বিভাগ: সাফল্য

কৃষির উপখাত প্রাণিসম্পদে বৈপ্লবিক সাফল্য

50রাজিয়া সুলতানা: কৃষিপ্রধান বাংলাদেশে কৃষির অন্যতম উপখাত হচ্ছে প্রাণিসম্পদ। সরকার কৃষি খাতের উৎকর্ষ-উৎপাদন বৃদ্ধিতে কার্যকর নীতি, ভর্তুকি সহায়তা ছাড়াও ঋণ কার্যক্রম ও সম্প্রসারণসেবা অব্যাহতভাবে বৃদ্ধি করছে। ফলে কৃষি খাতে বাংলাদেশ ক্রমাগত উন্নয়ন-অগ্রগতিতে সমৃদ্ধ হচ্ছে। তবে প্রাণিসম্পদ খাত সম্ভাবনাময় হওয়ার পরও স্পর্ট লাইটে আসছে না। তারপরও নীরব এক সাফল্যের স্বাক্ষর রেখে চলেছে দেশের প্রাণিসম্পদ খাত।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী দেশজ উৎপাদন বিবেচনায় কৃষি খাতের অবদান প্রায় ১৬ শতাংশ। এর মধ্যে ২ শতাংশ অবদান প্রাণিসম্পদ খাতের। সরকারিভাবে এখন খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিতের পাশাপাশি গ্রামীণ অর্থনীতি ঢেলে সাজাতে দারিদ্র্য বিমোচন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির নানা উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। আর এজন্য বাড়তি গুরুত্বারোপ করা হচ্ছে শুধু কৃষি খাতে। তবে উপখাতগুলো আরও গুরুত্ব দিলে দেশের সমৃদ্ধির পথ মসৃণ থাকত।
কৃষির অন্যতম উপখাত পশুসম্পদ দেশের জনগণের শুধু মাংসের চাহিদাই মিটায় না। কৃষকের জমি আবাদে লাঙল টানাসহ পণ্য পরিবহনের কাজেও ব্যবহার হয়। একসময় মাংসের চাহিদার জন্য প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকে বিপুল পরিমাণ গরু আদমানি করা হতো। কিন্তু ২০১৪ সালে ভারত বাংলাদেশে গরু রপ্তানি বন্ধ করে দেয়। ফলে দেশীয় চাহিদা মেটাতে সরকার পশুসম্পদের উৎপাদন-প্রজননের ওপর জোর দিয়েছে। চাহিদার পুরোটা উৎপাদন করতে না পারলেও আমদানি-নির্ভরতা অনেকটাই কমে গেছে। সঙ্গে বাড়ছে গরুর দুধ উৎপাদনও। উৎপাদন বৃদ্ধির ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে আমদানির চাহিদা শূন্যের কোটায় নেমে আসবে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে দেশে মাংস উৎপাদন হয়েছে ৭১ লাখ ৫৪ হাজার টন। পাশাপাশি দুধ উৎপাদন হয়েছে ৯২ লাখ ৮৩ হাজার টন। অন্যদিকে ডিম উৎপাদন হয়েছে প্রায় ১৪৯ কোটি ৩৩ লাখ। দুধ উৎপাদনে এখনও কিছুটা ঘাটতি থাকলেও মাংস ও ডিমের ক্ষেত্রে প্রায় স্বয়ম্ভরতার কাছাকাছি চলে এসেছে বাংলাদেশ। সংকটময় অবস্থা থেকে উত্তরণে সাফল্যের পথ দেখাচ্ছে দেশের প্রাণিসম্পদ খাত। বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের সর্বশেষ তথ্যমতে, দেশে গত বছর তরল দুধের চাহিদা ছিল প্রায় ১ কোটি ৪৮ লাখ ৬৫ হাজার টন। এর বিপরীতে উৎপাদন হয়েছে ৯২ লাখ ৮৩ হাজার টন। অর্থাৎ দেশে গত বছর দুধের ঘাটতি ছিল ৫৫ লাখ ৮২ হাজার টন।
চলতি অর্থবছরে দেশে গরু উৎপাদন হয়েছে ২ কোটি ৩৯ লাখ ৩৫ হাজার, মহিষ ১৪ লাখ ৭৮ হাজার, ভেড়া ৩৪ লাখ এবং ছাগল ২ কোটি ৫৯ লাখ ৩১ হাজার। এছাড়া উৎপাদন হয়েছে ২৭ কোটি ৫২ লাখ মুরগি ও ৫ কোটি ৪০ লাখ হাঁস। গত বছর দেশে প্রাণিসম্পদ খাতে মোট পশু উৎপাদনের পরিমাণ ছিল ৩৮ কোটি ৩৯ লাখ ৪৫ হাজার। ২০০৭-০৮ অর্থবছরে মোট পশু উৎপাদনের পরিমাণ ছিল মাত্র ৩ কোটি। ২০১২-১৩ অর্থবছরে এর পরিমাণ ছিল ৩৫ কোটি।
