বিভাগ: উত্তরণ ডেস্ক

ঐতিহাসিক প্রয়োজনেই আওয়ামী লীগের জন্ম হয়েছে — বর্ষীয়ান জননেতা শেখ আব্দুল আজিজ

আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাকালীন সর্বশেষ সদস্য শেখ আব্দুল আজিজ গত ৮ এপ্রিল ৯০ বছর বয়সে পরলোক গমন করেন। উত্তরণ ২০১১ সালের মে মাসে তার এই সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছিল। এটি উত্তরণ, জুন ২০১১ সংখ্যায় আওয়ামী লীগের ৬২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে প্রকাশিত হয়েছিল। প্রয়াত এই জাতীয় নেতার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে সাক্ষাৎকারটি পুনঃমুদ্রণ করা হলো।

PMউত্তরণ ডেস্ক: শেখ আব্দুল আজিজ আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাকালীন প্রত্যক্ষদর্শীদের একজন। তখন তিনি পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ নেতা। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৪৭ সালে বিএ পাস করে ঢাকায় আগমন করেন ১৯৪৮ সালে। বঙ্গবন্ধু তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এমএ’র ছাত্র হিসেবে শিক্ষারত থাকা অবস্থায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণী কর্মচারীদের দাবির সমর্থনে আন্দোলন করতে গিয়ে কারান্তরীণ। মুসলিম ছাত্রলীগের তখন দু’ধারায় বিভক্ত নইমুদ্দিনপন্থিরা রক্ষণশীল আর মুজিবপন্থিরা অসাম্প্রদায়িক ও প্রগতিশীল।
১৯৪৬ সালে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে ঘোষণা করেন। এটা ভারতবর্ষে কোথাও পালিত হয়নি, একমাত্র কলকাতা ছাড়া। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী তখন বঙ্গীয় সরকারের চিফ মিনিস্টার, অর্থাৎ প্রধানমন্ত্রী। কারণ ভারতবর্ষ তখন পরিচালিত হতো, ব্রিটিশ সরকার মনোনীত একদল ব্যক্তিদের হাতে। যার প্রধান থাকতেন ব্রিটিশ রাজা কর্তৃক মনোনীত একজন গর্ভনর। ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে-তে কলকাতায় হিন্দু-মুসলমান ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সূত্রপাত হয়। শেখ আব্দুল আজিজ, ছাত্রজীবন থেকে অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির পক্ষে থাকলেও বঙ্গবন্ধুর সাথে পরিচয় ঘটে ১৯৪৬-এর কলকাতা দাঙ্গা প্রতিরোধ আন্দোলনে সম্পৃক্ত হতে গিয়ে। থিয়েটার রোডে সোহরাওয়ার্দী সাহেবের নিবাস। এই বাসার নিচে বেঙ্গল রেস্টুরেন্ট পরিচালনা করতেন বঙ্গবন্ধু। সেখানে আলাপচারিতায় বঙ্গবন্ধুর সাথে ঘনিষ্ঠতার সূচনা। বঙ্গবন্ধু বয়সে কিছুটা বড় থাকলেও একই ব্যাচের ছাত্র হওয়ার কারণে দু’জনের মধ্যে তুমি সম্পর্ক, যা বঙ্গবন্ধু মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বিদ্যমান ছিল।
