বিভাগ: শোক সংবাদ/স্মরণ

এক আদর্শ সংস্কৃতিবান রাজনীতিবিদ

1-15-2019 6-58-37 PMনূহ-উল-আলম লেনিন:

এক
অকালেই চলে গেলেন সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। ক্যানসারাক্রান্ত স্ত্রীর মৃত্যুর শোক না কাটতেই জানা গেল, তার শরীরে এই কর্কট রোগ বাসা বেঁধেছে। কোনো চিকিৎসাই তাকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে পারল না। আমাদের রাজনৈতিক অঙ্গনে অপ্রত্যাশিত এক শূন্যতার সৃষ্টি করে চলে গেলেন না ফেরার দেশে।
সৈয়দ আশরাফ বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের দুবারের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ছিলেন সভাপতিম-লীর সদস্য এবং মন্ত্রিসভার সদস্য। রাজনৈতিক প্রোফাইলে নিঃসন্দেহে এগুলো বড় মাপের সাফল্যের দ্যোতক। কিন্তু তাকে কী রাজনৈতিক পদাধিকারকারীর ছকে ফেলে মাপা যথার্থ হবে? আশরাফ তো তার জীবন দিয়ে প্রমাণ করে গেলেন ‘ক্ষমতার চেয়ে ইন্টেলেক্ট’ এবং দাম্ভিকতার চেয়ে বিনয়, সর্বোপরি অর্থ-বিত্ত-সম্পদের চেয়ে সততার মূল্য কত বেশি। এই গুণগুলো আমাদের রাজনীতিবিদদের মধ্যে সত্যিই দুর্লভ। আশরাফ আমার চেয়ে বয়সে সামান্য ছোট হলেও, সে আমাদের প্রজন্মেরই একজন ছিলেন। এ জন্য আমি গর্বিত।
আমাদের প্রজন্মে পোড়খাওয়া অনেক ত্যাগী নেতা ছিলেন। প্রতিভার ঔজ্জ্বল্যও ছিল। কিন্তু ক্রমশ তাদের সংখ্যা কমে আসছে। আর যারা এখনও সক্রিয় আছেন, তারাও ঔজ্জ্বল্য হারাচ্ছেন। বাজার রাজনীতির ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে তারা কেমন যেন নিষ্প্রভ হয়ে যাচ্ছেন। হ্যাঁ, তাদের কারও কারও অর্থ-বিত্ত-সম্পদ বেড়েছে, চোখ ধাঁধানো জৌলুস বেড়েছে, ক্ষমতার দম্ভ তাদের অতীতকে কালো চাদরে ঢেকে দিয়েছে। কিন্তু আশরাফ ছিলেন এর মধ্যে ব্যতিক্রম। দুর্নীতি, দুর্বৃত্তায়ন, ক্ষমতার দম্ভ, অহঙ্কার এবং নির্বোধের মতো অতিকথনের মালিন্য তাকে স্পর্শ করেনি। সাদাসিধে জীবনযাপন করতেন তিনি, অর্থ-বিত্ত-সম্পদের প্রতি নির্লিপ্তি এবং স্বজন পোষণের প্রতি সচেতন ঔদাসীন্য তাকে তার নিকটজনেরও অনেকের কাছে অপ্রিয় করে তুলেছিল।
উচ্চ শিক্ষিত স্ত্রী শীলা এবং একমাত্র কন্যা রীমা লন্ডনেই চাকরি করতেন। শেষের দিকে শীলা লম্বা সময় নিয়ে বাংলাদেশে এসে থাকতেন। কিন্তু একমাত্র কন্যাটি কখনোই পিতার ‘ক্ষমতা’ দেখা বা তার কাছ থেকে অংশীদারিত্ব নেওয়ার জন্য আগ্রহী ছিল না। বরং আশরাফ বেশ তৃপ্তির সাথে বলতেন, ‘আমার মেয়েই আমার ইনসিওরেন্স।’ আমার ভরসা।
সৈয়দ নজরুল ইসলামের যেমন ঢাকায় কোনো জমিজমা বা স্থায়ী বাসস্থান ছিল না, তেমনি সৈয়দ আশরাফেরও কোনো স্থাবর সম্পত্তি নেই। যখন সংসদ সদস্য বা মন্ত্রী ছিলেন না, তখন থাকতেন ছোট ভাইয়ের বাসায়। কখনও বা ভাড়া বাসায়। মন্ত্রিপাড়ার ব্রিটিশ আমলে নির্মিত যে বাসাটিতে থাকতেন, সেটিও ছিল একেবারেই সেকেলে, আটপৌরে এবং অতি সাধারণ সামান্য আসবাবপত্রে সজ্জিত। ছোট বোনটি এসে মাঝে মাঝে এসে বড় ভাইয়ের কাছে থাকতেন। তার জন্য আলাদা কোনো কক্ষের ব্যবস্থা ছিল না। দোতলার বসার ঘরটিতেই বোন একটা অস্থায়ী তক্তপোষ ফেলে থাকতেন। আমি অন্য কোনো মন্ত্রী বা নেতার যাপিত জীবনে এ ধরনের নজির পাইনি।

