বিভাগ: ইতিহাস : প্রবন্ধ

কারাগারের রোজনামচা : অন্তরঙ্গ অবলোকন-১

12ড. মোহাম্মদ সেলিম: পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সাত মাসের মাথায় ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্বদানের অভিযোগে ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান গ্রেফতার হন। বঙ্গবন্ধুর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে বাঙালির ন্যায্য অধিকার আদায়ের জন্য বহু বছর পাকিস্তানের কারাগারে কাটাতে হয়। ১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ, প্রথম সেনাবাহিনী তাকে গ্রেফতার করে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যায়। সামরিক আদালত তাকে মৃত্যুদ- প্রদান করে। ১৬ই ডিসেম্বর বাংলাদেশের বিজয়ের পর ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি পাকিস্তান সরকার বৈশ্বিক চাপের মুখে বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দেয়।
৬-দফা আন্দোলনে ও আগরতলা মামলায় গ্রেফতারের পর ১৯৬৬ সালের ২ জুন থেকে ১৯৬৭ সালের ২২ জুন পর্যন্ত কেন্দ্রীয় কারাগারে এবং ১৯৬৮ সালের ১৮ জানুয়ারি থেকে ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কুর্মিটোলা সেনানিবাসে অফিসার মেসে বঙ্গবন্ধুর বন্দী থাকাকালীন দিনলিপির বিবরণ নিয়েই ‘কারাগারের রোজনামচা’ লেখা হয়েছে। এটি বঙ্গবন্ধুর লেখা দ্বিতীয় রচনা। বাংলা একাডেমি কর্তৃক এটি প্রকাশিত হয় মার্চ ২০১৭-তে। শুরুতে নাতিদীর্ঘ ভূমিকা লিখেছেন বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনা। পাঠকের জন্য তথ্যসমৃদ্ধ ভূমিকাটি বেশ সহায়ক হয়েছে। সংগত কারণে রোজনামচা জেলজীবনের খুঁটিনাটি নানা বিষয় নিয়ে আলোচিত হয়েছে। বলার অপেক্ষা রাখে না এই গ্রন্থে সমকালীন পাকিস্তানের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক অবস্থা বঙ্গবন্ধুর পারিবারিক জীবনের অনেক ঘটনা বস্তুনিষ্ঠ, প্রাঞ্জল ও নৈর্ব্যক্তিকভাবে উপস্থাপিত হয়েছে।
‘থালা-বাটি কম্বল, জেলখানার সম্বল’
রোজনামচায় যাবার পূর্বে ‘থালা-বাটি কম্বল, জেলখানার সম্বল’ শীর্ষক অংশে বঙ্গবন্ধু অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহী ভাষায় জেলখানার নানা নিয়ম-কানুন আলোচনা করেছেন। সাধারণত জেলখানার অভ্যন্তরের বিষয় সাধারণ পাঠকের জানার সুযোগ থাকে না। “জেলে যারা যায় নাই, জেল যারা খাটে নাইÑ তারা জানে না জেল কি জিনিস। বাইরে থেকে মানুষের যে ধারণা জেল সম্বন্ধে ভিতরে তার একদম উল্টা। … জেলের ভিতর অনেক ছোট ছোট জেল আছে।” বঙ্গবন্ধু এভাবেই শুরু করেছেন জেলের ভেতরে কয়েদিদের নানা দায়-দায়িত্বের বিবরণ। যেমন, রাইটার দফা, চৌকি দফা, জলভরি দফা, ঝাড়– দফা, বন্দুক দফা, পাগল দফা, দরজি খাতা, মুচি খাতা ইত্যাদি। এই অধ্যায়ে বঙ্গবন্ধু ইংরেজ ও পাকিস্তান আমলে রাজবন্দিদের সুযোগ-সুবিধার তুলনামূলক আলোচনা করেছেন। তার মতে, ইংরেজ আমলে খাবার ও থাকার ব্যবস্থা ভালো ছিল। জেলখানার হাসপাতালের চিকিৎসার মান নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা আছে। ভালো, মন্দ দু-ধরনের দৃষ্টান্তের উল্লেখ করেছেন। বন্দীরা সপ্তাহে একটি চিঠি আর ১৫ দিনে একবার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পারত। কিন্তু সেখানেও নানা বাধা-নিষেধ ছিল। গোয়েন্দা দফতরের কর্মচারীদের পড়ার পর চিঠি হাতে পাওয়া যেত, সাক্ষাতের সময় গোয়েন্দা ও জেলের কর্মচারীরা উপস্থিত থাকত। বঙ্গবন্ধু দুঃখ করে লিখেছেনÑ
“নিষ্ঠুর কর্মচারীরা বোঝে না যে স্ত্রীর সাথে দেখা হলে আর কিছু না হউক একটা চুমু দিতে অনেকেরই ইচ্ছ হয়, কিন্তু উপায় কি? আমরা তো পশ্চিমা সভ্যতায় মানুষ হই নাই। তারা তো চুমুটাকে দোষণীয় মনে করে না। স্ত্রীর সাথে স্বামীর অনেক কথা থাকে কিন্তু বলার উপায় নাই।”

