বিভাগ: আন্তর্জাতিক

ক্রাইস্টচার্চে নৃশংসতা রুখে দাঁড়িয়েছে নিউজিল্যান্ডবাসী ‘উই আর ওয়ান’

4-9-2019 6-36-30 PMসাইদ আহমেদ বাবু: নিউজিল্যান্ড শান্তির দেশ হিসেবে পরিচিত। এলাকাটি ছিল ব্রিটিশ উপনিবেশ। শ্বেতাঙ্গরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও বহু দেশ থেকে অভিবাসী এসে মিশ্র জনগোষ্ঠীরই দেশ হিসেবে গড়ে উঠেছে নিউজিল্যান্ড। লোকসংখ্যা মাত্র ৫০ লাখ। নিউজিল্যান্ড কুক প্রণালি দ্বারা দ্বিধাবিভক্ত। প্রণালির পূর্বপ্রান্তের দক্ষিণ পাশে ক্রাইস্টচার্চ শহর আর উত্তর প্রান্তে ওয়েলিংটন শহর। ক্রাইস্টচার্চ শহরে ১৮৫০ সালে এসে প্রথম মুসলমানরা বসতি স্থাপন শুরু করে। এই ক্রাইস্টচার্চ শহরে মুসলমানরা দুটি মসজিদ গড়ে তোলেনÑ আল নুর ও লিনউড। ২০১৮ সালে বিশ্বের মধ্যে শান্তিপূর্ণ রাষ্ট্রের তালিকায় নিউজিল্যান্ড ছিল দুই নম্বরে। বিশ্বের অনেক দেশেই সন্ত্রাসী ঘটনা ঘটলেও নিউজিল্যান্ড ছিল ব্যতিক্রম। নিউজিল্যান্ডকে বরাবরই একটি ‘শান্তির দেশ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ৯/১১-এর ঘটনাবলির পর বিশ্বের অনেক দেশেই সন্ত্রাসী ঘটনা ঘটলেও নিউজিল্যান্ড ছিল ব্যতিক্রম। এতদিন দেশটার মাঝে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ছিল। কিন্তু এই শান্তির দেশটিও এখন অশান্ত হয়ে উঠেছে? গত ১৫ মার্চ নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চে দুটি মসজিদে হামলা চালায় শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদী সন্ত্রাসী। হামলায় প্রায় ৫০ জন নিহত হন। নিউজিল্যান্ডের মুসলমানরা শান্তিপূর্ণ ও সহানুভূতিশীল হিসেবেই বেশি পরিচিত। অথচ সেই দেশেই শুক্রবার (১৫ মার্চ) মসজিদের ভেতর ঘটে গেল নারকীয় হামলা। হত্যাকারী ব্যক্তি অস্ট্রেলীয় নাগরিক এবং হামলার শিকার হতাহত ব্যক্তিরা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে আসা। যাদের মধ্যে ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, মিসর, জর্ডান এবং সোমালিয়া আছে। ২০১৩ সালের আদমশুমারি অনুসারে নিউজিল্যান্ডে মুসলিম জনসংখ্যা মাত্র ৪৬ হাজার, ওই হামলায় অল্পের জন্য রক্ষা পান বাংলাদেশ জাতীয় দলের ক্রিকেটাররা। তবে প্রাণ হারান ৫ বাংলাদেশি। ১৯৪৩ সালের পর নিউজিল্যান্ডে এ ধরনের নারকীয় হামলা এই প্রথম। এই হত্যাকা- কেবল নিউজিল্যান্ডকে ভারাক্রান্ত করেনি, বিশ্বজুড়ে মানুষকে আলোড়িত করেছে। নিউজিল্যান্ডবাসীসহ গোটা বিশ্বের মানুষ এ বর্বর হত্যাকা-ে বিস্মিত, হতবাক। ঘাতক-সন্ত্রাসী টারান্ট এই হত্যাকা-ের দৃশ্য ধারণ করে ফেসবুকে সরাসরি সম্প্রচার করেছে। সে এর আগে ৭৪ পৃষ্ঠাব্যাপী একটি বিবৃতিও প্রচার করেছে। হত্যাকা-টি যে সুপরিকল্পিত ও চরম হিংসাত্মক, সে-বিষয়ে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই। দেখা গেছে, আহতদের অনেকের ওপর বারবার গুলি চালিয়ে সে তাদের মৃত্যু নিশ্চিত করেছে। তাকে আটক করে পুলিশ।
নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জাসিন্ডা আরডের্ন ঘটনার কয়েক ঘণ্টা পর বিবৃতি প্রদানের জন্য হাজির হলেন, তখন শুধু নিউজিল্যান্ডই তার বক্তব্য শুনতে উদগ্রীব ছিল, তা নয়। সারাবিশ্বের মনোযোগ ছিল সেদিকে। এই সংকটকালে সমগ্র দেশবাসীকে ঐক্যবদ্ধ রাখার গুরুত্ব অনুধাবন করেছেন তিনি। অতি দ্রুত এবং স্পষ্টভাবে এই বন্দুক হামলাকে তিনি ‘সন্ত্রাসী হামলা’ বলে বর্ণনা করেন। ঐক্য সংহতি ও পরস্পরের জন্য সহমর্মিতাই পারে একটি বহুজাতিক সমাজে সহিংস উগ্রবাদের বিস্তার রোধ করতে। প্রধানমন্ত্রী জাসিন্ডা আরডের্ন ১৫ মার্চের চরম বিদ্বেষমূলক অন্যায় আক্রমণের পর, মুসলমানরা বিক্ষুব্ধ হয়ে ইসলামি উগ্রপন্থিদের সাথে যোগাযোগ করে প্রতিশোধ নিতে পারে। সন্ত্রাসী হামলার পর নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জাসিন্ডা আরডের্র্ন মুসলমানদের সান্ত¦না প্রদানের জন্য বিরল সংহতি প্রকাশ করলেন। এদেশটির জনগণ ও প্রধানমন্ত্রী একযোগে মুসলমানদের পাশে এসে দাঁড়ান। দেশের প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা মসজিদ দুটোর কাছে গেলেন এবং হতাহত লোকদের ও সন্ত্রাসী হামলায় নিহত মুসলিমদের পরিবারের সদস্যদের জড়িয়ে ধরে সান্ত¦না ও সমবেদনা জানান তিনি। সে-সময় মাথায় কালো রং এর স্কার্ফ পরেন তিনি, যা তাদের প্রতি শ্রদ্ধারই বহিঃপ্রকাশ। গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করেছেন মুসলমান সম্প্রদায়ের নেতাদের সঙ্গে। তাদের অভয় দেন। তিনি অকণ্ঠে উচ্চারণ করলেন, হামলার ঘটনাটি আমাদের ইতিহাসের কালো অধ্যায় তাই সর্বোচ্চ তদন্তকারী সংস্থা রয়েল কমিশনই এর তদন্ত করবে। মন্ত্রিসভার বৈঠকে মন্ত্রিপরিষদের সদস্যরা এ ব্যাপারে একমত পোষণ করেছেন। হামলাটি প্রতিরোধে কী করা উচিত ছিল, তাও খাতিয়ে দেখবে রয়েল কমিশন। আমরা সকলে মিলে এই আক্রমণকারীকে প্রতিহত করব। ক্রাইস্টচার্চে নৃশংস হত্যাকা-ের প্রেক্ষিতে সংসদের বিশেষ সভায় গত ১৯ মার্চ নিউজিল্যান্ডে পার্লামেন্ট অধিবেশন শুরু হয়েছিল একজন মাওলানার কোরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে। নিউজিল্যান্ডের ইতিহাসে যা এই প্রথম। অধিবেশনের শুরুতে কিউই পার্লামেন্টের স্পিকার বলেন, ক্রাইস্টচার্চে ভয়াবহ হামলার প্রেক্ষিতে আমি ইমাম নিজাম উল হক থানভিকে সংসদে আমন্ত্রণ জানিয়েছি। তিনি আরবিতে পবিত্র কোরআন থেকে তেলাওয়াত করবেন এবং তাহির নেওয়াজ সেটি ইংরেজিতে অনুবাদ করে শোনাবে। কোরআন তেলাওয়াতের পর নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জাসিন্ডা আরডের্ন  ‘আসসালামু আলাইকুম’ বলে পার্লামেন্টে তার বক্তব্য শুরু করেন। ক্রাইস্টচার্চ সন্ত্রাসী হামলায় অভিযুক্ত অস্ট্রেলীয় বন্দুকধারীর নাম উচ্চারণ না করার অঙ্গীকার করেন তিনি। তিনি আরও বলেন, সে একজন সন্ত্রাসী। সে একজন চরমপন্থি। এ হামলাকারীকে ‘আইনের সর্বোচ্চ সাজা’ ভোগ করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, তার এই সন্ত্রাসী কর্মকা-ের পক্ষে সে অনেক কিছু ভাবতে পারে। কিন্তু সে কুখ্যাতি ছাড়া আর কিছুই পায়নি। তিনি সন্ত্রাসকে কঠোরভাবে মোকাবিলা করার ঘোষণা দিয়েছেন। এখন মুসলমানেরা সাধারণ এই প্রধানমন্ত্রীর অসাধারণ ভূমিকায় সাহস ফিরে পাচ্ছে।