দুই
শেখ হাসিনা ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বাবা-মা, ভাই ও ভ্রাতৃবধূদের হারিয়ে একেবারে ‘একা’ হয়ে পড়েছিলেন। ছোট বোন রেহানাকে নিয়ে তার দুর্দিনের দিনগুলো কেটেছে। একপর্যায়ে রেহানাকে বিয়ে দিয়ে তিনি একদিকে কিছুটা নিশ্চিন্তবোধ করেন। অন্যদিকে আরও একা হয়ে পড়েন। উদ্বাস্তু জীবনের প্রাথমিক ধাক্কা সামাল দিয়ে শেখ হাসিনা প্রবাসেই রাজনৈতিক কর্মকা-ে সক্রিয় হয়ে ওঠেন। লন্ডনে তখন তার সহায় হয়ে ওঠেন সৈয়দ আশরাফ। আশরাফ উচ্চ শিক্ষার্থে লন্ডনে গিয়েছিলেন আগেই। ইংল্যান্ডে এবং ইউরোপে বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদে ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক জনমত গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছিলেন তারা।
ব্রিটিশ পার্লামেন্টের লেবার পার্টির স্যার টমাস উইলিয়ামস, আয়ারল্যান্ডের সাবেক মন্ত্রী ও শান্তিতে নোবেল জয়ী শন ম্যাকব্রাইড এবং ব্রিটিশ এমপি জেফরি টমাস প্রমুখের নেতৃত্বে ইউরোপের কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তিকে নিয়ে গড়ে তোলা হয় বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ের আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশন। লন্ডন ও ইউরোপ প্রবাসী বঙ্গবন্ধুর অনুরাগী বিশিষ্টজনকে এই কর্মকা-ে সম্পৃক্ত করা হয়। এই সামগ্রিক কর্মকা-ে শেখ হাসিনার সঙ্গী ছিলেন সৈয়দ আশরাফ। শেখ হাসিনা ও আশরাফের কাছ থেকে সেই দুঃসময়ের অনেক দুঃখ-যন্ত্রণা এবং কষ্টের কথা আমরা অনেকেই কম-বেশি শুনেছি। সেই সময় থেকেই, ভাইহারা শেখ হাসিনা সৈয়দ আশরাফের মধ্যে তার ভাইকে ফিরে পেয়েছিলেন। দুজনের এই ভাই-বোনের সম্পর্কে নানা টানাপড়েন থাকলেও, আশরাফের মৃত্যু পর্যন্ত তা অটুট ছিল। ’৭৫-এ ভাই হারানোর পর শেখ হাসিনা আরেকবার তার ভাইকে হারালেন।

তিন
শেখ হাসিনার প্রেরণায় সৈয়দ আশরাফ লন্ডনের পাট চুকিয়ে নব্বইয়ের দশকে দেশে ফিরে আসেন। ১৯৯৬-এর নির্বাচনে আশরাফ তার পিতার আসন, কিশোরগঞ্জ থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০২ সালের কাউন্সিলে তিনি দলের অন্যতম যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পান।
১৯৯৭ সালে আমি আওয়ামী লীগে যোগদান করি। ঐ বছরই কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সদস্য হই। ২০০২ সালে দলের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদকের দায়িত্ব পাই। আওয়ামী লীগ ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠকে কালেভদ্রে আশরাফ বক্তব্য রাখতেন। কিন্তু তার সংক্ষিপ্ত এবং পয়েন্টেড বক্তৃতা শুনে মুগ্ধ বিস্ময়ে আবিষ্কার করলাম, একজন বুদ্ধিদীপ্ত পরিশীলিত সম্ভাবনাময় রাজনীতিবিদকে। একটু একটু করে তার সাথে পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে।
