বিভাগ: প্রতিবেদন

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও প্রাসঙ্গিক কথা

2-6-2019 8-24-44 PMঅ্যাডভোকেট আফজাল হোসেন: একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর এক মাস পার হলো। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু-কন্যা দেশরতœ শেখ হাসিনার নেতৃত্বে নতুন সরকার পূর্ণ উদ্যমে উন্নয়নের ধারাবাহিকতা অক্ষুণœ রাখতে কাজ করে যাচ্ছে। নির্বাচনোত্তর দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে ভালো। মানুষ শান্তিতে আছে, স্বস্তিতে আছে, ভালো আছে।
চতুর্থবারের মতো সরকার পরিচালনার দায়িত্ব প্রাপ্তিতে শেখ হাসিনার রাষ্ট্রনায়কোচিত প্রজ্ঞা ও নেতৃত্বকে অভিনন্দিত করছে বিশ্ববাসী। অতীতের সন্ত্রাস নৈরাজ্যকে প্রত্যাখ্যান করে শান্তি ও গণতন্ত্রের অভিযাত্রায় দেশের মানুষ আজ ঐক্যবদ্ধ। মানুষের প্রত্যাশাÑ অযুত রক্তের বিনিময়ে পাওয়া এই ভূখ- শান্তি, উন্নয়ন ও গণতন্ত্রের ধারায় এগিয়ে যাক। সাম্প্রদায়িকতা, জঙ্গিবাদ যেন আমাদের পথ আগলে না দাঁড়ায়। একটা কল্যাণকামী রাষ্ট্র বিনির্মাণের স্বপ্নযাত্রা থেকে আমরা যেন আর পিছিয়ে না যাই। ষড়যন্ত্র, বিভাজনের অপরাজনীতির কারণে আমাদের অনেক মূল্য দিতে হয়েছে। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মতো মহান নেতাকে আমরা হারিয়েছি। হত্যা, খুন, সন্ত্রাসের ধারাবাহিকতায়Ñ স্বাধীন দেশে জীবন দিতে হয়েছে অনেক মুক্তিযোদ্ধাদের। ক্ষমতাকে সম্পদ অর্জনের হাতিয়ার করে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় তৈরি করা হয়েছে এক লুটেরা গোষ্ঠীর। একরকম এক অন্ধকার সময় পার করে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাঙালি জাতি আলোকোজ্জ্বল এক ভবিষ্যতের দিকে পা বাড়িয়েছে। শেখ হাসিনা সরকারের দৃশ্যমান ভালো কাজের প্রশংসা আজ মানুষের মুখে মুখে। দেশের সকল শ্রেণি-পেশার মানুষ মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আস্থাশীল। কিন্তু একটি গোষ্ঠীর মুখে কুলুপ আঁটা। সরকারের উন্নয়নের সকল সুফল ভোগ করার পরও ভাবটা এমন যেন কিছুই হয়নি। এই নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টাতে হবে। দেশ-জাতির মঙ্গলে মৌলিক বিষয়ে ঐকমত্য থাকতে হবে। যে মূল আদর্শের ওপর দাঁড়িয়ে আমরা স্বাধীন জাতিরাষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন দেখেছিলাম সে-পথেই আমাদের ফিরে আসতে হবে। দীর্ঘ চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে বাংলাদেশ এখন শেখ হাসিনার হাত ধরে সেই পথেই হাঁটছে। স্বাধীনতার পর প্রায় পাঁচ দশক অতিক্রান্ত হয়েছে। এ-সময়ে পৃথিবীর অনেক দেশ অনেক দূর এগিয়েছে, উন্নত হয়েছে। আমরা পারিনি। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর জাতি নেতৃত্বশূন্য হয়ে পড়ে। সেনাশাসনে বাংলাদেশ নিপতিত হয়। তারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধ্বংস করে, বঙ্গবন্ধুর সৃষ্টিশীল উন্নয়ন-অগ্রযাত্রাকে স্তব্ধ করে দেয়। দীর্ঘ ২১ বছর হত্যা, ক্যু, পাল্টা ক্যু, খুন, ধর্ষণ, সন্ত্রাস, লুটপাটের এক দুষ্টচক্রে ঘুরপাক খাচ্ছিল বাংলাদেশ। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ১৯৯৬ সালে দীর্ঘ ২১ বছর পর দেশ পরিচালনার সুযোগ পায় আওয়ামী লীগ। সাম্প্রদায়িক স্বৈরতান্ত্রিক ধারার অবসান ঘটে। রাষ্ট্র ও সমাজ-জীবনে প্রতিষ্ঠিত হয় মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। বিশ্বসভায় বাংলাদেশ মাথা উঁচু করে দাঁড়ায়। এই সময়কাল বাংলাদেশের ইতিহাসে স্বর্ণযুগ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। ২০০১ সালে ষড়যন্ত্রমূলক ভোট ডাকাতির নির্বাচনে বিএনপি-জামাত ক্ষমতা দখল করে। জেনারেল জিয়া সৃষ্ট স্বৈরতান্ত্রিক ধারায় ফিরে যায় বিএনপি-জামাত জোট। ক্ষমতার প্যারালাল কেন্দ্র হাওয়া ভবনের নির্দেশে চলতে থাকে দমন-নিপীড়ন, সন্ত্রাস ও লুটপাট। জঙ্গিবাদ ও সাম্প্রদায়িক রাজনীতিকে উসকে দেওয়া হয়। একযোগে ৬৩ জেলার ৫০০ স্থানে বোমা হামলা চালানো হয়। জননেত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা হয়। রাষ্ট্রীয় মদদে প্রতিহিংসার রাজনীতির নিষ্ঠুরতার সাক্ষী এই বাংলাদেশ। এই অপকর্মের হোতা বিএনপি-জামাত। এই জোটের অপরাজনীতির কারণে ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি পটপরিবর্তন হয়। বিএনপি-জামাতের পাঁচ বছরে স্বৈরশাসন ও সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিরাজনীতিকরণের হীন প্রচেষ্টাকে প্রতিহত করে ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে অবাধ সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে। এ-সময় দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করে, ক্ষুধা-দারিদ্র্যের অবসান, মাথাপিছু আয়, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে দেশের অভাবনীয় সাফল্যে অর্জিত হয়। ২০১৪ সালের নির্বাচন পূর্ব ও পরবর্তী সময়ে জনসম্পৃক্ততাহীন বিএনপি-জামাতের আগুন সন্ত্রাস প্রতিহত করে গণতান্ত্রিক ধারায় দেশ এগিয়ে যায়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ধৈর্য, সাহস, প্রজ্ঞায় উন্নয়নের ধারায় দেশ পরিচালিত হয়। বিশ্বসমাজে উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে ঘুরে দাঁড়ায় বাংলাদেশ।
বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ আর্থিক প্রতিষ্ঠান এইচএসবিসি’র (হংকং সাংহাই ব্যাংকিং কর্পোরেশন) বার্ষিক রিপোর্টে বলা হয়েছেÑ বাংলাদেশ বিশ্বের ২৬তম বৃহৎ অর্থনীতির দেশে পরিণত হতে যাচ্ছে। একইসঙ্গে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক উন্নয়নের দিক থেকে ফিলিপাইন, পাকিস্তান, ভিয়েতনাম ও মালয়েশিয়াকে পেছনে ফেলে দেবে।
এছাড়া ‘বিশ্ব অর্থনীতির অবস্থা ও সম্ভাবনা-২০১৯’ নামে জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনের পূর্বাভাস রয়েছে যে, চলতি বছর বিশ্বের যেসব দেশে ৭ শতাংশ বা এর বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জিত হবে তার মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম।
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে লেখা শুরু করেছিলাম। গত তিন মেয়াদের আওয়ামী লীগ সরকারের উন্নয়নের ফিরিস্তি স্বল্প পরিসরে দেওয়া সম্ভব নয়। এবার মূল প্রসঙ্গে আসি। আওয়ামী লীগ সরকারের কোনো ভালো কাজই বিএনপি-জামাতের সহ্য হয় না। বক্তৃতা-বিবৃতি-টকশো’তে তারা নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করছে। বিএনপি-জামাত ঐক্যফ্রন্টের যতই মন কষ্ট হোক না কেন, এবারের নির্বাচনে যুদ্ধাপরাধী সাম্প্রদায়িক শক্তির বিদায় ঘণ্টা বেজেছে। উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রয়েছে। অসাংবিধানিক পন্থায় ক্ষমতায় যাওয়ার পথ রুদ্ধ হয়েছে।
তবে সুখের বিষয় অতীতের মতো বিএনপি-জামাতের সাথে কোরাস তোলার লোকের সংখ্যা দেশে কমে যাচ্ছে। অসাংবিধানিক পন্থায় ক্ষমতায় যাওয়ার ছিদ্রপথ বন্ধ হওয়াতে অনেকেই হতোদ্যম হয়েছে। সামরিক শাসন ও অগণতান্ত্রিক শক্তির উচ্ছিষ্ট ভোগকারীরা এখন বিএনপি-জামাতের কাঁধে সওয়ার হয়েছে। যদি কিছু পাওয়া যায় এই আশায়। দেশের স্বার্থ তাদের কাছে বড় না।