এই অধ্যায়ে আরও কিছু বিষয়ের অবতারণা করেছেন। জেলজীবনের শুরু থেকেই সিপাহি, কয়েদিদের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর বেশ আন্তরিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। যে কারণে সবাই তার সঙ্গে সৌজন্যপূর্ণ আচরণ করেছে। তিনিও জেলের আইন মেনে চলতেন, তবে সাধারণ কয়েদিদের সঙ্গে জেল কর্তৃপক্ষের অন্যায় আচরণের প্রতিবাদ করতেন। সাধারণ মানুষকে বঙ্গবন্ধু সব সময় দেখেছেন মমতা ও সহানুভূতির চোখে, লুদু ওরফে লুৎফর রহমানের প্রতি তিনি যে ¯েœহ দেখিয়েছেনÑ তা এক কথায় নজিরবিহীন। তথাকথিত ভদ্রলোকেরা লুদুদের সঙ্গে কথাও বলবেন না। কারণ লুদু একজন পেশাদার চোর। লুদুর সঙ্গে বঙ্গবন্ধু যে সদয় আচরণ করেছেন তাতে মনে হয়েছে “অপরাধকে ঘৃণা করো, অপরাধীকে নয়”Ñ তিনি আক্ষরিক অর্থে তা বিশ্বাস করতেন। কেন একজন সাধারণ চোরের সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। এ বিষয়ে তিনি লিখেছেনÑ
“আমি লিখছি এর জীবনের ঘটনা থেকে পাওয়া যাবে আমাদের সমাজ ব্যবস্থার চিত্র, মনুষ্য চরিত্র সম্বন্ধে, যারা গভীরভাবে দেখতে চেষ্টা করবেন। তারা বুঝতে পারবেন আমাদের সমাজের দুরবস্থা এবং অব্যবস্থায় পড়েই মানুষ চোর ডাকাত পকেটমার হয়। আল্লাহ কোনো মানুষকে চোর ডাকাত করে সৃষ্টি করে না।”