বস্তুত, ১/১১-এর পরেই সৈয়দ আশরাফের সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এই সময় থেকে তিনিও জাতীয়ভাবে পরিচিতি লাভ করেন। ১/১১-এর বৈরী পরিবেশে শেরেবাংলা নগরে আশরাফের সংসদ সদস্য ভবনটি আমাদের কর্মকা-ের অন্যতম কেন্দ্র হয়ে ওঠে। ইতোমধ্যে দলের সাধারণ সম্পাদক আবদুল জলিল এবং যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের গ্রেফতার হয়ে যান। সৈয়দ আশরাফ ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পান। জরুরি অবস্থার সুবাদে উচ্চাভিলাষী সামরিক কর্মকর্তাগণ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মেয়াদ প্রলম্বিত, বিকল্প রাজনৈতিক দল/প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলা, ‘মাইনাস টু’ ফর্মুলা প্রচার করে প্রধান দুই দলে ভাঙন ধরানোর চেষ্টা প্রভৃতি অপতৎপরতা শুরু করে। ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে শেখ হাসিনাকে রাজনীতি থেকে নির্বাসিত করার ষড়যন্ত্র কার্যকর হতে চলছে। ২০০৭ সালের প্রথম দিকে শেখ হাসিনা কিছুদিনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে যান। তিনি দেশে ফিরে আসার পথে সরকার ঘোষণা করে শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরে আসতে দেওয়া হবে না। লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দরে কোনো ঢাকাগামী বিমান তাকে বহন করতে অস্বীকৃতি জানায়। শেখ হাসিনা ঘোষণা করেন, যে কোনো উপায়েই হোক তিনি বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করবেনই। শেখ হাসিনার অনমনীয় মনোভাব এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে তত্ত্বাবধায়ক প্রশাসনের এই পদক্ষেপের নিন্দার ঝড় ওঠার পর একপর্যায়ে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়। শেখ হাসিনা দেশে ফিরে আসেন।
ইতোমধ্যে দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের নামে বিপুলসংখ্যক রাজনীতিবিদকে গ্রেফতার ও নির্যাতন করা হয়। সৈয়দ আশরাফ সেই দুর্দিনে শেখ হাসিনার পাশে দাঁড়ান। কিন্তু দলের মধ্যেই তথাকথিত সংস্কারবাদী নেতারা পৃথক পৃথক সংবাদ সম্মেলন করে দলে সংস্কারের নামে মাইনাস টু ফর্মুলা কার্যকর করার উদ্যোগ নেন। শেখ হাসিনা পাল্টা উদ্যোগ নিয়ে নিজেই ‘সংস্কার প্রস্তাব’ দিতে বলেন। শেখ হাসিনার এই উদ্যোগের ফলে সংস্কারবাদী নেতারা প্রমাদ গুনেন।
ঠিক এই সময়টিতে সামরিক কর্তৃপক্ষ সৈয়দ আশরাফকে ডেকে অবিলম্বে দেশত্যাগ করতে বলেন। কিংকর্তব্যবিমূঢ় আশরাফ নেত্রীকে সব খুলে বলেন। তিনি সাময়িকভাবে লন্ডনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। যাওয়ার আগের রাতে আমার কলাবাগানের বাসায় বসে তাকে ভুল বোঝা হবে ভেবে আশরাফ অঝোরে কেঁদেছিলেন। যাওয়ার আগে বলেছিলেন, লেনিন ভাই, আমি স্থায়ীভাবে যাচ্ছি না। আমি শিগগিরই ফিরে আসব।
সৈয়দ আশরাফের অনুপস্থিতিতে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মুকুল বোস ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হন। সংস্কারবাদীরা এতে উৎসাহিত হন। পরিস্থিতি কিছুটা নাজুক হয়ে ওঠে। এই পটভূমিতে শেখ হাসিনাকে গ্রেফতার করা হয়। দলে সৃষ্টি হয় নেতৃত্বের শূন্যতা। ইতোমধ্যে বিএনপি-তেও সংকট ঘণীভূত হয়। শেখ হাসিনাকে গ্রেফতার করার বেশ কিছুদিন পর খালেদা জিয়াকে গ্রেফতার করা হয়। বিএনপি-র সংস্কারবাদীরা দলের মহাসচিব মান্নান ভূঁইয়ার নেতৃত্বের আলাদা কেন্দ্র গড়ে তোলে। বিএনপি কার্যত ভাগ হয়ে যায়।
