বিভাগ: প্রবন্ধ

ক্ষমা না চেয়ে বিএনপি-জামাত জোট পার পেতে তৎপর!

PM2শেখর দত্ত: সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণের ভেতর দিয়ে নির্বাচনী ডামাডোল শুরু হয়ে গেছে। গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রার জন্য এটা খুবই শুভ। মুক্তিযুদ্ধ এবং বর্তমানে উন্নত সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে নেতৃত্বদানকারী দেশের সর্ববৃহৎ ও ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ দুই মেয়াদে ক্ষমতায় থাকায় পরাজিত শক্তি পুনরায় নির্বাচন বয়কট ও আগুন সন্ত্রাস চালিয়ে গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রার পথ রুদ্ধ করতে চেয়েছিল। সংকট সৃষ্টি করে অবৈধ শক্তিকে ক্ষমতায় এনে জাতীয় অগ্রগতির পথ রুদ্ধ করতে চেয়েছিল। কিন্তু তা সম্ভব হয়নি আওয়ামী লীগ সভাপতি বঙ্গবন্ধু-কন্যা প্রধানমন্ত্রী দেশরতœ শেখ হাসিনার দেশের প্রতি, গণতন্ত্রের প্রতি ঐকান্তিক শ্রদ্ধাবোধ ও রাজনৈতিক দূরদর্শিতার ফলে। গত নির্বাচনের আগেও তিনি সংলাপের দুয়ার খুলে দিয়েছিলেন। তা অসৌজন্যমূলকভাবে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন বিএনপি-জামাত জোটনেত্রী খালেদা জিয়া। এবারেও তিনি সংলাপের ভেতর দিয়ে পরাজিত শক্তির হীন উদ্দেশ্যমূলকভাবে সৃষ্ট সংকটের সমাধান করলেন। দেশের গণতান্ত্রিক সংগ্রাম ও অগ্রযাত্রার ইতিহাসে তাৎপর্যপূর্ণ এবং একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে।
এই ইতিহাস সৃষ্টির জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কৃতিত্বের দাবিদার। বিশ^সমাজের রীতি ও সংবিধান অনুযায়ী স্বাভাবিকতা বজায় রেখে সব রাজনৈতিক দলকে নির্বাচনী মাঠে নামিয়ে গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রার ইতিহাসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে উদাহরণ সৃষ্টি করলেন, তা দেশের রাজনীতির ইতিহাসে অমোচনীয় কালিতে লিপিবদ্ধ থাকবে।