শেখ আব্দুল আজিজ, ১৯৫৩ থেকে ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত একাধারে ২০ বছর বৃহত্তর খুলনা জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন ও কেন্দ্রীয় কমিটির এক নম্বর সদস্য। এর আগে ১৯৪৯ সাল থেকে তিনি ছিলেন বৃহত্তর খুলনা জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কমিটির চেয়ারম্যান। ১৯৫৪ সালে এমএলএ, ১৯৭০ সালে এমএনএ, ১৯৭৩ সালে এমপি নির্বাচিত হন। মুক্তিযুদ্ধ-উত্তর তাজউদ্দিন সরকারের যোগাযোগ মন্ত্রী। অতঃপর বঙ্গবন্ধু সরকারে পর্যায়ক্রমে কৃষি, তথ্য ও বেতার এবং সবশেষে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী।  বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর শেখ আব্দুল আজিজ গ্রেফতার হয়ে সামরিক আদালতে ৫ বছর সাজাপ্রাপ্ত হয়ে ৩ বছর জেল খেটেছেন। খন্দকার মোশতাক দুটি ঘটনায় শেখ আজিজের ওপর রুষ্ট ছিল। প্রথমটি হলো ১৯৭১ মুক্তিযুদ্ধের সময় খন্দকার মুশতাক তাকে পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নেয়ার কথা বললে তা তিনি প্রকাশ্য সভায় ফাঁস করে দেন। দ্বিতীয়টি হলো মুশতাকের আগামাসি লেনের বাসায়, বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে সরকার উচ্ছেদ ও তাকে হত্যার ষড়যন্ত্রের যে বৈঠক হয়, তা তিনি বঙ্গবন্ধুকে জানিয়ে দেন। বঙ্গবন্ধু শেখ আব্দুল আজিজের কথা আমলে নেন নি এবং বঙ্গবন্ধু এ কথা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলীকে জানালে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তা হেসে উড়িয়ে দেন। শেখ আব্দুল আজিজ, মুক্তিযুদ্ধে নয় নম্বর সেক্টরের লিয়াজোঁ অফিসারের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮১ সালে শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের সভানেত্রী নির্বাচিত হলে তিনি প্রেসিডিয়াম সদস্য নির্বাচিত হন। কর্মময় জীবনে আইনজীবী হিসেবে অতিবাহিত করেন এবং বর্তমানে তিনি অবসর জীবনযাপন করছেন। আগামী ২৩ জুন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ৬২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে বঙ্গবন্ধু মন্ত্রিসভার একমাত্র জীবিত সদস্য শেখ আব্দুল আজিজের সাথে এসব নিয়েই কথোপকথন হয়।
উত্তরণ : আওয়ামী লীগ গঠনের প্রেক্ষাপট বর্ণনা করুন।
শেখ আব্দুল আজিজ : ধর্মের ভিত্তিতে ভারত বিভাজনের জন্য যে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়, সংখ্যাসাম্যে বঙ্গে হিন্দু-মুসলমান প্রায় সমান সমান হলেও বঙ্গে মুসলিম লীগ বিজয় লাভ করে, অর্থাৎ বঙ্গের হিন্দুদের একাংশ পাকিস্তানের পক্ষে ভোট দেয়। ভারতব্যাপী অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে বঙ্গ ছাড়া কোথাও মুসলিম লীগ জয়লাভ করতে পারে নি। পাঞ্জাবের মুসলমানরা জয়লাভ করে বটে কিন্তু সেটা ছিল কংগ্রেস সমর্থিত এক ভারতের পক্ষের একটি স্থানীয় দল, সিন্ধুতে জয়লাভ করে মুসলীম লীগ বিরোধী জিয়ে সিন্ধ। বেলুচিস্তানে জয়লাভ করে কংগ্রেস সমর্থিত আব্দুল গাফফার খানের দল। ভারত ভাগের আগে শরৎ বসু ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী পৃথক সংযুক্ত বাংলা সমাজতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের রূপরেখা প্রদান করেন। প্রথম এই প্রস্তাব সবাই