বিভাগ: সংসদ

একাদশ সংসদের যাত্রা শুরু

2-6-2019 8-12-13 PMউত্তরণ প্রতিবেদন: সংসদীয় গণতন্ত্রের পথে ফের আনুষ্ঠানিক যাত্রা করল বাংলাদেশ। সরকার ও বিরোধী দলের সরব উপস্থিতির মধ্য দিয়ে গত ৩০ জানুয়ারি শুরু হলো একাদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন। সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার দৃঢ় প্রত্যয়ে শুরু হওয়া সংসদের প্রথম অধিবেশন ছিল উৎসবমুখর পরিবেশ। ’৭৩-পরবর্তী দেশের ইতিহাসে বৃহত্তম সরকারি দলের পাশাপাশি ক্ষুদ্রতম বিরোধী দল নিয়ে শুরু হওয়া সংসদ অধিবেশনে দিক-নির্দেশনামূলক ভাষণ দেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। জয়-পরাজয়ের ব্যবধানে দেশের ইতিহাসে রেকর্ড সৃষ্টিকারী একাদশ জাতীয় সংসদের সূচনাতেই স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার পদে পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী ও অ্যাডভোকেট ফজলে রাব্বি মিয়া। আর সংসদে প্রধান হুইপ পদে নিয়োগ পেয়েছেন নূর-ই-আলম চৌধুরী লিটন।
অধিবেশনের শুরুতেই সংবিধান অনুযায়ী জাতীয় সংসদের ১৬তম স্পিকার হিসেবে পুনর্নির্বাচিত হন ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী। স্পিকার পদে ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর নাম প্রস্তাব করেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। সমর্থন করেন নতুন চিফ হুইপ নূর-ই-আলম চৌধুরী লিটন। স্পিকারের আসনে থাকা ডেপুটি স্পিকার অ্যাডভোকেট ফজলে রাব্বি মিয়া প্রস্তাবটি ভোটে দিলে সরকার ও বিরোধী দলের কণ্ঠভোটে সর্বসম্মতিক্রমে তৃতীয়বারের মতো স্পিকার নির্বাচিত হন ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী।
স্পিকার নির্বাচনের পর সংসদের অধিবেশন ২০ মিনিটের জন্য মুলতবি করা হয়। মুলতবির সময়ে সংসদ ভবনের সপ্তম তলায় রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ে পুনর্নির্বাচিত স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীকে শপথ বাক্য পাঠ করান রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। এ সময় চিফ হুইপ নূর-ই-আলম চৌধুরী লিটনসহ অন্যরা উপস্থিত ছিলেন। শপথ গ্রহণ শেষে ফের অধিবেশন শুরু হলে স্পিকারের আসনে বসেন ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী।
বিকাল ৩টায় ডেপুটি স্পিকার অ্যাডভোকেট ফজলে রাব্বি মিয়ার সভাপতিত্বে পর্দা ওঠে একাদশ জাতীয় সংসদের। অধিবেশন শুরুর আগে বেলা ১২টার পর থেকেই পুরো সংসদ ভবন নবীন-প্রবীণ সংসদ সদস্যের পদচারণায় মুখরিত হয়ে ওঠে। দেশের ইতিহাসে এবারই প্রথম ৩০০ আসনের মধ্যে ২৫৮ আসনেই বিজয়ী হয়েছে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ।
সংসদ অধিবেশনে ঢোকার আগেই দুপুর ২টায় সংসদের নবম তলার সরকারি দলের কমিটি কক্ষে আওয়ামী লীগ এবং অন্যপাশে বিরোধী দলের সভাকক্ষে জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্যরা সভায় বসে নিজ নিজ দলের কর্মকৌশল চূড়ান্ত করে। আওয়ামী লীগের সভায় সর্বসম্মতক্রমে স্পিকার পদে ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী, ডেপুটি স্পিকার হিসেবে অ্যাডভোকেট ফজলে রাব্বি মিয়াকে মনোনয়ন দেওয়া হয়। আর প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শক্রমে রাষ্ট্রপতি সংসদের প্রধান হুইপ হিসেবে নূর-ই-আলম চৌধুরী লিটন এবং ছয়জন যথাক্রমে আতিউর রহমান আতিক, ইকবালুর রহীম, আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন, পঞ্চানন বিশ্বাস, সামশুল হক চৌধুরী ও মাহবুব আরা গিনিকে নিয়োগ দেন। ছয় হুইপের মধ্যে তিনজনই নতুন মুখ। আওয়ামী লীগের সংসদীয় দলের বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নতুন সংসদ সদস্যদের সংবিধান ও কার্যপ্রণালি বিধিসহ সংসদীয় কার্যক্রম শিখতে বেশি করে লাইব্রেরিতে যাওয়ার নির্দেশ দেন।
আধাঘণ্টা বিরতির পর বিকাল ৩টা ৫৪ মিনিটে নয়া স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে সংসদের কার্যক্রম শুরু হয়। প্রথমেই তিনি ডেপুটি স্পিকার পদে নির্বাচনের কার্যক্রম শুরু করেন। ওই পদে একটিমাত্র মনোনয়ন জমা পড়ে। দ্বিতীয়বারের মতো ডেপুটি স্পিকার হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন অ্যাডভোকেট ফজলে রাব্বি মিয়া। তার পক্ষে প্রস্তাব করেন হুইপ আতিউর রহমান আতিক, সমর্থন করেন অপর হুইপ ইকবালুর রহীম। এরপর স্পিকার প্রস্তাবটি ভোটে দিয়ে কণ্ঠভোটে সর্বসম্মতক্রমে ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হন ফজলে রাব্বি মিয়া। নির্বাচিত হওয়ার পর রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ে তাকে শপথ বাক্য পাঠ করান রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ।
স্পিকার তার স্বাগত বক্তব্যে দ্বিতীয়বারের মতো নির্বাচিত হওয়ায় আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করে সংসদীয় গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে সবার সহযোগিতা কামনা করেন।