নিউজিল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, প্রত্যেকটা মসজিদে মুসল্লিরা যাতে শান্তিতে নামাজ আদায় করতে পারে তা নিশ্চিতে নিরাপত্তার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে পুলিশকে। গোটা দেশের নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে। দেশের বন্দুকনীতি কঠোর করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। তাছাড়া সামাজিক মাধ্যমে যে ঘৃণা ছড়ানো হয় তা প্রতিহত করা হবে। নিউজিল্যান্ডে মসজিদে সন্ত্রাসী হামলা এটা আবার সামনে নিয়ে আসে যে সন্ত্রাসের কোনো ধর্ম নেই, জাত নেই। ক্রাইস্টচার্চে মসজিদে গত ১৫ মার্চের হামলায় ৫০ জন নিহত ও ৪০ জনের বেশি মুসল্লি আহত হন। হতাহতদের প্রতি শ্রদ্ধা ও মুসলিমদের প্রতি সংহতি জানাতে ২২ মার্চ এক সপ্তাহ পূরণ হলে দেশটিতে রাষ্ট্রীয়ভাবে শোক পালন করা হয়। ক্রাইস্টচার্চের সামনে আল নূর মসজিদের সামনে হেগলি পার্কে স্মরণসভা আয়োজন করা হয়েছে। শোক পালনে হ্যাগলি পার্কে দেখা গেছে অভূতপূর্ব সব দৃশ্য। হাজার হাজার মানুষ জড়ো হয়। সেদিন জুমার নামাজের আগে ওই সংকটকালে পুরো দেশবাসীকে ঐক্যবদ্ধ রাখার মানসে স্মরণসভায় সমবেত নাগরিকদের উদ্দেশ্যে দেশটির প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘উই আর ওয়ান’ আমরা সবাই এক, নিউজিল্যান্ডের সবাই আপনাদের সঙ্গে ব্যথিত। জাসিন্ডা আরডের্ন আরও বলেন, ‘মোহাম্মদ (স.) বলেছেন পারস্পরিক ভালোবাসা ও সহানুভূতি দিয়ে একটি শরীরের মতো থাকবেন। যখন শরীরের কোনো অঙ্গে ব্যথা হয় তখন পুরো শরীরের ব্যথা হয়।’
এ-বিষয়ে জাসিন্ডা বলেছেন, অপ্রত্যাশিত সন্ত্রাসী হামলার পর থেকে পুরো দেশে বেদনা ও ভালোবাসায় ভরে গেছে। স্মরণসভা আয়োজন করার মধ্য দিয়ে নিউজিল্যান্ডের অধিবাসীরা আরেকবার দেখাতে চায়, তারা সহানুভূতিশীল, সবাইকে নিয়ে একসঙ্গে থাকতে চায়, এখানকার সমাজ বৈচিত্র্যময়। আর আমরা সেই মূল্যবোধকে সুরক্ষিত রাখব। হাজার হাজার মানুষ বাইরে বেরিয়ে এসে দুই মিনিট নীরবতা পালন করেছেন। নিউজিল্যান্ডের জাতীয় টিভি ও রেডিওতে জুমার নামাজের আজান প্রচার করা হয়। ঐদিন পুরো নিউজিল্যান্ডই মুসলমান সম্প্রদায়ের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে, অমুসলিম নারীরাও মাথায় কাপড় দিয়ে মুসলিমদের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করেছেন : শুধু মুসলিমরা নন, নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে নানা জাতি-ধর্মের মানুষের ঢল নেমেছিল সেখানে। এ-সময়ে প্রধানমন্ত্রীর গায়ে ছিল মুসলিম রীতির পোশাক, মাথায় ছিল