বিভাগ: তত্ত্ব তথ্য ইতিহাস

কমনওয়েলথ

5-7-2018 7-06-57 PMএকদা বিশ্বের সর্ববৃহৎ ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যের অধিকারী ছিল যুক্তরাজ্য। এক কথায় যাকে আমরা ব্রিটিশ সাম্রাজ্য হিসেবে আখ্যায়িত করি। পৃথিবীর সকল মহাদেশেই ব্রিটিশ উপনিবেশ ছড়িয়ে ছিল। বলা হতো ‘ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে সূর্য অস্ত যায় না।’ তবে কালক্রমে সাম্রাজ্য সংকোচিত হতে থাকে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে কয়েকটি উপনিবেশ ডোমিনিয়ন মর্যাদা লাভ করে। অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, দক্ষিণ আফ্রিকা এবং নিউজিল্যান্ড প্রথম মহাযুদ্ধে ব্রিটেনের অধীনস্ত ডোমিনিয়ন হিসেবে ব্রিটেনের পক্ষে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। ১৯২৬ সালের ১৮ নভেম্বর বেলফোর ঘোষণার মাধ্যমে ব্রিটিশ কমনওয়েলথ অব নেশন প্রতিষ্ঠিত হয়। তখন থেকেই এই দেশগুলো ব্রিটিশ কমনওয়েলথ নামে পরিচিতি লাভ করে। ১৯৩১ সালে ওয়েস্ট মিনস্টার ‘সংবিধি’ দ্বারা এই ডোমিনিয়নগুলো স্বাধীন-সার্বভৌম দেশের মর্যাদা লাভ করে।
কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যুক্তরাজ্যকে সমর্থন জানায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্ব পরিস্থিতি বদলে যায়। দ্রুতই ঔপনিবেশিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। পরাধীন দেশগুলো একের পর এক স্বাধীনতা অর্জন করে। সর্ববৃহৎ ব্রিটিশ উপনিবেশ ভারত ১৯৪৭ সালে ভারত ও পাকিস্তান নামে স্বাধীনতা অর্জন করে। একে একে স্বাধীন দেশ হিসেবে আবির্ভূত হয় বার্মা (মিয়ানমার), শ্রীলংকা, মালয়, সিঙ্গাপুর, ফিজি, নামিবিয়া, গ্রানাডা, গায়েনা, নাইজেরিয়া প্রভৃতি দেশ। ১৯৪৯ সালের ২৮ এপ্রিল ‘ব্রিটিশ’ শব্দটি বাদ দিয়ে ‘কমনওয়েলথ অব নেশনস’ নামে আনুষ্ঠানিকভাবে বর্তমান কমনওয়েলথ জোট আত্মপ্রকাশ করে।
ইংল্যান্ডের রানি কমনওয়েলথের প্রধান হিসেবে সর্বজন মান্য। ৫৩ সদস্য বিশিষ্ট কমনওয়েলথের ১৬টি দেশ যুক্তরাজ্যের রানিকে তাদের দেশের সাংবিধানিক রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে গ্রহণ করেছে।
বিশ্বের বর্তমান জনসংখ্যা ৭৪০ কোটি। আর কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলোর মোট জনসংখ্যা এর এক-তৃতীয়াংশ অর্থাৎ ২৪০ কোটি। অন্যদিকে বিশ্বের চার ভাগের এক ভাগ জায়গা কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলোর অন্তর্ভুক্ত। সাধারণভাবে সাবেক ব্রিটিশ উপনিবেশগুলোকে নিয়েই কমনওয়েলথ গঠিত। তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও মিয়ানমার এক সময়ের ব্রিটিশ উপনিবেশ হলেও তারা কমনওয়েলথের সদস্য নয়। পক্ষান্তরে ব্রিটিশ উপনিবেশ না হওয়া সত্ত্বেও ১৯৯৫ সালে মোজাম্বিক এবং ২০০৯ সালে রোয়ান্ডা, এ দুটি আফ্রিকান দেশ কমনওয়েলথের সদস্যপদ গ্রহণ করে।
কমনওয়েলথের ইতিহাসে অনেক দেশ একবার সদস্যপদ নিয়েছে, পরে বেরিয়ে গেছে বা সদস্যপদ বাতিল করা হয়েছে। কয়েক বছর পর আবার সদস্যপদে ফিরেও এসেছে। ১৯৭২ সালের ১৮ এপ্রিল বাংলাদেশ কমনওয়েলথের সদস্যপদ লাভ করায় পাকিস্তান কমনওয়েলথ ত্যাগ করে। পরে ফিরে আসে। পাকিস্তানে ১৯৯৯ সালে সামরিক শাসন প্রতিষ্ঠার কারণে কমনওয়েলথ তার সদস্যপদ খারিজ করে দেয়। পরে অবশ্য সদস্যপদ ফিরে পায়। ১৯৬১ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদী শাসকগোষ্ঠীর নীতির কারণে কমনওয়েলথ থেকে বেরিয়ে যায়। তবে ১৯৯৪ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনের পর তারা আবার কমনওয়েলথে ফিরে আসে। ২০০৩ সালে রবার্ট মুগাবের নির্বাচনী কারচুপির সমালোচনার পরিপ্রেক্ষিতে কমনওয়েলথ থেকে বেরিয়ে যায়। সর্বশেষ কমনওয়েলথ ত্যাগ করে গাম্বিয়া।
১৯৬৫ সালে কমনওয়েলথের একটি সচিবালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়। কমনওয়েলথের সদর দফতর লন্ডনের মার্লবোরো হাউসে অবস্থিত। প্রতি দু-বছর অন্তর কমনওয়েলথের রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানদের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। কমনওয়েলথ শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, পরিবেশসহ পারস্পরিক সহযোগিতার ১০টি ক্ষেত্র চিহ্নিত করেছে। কমনওয়েলথ সকল সিদ্ধান্ত সর্বসম্মতিক্রমে গ্রহণ করা হয়। প্রতিবছর মার্চ মাসের দ্বিতীয় সোমবার কমনওয়েলথ দিবস পালিত হয়।
কমনওয়েলথের ৫৩টি সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে এশিয়ায় ৮টি, আফ্রিকায় ১৮টি, ইউরোপে ৩টি, উত্তর আমেরিকায় ১২টি, দক্ষিণ আমেরিকায় ১টি এবং ওশেনিয়ায় অস্ট্রেলিয়াসহ ১১টি সদস্য রাষ্ট্র রয়েছে। এর মধ্যে আয়তনের দিক থেকে সর্ববৃহৎ রাষ্ট্র কানাডা এবং সবচেয়ে ছোট দেশ নাউরু। জনসংখ্যার দিক থেকে ভারত সর্ববৃহৎ। একা ভারতের জনসংখ্যা কমনওয়েলথের অন্য সকল রাষ্ট্রের চেয়ে বেশি। কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলোর কূটনৈতিক মিশনকে বলা হয় হাই কমিশন এবং রাষ্ট্রদূতকে হাই কমিশনার।

নূহ-উল-আলম লেনিন

পাঠকের মন্তব্য:

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না। তারকাচিহ্নযুক্ত (*) ঘরগুলো আবশ্যক।

*