্নতি করতে পারেনি। কেন তারা পারেনি? তার মূল কারণ একটাই। তারা তো দেশের স্বাধীনতায় বিশ্বাসই করত না। তারা এ দেশের উন্নয়নে বিশ্বাস করত না। তারা যুদ্ধাপরাধীদের নিয়ে কাজ করতেই ব্যস্ত ছিল।
তিনি বলেন, যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতাই বিশ^াস করে না, ক্ষমতায় থেকে তারা এ দেশের উন্নতি করবে কেমনে? তারা জানে শুধু নিজেদের উন্নতি করতে। জেনারেল জিয়ার রেখে যাওয়া ভাঙা সুটকেস ছেঁড়া গেঞ্জি তো যাদুর বাক্স হয়ে গেছে। যার ভিতর দিয়ে ফ্রেঞ্চ শিফন বের হয়। কিন্তু দেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন তারা করে নাই। তবে আমাদের একটাই লক্ষ্য দেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন করা। আজকে বাংলাদেশের মানুষ স্বাধীনতার সুফল ভোগ করছে। আমাদের যা উন্নয়ন দরকার তা করছি। আমরা অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে যাচ্ছি।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে বিশাল এ জনসভার শুরুতেই স্বাগত বক্তব্য রাখেন দলটির সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এমপি। আরও বক্তব্য রাখেন জাতীয় সংসদের উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী এমপি, উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ও শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু এমপি, বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ এমপি, সভাপতিম-লীর সদস্য ও কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী এমপি, শেখ ফজলুল করিম সেলিম এমপি, স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম এমপি, অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুন এমপি, লে. কর্নেল (অব.) ফারুক খান এমপি, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক এমপি, সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ চৌধুরী এমপি, বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মির্জা আজম এমপি, ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র মুহাম্মদ সাঈদ খোকন, ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সভাপতি একেএম রহমতুল্লাহ, দক্ষিণের সভাপতি হাজী আবুল হাসনাত, ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপস এমপি, যুবলীগের হারুনুর রশীদ, স্বেচ্ছাসেবক লীগের মোল্লা মোহাম্মদ আবু কাউসার, যুব মহিলা লীগের নাজমা আখতার, শ্রমিক লীগের শুক্কুর মাহমুদ, মহিলা আওয়ামী লীগের সুফিয়া খাতুন ও ছাত্রলীগের সাইফুর রহমান সোহাগ। ঐতিহাসিক ৭ মার্চ নিয়ে নিজের লেখা অমর কবিতা ‘স্বাধীনতা শব্দটি কীভাবে আমাদের হলো’ আবৃত্তি করেন কবি নির্মলেন্দু গুণ। সমাবেশ পরিচালনা করেন আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ এমপি ও সাংস্কৃতিক বিষয়ক সম্পাদক অসীম কুমার উকিল।
বিশাল জনসমুদ্রে ভাষণে প্রধানমন্ত্রী সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ ও মাদকের বিরুদ্ধে তার সরকারের জিরো টলারেন্স নীতির কথা পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, বাংলাদেশের মাটিতে কোনো জঙ্গি-সন্ত্রাসী ও মাদকের স্থান হবে না। দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, এ সভায় যারা আছেন অথবা গোটা বাংলাদেশের সকলের কাছে আমার আহ্বান থাকবেÑ এ বাংলাদেশ জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাস এবং মাদকÑ এইগুলো যেন কোনোভাবেই আমাদের যুবসমাজকে নষ্ট করতে না পারে। তার জন্য আপনারা সজাগ থাকবেন। শিক্ষক, মসজিদের ইমাম, বিভিন্ন ধর্মগুরু ও অভিভাবকদেরও সজাগ থাকতে হবে কেউ যাতে এই জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাস বা মাদকে জড়িয়ে পড়তে না পারে।
