বিভাগ: ছোট গল্প

একটি গল্পের অপমৃত্যু!

41অঞ্জন আচার্য: নিতান্ত একটা সুখী সমাপ্তি ঘটতে পারতো আমার জীবনে। যেমনটা ঘটে রূপকথার গল্পে : ‘অবশেষে রাজা-রানি সুখে-শান্তিতে বসবাস করিতে লাগিলো’। কিন্তু বিধি বাম। সেই কপাল নিয়েই জন্মাই নি যে! আমি বড়ো কপালে বিশ্বাসী মেয়ে। কিংবা বলা যায়, ওই সুখী পরিণতি কি আমি আদৌ চেয়েছি কখনও? আর সবার মতোই আমার বেড়ে ওঠা। টানাপড়েন সংসারের মধ্যবিত্ত ঘরের সাদামাটা জীবন আমার। লেখাপড়ায় বলতে গেলে অনেকটা বুদ্ধদেব বসুর মতো; সহজাতভাবেই মেধাবী। স্কুলের গ-ি পেরিয়ে গেছি অনায়াসে বন্ধুদের ঈর্ষার কারণ হয়ে। কলেজেও তাই, বিশ্ববিদ্যালয়ে উঠেও সেই একই দশা। হঠাৎ এ সময় এসে আর অনেকের মতো আমার জীবনের বাঁক-বদল হয়। শুরুতে এমনটা অনুভব করিনি। মনে করার মতো তেমন কারণও ছিল না। খুব ছোট্টবেলা থেকেই নিজের রূপের বর্ণনা শুনতে শুনতে ভেতরে ভেতরে অহঙ্কারী হয়ে উঠেছি কবে, টেরই পাই নি। অথচ স্বভাবে আমি নিরহঙ্কারী। আমাকে জেনেছে যে খুব কাছ থেকে, অনুভব করেছে নিবিড়ভাবে, সে-ই জানে, আমি মানুষটা নারকেলের মতো। বাইরে মরুভূমি, ভেতরে অথৈ সাগর।
যা-ই হোক, অরুণাভ এলো। পাল্টে গেল আমার প্রতিদিনের ছকবাঁধা জীবন। নিয়ত তাকে প্রত্যাখ্যান একদিন আমাকে শেখালো ভালোবাসা কাকে বলে। বর্ণমালার মতো অরুণাভ শেখাল কী করে ভালোবাসতে হয়। জীবনে সেই প্রথমবার জানলামÑ ভালোবাসাও শেখার বিষয়; যেমনটা একদিন হারমোনিয়ামের রিড চেপে শিখেছিলাম গান। তবে এর আগেও সেই নরম অনুভূতি বুদবুদ করেছিল আমার মনের কুয়োয়। সেটা একান্ত একপেশে, নিজস্ব গোপনে। সেসব অতীত। ডায়েরির পাতার ভাঁজে যেমন শুকনো পাতা থাকে কিংবা গোলাপের পাপড়ি, অতীতের সেই দিনগুলো আজও রাখা আছে আমার ডায়েরির ভাঁজে ভাঁজে। কারণ, আমার অতীত কখনও ধূসর হয় না। এক এক করে স্মৃতি হয়ে ধরে দেয় এক একটা দিনে, নয়তো নির্ঘুম রাতে। তবে আজ যে সংকটের ভেতর দিয়ে আমি যাচ্ছি, তা কাউকেই বলতে পারছি না। না আমার কোনো বন্ধুকে, না কোনো স্বজনকে।
অরুণাভকে আমি আর ভালোবাসতে পারছি না। তাকে দেখলে বরং বড্ড করুণা হয় আজকাল। ছেলেটা পাগলের মতো এখনও ভালোবেসে যাচ্ছে আমাকে। অথচ কবেই ছিঁড়ে গেছে আমাদের ভেতরকার তানপুরার তারটি। দুজনার হাতে ধরা থার্মোমিটারটি হাত ফসকে কবে কখন মাটিতে পড়ে ভেঙে গেছে, পারদ তার ছিটকে পড়েছে এদিক-ওদিকÑ দুজনার কেউ তা টের পাইনি। এই পুরুষবাদী সমাজে হয়তো এতে করে সবাই আমাকেই মন্দ বলবে। পুরো দোষটা চাপিয়ে দেবে আমারই ওপর। আমার পরিবার, আমার বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন সবাই আমাকে ছিঃ ছিঃ করবে। ঘেন্নায় মুখ ঘুরিয়ে নেবে। হয়তো সবাই বলবে, তবে কেন এই মিছে স্বপ্ন-স্বপ্ন খেলা? গ্রিক একটা মিথের কাহিনি আজকাল বড়ো মনে পড়ে। ভালোবাসার চোখে কোনো নারী-পুরুষ যদি একে অপরের দিকে তাকায় তবে স্বর্গে একটি শিশুর নামকরণ করা হয়। আমাদের সেই শিশুর জন্ম আজ থেকে পাঁচ বছর আগে। আজ তার স্কুলে পড়ার বয়স। অথচ জানি, তার জন্ম কখনোই হবে না এই পৃথিবীতে। এ হওয়ার নয়। কেননা, আমি আর অরুণাভকে ভালোবাসি না। অনেক চেষ্টা করেও পারছি না। আমি যাকে আজ ভালোবাসি, তাকে কোনোদিনই পাওয়ার নয়। তবুও তাকে ভালোবাসি। সমাজ-সংসার-ধর্ম বলে কথা! আমার ও অরুণাভের প্রেম পর্বে যে মানুষটির ভূমিকা ছিল সবচেয়ে বেশি, সেই শুভ্র মামাকে আমি ভালোবাসি। মায়ের মেসতুতো ভাইটিই আজ আমার কাক্সিক্ষত প্রেমিক পুরুষ। দিন শেষে আমি যে একজন নিতান্ত মানুষ। ভালোবাসার কাঙ্গাল!
শুভ্র মামা আমাকে ভালোবাসে নিজের জীবনের চেয়েও বেশি। কিন্তু আমি তো সেই ভালোবাসা চাই না। আমি চাই তার কাছ থেকে অরুণাভের মতো কিছু। অথচ তা পাওয়ার নয়। সমাজ আমাকে আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে শিখিয়েছে মামা-সম্পর্কের কাউকে ভালোবাসার বাঁধনে বাঁধতে নেই। আমি বাঁধছিও না। ছেড়ে দিয়েছি নিজেকে। সমুদ্রে ভাসিয়েছি একা ডিঙি নৌকো। কেবল মনে মনে ভেসে যাচ্ছি, ভালোবেসে যাচ্ছি। এইটুকু অধিকার তো আমার আছে, না-কি?
আজ মামা আমাদের বাড়িতে এসেছিল তার বিয়ের নিমন্ত্রণ করতে। আমি মামার দিকে তাকিয়েছিলাম। মামাও আমায় দেখে ¯েœহের হাসি হেসে বললÑ ‘তোর পড়াশোনা কেমন চলছে রে মৃদু?’ আমি আমার নামের মতো মৃদু হেসে ছোট্ট করে বললামÑ ভালোই। কথাটি বলার সঙ্গে সঙ্গে কেন জানি হঠাৎ আমার খুব কান্না পেল। দু-হাতে জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে করল মামাকে। মামার বুকে মুখ রেখে খুব কাঁদতে ইচ্ছে করল। কেন এমনটা অনুভূত হলো, ঠিক জানি না। দোতলার বারান্দার এক কোণে দাঁড়িয়ে আমি শুভ্র মামার চলে যাওয়া দেখলাম। শুভ্র মামা হেঁটে যাচ্ছে। রাস্তা পেরিয়ে বড় রাস্তায়। পেছন থেকে মামাকে খুব ডাকতে ইচ্ছে করছিল। এমনিতেই। আরেকটিবার মুখখানা খুব দেখতে ইচ্ছে করছিল তার। কিন্তু ডাকিনি। কিংবা সাহস হয়নি। শুনেছি, পেছন থেকে ডাকা না-কি অমঙ্গল। আমি তো আর শুভ্র মামার কোনো অমঙ্গল চাইতে পারি না।

পাঠকের মন্তব্য:

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না। তারকাচিহ্নযুক্ত (*) ঘরগুলো আবশ্যক।

*