কিন্তু আওয়ামী লীগে পরিস্থিতি ভিন্ন দিকে মোড় নেয়। শেখ হাসিনাকে অন্যায়ভাবে গ্রেফতার করায় দেশবাসীর মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। নেতা-কর্মীদের মধ্যে সৃষ্টি হয় গভীর আবেগ। ফলে সংস্কারবাদী বলে কথিত নেতাদের ওপর সামরিক কর্তৃপক্ষের চাপ থাকলেও তাদের দিয়ে দলে আনুষ্ঠানিক ভাঙন সৃষ্টি করতে তারা ব্যর্থ হয়। বিচার প্রহসনের বিরুদ্ধে কর্মীদের সাহসী ভূমিকা এবং আন্দোলন প্রবল জনমত গড়ে উঠতে সহায়তা করে। সরকার আকস্মিকভাবেই রাজনৈতিক তৎপরতার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে।

চার
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও সেনা কর্তৃপক্ষের মধ্যে ভেতরে ভেতরে মতপার্থক্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। নোবেল জয়ী ড. ইউনূসের দল গঠনের উদ্যোগ ব্যর্থ হয়। তিনি দল করবেন না ঘোষণা দিয়ে নিজেকে গুটিয়ে নেন। ফেরদৌস কোরেশী এবং সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল ইব্রাহিম প্রমুখের সরকারের আশীর্বাদপুষ্ট দল গঠনের উদ্যোগে তেমন কোনো সাড়া না পাওয়ায়, তারাও নিষ্প্রভ হতে থাকেন। ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে সেনাবাহিনীর অভিযান, শিক্ষক ও ছাত্রদের গ্রেফতার প্রভৃতি তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও সেনাবাহিনীকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে। সেকুলার গণতান্ত্রিক দলগুলোর মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের চেষ্টা চলতে থাকে।
লন্ডনে বসে বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ রেহানা আওয়ামী লীগ নেতাদের ঐক্যবদ্ধ রাখতে, শেখ হাসিনার মুক্তির দাবিতে সোচ্চার হতে উদ্বুদ্ধ করেন। সেই সময় শেখ রেহানার সাথে আমারও কথা হয়। তিনি জানান, শিগগিরই সৈয়দ আশরাফ ঢাকায় ফিরে যাবে। লন্ডনে থাকাকালে সৈয়দ আশরাফের সঙ্গে আমাদের নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। তার সাথে যোগাযোগ রাখার একটি প্রধান কেন্দ্র ছিলেন অ্যাডভোকেট রেজা আলী, যিনি ২০০৮-এর নির্বাচনে সংসদ সদস্য হয়েছিলেন। পর্দার অন্তরালে নানামুখী তৎপরতা চলতে থাকে। সৈয়দ আশরাফ লন্ডন থেকে ঢাকায় ফিরে আসেন। আওয়ামী লীগ কর্মীদের মধ্যে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে আসে।
ভারপ্রাপ্ত সভাপতি জিল্লুর রহমান দৃঢ়ভাবে দলের হাল ধরেন। জেল থেকে শেখ হাসিনার প্রেরিত নির্দেশনা ও পরামর্শমতো দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখার সর্বাত্মক উদ্যোগ নেওয়া হয়। সৈয়দ আশরাফ ফিরে আসায়, তিনি আবার ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সংস্কারবাদীরা হতোদ্যম হয়ে পড়ে। আশরাফ আমার বাসায় বসেই একটি অঘোষিত কোর টিম গঠন করেন। জেলাগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ, সেকুলার গণতান্ত্রিক দলগুলোর সঙ্গে লিয়াজোঁ এবং কূটনৈতিকমহলে যোগাযোগের জন্য দায়িত্ব ভাগ করা হয়। সিদ্ধান্ত হয়, যারা এই সকল কাজে যুক্ত থাকবেন, তারা প্রকাশ্য মিটিং-মিছিলে আপাতত বেশি যাবেন না। আশরাফ সুনির্দিষ্টভাবে আমাকে বললেন, আপনারা তো গোপন তৎপরতার ওস্তাদ। যে যাই বলুক, আপনি নিজেকে এক্সপোসড করবেন না।