হিজাবের মতো ওড়না দেওয়া। হিজাব পরে আরডের্ন এবং তার দেশের নারীরা বার্তা দেন মুসলিম নারীদের। ‘সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই’Ñ সেই চিরায়ত উচ্চারণ দীপ্তকণ্ঠে ফিরে আসে আরডের্নের মুখে। জুমার নামাজের পর মুসলমানদের সঙ্গে গণপ্রার্থনায় অংশগ্রহণ করে আক্রান্ত মুসলিম সম্প্রদায়কে অভয় দিলেন, আল নূর মসজিদে হাজার হাজার মানুষের সামনে ইমাম জামাল ফাওদা যে বক্তৃতা দেন, সেটি আলোড়িত করেছে সব মানুষকে।
বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ মানুষের মন ভেঙে গেছে। আজ সেই একই জায়গায় দাঁড়িয়ে যখন চারপাশে তাকিয়েছি, তখন নিউজিল্যান্ড ও বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা হাজার হাজার মানুষের চোখে ভালোবাসা ও সহানুভূতি দেখেছি। এতে আরও লাখ লাখ মানুষের হৃদয় ভরে গেছে, যারা আমাদের সঙ্গে এখানে শারীরিকভাবে নেই; কিন্তু তাদের আত্মা আমাদের সাথেই আছে।
সন্ত্রাসী আমাদের দেশকে তার অশুভ মতাদর্শ দিয়ে বিভক্ত করে দিতে চেয়েছিল। কিন্তু তার বদলে আমরা তাকে দেখিয়ে দিতে পেরেছি যে নিউজিল্যান্ড ভেঙে টুকরো হয়ে যায়নি। বরং বিশ্ব আমাদের ভালোবাসা আর ঐক্যের উদাহরণ হিসেবে দেখছে। আমাদের মন ভেঙে গেছে; কিন্তু আমরা ভেঙে পড়িনি। আমরা বেঁচে আছি। আমরা ঐক্যবদ্ধ। আমরা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ যে কেউ আমাদের বিভক্ত করতে পারবে না।
এই হামলায় যারা হতাহত হয়েছেন, তাদের পরিবারকে বলছি আপনাদের স্বজনের মৃত্যু বৃথা যায়নি। আপনাদের হারিয়ে নিউজিল্যান্ডের ঐক্য ও শক্তি জোরদার হয়েছে। কিন্তু আপনাদের চলে যাওয়াটা যেন নিউজিল্যান্ড এবং বিশ্ব মানবতার জন্য একটি সতর্কবার্তা ছিল।
ইসলামোফোবিয়া বা ইসলাম বিদ্বেষ হন্তারক। মুসলমানেরা আগেও এর শিকার হয়েছে। কানাডা, নরওয়ে, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশেই ইসলাম বিদ্বেষের শিকার হয়েছেন অনেক মানুষ। কিন্তু ইসলাম বিদ্বেষ খুবই বাস্তব। এ মতাদর্শ মানুষের মানবতা ভুলে অযৌক্তিকভাবে মুসলমানদের সম্পর্কে ভীতি ছড়ায়। আমরা নিউজিল্যান্ডের সরকার এবং আশপাশের প্রতিবেশী দেশগুলোর কাছে আহ্বান জানাই হেটস্পিচ বা হিংসাত্মক বক্তৃতা ও ভয়ের রাজনীতির ইতি টানার জন্য যেন উদ্যোগ নেওয়া হয়। শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদের উত্থান এবং ডানপন্থি প্রতিক্রিয়াশীলতা বিশ্ব মানবতার জন্য বিরাট এক হুমকি এবং এর অবসান এক্ষুণি হতে হবে। ইমাম তার বক্তব্যে ১৫ মার্চের ঘটনায় হতাহতদের প্রতি নিউজিল্যান্ডের মুসলমান ও অমুসলমানদের ভালোবাসা এবং চোখের জলের জন্য ধন্যবাদ জানান। নিউজিল্যান্ডের মানুষ মুসলমানদের সাথে সংহতি জানিয়ে যে ঐতিহ্যবাহী হাকা নৃত্যের আয়োজন করেছে সেজন্য ধন্যবাদ জানান।