পশুসম্পদে বাংলাদেশ ক্রমেই স্বয়ংসম্পূর্ণ হচ্ছে। অথচ বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষণা বলছে, দেশের বৃহদায়তনের গরুর খামারের সংখ্যা খুবই কম। এক থেকে ৫টি গরুর মালিক, এ ধরনের পরিবারের কাছেই রয়েছে দেশের ৯০ শতাংশ গরু। ৬-১০টি গরুর মালিক পরিবারে রয়েছে প্রায় ৬ শতাংশ গরু। অন্যদিকে ১০টি বা তার বেশি সংখ্যক গরুর মালিক পরিবারের কাছে গরু রয়েছে মাত্র ৪ শতাংশ।
কোরবানির বাজারে সরবরাহের ক্ষেত্রে অনেকটাই স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে সারাদেশে মোট পশু কোরবানি হয়েছিল ১ কোটি ৯ লাখ। চলতি বছর দেশের বাজারে ১ কোটি ১৫ লাখ ৫৭ হাজার পশু সরবরাহ করা হয়েছে। এর মধ্যে গরু ৩৩ লাখ ৩০ হাজার, মহিষ ১১ লাখ ২৭ হাজার এবং ছাগল ও ভেড়া প্রায় ৭১ লাখ। অর্থাৎ দেশে কোরবানিযোগ্য পশুর পরিমাণ বাড়ছে প্রতিবছরই। ২০১৫ সালে এ ধরনের পশুর সংখ্যা ছিল ৯৬ লাখ ৩৫ হাজার। গত বছর তা বেড়ে দাঁড়ায় ১ কোটি ৪ লাখে। এ বছর কোরবানিযোগ্য পশুর সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ১১ লাখ।
২০১৩-১৪ অর্থবছরে রাজশাহী, যশোর, খুলনা, সিলেট ও চট্টগ্রাম অঞ্চলের ৩১টি করিডর দিয়ে ভারত থেকে আমদানি হয়েছিল ২০ লাখ গরু। তবে পরের অর্থবছর থেকেই দেশে গরু প্রবেশের সংখ্যা কমতে থাকে, যার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে চলতি বছর দেশে প্রবেশকৃত গরুর সংখ্যায়। চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে দেশে গরু প্রবেশ করেছে ৩ লাখ ৬৫ হাজার।
দুধের ঘাটতি মেটানোয় অগ্রগতি দেখা গেলেও এখনও চাহিদার তুলনায় অনেক পিছিয়ে বাংলাদেশ। সরকারের এক গবেষণায় দেখা গেছে, দৈনিক দুধ গ্রহণের তালিকায় দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সর্বনি¤েœ বাংলাদেশ। তালিকার শীর্ষে থাকা পাকিস্তানে মাথাপিছু দৈনিক গড় দুধ গ্রহণের পরিমাণ ৫২০ মিলিলিটার। ভারতে এই পরিমাণ ২২৭ মিলিলিটার। আর বাংলাদেশে মাথাপিছু দুধ গ্রহণের পরিমাণ মাত্র ৫৬ মিলিলিটার। তবে বর্তমানে এ পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি হচ্ছে। দেশে কয়েক বছর ধরে দুধ উৎপাদন বাড়ছে। ২০০৫-০৬ থেকে ২০০৯-১০ অর্থবছর পর্যন্ত দেশে দুধ উৎপাদন ২৩-২৪ লাখ টনের ঘরেই সীমাবদ্ধ ছিল। সেখান থেকে বেড়ে ২০১০-১১ অর্থবছরে তা প্রায় ৩০ লাখ টন, ২০১১-১২ অর্থবছরে ৩৫ লাখ, ২০১২-১৩ অর্থবছরে ৫১ লাখ, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ৭০ লাখ ও ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ৭৩ লাখ টনে উন্নীত হয়। আর ২০১৬-১৭ অর্থবছরে উৎপাদন হয়েছে ৯২ লাখ ৮৩ হাজার টন দুধ। দেশে দুধের চাহিদা রয়েছে প্রায় ১ কোটি ৫৮ লাখ টন। অর্থাৎ দেশে দুধের ঘাটতি প্রায় ৫৬ লাখ টন।
দুগ্ধ উৎপাদন সক্ষমতায় বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় পিছিয়ে বাংলাদেশ। অস্ট্রেলিয়ায় একটি গাভীর দুধ উৎপাদনক্ষমতা বার্ষিক ৪ হাজার ৯২৬ কেজি হলেও বাংলাদেশের গাভীর ক্ষমতা মাত্র ২০৭ কেজি। অন্যদিকে নেপালের গাভীগুলোর ক্ষেত্রে এই সক্ষমতা ৪১৫ কেজি, ভারতের ৯৮৭ ও পাকিস্তানের ১ হাজার ১৯৫ কেজি। পাশাপাশি দেশের মাংস উৎপাদনকারী গরুগুলোকে বিশ্বের অনান্য দেশের তুলনায় অনেক বেশি ঘাস বা খাদ্য খেতে দিতে হয়। অথচ তারা মাংস দিচ্ছে কম। উন্নত বিশ্বে যেখানে সাড়ে তিন-চার কেজি খাদ্য দিলে এক কেজি মাংস উৎপাদন করতে সক্ষম, সেখানে বাংলাদেশের গরুকে দিতে হয় ৭-৮.৫ কেজি। আর সেটি হচ্ছে একমাত্র উন্নত প্রযুক্তি না আসায়। গরুর জাত প্রজননে দেশে এখন ৩০ বছরের আগের ব্রিড নিয়ে কাজ করা হচ্ছে। স্বাধীনতার পর যে ৪টি জাত দেশে ছাড়া হয়েছিল, এরপর আর দেশে জাত আনা হয়নি। এসব গরুর মধ্যে শতভাগ দেশি জাতের গরুর সংখ্যা ধীরে ধীরে কমে আসছে। বেশির ভাগই সংকর জাতের। দেশের প্রায় ১০ শতাংশ গরু বিদেশি জাত দ্বারা সংকরায়িত। অনেক গরুরই এখন ইনব্রিড শুরু হয়ে গেছে। আর এ কারণে মাংস বা দুধ উৎপাদনক্ষমতা কমে গেছে।
