বিভাগ: কূটনীতি

কর্মক্ষেত্রে স্বাস্থ্য নিরাপত্তা

ড. প্রকৌশলী মাসুদা সিদ্দিক রোজী: কল-কারখানা ও প্রতিষ্ঠানসমূহে পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কর্মজীবীদের দিনের বেশির ভাগ সময় কাটে কর্মক্ষেত্রে। কাজেই প্রতিষ্ঠান ছোট-বড় যাই হোক না কেন, কর্মীদের ইতিবাচক, নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ দিতে হবে। কর্মীদের প্রয়োজনীয় চাহিদাগুলো পূরণ না হলে যথাযথ কাজের পরিবেশ তৈরি হয় না কর্মক্ষেত্রে।
কর্মক্ষেত্রে পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা ঝুঁকি মোকাবিলায় বিশ্বের যেসব দেশ পিছিয়ে আছে, তাদের অর্থনৈতিক অবস্থাও ঝুঁকিমুক্ত নয়। জাতিসংঘ, বিশ্বের উন্নত দেশসমূহ শ্রমিকদের কর্মক্ষেত্রের সার্বিক পরিবেশ স্বাস্থ্যসম্মত ও নিরাপদ করার বিষয়ে ব্যাপক জোর দিয়েছে। বাংলাদেশও ইতোমধ্যে ঐ মিছিলে শরিক হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে বিশেষ গুরুত্বারোপ করে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করছে।
কর্মক্ষেত্রে নারী ও পুরুষ কর্মীদের জন্য আলাদা টয়লেট, সাবান, বিশ্রাম নেওয়ার কক্ষ ও বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা থাকতে হবে। প্রাপ্য সব সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে কর্মীদের অধিকার সচেতনতাও প্রয়োজন। এসব নিশ্চিত করতে ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের ইতিবাচক মানসিকতা যেমন দরকার, তেমনি প্রয়োজন কর্মীদের সহযোগিতা। প্রতিষ্ঠানের কাজ সঠিকভাবে করার জন্য নিয়মগুলোও সহজ হতে হবে। কর্মক্ষেত্রে বেতন বেশি, ঝকঝকে চকচকে পরিবেশ ও নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধা ফিকে হয়ে যাবে যদি কর্মীদের জীবনের নিরাপত্তা না দেওয়া হয়। এছাড়া কর্মচারীদের সঙ্গে যে কোনো দুর্ঘটনার সময় কী করণীয়, সেসব বিষয়েও আমাদের আলোচনা এবং অনুশীলন করতে হবে।
শ্রম আইনের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য একটি নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত কর্মপরিবেশের নিশ্চয়তা বিধান করা। তাই শ্রম আইনের আলোকে বলা যায়, কর্মক্ষেত্রে স্বাস্থ্যসেবা ও নিরাপত্তা সুবিধা প্রতিটি শ্রমিকের বৈধ এবং আইনগত অধিকার। শ্রম আইন ২০০৬-এর অধীনে অন্তর্ভুক্ত পেশাগত স্বাস্থসেবা এবং নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয়গুলো হলোÑ ১. পরিচ্ছন্নতা ২. পর্যাপ্ত বায়ু চলাচল এবং তাপমাত্রা ব্যবস্থা ৩. আলোর ব্যবস্থা ৪. অগ্নি সংক্রান্ত ঘটনা ৫. কৃত্রিম আর্দ্রকরণ ৬. জনবহুলতা ৭. অতিরিক্ত ওজন ৮. বিল্ডিং ও যন্ত্রপাতির সুরক্ষা ৯. যন্ত্রপাতিকে ঘেরাওকরণ ১০. বিস্ফোরক বা দাহ্য গ্যাস, বিপজ্জনক ধোঁয়ার বিষয়ে সতর্কতা ১১. ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম ব্যবহার ১২. ঝুঁকি মূল্যায়ন ও প্রতিরোধ ব্যবস্থা।
মালিক, শ্রমিক এবং সরকারের সংশ্লিষ্ট দফতর একযোগে তৎপর হলে নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা কঠিন কিছু নয়। শুধু একটু সদিচ্ছা থাকলেই আমরা নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করে সারাবিশ্বে একটি অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারব।
‘সুস্থ্য শ্রমিক, নিরাপদ জীবনÑ নিশ্চিত করে টেকসই উন্নয়ন’ এই প্রতিপাদ্য নিয়ে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীন কল-কারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদফতর দেশব্যাপী জাতীয় পেশাগত স্বাস্থ্য ও সেইফটি দিবস-২০১৮ পালন করতে যাচ্ছে, এজন্য আমি তাদের অভিনন্দন জানাই।
বর্তমান সরকার জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যাপক সাফল্য অর্জন করতে বদ্ধপরিকর। এ লক্ষ্যমাত্রায় টেকসই শিল্পায়ন, স্বাস্থ্য, নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর আবাস এবং টেকসই উৎপাদনকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আমার জানা মতে, বাংলাদেশ ৮৩ লাখ ইকোনমিক ইউনিট রয়েছে। সবক্ষেত্রে পেশাগত স্বাস্থ্য ও সেইফটি নিশ্চিত করতে গণসচেতনতা প্রয়োজন।
রিহ্যাব নির্মাণ শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ প্রদানের জন্য রিহ্যাব ট্রেনিং ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করেছে। এ ইনস্টিটিউটে তাদের পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নের পাশাপাশি সুরক্ষা বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধিমূলক উদ্বুদ্ধকরণ ক্লাসও নেওয়া হচ্ছে।
সরকারি/বেসরকারি ব্যক্তি/প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তায় অনেক কাজ করেছে বাংলাদেশ। তবে আত্মতৃপ্তির কোনো সুযোগ নেই। এখনও অনেক কাজ বাকি। কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে শিল্পের পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিও টেকসই হবে না।

পাঠকের মন্তব্য:

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না। তারকাচিহ্নযুক্ত (*) ঘরগুলো আবশ্যক।

*