১/১১-এর এই পর্যায়টিতে আমরা বহুমুখী গোপন তৎপরতা চালিয়েছি। ইতিহাসের সকল সত্য সব সময় প্রকাশ করা যায় না। এমন অনেক কাজ, ঘটনা ও ব্যক্তি থাকেন, যাদের কথা কোনোদিনই প্রকাশ করা সম্ভব হবে না। আত্মপ্রচারবিমুখ সৈয়দ আশরাফ এ ব্যাপারে খুবই সতর্ক ছিলেন। এমন অনেক স্পর্শকাতর বিষয় আছে, যা আমরা তৃতীয় কারও কাছেই প্রকাশ করতে পারব না। এটা কোনো বাহাদুরি নেওয়ার বিষয় নয়। এটাই হলো সত্যনিষ্ঠ রাজনৈতিক সংস্কৃতি।

পাঁচ
তত্ত্বাবধায়ক সরকার নির্বাচনের রূপরেখা ঘোষণা করে। যদিও তখনও সুনির্দিষ্ট তারিখ ঘোষিত হয়নি। তবে নির্বাচনের প্রস্তুতির লক্ষ্যে ঘরোয়া রাজনৈতিক তৎপরতার ওপর পূর্বের নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে করণীয় নির্ধারণের জন্য আওয়ামী লীগ ওয়ার্কিং কমিটির সভা আহ্বান করা হয়। জিল্লুর রহমান সাহেবের বাসায় সভাপতিম-লীর বর্ধিত সভা আহ্বান করা হয়। ওয়ার্কিং কমিটিতে কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে তা নিয়ে আলোচনা হয়। কিন্তু সুনির্দিষ্টভাবে কোনো সিদ্ধান্ত সেই সভায় নেওয়া হয়নি। ইচ্ছে করেইÑ সিদ্ধান্ত নেওয়া থেকে জিল্লুর রহমান ও আশরাফ বিরত থাকেন। এই সভার পর আরও ছোট আকারে জিল্লুর রহমান সাহেবের সঙ্গে আমাদের বৈঠক হয়। সেখানে নেত্রীর পরামর্শ আমাদের জানানো হয়। আমি নেত্রীর ওই পরামর্শের আলোকে একটি লিখিত প্রস্তাব ওয়ার্কিং কমিটিতে উত্থাপনের কথা বলি। আমাকে প্রস্তাবটি লিখতে বলা হয়। সিদ্ধান্ত হয়, ওয়ার্কিং কমিটিতে দলের কার্যনির্বাহী সংসদের বর্ধিত সভা আহ্বানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। আরও সিদ্ধান্ত হয়, জিল্লুর রহমান সাহেব জ্যেষ্ঠ নেতাদের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে পৃথক পৃথকভাবে কথা বলবেন এবং তাদেরও ঐক্য প্রক্রিয়ায় শামিল করবেন।
সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীর সভাপতিত্বে ধানমন্ডি ৩/এ-এর সভানেত্রীর কার্যালয়ে কার্যনির্বাহী সংসদের সভা অনুষ্ঠিত হয়। একপর্যায়ে আমি লিখিত প্রস্তাব পাঠের অনুমতি চাই। এক প্যারা পাঠের পরই একজন অতি উৎসাহী তৎকালীন মধ্যম স্তরের সংস্কারবাদী নেতা আমাকে বাধা দেন। তিনি আমার এখতিয়ার নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। প্রস্তাব পাঠ বন্ধ হয়।
সভাপতি অন্য কারও কোনো প্রস্তাব আছে কি না জানতে চান। কেউ কোনো কথা বলেন না। সৈয়দ আশরাফ সাজেদা আপাকে বলেন, অন্য কারও যেহেতু কোনো প্রস্তাব নেই, তাহলে আমরা লেনিন ভাইয়ের প্রস্তাব শুনতে পারি। বাধাদানকারী নেতা বলেন, এটা যদি তার ব্যক্তিগত প্রস্তাব হয়, তাহলে তিনি পাঠ করতে পারেন। সভাপতি সাজেদা চৌধুরী আমাকে প্রস্তাব পাঠ করতে বলেন। প্রস্তাবটির ভাষা ব্যক্তিগত ছিল না। ছিলÑ ‘এই সভা প্রস্তাব গ্রহণ করেছে যে…। ইত্যাদি। প্রস্তাবের মূল কথা ছিল, ‘মুক্ত শেখ হাসিনাকে ছাড়া আওয়ামী লীগ কোনো নির্বাচনে যাবে না এবং নির্বাচন হতেও দেবে না।’ প্রকাশ্যে এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করার সাহস তখন কারও ছিল না। সমস্বরে কার্যনির্বাহী সংসদের সদস্যগণ এই প্রস্তাবের প্রতি সমর্থন জানায়।