মেনে নিলেও পরবর্তীতে জিন্নাহ ও গান্ধীজি এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করেন। ভারত বিভাজনের সময় অন্তর্বর্তীকালীন ভারত ও পাকিস্তান সরকারের গভর্নর হতে চেয়েছিলেন লর্ড মাউন্টব্যাটেন। কংগ্রেস সভাপতি জহরলাল নেহরু এই প্রস্তাব মেনে নিলেও জিন্নাহ তা মানেন নি। এটা মাউন্টব্যাটেনের আত্মসম্মানে আঘাত হানে। তিনি নেহরুর ইচ্ছামতো ভারত বিভাজন করার কারণে অযৌক্তিকভাবে বঙ্গের বিশাল ও গুরুত্বপূর্ণ অংশ ভারতে চলে যায়। মুর্শিদাবাদ জেলায় ৬০ শতাংশ ও বৃহত্তর খুলনা জেলার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ মুসলমান হওয়া সত্ত্বেও জেলা দুটো ভারতের অন্তর্ভুক্ত হলো। এই বিভাজনের বিরুদ্ধে আপিল শুনানির জন্য র‌্যাডক্লিফ কমিশন তৈরি হলে, এই কমিশনে জিন্নাহ, ওয়াসিস নামে এক পাঞ্জাবি আইনজীবীকে নিযুক্ত করেন। যিনি শুনানির সময় উপস্থিত পর্যন্ত হননি। তখন বঙ্গীয় প্রাদেশিক পরিষদে বাগেরহাট এলাকা থেকে নির্বাচিত হয়েছিলেন শেরেবাংলা একে ফজলুল হক। জনতার চাপে তিনি শুনানিতে অংশ নিয়ে খুলনাকে পাকিস্তান অংশে ফিরিয়ে আনতে পারলেও বনগাঁওয়ের মতো মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল ভারতে চলে যায়। জিন্নাহ, লিয়াকত আলী খান ও খাজা নাজিমুদ্দিনের এহেন ষড়যন্ত্র সফল হলে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর অনুসারীদের মনে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। বাংলা ভাগের বেদনায় সংক্ষুব্ধ মুসলিম লীগের অসাম্প্রদায়িক অংশের নেতারা ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন ঢাকার টিকাটুলির রোজ গার্ডেনে আওয়ামী (জনগণের) মুসলীম লীগ গঠন করে। আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মওলানা ভাসানী কম শিক্ষিত লোক থাকলেও জনমুখী নেতা ছিলেন। আর প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক টাঙ্গাইলের শামসুল হক শিক্ষিত জ্ঞানী ও ভালো বক্তা ছিলেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব তখন কারাগারে। তাকে যুগ্ম সম্পাদকের পদ দেয়া হয়।
উত্তরণ : বঙ্গবন্ধুর মূল্যায়ন করুন।
শেখ আব্দুল আজিজ : বঙ্গবন্ধু ছাত্রজীবন থেকেই সংগ্রামী নেতা ছিলেন, জনগণের যে কোনো ন্যায়সঙ্গত দাবির প্রতি তিনি সমর্থন দিয়ে সক্রিয় অংশগ্রহণ করতেন। তার সাংগঠনিক ক্ষমতা ছিল অপরিসীম। ফলে তার সুদৃঢ় নেতৃত্বের কারণে আওয়ামী লীগ অতি দ্রুত জনগণের দলে পরিণত হয় এবং তিনি হয়ে ওঠেন বাংলার মানুষের আশা-আকাক্সক্ষার প্রতীক। কিন্তু তার রাজনৈতিক দুর্বলতা ছিল, তিনি সংগ্রামী ছিলেন কিন্তু বিপ্লবী ছিলেন না। যে কারণে মুক্তিযুদ্ধ-উত্তর বাংলাদেশে তিনি বৈপ্লবিক পন্থায় রাষ্ট্র পরিচালনা করতে পারেন নি। ফলে শত্রুরা ঘরে-বাইরে ষড়যন্ত্র করার সুযোগ পায়। বঙ্গবন্ধুর নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল সবচেয়ে দুর্বল। তিনি মানুষকে অতিমাত্রায় বিশ্বাস করতেন। সারা জীবন গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক মতবাদের প্রতি বিশ্বাসী বঙ্গবন্ধুর বাকশাল গঠন করার প্রয়োজন ছিল না। একদলীয় শাসন ব্যবস্থা চালু না করেও জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্র গঠন করা সম্ভব ছিল। ভুল পন্থার কারণে সোভিয়েত ইউনিয়ন ধারার রাজনীতি আজ বিশ্ববুক থেকে হারিয়ে গেছে। এমনকি লেনিনগ্রাদ, স্ট্রালিনগ্রাদের নামও পাল্টে গেছে।