বাঙালির স্বাধিকার অর্জনের ইতিহাসে ৬-দফা আন্দোলন একটি অসামান্য দিক পরিবর্তকারী ঘটনা। ১৯৬৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু লাহোরে অনুষ্ঠিত বিরোধীদলীয় কনভেনশনে ৬-দফা দাবি উত্থাপন করেন। উল্লেখ্য, ২৬ বছর পূর্বে আরেক বাঙালি শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক লাহোর প্রস্তাব উত্থাপন করেছিলেন। লাহোর প্রস্তাব যেমন গৃহীত হয়েছে, ৬-দফা তেমনি প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। কিন্তু বঙ্গবন্ধু বিশ্বাস করতেন ৬-দফা হলো বাঙালির বাঁচার দাবি। তাই ৬-দফার পক্ষে জনমত গঠনে জান-প্রাণ দিয়ে নেমে পড়লেন। ৬-দফা আন্দোলন দমনের নামে পাকিস্তান সরকার জেল-জুলুম অত্যাচারের পথ বেছে নিল। ১৯৬৬ সালের ৮ মে রাতে বঙ্গবন্ধুকে দেশরক্ষা আইন ৩২(১)ক ধারা অনুযায়ী গ্রেফতার করে। গ্রেফতারের পূর্বে ১৯৬৬ সালের ২০ মার্চ থেকে ৭ মে পর্যন্ত তিনি ৩২টি জনসভায় ভাষণ দেন। ৫০ হাজার লিফলেট ছাপিয়ে জনসাধারণের মাঝে বিতরণ করা হয়। সব মিলে তুলনামূলক স্বল্প সময়ের মধ্যে ৬-দফার পক্ষে জনমত দানা বেঁধে ওঠে। ৭ জুনের হরতাল প্রতিহত করার উদ্দেশে ব্যাপক ধর-পাকড় শুরু হয়।
জেলে বন্দী থাকা অবস্থায়ও বঙ্গবন্ধু সব সময় আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের খোঁজখবর নিতেন। জেলের ভেতরে কাকে কোথায় রাখা হলো, খাবারের ব্যবস্থা করা, মশারির ব্যবস্থা করা, আবার কাউকে কষ্ট দিলে প্রতিবাদ করেছেন। বেগম মুজিবের দেওয়া খাবার সবাইকে দিয়ে তারপর খেয়েছেন। নিজের শারীরিক অসুস্থতা, খাবারের কষ্ট, ঘুমের কষ্ট, বাবা-মাসহ সন্তানদের চিন্তা, আর্থিক সংকট তারপরও তিনি ছিলেন সবার আশ্রয়স্থল, যেন বটবৃক্ষ।
‘৬-দফার জন্য জেলে এসেছি’
বাস্তবিক অর্থে ৬-দফা আন্দোলন পাকিস্তানের রাজনীতিকে দ্বিধাবিভক্ত করে দেয়, হয় ৬-দফার পক্ষে, না হয় বিপক্ষে। ধান্দাবাজ, সুবিধাবাদী তথাকথিত প্রগতিবাদীদের পক্ষে ৬-দফার পক্ষে থাকা সম্ভব ছিল না। বিশেষ করে পূর্ব পাকিস্তানে এই বিভাজন প্রকট ধারণ করে। ন্যাপ নেতা মশিয়ুর রহমান ৬-দফাকে বিচ্ছিন্নতাবাদের সঙ্গে তুলনা করেছেন, এর জবাবে বঙ্গবন্ধু ক্ষোভের সঙ্গে লিখেছেনÑ
“জনগণ জানে এই দলটির কিছু সংখ্যক নেতা কিভাবে কৌশলে আইয়ুব সরকারের অপকর্মকে সমর্থন করছে। আবার নিজেদের বিরোধী দল হিসেবে দাবি করে এরা জনগণকে ধোঁকা দিতে চেষ্টা করছে। এরা নিজেদেরকে চীনপন্থী বলেও থাকেন। একজন একদেশের নাগরিক কেমন করে অন্য দেশপন্থী, প্রগতিবাদী হয়?”

হাজার হাজার আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী গ্রেফতারের পাশাপাশি গভর্নর মোনায়েম খান গণমাধ্যমের স্বাধীনতাও হরণ করেন। ১৯৬৬ সালের ৫ জুন বঙ্গবন্ধু লিখেছেনÑ “এটা ক্ষমতা দখলের সংগ্রাম নয়, জনগণকে শোষণের হাত থেকে বাঁচাবার জন্য সংগ্রাম।” ৭ জুন নিয়ে বঙ্গবন্ধুর নিজেরও উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা কম ছিল না, একই সঙ্গে এদেশের জনগণের ওপর আস্থা ও বিশ্বাস ছিল সীমাহীন। সারাজীবন ত্যাগ আর আদর্শের রাজনীতি করেছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, “ত্যাগের মাধ্যমেই আদর্শের জয় হয়।”
৭ জুন বাঙালির ঐক্যবদ্ধ প্রতিবাধে উজ্জ্বল একটি দিন। আইয়ুব-মোনায়েম চক্রের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে আপামর জনতা রাজপথে নেমে আসে। নজিরবিহীন হরতাল পালন করে। বঙ্গবন্ধু ১৯৬৬ সালের ৭ জুন দিনলিপির পাতায় লিখেছেনÑ
“সকালে ঘুম থেকে উঠলাম। কি হয় আজ? আব্দুল মোনায়েম খান যেভাবে কথা বলছেন তাতে মনে হয় কিছু একটা ঘটবে আজ। কারাগারের দুর্ভেদ্য প্রাচীর ভেদ করে খবর আসলো দোকান-পাট, গাড়ি, বাস, রিক্সা সব বন্ধ। শান্তিপূর্ণভাবে হরতাল চলছে।”