কার্যনির্বাহী সংসদ বর্ধিত সভার সিদ্ধান্ত এবং তারিখ নির্ধারণ করে। বর্ধিত সভার আগে শেখ হাসিনার মুক্তির দাবিতে সকল জেলা কার্যালয়ে (তখনও প্রকাশ্য সমাবেশ নিষিদ্ধ) ঘরোয়া সমাবেশ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। দ্বিতীয়ত, নির্বাহী সংসদে গৃহীত এই প্রস্তাবটি বর্ধিত সভায় উত্থাপনের সিদ্ধান্ত হয়।
জেলায় জেলায় ঘরোয়া সমাবেশের তারিখ নির্ধারণের দায়িত্ব ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের ওপর অর্পিত হয়। পর্দার অন্তরালে তখন নানা ঘটনা ঘটছে। সব কিছু আমার পক্ষে জানা সম্ভব ছিল না। আশরাফও কিছু বলছেন না। এদিকে জেলায় জেলায় সমাবেশের কোনো তারিখ তিনি ঘোষণা করছেন না। ব্যক্তিগতভাবে আমি এ বিষয়ে কথা বলেও কোনো সদুত্তর পেলাম না। আমার মনে হলো, এই দীর্ঘসূত্রতার ফলে আন্দোলন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। আমি সভাপতিম-লীর সদস্যদের উদ্দেশ্যে ওই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে উদ্যোগী হওয়ার অনুরোধ করে একটি আনুষ্ঠানিক চিঠি লিখি।
চিঠি পাঠানোর দু-তিন দিন পর দেখি দৈনিক সমকাল ও জনকণ্ঠ আমার প্রস্তাব ছেপে দিয়েছে। একেবারেই বিব্রতকর পরিস্থিতি। স্বভাবতই আশরাফ আমার ওপর ক্ষুব্ধ হবেন। আমি তার সাথে দেখা করি, আমি যে সংবাদপত্রে ওই প্রস্তাব পাঠাইনি তা জানাই। আশরাফ আমাকে বিশ^াস করেন। তিনি প্রতিবাদলিপি পাঠাতে বলেন। জনকণ্ঠ আমার প্রতিবাদ ছাপায়। পরে বর্তমানে আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য ড. রাজ্জাক আমাকে জানান, তোফায়েল আহমেদের (তৎকালীন প্রেসিডিয়াম সদস্য) কাছ থেকে তিনি আমার প্রস্তাবের ফটোকপি নেন এবং তিনিই বিষয়টি পত্রিকায় ফাঁস করে দেন। এটা কোনো অসৎ উদ্দেশ্যে করা হয়নি। পরবর্তীতে আশরাফ অবশ্য আমাদের জানান, বর্ধিত সভা বিঘিœত হতে পারে আশঙ্কা করেই তিনি জিল্লুর রহমান সাহেবের সাথে কথা বলেন, জেলার সমাবেশ আপাতত না করার চিন্তা করেছেন। এগুলো বর্ধিত সভার পর জেলার সমাবেশ করা হবে।
আওয়ামী লীগের বর্ধিত সভাটি ছিল রাজনীতিতে টার্নিং পয়েন্ট। জেলা থেকে আমন্ত্রিত ছাড়াও বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মী বর্ধিত সভায় যোগদান করেন। বর্ধিত সভা বিপুল উদ্দীপনার সাথে মুক্ত শেখ হাসিনা ছাড়া আওয়ামী লীগ কোনো নির্বাচনে অংশ নেবে না, হতেও দেবে নাÑ এই ঘোষণা সর্বসম্মতিক্রমে গ্রহণ করে।
কিছুদিনের মধ্যেই দৃশ্যপট বদলে যায়। শেখ হাসিনাসহ রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ পর্যায়ক্রমে মুক্তি পান। শেখ হাসিনা তার কানের চিকিৎসার জন্য অবিলম্বে যুক্তরাষ্ট্রে গমন করেন। নির্বাচনের তফসিল ও তারিখ ঘোষিত হয়। প্রকাশ্য রাজনীতির ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়। শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতেই আওয়ামী লীগ নির্বাচনের প্রস্তুতির কাজ শুরু করে। মাসাধিক পর শেখ হাসিনা চিকিৎসা শেষে দেশে ফিরে আসেন।