বর্তমান সরকারের উন্নয়ন ও অগ্রগতির পুরো চিত্র সারাদেশের প্রতিটি মানুষের ঘরে ঘরে, পাড়া-মহল্লা, গ্রামে-গঞ্জে তুলে ধরার জন্য আওয়ামী লীগ নেতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, গ্রাম-গঞ্জের মানুষের কাছে উন্নয়নের কথা জানাতে হবে। আমাদের উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে হবে। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার পর বাংলাদেশকে একটা নিম্নমধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন। আজকের বাংলাদেশ জাতির পিতার সেই লক্ষ্য সামনে নিয়ে তার পদাঙ্ক অনুসরণ করে অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথে বাংলাদেশ ধাপে ধাপে এগিয়ে যাচ্ছে। আমরা আজকে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে সারাবিশে^ সম্মান পেতে যাচ্ছি অতি শীঘ্রই। আমরা এই সম্মান পাব। আমরা আজ কারও কাছে মাথা নত করে চলব না। আমরা বিশ্বসভায় মর্যাদার সঙ্গে চলব। জাতির পিতা আমাদেরকে সেই শিক্ষা দিয়ে গেছেন।
মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আশ্রয় দেয়ার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা শুধু দেশের ১৬ কোটি জনগণকে খাদ্য দিচ্ছি না। মিয়ানমারের প্রায় ১০ লাখেরও উপরে মানুষের উপর অত্যাচার হয়েছে। তারা বাংলাদেশের কাছে আশ্রয় চেয়েছে। মানবিক কারণে আমরা তাদের আশ্রয় দিয়েছি। তাদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা আমরা করে দিয়েছি। আমরা মানবতার পরিচয় দিয়েছি। তিনি বলেন, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর কারণে ভারতের মাটিতে আমাদের ১ কোটি মানুষকে আশ্রয় নিতে হয়েছিল। সেই কারণে আমরা তাদেরকে আশ্রয় দিয়েছি। রোহিঙ্গা ইস্যুতে আজকে সারাবিশ^ বাংলাদেশের পক্ষে আছে। সারাবিশ^ বাংলাদেশকে আজকে তারা সম্মান জানাচ্ছে। সাধুবাদ জানাচ্ছে।
সরকারপ্রধান বলেন, আমরা মানবতার জন্য কাজ করি। আর যারা মানবতাবিরোধী কাজ করেছে। যারা এ দেশের মানুষকে গণহত্যা করেছে, লুটপাট করেছে, অগ্নিসংযোগ করেছে। মা-বোনের ইজ্জত লুটেছে, হানাদার বাহিনীর হাতে তুলে দিয়েছে। দেশবাসীর প্রতি আমার আহ্বানÑ এই যুদ্ধাপরাধী ও খুনিরা যেন কোনোদিন আর ক্ষমতায় আসতে না পারে। এর জন্য সমস্ত দেশের মানুষ, স্বাধীনতায় বিশ^াসী সকল মানুষ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় যারা বিশ^াস করেন অত্যন্ত তারা এ ব্যাপারে সজাগ থাকবেন।
এ সময় মেট্রোরেল, ফ্লাইওভার, পদ্মাসেতুসহ সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন পদক্ষেপগুলো তুলে ধরে শেখ হাসিনা আরও বলেন, আমরা প্রত্যেকটি জায়গায় মানুষের জন্য কাজ করে যাচ্ছি। প্রত্যেকটি মানুষ যেন কিছু জীবন-জীবিকার ব্যবস্থা করতে পারে। এগুলো লক্ষ্য রেখে সমস্ত বাংলাদেশে অর্থনৈতিক উন্নয়নের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাব। আমাদের উন্নয়নের ধারাবাহিকতা যেন বজায় থাকে। সরকারের এই উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে। ইনশাআল্লাহ ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ ক্ষুধামুক্ত দারিদ্র্র্যমুক্ত সোনার বাংলাদেশ হিসেবে গড়ে তুলতে পারব। এই বাংলাদেশ হবে জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ। সেই হিসেবেই আমরা দেশকে গড়ে তুলব।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ৭ মার্চের ভাষণ এই ভাষণের আবেদন কখনও শেষ হবে না। এই ভাষণে জাতির পিতা একদিকে স্বাধীনতার কথা বলেছেন। অপরদিকে অর্থনৈতিক মুক্তির কথা তিনি বলে গেছেন। তিনি রাজনৈতিক স্বাধীনতা দিয়ে গেছেন, কিন্তু অর্থনৈতিক মুক্তির পথে যখন পা বাড়িয়ে ছিলেন তখনই তাকে আমাদের মাঝ থেকে কেড়ে নিয়ে গেছে। তাই আজকে আমাদের দায়িত্ব বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন পূরণে অর্থনৈতিক মুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশকে ক্ষুধামুক্ত দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ হিসেবে বিশ^সভায় মাথা উঁচু করে চলতে পারি। মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ী জাতি হিসেবে মাথা উঁচু করে বাঙালি চলবে, মাথা উঁচু করে বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে। এটাই আমাদের একমাত্র লক্ষ্য।

পাঠকের মন্তব্য:

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না। তারকাচিহ্নযুক্ত (*) ঘরগুলো আবশ্যক।

*