স্পিকার বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ আজ সমগ্র বিশ্বে উন্নয়নের বিস্ময়। এই নির্বাচনে বাংলাদেশের জনগণ আমাদের ওপর আস্থা ও গুরুদায়িত্ব অর্পণ করেছেÑ তা যথাযথভাবে পালন করাই হোক আমাদের আজকের প্রত্যয়। গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রার মধ্য দিয়ে উন্নয়নের লক্ষ্যে জাতীয় সংসদ কার্যকর ভূমিকা রাখবে এই হোক আমাদের সকলের সম্মিলিত কাজ। আসুন আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করে ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত উন্নত-সমৃদ্ধ বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়ে তুলি।
এরপর পুনর্নির্বাচিত স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীকে শুভেচ্ছা জানিয়ে সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছাড়াও বক্তব্য রাখেন আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতা তোফায়েল আহমেদ, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন, জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু ও বিরোধী দলের উপনেতা গোলাম মোহাম্মদ কাদের। তারা সবাই স্পিকারকে শুভেচ্ছা জানানোর পাশাপাশি গঠনমূলক কর্মকা-ের মাধ্যমে সংসদীয় গণতন্ত্রের ভিতকে আরও মজবুত করার অঙ্গীকার করেন। সংসদে জাতীয় পার্টি সত্যিকারের বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করবে বলে জানান বিরোধী দলের উপনেতা জিএম কাদের।
স্বাগত বক্তব্য শেষে সদ্য প্রয়াত সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম ছাড়াও বিভিন্ন সময়ে দেশে-বিদেশে মৃত্যুবরণকারী বিশিষ্ট ব্যক্তি ও রাজনীতিকের জন্য শোক প্রস্তাব উত্থাপন করেন স্পিকার। শোক প্রস্তাবের ওপর বক্তব্য শেষে মৃত্যুবরণকারীদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করে এক মিনিট নীরবতা পালন শেষে মোনাজাত করা হয়। মোনাজাত পরিচালনা করেন আওয়ামী লীগের বজলুল হক হারুন। শোক প্রস্তাবের ওপর আলোচনা করেন সংসদ নেতা শেখ হাসিনা, জ্যেষ্ঠ নেতা আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমেদ, মোহাম্মদ নাসিম ও কৃষিমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক।
সর্বসম্মতিক্রমে শোক প্রস্তাব গ্রহণ শেষে সভাপতিম-লীর সদস্য ঘোষণা করা হয়। স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের অনুপস্থিতিতে সংসদ পরিচালনাকারী সভাপতিম-লীর সদস্যরা হলেনÑ আবুল কালাম আজাদ, শামসুল হক টুকু, এবি তাজুল ইসলাম, ফখরুল ইমাম এবং সাগুফতা ইয়াসমীন এমিলি।
এরপর আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের অনুপস্থিতিতে তার পক্ষে গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম রাষ্ট্রপতির জারি করা ৫টি অধ্যাদেশ সংসদে উত্থাপন করেন। অধ্যাদেশগুলো হলোÑ রিপ্রেজেনটেশন অব দি পিপল (এ্যামেন্ডমেন্ট) অর্ডিন্যান্স-২০১৮, ইট প্রস্তুত ও ভাঁটি স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) (সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০১৮, চিটাগাং হিল ট্রাক্টস (ল্যান্ড ইকুইজেশন) (সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০১৮, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অ্যাভিয়েশন অ্যান্ড অ্যারোস্পেস বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ-২০১৮ এবং ইপিজেড শ্রম অধ্যাদেশ-২০১৯।
সৈয়দ আশরাফের মৃত্যুতে রেওয়াজ অনুযায়ী ৩৫ মিনিটের বিরতি শেষে সন্ধ্যা সোয়া ৬টায় স্পিকারের সভাপতিত্বে ফের শুরু হয় সংসদ অধিবেশন। বিউগল বাজানোর মধ্য দিয়ে সোয়া ৬টায় রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ অধিবেশন কক্ষে প্রবেশ করলে সবাই দাঁড়িয়ে তাকে সম্মান জানান। রাষ্ট্রপতি প্রবেশের সময় যন্ত্রের মাধ্যমে জাতীয় সংগীত পরিবেশন করা হয়। স্পিকারের পাশের আসনে বসে নতুন বছরের প্রথম অধিবেশনে ভাষণ দেন তিনি। এরপর জাতীয় সংগীত পরিবেশন শেষে সন্ধ্যা ৭টা ২৪ মিনিটে রাষ্ট্রপতি তার বক্তব্য শেষ করেন। এরপর রাষ্ট্রপতি সংসদ অধিবেশন কক্ষ ত্যাগ করলে স্পিকার সংসদের অধিবেশন ৬ জানুয়ারি বিকাল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত মুলতবি করেন।
গত ৩ জানুয়ারি শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে দায়িত্বভার গ্রহণ করেছেন সরকার ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা। এই সংসদে আওয়ামী লীগ ২৫৮, জাতীয় পার্টি ২২, ওয়ার্কার্স পার্টি ৩, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) ২, বিকল্পধারার ২, তরিকত ফেডারেশনের ১, জাতীয় পার্টির (মঞ্জু) ১ এবং স্বতন্ত্র সদস্যরা ৩টি আসন পেয়েছে।

পাঠকের মন্তব্য:

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না। তারকাচিহ্নযুক্ত (*) ঘরগুলো আবশ্যক।

*