ছয়
ইতোমধ্যে দলের সাধারণ সম্পাদক আবদুল জলিল ও জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের কারাগার থেকে মুক্তিলাভ করেন। স্বাভাবিকভাবেই অনেকের ধারণা ছিল আশরাফ আর ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক থাকবেন না। কিন্তু দলের সভানেত্রী সৈয়দ আশরাফকে তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব অব্যাহত রাখতে বলেন। ব্যতিক্রমী হলেও সৈয়দ আশরাফ পরবর্তী কাউন্সিল পর্যন্ত ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
দুঃসময়ে বিশ^স্ততার সাথে দায়িত্ব পালনের নজির স্থাপন করায় শেখ হাসিনা নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার লক্ষ্যে সৈয়দ আশরাফকে ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে রেখে দেন।
শেখ হাসিনার অসম সাহসী প্রাজ্ঞ নেতৃত্ব এবং তার সাথে সৈয়দ আশরাফের মতো সৎ, বিশ^স্ত এবং বুদ্ধিদীপ্ত ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক ছিল বলেই ১/১১-এর সংকট উত্তরণ এবং ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয় লাভ সম্ভব হয়েছে। পরবর্তীতে ২০০৯ সালের কাউন্সিলে আশরাফ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।

সাত
আমাদের রাজনীতিবিদদের মধ্যে কজন আছেন, যে বা যারা রাজনীতির বাইরে শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতি নিয়ে আলোচনা করেন, আড্ডা দেন? আশরাফ লন্ডন গিয়েছিলেন উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করতে। কিন্তু সেখানে তার শিক্ষা সমাপ্ত হয়নি। দৃশ্যত তিনি ইন্টারমিডিয়েট পাস। বড় কোনো ডিগ্রি তার নেই। অথচ ইংরেজি সাহিত্য, বাংলা সাহিত্য এবং বিশ^সাহিত্যে তার অবাধ বিচরণ আমাদের বিস্মিত করেছে। শেক্সপিয়র থেকে গ্যাটে, তলস্তয় থেকে রবীন্দ্রনাথ সর্বত্র ছিল তার স্বচ্ছন্দ বিচরণ। বিশ^ ইতিহাস, ইউরোপীয় রেনেসাঁ, চিত্রকলা ও স্থাপত্য এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সব কিছুতেই সমান উৎসাহ ছিল। আমার মতে, সৈয়দ আশরাফ ছিলেন আমাদের দেশে বিরলপ্রজ এক সুশিক্ষিত, ধীশক্তিসম্পন্ন, সৎ, নিষ্ঠাবান মার্জিত রুচির সংস্কৃতিবান রাজনৈতিক নেতা।
দোষেগুণে মানুষ ছিলেন তিনি। দলের দৈনন্দিন সাংগঠনিক কাজে তার এক ধরনের নির্লিপ্ততা ছিল। জনারণ্যেও যেন একা থাকতে পছন্দ করতেন। কিন্তু তার দেশপ্রেম, সততা, বিশ^স্ততা এবং শেখ হাসিনার প্রতি তার আনুগত্য ছিল প্রশ্নাতীত। তিনি প্রায়শ বলতেন, ‘আমার বাবা কোনো দিন বঙ্গবন্ধুর সাথে বিশ^াসঘাতকতা করেন নি। আমিও শেখ হাসিনার সঙ্গে বিশ^াসঘাতকতা করতে পারি না।’ জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি তা প্রমাণ করেছেন। বিশ^স্ত ও অনুগত ছিলেন; কিন্তু স্তাবক বা আত্মমর্যাদাহীন অন্ধ ভক্তিবাদী ছিলেন না।

পাঠকের মন্তব্য:

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না। তারকাচিহ্নযুক্ত (*) ঘরগুলো আবশ্যক।

*