কিন্তু শেষ পর্যন্ত শান্তিপূর্ণ থাকতে দেওয়া হয়নি। অশান্তি সৃষ্টি করেছে, যাদের শান্তিরক্ষার দায়িত্ব ছিল। সরকারের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। টিয়ার গ্যাস, লাঠিচার্জ করে ক্ষান্ত হয়নি; গুলি করে সরকারি হিসাবে ১০ জনকে হত্যা করেছে। গ্রেফতার করেছে অগণিত। বঙ্গবন্ধু লিখেছেনÑ “গুলি ও মৃত্যুর খবর পেয়ে মনটা খুব খারাপ হয়ে গেছে। … … … অনেক রাত হয়ে গেল, ঘুম তো আসে না। নানা চিন্তা এসে পড়ে। এ এক মহাবিপদ, বই পড়ি, কাগজ উল্টাইÑ কিন্তু তাতে মন বসে না।” একজন মহান নেতা দেশ ও জনগণের কথা না ভেবে পারেন না। ৬-দফা দমনের নামে সরকার আতঙ্ক ছড়িয়ে দিতে চেয়েছে। ১৩ জুন তারিখের মধ্যে ৯ হাজার ৩৩০ জন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীকে বন্দী করা হয়। এর পূর্বে আওয়ামী লীগের প্রায় ৩ হাজার ৫০০ নেতাকর্মী গ্রেফতার করা হয় ১০ মে’র মধ্যে। সরকারি চরমপন্থার অংশ হিসেবে ১৫ জুন ‘দৈনিক ইত্তেফাক’ পত্রিকার সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়াকে গ্রেফতার করা হয়। পরের দিন ১৬ জুন। ইত্তেফাক নিষিদ্ধ এবং পাকিস্তান দেশরক্ষা আইন বলে ‘নিউনেশন প্রেস’ বাজেয়াপ্ত করে সরকার। বাঙালির স্বাধীনতার সংগ্রামে মানিক মিয়ার অবদান অবিস্মরণীয়। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তার ছিল আত্মিক সম্পর্ক। দুজনেই ছিলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর রাজনৈতিক শিষ্য। বঙ্গবন্ধু লিখেছেনÑ
“মানিক ভাইকে যেখানে রেখেছে, সেখান থেকে খবর আনা খুবই কষ্টকর। এতবড় আঘাত পেলাম তা কল্পনা করতে বোধ হয় অনেকেই পারবে না। প্রথম থেকেই এই কাগজের (ইত্তেফাক) সাথে আমি জড়িত ছিলাম।”

জুলম-নির্যাতনের পাশাপাশি ৬-দফার আন্দোলনের বিকল্প হিসেবে বিরোধী রাজনৈতিক দলসমূহের সমন্বয়ে সর্বদলীয় ঐক্য গড়ে তোলার চেষ্টা হয়। সর্বোপরি আওয়ামী লীগের মধ্যে দ্বন্দ্ব, কোন্দল ও ভাঙনের ষড়যন্ত্র করে সরকার। নানামুখী প্রতিকূলতার মধ্যে দলের ঐক্য ধরে রাখা এবং ৬-দফার আন্দোলন এগিয়ে নেওয়া ছিল বিরাট চ্যালেঞ্জ। এই রকম পরিস্থিতিতে পাকিস্তান গণতান্ত্রিক আন্দোলন Pakistan Democratic Movement বা পিডিএম) গঠিত হয়। বঙ্গবন্ধু স্পষ্ট উপলব্দি করেছিলেন যে, ৬-দফার আন্দোলন নসাৎ করার জন্যই এসব আয়োজন। তিনি দ্বিধাহীনভাবে লিখেছেন যে, “৬-দফার জন্য জেলে এসেছি, বের হয়ে ৬-দফার আন্দোলনই করব। যারা রক্ত দিয়েছে পূর্ব পাকিস্তানের মুক্তিসনদ ৬-দফার জন্য, যারা জেল খেটেছে ও খাটছে তাদের রক্তের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করতে আমি পারব না।” শেষ পর্যন্ত ১৯৬৮ সালের ১৭ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুকে কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুক্তি দেওয়া হলেও কারাগারের ফটক থেকেই সেনাবাহিনী গ্রেফতার করে। কুর্মিটোলা ক্যান্টনমেন্টে পাঞ্জাব রেজিমেন্টের অফিসার্স মেসের ১০নং কক্ষে তাকে বন্দী করা হয়। “রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিবুর রহমান ও অন্যান্য”Ñ মামলার ১ নম্বর আসামি হিসেবে বঙ্গবন্ধুকে বিচারের মুখোমুখি করা হয়। এমন কী বন্দী অবস্থায় তাকে হত্যার ষড়যন্ত্র হয়। দেশব্যাপী ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে বাধ্য হয়ে জেনারেল আইয়ুব খান ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধুকে নিঃশর্ত মুক্তি দেন। যদিও মামলা চলাকালীন ট্রাইব্যুনালে দেওয়া জবানবন্দিতে বঙ্গবন্ধু নিজেকে নির্দোষ দাবি করে বলেনÑ
“আমি পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সভাপতি।… আমি অনিয়মতান্ত্রিক রাজনীতিতে কদাপি আস্থাশীল নই। … … .. আমি কখনো পূর্ব পাকিস্তানকে পশ্চিম পাকিস্তান হইতে বিচ্ছিন্ন করিবার জন্য কোনো কিছু করি নাই কিংবা কোনোদিনও এই উদ্দেশ্যে কোনো স্থল, নৌ বা বিমানবাহিনীর কোনো কর্মচারীর সংস্পর্শে কোনো ষড়যন্ত্রমূলক কার্যে আত্মনিয়োগ করি নাই।”