উত্তরণ : জাতীয় চারনেতার মূল্যায়ন করুন।
শেখ আব্দুল আজিজ : মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশ সরকার গঠনকালে মন্ত্রিসভার সদস্যদের মানদ- নিয়ে বিরোধের সূত্রপাত হয়। ফলে সিদ্ধান্ত হয় আওয়ামী লীগের পদবি অনুযায়ী মন্ত্রিসভা হবে। তাজউদ্দীন আহমদ পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, এম মনসুর আলী সাংগঠনিক সম্পাদক, কামারুজ্জামান পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, খন্দকার মুশতাক দলের ভাইস প্রেসিডেন্টÑ এভাবে পদের বিবেচনায় মন্ত্রিসভা গঠিত হয়। তবে এর মধ্যে সবচেয়ে যোগ্য ও বিপ্লবী নেতা ছিলেন মরহুম তাজউদ্দীন আহমদ। দেশ স্বাধীন হলে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন কলকাতায় আমাকে তার বাসায় ডেকে পাঠান এবং স্বাধীন দেশে ফিরে এসে আমাকে মন্ত্রিসভার অন্তর্ভুক্ত করেন।
উত্তরণ : জননেত্রী শেখ হাসিনার মূল্যায়ন করুন।
শেখ আব্দুল আজিজ : একজন নেতার কর্মযজ্ঞ চলাকালীন তার সঠিক মূল্যায়ন হয় না। তবে তিনি যা করতে চান তা ভালো ও সঠিক। একটি জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্র গঠনই তার লক্ষ্য।
উত্তরণ : বর্তমান আওয়ামী লীগকে কীভাবে মূল্যায়ন করেন? শেখ আব্দুল আজিজ : আওয়ামী লীগের মেনিফেস্টো ও দিনবদলের সনদ খুবই ভালো। কিন্তু এসব বাস্তবায়নে দলকে কমিটেড হতে হবে। ধর্মগ্রন্থে ভালো ভালো কথা লেখা আছে। কিন্তু মানুষ কী এসব মেনে চলে? ধর্মমত অনুযায়ী যদি সব মানুষ পরিচালিত হতো তা হলে তো পৃথিবীতে অশান্তি থাকত না।
উত্তরণ : যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনে কী ভূমিকা পালন করেছিলেন?
শেখ আব্দুল আজিজ : আমি প্রথম কিছুদিন যোগাযোগমন্ত্রী ছিলাম। দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের সুবিধার্থে গোয়ালন্দ ফেরিঘাট দৌলতদিয়ায় স্থানান্তর করি। এতে ওই অঞ্চলের মানুষের যোগাযোগ ব্যবস্থা অনেকটা সহজ হয়ে যায়।
উত্তরণ : ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে প্রত্যাশা কী?
শেখ আব্দুল আজিজ : তারা যেন একটি কল্যাণকামী রাষ্ট্র গড়ে তোলে এবং তাদের হাতে যেন একটি সুখি-সমৃদ্ধিশালী বাংলাদেশ নির্মিত হয়। যেখানে মানুষের অর্থনৈতিক বৈষম্য থাকবে না এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে।

সাক্ষাৎকার গ্রহণ : আনিস আহামেদ
প্রকাশ : উত্তরণ, প্রথম বর্ষ, সপ্তম সংখ্যা, ০১ জুন ২০১১

পাঠকের মন্তব্য:

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না। তারকাচিহ্নযুক্ত (*) ঘরগুলো আবশ্যক।

*