এ খাতের উন্নয়ন করতে আরও উন্নত জাতের ব্রিড আনতে হবে। দেশে মাংস ও দুধ উৎপাদনের জন্য ৪০-৫০ বছর ধরে যে জাত ব্যবহার করা হচ্ছে, সেগুলো পরিবর্তন করতে হবে। উন্নত জাত আনা সম্ভব না হলে যে জাত আছে, সেগুলো আর্টিফিসিয়াল সিমেন বা ফার্টাইল এমব্রয় সিমেন দিয়ে উন্নত করা যেতে পারে।
সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারিভাবে ব্র্যাকের আড়ং, প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ, আকিজ গ্রুপ, রংপুর ডেইরি ফুড অ্যান্ড প্রোডাক্ট লিমিটেড, আবুল মোনেম গ্রুপসহ আরও কিছু প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগ করছে। মানুষের আয় বাড়ার কারণে খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন হচ্ছে। পুষ্টিকর খাবারের দিকে ঝুঁকছে সাধারণ মানুষ। ফলে দেশের তরল দুধসহ দুগ্ধ শিল্পের ব্যাপক চাহিদা বাড়ছে।
প্রাণিসম্পদ অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হওয়ার উদ্দেশে গবাদিপ্রাণী ও হাঁস-মুরগি প্রতিপালন করার জন্য খামার গড়ে তুলছে। গবাদিপ্রাণীর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেÑ গরু, মহিষ, ছাগল ও ভেড়া। এগুলো দেশের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। কারণ এসব প্রাণী কৃষি কার্যক্রমসহ বিভিন্ন কাজের চালিকাশক্তি, চামড়া ও সারের জোগান দেয়। এই প্রাণিসম্পদই দেশে মাংস ও দুধের প্রধান উৎস। অর্থাৎ বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রাণিসম্পদের ভূমিকা যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। তাই প্রাণিসম্পদ খাতের উন্নয়ন নিশ্চিত এবং মসৃণ করতে গত অর্থবছর থেকে সরকার দুগ্ধ ও পশুপালন খাতের জন্য বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে থোক বরাদ্দ রেখেছে।
পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, মোট জাতীয় উৎপাদনের (জিডিপির) প্রায় ২.৯ শতাংশ জোগান দিচ্ছে প্রাণিসম্পদ খাত এবং এটির বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার ৫.৫ শতাংশ। বাংলাদেশের জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশ গবাদি প্রাণী ও হাঁস-মুরগি পালন ও প্রজনন কর্মসূচির আওতায় জীবিকা নির্বাহ করে। জমি চাষ, ভারবহন এবং গোবরের সার ও জ্বালানি সরবরাহে প্রাণিসম্পদের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। পাশাপাশি প্রাণীর চামড়া, হাড়, নাড়িভুঁড়ি ও পালক ইত্যাদি বৈদেশিক মুদ্রা আয়ে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। ভূমিহীন মানুষের জীবিকার হিসেবে প্রাণিসম্পদ প্রধান অবলম্বন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
লেখক : শিক্ষক, গবেষক এবং সমাজকর্মী

পাঠকের মন্তব্য:

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না। তারকাচিহ্নযুক্ত (*) ঘরগুলো আবশ্যক।

*