যৌক্তিক কারণেই বঙ্গবন্ধুসহ অন্যান্য সকল অভিযুক্ত ব্যক্তি নিজেদের নির্দোষ দাবি করেন। সম্প্রতি বিভিন্ন গবেষণা এবং স্মৃতিকথা থেকে জানা যাচ্ছে যে, মূলত, কৌশলগত কারণে তারা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। কর্নেল শওকত আলী তাঁর ‘সত্য মামলা আগারতলা’ গ্রন্থে লিখেছেনÑ “অভিযুক্তদের সঙ্গে বসে অভিযোগনামা শুনতে শুনতে আমি নিশ্চিত হয়েছিলাম, বঙ্গবন্ধু আমাদের সার্বিক পরিকল্পনার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত ছিলেন এবং সশস্ত্র পন্থায় বাংলাদেশকে স্বাধীন করার পরিকল্পনায় তিনি সম্মতি দিয়েছিলেন।” বলা যেতে পারে এই ভূখ-ের মানুষের স্বাধীনতার জন্য তিনি কোনো পন্থাই বাদ দেননি। বাবা-মা, পুত্র-কন্যার ভালোবাসা বিসর্জন দিয়েছেন, জীবনের ঝুঁকি নিয়েছেন। দেশের মানুষও তাকে ভালোবেসেছে অকৃপণভাবে। ছাত্র-জনতা তাকে আইয়ুব কারাগার থেকে মুক্ত করে “বঙ্গবন্ধু” উপাধিতে অভিসিক্ত করেছে।
‘দুঃখ আমি পাব না’
বঙ্গবন্ধুকে জেলে বন্দী রেখেও মোনায়েম খানের গায়ের ঝাল মেটিনি। জেলে আইনানুগ সুবিধা থেকে তাকে বঞ্চিত করে। অধিক কষ্ট দেওয়ার অলিখিত নির্দেশ দিয়েছিলেন গর্ভনর। যে কারণে বঙ্গবন্ধুকে জেল আইন ভঙ্গ করে Solitary Confinement-এ রাখা হয়। কঠোর নজরদারির মধ্যে রাখা হয় তাকে। কৌতুক করে লিখেছেনÑ
“আমার অবস্থা হয়েছে, ‘পর্দানসিন জানানা’র মতো, কেউ আমাকে দেখতেও পারবে না, আমিও কাউকে দেখতে পারব না। কেউ কথা বলতে পারবে না, আমিও পারব না।”