শেখ হাসিনার সরকার পরিচালনার নীতি-কৌশল নিয়ে কঠিন নিন্দুকরাও খুব একটা খুঁত ধরতে পারছে না। তাদের একটাই কথা ‘নির্বাচনটা ভালো হয়নি’। তাহলে তাদের কাছে নিশ্চয়ই ভালো নির্বাচনের একটা সংজ্ঞা আছে, উদাহরণ আছে। দেশবাসী কি ১৯৭৭ সালের হ্যাঁ-না ভোটকে ভালো নির্বাচন বলবে। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি বিনা ভোটের নির্বাচনকে কোন সংজ্ঞায় সংজ্ঞায়িত করবেন। এছাড়া হোন্ডা-গু-ার মহড়ায় ‘মাগুরা মার্কা’ নির্বাচন তো আছেই। এখন যারা ভালো নির্বাচনের কথা বলতে বলতে মুখে ফেনা তুলে ফেলছেন, তারা তো ভুলেও ২০০১-এর ভোট ডাকাতির নির্বাচনের কথা মুখে আনেন না।
১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছর মেয়াদ শেষ করে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করেছিল আওয়ামী লীগ। দেশবাসী নিশ্চয়ই ভুলে যায়নি কীভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের প্রথম দিনেই ১৩ জন সচিবকে চাকরি থেকে বের করে দিয়ে নির্বাচনকে প্রভাবিত করার জন্য মাঠ প্রস্তুত করা হয়েছিল। কোনো রকম সৌজন্যবোধের তোয়াক্কা না করে সদ্য বিদায়ী প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবনের ফোনের লাইন ও বিদ্যুতের লাইন কেটে দেওয়া হয়েছিল। ভোটের দিন আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা ভোটকেন্দ্রের কাছে যেতে পারেনি। পূর্বনির্ধারিত পরিকল্পনামাফিক বিএনপি-জামাত ক্ষমতায় আসে। এরপর শুরু হয় তা-ব, গ্যাং রেপ। হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করা হয়। এখন যারা বিবেকের তাড়নায় ঘুমোতে পারছেন না। তাদের বিবেক তখন কোথায় ছিল? বিবেকবানদের দৃষ্টিতে ২০০১ সালের নির্বাচন যদি ভালো নির্বাচন হয়। তাহলে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে তাদের বক্তব্যকে দেশবাসী কীভাবে নেবে? এই নির্বাচনের আগে-পরে প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিদের চাকরিচ্যুতি ঘটেনি। রাজপথ রক্তাক্ত হয়নি। অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে নির্বাচনের পূর্ব ও পরে সংঘাতমুক্ত শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বিরাজ করছে। চাকরিজীবীরা সন্তুষ্টমনে চাকরি করছেন। ব্যবসায়ীরা হাওয়া ভবনের উৎপাতমুক্ত পরিবেশে ব্যবসা করছে। ২০১১ সালে কানাডা সফরের সময় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা ‘ভালোর পসরা’ নামে একটা প্রবন্ধ লিখেছিলেন। লেখাটা এ-সময়ের জন্যও খুব প্রাসঙ্গিক। শেখ হাসিনা যত ভালো কাজই করুক না কেন, তাতে তাদের মন ভরে না। নির্বাচন ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার জন্য ছবিযুক্ত ভোটার তালিকা, স্বচ্ছ ব্যালট বাক্সসহ যত বিধিবিধান করা হয়েছে, সবই করেছে আওয়ামী লীগ সরকার। অথচ সামরিক সরকার বা তার উচ্ছিষ্ট ভোগকারীরা যখন ক্ষমতায় ছিল তখন নির্বাচন ব্যবস্থাকে সমূলে ধ্বংস করেছিল, এখন আবার তারাই নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য ‘ভালোর পসরা’ নিয়ে হাজির হয়েছে। এই ভালোর দল নিয়ে জননেত্রী শেখ হাসিনার কয়েকটা লাইন দিয়েই লেখার ইতি টানছি।Ñ

“…অগণতান্ত্রিক বা অসাংবিধানিক সরকার থাকলে এদের দাম থাকে। এই শ্রেণিটা জীবনে জনগণের মুখোমুখি হতে পারে না। ভোটে জিততে পারে না। কিন্তু ক্ষমতার লোভ ছাড়তে পারে না। তাই মুখে গণতন্ত্রের কথা বলে কিন্তু অগণতান্ত্রিক বা অসাংবিধানিক সরকারের যে খোশামোদি, তোষামোদি ও চাটুকারের দলের যে প্রয়োজন হয়Ñ এরা সেই দল।”

লেখক : তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ

পাঠকের মন্তব্য:

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না। তারকাচিহ্নযুক্ত (*) ঘরগুলো আবশ্যক।

*