আরডের্ন মনে করেন, তার দেশে সন্ত্রাসবাদের এই বাজে দৃষ্টান্তের মাধ্যমে অস্ত্র আইনের দুর্বলতা ফুটে উঠেছে। তিনি আগামী ১০ দিনের মধ্যে এই আইন সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দেন। যাতে দেশটির নাগরিকরা সেখানে বসবাস করতে নিরাপদ বোধ করে।
প্রধানমন্ত্রী জাসিন্ডার কার্যক্রম বিশ্বব্যাপী ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় দৈনিক নিউইয়র্ক টাইমস লিখেছে, জাসিন্ডার মতো একজন নেতা দরকার যুক্তরাষ্ট্রের। বিশ্বের দেশ-বিদেশের প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীরা ভূয়সী প্রশংসা করেছেন জাসিন্ডার কার্যক্রমের। নিউইয়র্ক টাইমস, ওয়াশিংটন পোস্ট, গার্ডিয়ান থেকে সারা পৃথিবীর সংবাদমাধ্যমে এক প্রশংসিত নাম আরডের্ন। আরডের্নের প্রশংসা করে নিউইয়র্ক টাইমসের সম্পাদকীয়তে লেখা হয়েছে, আতঙ্ক কীভাবে সামাল দিতে হয়, তা আরডের্নের কাছ থেকে শেখা উচিত বিশ্বের। অন্যদিকে, গার্ডিয়ানে লেখা হয়েছে সত্যিকারের নেতা।
ফরাসি সাইটে লেখা হয়েছে, ক্রাইস্টচার্চে বিয়োগান্তক ঘটনার পর উপযুক্ত, উন্মুক্ত ও শান্তিপূর্ণভাবে যে পদক্ষেপ নিয়েছেন নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জাসিন্ডা আরডের্ন, আমরা আশা করি আগামীতে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার তার হাতে তুলে দেওয়া হবে। ধারণা করা হচ্ছে, ফরাসি সাইটে এই আবেদনটির উদ্যোক্তা ফরাসি কবি ড. খাল তোরাবুলি।
পশ্চিমা সমাজে শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদীরা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অশ্বেতাঙ্গ ও অভিবাসীদের ওপর যত সন্ত্রাসী কর্মকা- ঘটিয়েছে, তার তালিকা দীর্ঘ। নিউজিল্যান্ডের মসজিদে হামলাকে সেই তালিকার সর্বশেষ সংযোজন বলা যেতে পারে। তবে ঘটনাটি যে হঠাৎ করেই ঘটেনি, তা বহু পর্যবেক্ষকই স্বীকার করেন। পশ্চিমা রাজনীতিবিদ ও গণমাধ্যমের একটি অংশ দীর্ঘদিন ধরে এ ঘৃণা ছড়িয়ে আসছে। ইসলামভীতি তৈরিতে নিরন্তর চেষ্টা চালিয়ে আসছেন তারা। সন্ত্রাসী হামলার পর বিশ্বজুড়ে মুসলিমদের মধ্যে এক হতাশার সৃষ্টি হয়েছে। তারপর নিউজিল্যান্ড ও এদেশের প্রধানমন্ত্রী জাসিন্ডা আরডের্ন যে আন্তরিক সহানুভূতি ও সমর্থন দিয়েছেন তাতে ১৫০ কোটি মুসলিমের শ্রদ্ধা পেয়েছেন তিনি। অভিবাসনের হার বেড়ে যাওয়ার কারণে বর্ণবাদ বেড়ে যাচ্ছেÑ বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেন জাসিন্ডা আরডের্ন।
উগ্র কট্টরপন্থি জাতীয়তাবাদী মনোভাবের উত্থানের বিষয়ে প্রশ্ন করলে আরডের্ন বলেন, নিউজিল্যান্ডে আমরা এ-ধরনের মতাদর্শে বিশ্বাস করি না। তবে আমি বিশ্বব্যাপী একটি আহ্বান জানাতে চাই। নিউজিল্যান্ডের ঘটনায় এখানকার মানুষ এমন এক ব্যক্তির সহিংসতার ভুক্তভোগী হয়েছে যে নিউজিল্যান্ডের বাইরে তার কট্টরপন্থি মতাদর্শের সাথে পরিচিত হয়েছে এবং সেখানেই এর অনুশীলন করেছে।
শরণার্থীদের গ্রহণ করার বিষয়ে নিউজিল্যান্ডের ভূমিকার প্রশংসা করে আরডের্ন বলেন, আমাদের দেশে মানুষকে স্বাগত জানানো হয়।