বঙ্গবন্ধুকে যে কক্ষে রাখা হয়েছে তার দক্ষিণে ১৪ ফুট উঁচু দেওয়াল, উত্তর দিকে ৪০ সেল, যেখানে পাগলদের রাখা হয়েছে। পূর্ব দিকে ১৫ ফুট দেয়াল ও নতুন ২০ এবং পশ্চিমে থাকে একরারী আসামি, ৬ সেল ও ৭ সেল। এভাবে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস একাকী বন্দী জীবনে অনেকের পক্ষে শারীরিক-মানসিক সুস্থতা অক্ষুণœ রাখা সম্ভব হবে না। ১৯৬৬ সালের ৮ মে তাকে গ্রেফতার করা হয়। গণ-অভ্যুত্থানের পর ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি মুক্তি লাভ করেন। প্রায় তিন বছর এক দুঃসহ নির্যাতন ভোগের পর স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসেন। প্রবল মানসিক শক্তির জোরে অসম্ভবকে সম্ভব করেছেন। তিনি পাকিস্তানি শাসকচক্রের বদ মতলব সম্পর্কে সম্পূর্ণ সচেতন ছিলেন। এ প্রসঙ্গে লিখেছেনÑ
“যতই কষ্টের ভিতর আমাকে রাখুক না কেন, দুঃখ আমি পাব না। … … … এরা মনে করেছে বন্ধু শামসুল হককে (পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের প্রথম সাধারণ সম্পাদক) জেলে দিয়ে যেমন পাগল করে ফেলেছিল। আমাকেও একলা একলা জেলে রেখে পাগল করে দিতে পারবে। আমাকে যারা পাগল করতে চায় তাদের নিজেদেরই পাগল হয়ে যাবার সম্ভাবনা আছে।”

‘ভিক্ষুকের কোনো সম্মান নাই’
রোজনামচায় বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক রাজনীতি, পাকিস্তানের সঙ্গে বিভিন্ন রাষ্ট্রের বৈদেশিক সম্পর্ক, ঋণ, সাহায্য ইত্যাদি বিষয়ে মন্তব্য করেছেন। তিনি মনে করেন, ভারত ও পাকিস্তান উভয় দেশের জনগণের স্বার্থে কাশ্মীর সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধান করা উচিত। এক্ষেত্রে তিনি ভারতকে অধিক দায়ী করে মন্তব্য করেছেন যে, “ভারতের উচিত ছিল গণভোটের মাধ্যমে কাশ্মীরের জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার মেনে নিয়ে দুই দেশের মধ্যে একটা শান্তি চুক্তি করে নেওয়া।”
¯œায়ুযুদ্ধকালীন পর্বে ঋণ-সাহায্যের নামে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাববলয় বিস্তারের প্রচেষ্টা সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু অত্যন্ত সজাগ ছিলেন। পাক-ভারত যুদ্ধের পর মার্কিন সাহায্য নেওয়ার অসম্মানজনক প্রক্রিয়ায় তিনি অত্যন্ত মর্মাহত হয়ে লিখেছেনÑ
“নিজের দেশকে এত হেয় করে কোনো স্বাধীন দেশের সরকার এরূপভাবে সাহায্য গ্রহণ করতে পারে না। শুধু সরকারকে অপমান করে নাই, দেশের জনগণ ও দেশকেও অপমান করেছে। ভিক্ষুকের কোনো সম্মান নাই।”

তিনি বরং সোভিয়েত রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার পক্ষপাতি ছিলেন। জনগণের স্বার্থে সমাজতন্ত্র কায়েমের পক্ষে মত দিয়েছেন। ঘোড়াশাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য সোভিয়েত সহায়তায় উচ্ছ্বসিত হয়ে বলেছেন, “রুশ ও পাকিস্তানের মধ্যে বন্ধুত্ব কায়েম হউক এটাই আজ সাধারণ মানুষের কামনা।” তবে চীনের ভূমিকা নিয়ে তিনি অসন্তুষ্ট ছিলেন। পাকিস্তানের পিকিংপন্থিদের আইয়ুবের দালালি এবং পুঁজিবাদের সমর্থক জেনারেল আইয়ুবের প্রতি চীনের প্রধানমন্ত্রী চৌ এন লাই-এর সমর্থন তাকে রুষ্ট করেছে। ১৯৬৬ সালের ২৯ জুন চীনের প্রধানমন্ত্রীর রাওয়ালপিন্ডি সফর উপলক্ষে বঙ্গবন্ধু চীনের নীতির খোলামেলা সমালোচনা করেছেনÑ
“আপনারা জনগণের মুক্তিতে বিশ্বাস করেন, আর যে সরকার (আইয়ুব সরকার) জনগণের অধিকার কেড়ে নিয়েছেন তাদের সার্টিফিকেট দেওয়া আপনাদের উচিত না। এতে অন্য দেশের ভিতরের ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করা হয়। এই ব্যাপারে আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদ ও আপনাদের পথ এক না হওয়াই উচিত।”

‘পাকিস্তানের আপন মার পেটের ভাই’
রোজনামচা পড়তে গিয়ে পাঠক বঙ্গবন্ধুর মার্জিত রসবোধের সঙ্গে পরিচিত হয়ে আনন্দিত না হয়ে পারবেন না। সুযোগ পেলেই তিনি ব্যঙ্গ, বিদ্রƒপাত্মক মন্তব্য করেছেন। ইন্দোনেশিয়া ও পাকিস্তানের স্বৈরশাসকদের মধ্যে সাযুজ্য লক্ষ্য করে বঙ্গবন্ধু ইন্দোনেশিয়াকে, পাকিস্তানের আপন মায়ের পেটের ভাই বলে বিদ্রƒপ করেছেন। পাকিস্তানের বাজেটের একটা বড় অংশ মার্কিন সহায়তার ওপর নির্ভরশীল ছিল। এতদ্সত্ত্বেও পাকিস্তান সরকার ইন্দোনেশিয়াকে ১৪ কোটি টাকা ঋণদানের ঘোষণা দিলে বঙ্গবন্ধু ব্যঙ্গ করে লিখেছেনÑ
“এভাবেই আমরা ইসলামের খেতমত করছি। কারণ না খেয়ে অন্যকে খাওয়ানো তো ইসলামের হুকুম। দয়ার মন আমাদের! এমন প্রেম ভালবাসা-ই তো আমাদের নীতি হওয়া উচিত! কাপড় যদি কারও না থাকে তাকে কাপড়খানা খুলে দিয়ে রাস্তা দিয়ে হেঁটে বাড়ি চলে আসবা। আমাদের সরকারের অবস্থাও তাই।”

‘আমাকে দেখতে আয়, আমি আর বেশিদিন বাঁচব না’
বঙ্গবন্ধুর মা সায়েরা খাতুন খুলনা থেকে ছেলেকে ফোনে জানালেন, “তুই আমাকে দেখতে আয়, আমি আর বেশিদিন বাঁচব না। মমতাময়ী মায়ের আকুল আহ্বানে কেউ কি সাড়া না দিয়ে পারে? বঙ্গবন্ধু বাবা-মা দুজনেরই অতি আদরের খোকা। যদিও তখন বঙ্গবন্ধুর বয়স ৪৭, তিনি পাঁচ সন্তানের জনক। তারপরও তিনি বাবা-মার গলা ধরে আদর করেন। তিনি ছিলেন তার বাবা-মার অত্যন্ত ¯েœহধন্য পুত্র। বঙ্গবন্ধু লিখেছেনÑ
“আমি জানি না আমার মত এত ¯েœহ অন্য কোনো ছেলে পেয়েছে কি না!” আমার কথা বলতে আমার আব্বা অন্ধ। আমরা ছয় ভাই বোন। সকলে একদিকে, আমি একদিকে। খোদা আমাকে যথেষ্ট সহ্য শক্তি দিয়েছে, কিন্তু আমরা আব্বা-মার অসুস্থতার কথা শুনলে আমি পাগল হয়ে যাই, কিছুই ভালো লাগে না। খেতেও পারি না, ঘুমাতেও পারিনা, তারপর আবার কারাগারে বন্দি।”

বঙ্গবন্ধু তার ¯েœহময়ী মাকে কথা দিয়েছিলেন ১৯৬৬ সালের ১৩ মে গ্রামের বাড়িতে যাবেন। কিন্তু ৮ মে তাকে গ্রেফতার করে পাকিস্তান সরকার। আর বাড়ি যাওয়া হয়নি তার। মায়ের অসুস্থতার সংবাদ বঙ্গবন্ধুকে ভীষণ ব্যাকুল করে তোলে। মাতৃভূমির ডাকে ৬-দফার আন্দোলনে নেতৃত্ব দিতে গিয়ে জন্মধাত্রী মায়ের ডাকে সাড়া দিতে পারেননি।

লেখক : অধ্যাপক, ইতিহাস বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা

পাঠকের মন্তব্য:

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না। তারকাচিহ্নযুক্ত (*) ঘরগুলো আবশ্যক।

*