কট্টর দক্ষিণপন্থি বর্ণবাদী মতাদর্শের মূলোৎপাটনের লক্ষ্যে বিশ্বের সব দেশের একত্রিত হয়ে লড়াই করা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেছেন নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জাসিন্ডা আরডের্ন।
বিবিসির সাথে বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি নিউজিল্যান্ড এবং বিশ্ব থেকে বর্ণবাদ ‘বিতাড়িত’ করার বিষয়ে প্রতিশ্রুতি দেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, এ বিষয়গুলোর ক্ষেত্রে ‘সীমানা দিয়ে ভাবলে আমাদের চলবে না’। আরডের্নের প্রথম বক্তব্যের সূত্র ধরে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানের পর্যবেক্ষকরা তার নেতৃত্বের প্রশংসা করেছেন।
ব্রিটিশ পত্রিকা গার্ডিয়ানে সুজানে মুর লিখেছেনÑ ‘মার্টিন লুথার কিং বলেছেন সত্যিকারের নেতারা ঐক্য খোঁজে না, তারাই ঐক্য তৈরি করে, আরডের্ন ভিন্ন ধরনের ঐক্য তৈরি, কর্ম, অভিভাবকত্ব ও একতার প্রদর্শন করেছেন।’
‘সন্ত্রাসবাদ মানুষের মাঝে ভিন্নতাকে দেখে এবং বিনাশ ঘটায়। আরডের্ন ভিন্নতা দেখেছেন এবং তাকে সম্মান করতে চাইছেন, তাকে আলিঙ্গন করছেন এবং তার সাথে যুক্ত হতে চাইছেন।’
নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জাসিন্ডা আরডের্নকে সম্প্রতি টুইটারে খুনের হুমকি দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
ক্রাইস্টচার্চে নিহতদের সম্মানে এমনই একটি ছবি এঁকেছেন অস্ট্রেলিয়ান কার্টুনিস্ট ক্যাম্পবেল। হাসপাতালের বেডে শুয়ে আঁকা তার এ ছবিটি ছড়িয়ে পড়েছে সারাবিশ্বে। তিনি বলেন, রুপালি ফার্ন পাতা নিউজিল্যান্ডের জাতীয় জীবনে কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা আমি জানি। সে ধারণা থেকেই নিহতদের প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করে এটি আঁকার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
মার্টিন লুথার কিং প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছেন অনেক কারণেই। এর প্রধান ও মুখ্য কারণ হিসেবে বলা যায় ডোনাল্ড ট্রাম্পের কথা। সারাবিশ্বে ক্রমবর্ধমান কট্টর ও উগ্র জাতীয়তাবাদের উত্থানের ঢেউ আমেরিকায় প্রবেশ করে ডোনাল্ড ট্রাম্পের হাত ধরে। তিনিই নিয়ে আসেন ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ শব্দবন্ধটি।
মুখে বললেন পুরনো ঐতিহ্য ও শক্তিমত্তা ফিরিয়ে আনার কথা। কিন্তু কাজে টানলেন বিভাজনের রেখা। তার এই নীতি বলার অপেক্ষা রাখে না, সারাবিশ্বেই বড় প্রভাব ফেলেছে। ঠিক এই প্রাসঙ্গিকতাতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছেন মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র। তার সেই স্বপ্ন ও আশার কথা আরও জোর দিয়ে বলার সময় এখনই, যেখানে কোনো বিভাজন থাকবে না, থাকবে না কোনো বৈষম্য।

পাঠকের মন্তব্য:

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না। তারকাচিহ্নযুক্ত (*) ঘরগুলো আবশ্যক।

*