সব দলকে নির্বাচনে আনার ক্ষেত্রে
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কৃতিত্ব কোথায়
এই প্রশ্ন আলোচনায় দুটো দিক বিবেচনাযোগ্য। প্রথমত; সামরিক শাসন নেই, নেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার, দলীয় সরকার ক্ষমতায়, সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণের ভেতর দিয়ে ভোট হচ্ছে। দ্বিতীয়ত; নির্বাচনের আগে কোনো আন্দোলন নেই, শান্তিপূর্ণভাবে সংলাপ হয়েছে, স্বাভাবিক অবস্থার মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এমন অবস্থায় ১৯৭৩ সালের পর আর কোনো নির্বাচন হয়নি।
প্রসঙ্গত, ১৯৭৩ সালের নির্বাচনের সময় আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ছিল এবং সব দলের অংশগ্রহণের ভেতর দিয়ে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। তারপর ১৯৭৯ ও ১৯৮৬ সালের দ্বিতীয় ও তৃতীয় সংসদ নির্বাচন সামরিক আইনের মধ্যে যথাক্রমে সেনাশাসক জিয়া ও এরশাদের আমলে সংঘটিত হয়েছিল। দুই নির্বাচনের আগেই কম-বেশি আন্দোলন হয়েছিল এবং এর মধ্যে এরশাদের আমলের নির্বাচনে বিএনপি নির্বাচন বয়কট করেছিল। ১৯৮৮ সালে এরশাদ আমলের চতুর্থ সংসদ নির্বাচন হয়েছিল আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে আট দল, বিএনপির নেতৃত্বে সাত দল ও বামপন্থিদের পাঁচ দলের আন্দোলন ও নির্বাচন বয়কটের ভেতর দিয়ে। অন্দোলনের পটভূমিতে ১৯৯১ সালের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল সব দলের অংশগ্রহণের ভেতর দিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে।
১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে দলীয় সরকার বিএনপি ও খালেদা জিয়ার অধীনে আওয়ামী লীগসহ বিরোধী দলের বয়কট সত্ত্বেও একতরফা ভোটারবিহীন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। চার মাস পর জুনে আন্দোলনের পটভূমিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে এবং আন্দোলন ছাড়া স্বাভাবিক অবস্থায় ২০০১ সালে সব দলের অংশগ্রহণের ভেতর দিয়ে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ২০০৮ সালে আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে সব দলের অংশগ্রহণের ভেতর দিয়ে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও ২০১৪ সালের নির্বাচন বয়কট ও আগুন সন্ত্রাসের ভেতর দিয়ে দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হয়।
সংসদ নির্বাচনের এই ইতিহাস দেখিয়ে দিচ্ছে, ৪৫ বছর তথা ১৯৭৩ সালের পর এই প্রথম সংবিধানের ভিত্তিতে দলীয় সরকারের অধীনে আন্দোলন না থাকা অবস্থায় স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। প্রথমে সেনাশাসক এরশাদ ও পরবর্তীতে বিএনপি-জামাত জোট নেতা খালেদা জিয়ার পক্ষে সম্ভব হয়নি, শান্তিপূর্ণভাবে সংবিধানের ভিত্তিতে সব দলের অংশগ্রহণের ভেতর দিয়ে নির্বাচন অনুষ্ঠানের। তারা দুজন অবশ্য সরকারপ্রধান হিসেবে সব দলকে নির্বাচনে অংশগ্রহণের ব্যাপারে চেষ্টা করেন নি কিংবা করার মতো ইচ্ছে বা অবস্থানও তাদের ছিল না। ঠিক উল্টোভাবে ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগ নেতা শেখ হাসিনা অনেক চেষ্টা করেছিলেন সব দলকে নির্বাচনে আনতে।
কিন্তু অবৈধ শক্তিকে ক্ষমতায় আনার ষড়যন্ত্র-চক্রান্তের জন্য তা সম্ভব হয়নি। পুরো নির্বাচন পর্বই তখন ছিল দুঃস্বপ্নের মতো, নাশকতামূলক আগুন সন্ত্রাস নির্বাচারে চালিয়ে বিএনপি-জামাত জোটের ক্যাডার-সন্ত্রাসীরা নিরীহ মানুষ-পুলিশ হত্যা ও বাস-ট্রাক পুড়িয়ে তা-ব চালিয়েছে। বলার অপেক্ষা রাখে না, ২০১৫ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের প্রথম বর্ষপূর্তিতে একইভাবে যুদ্ধংদেহী মনোভাব নিয়ে রাস্তায় নেমে আগুন সন্ত্রাস চালিয়ে বিএনপি-জামাত জোট নীলনকশা করেছিল যে, শেখ হাসিনা সরকারকে এখনই ক্ষমতা থেকে নামতে হবে এবং ২০১৮ সালে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিকে অগ্রসর হওয়ার সুযোগ কোনোক্রমেই দেওয়া হবে না। নির্বাচন বয়কট করা, সরকার পতন ইত্যাদি কত বড় বড় কথাই না খালেদা জিয়া বাইরে থাকতে তিনি নিজে আর দোষী সাব্যস্ত হয়ে জেলে যাওয়ার পর বিএনপি নেতারা দিয়েছেন। কিন্তু আগে যেন তারা গর্হিত অপরাধ কিছু করেনি এমন ভাব দেখিয়ে কার্যত নাকে খত দিয়ে বিএনপি-জামাত জোটকে এবারে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সহনশীল ও দূরদর্শী রাজনীতির কাছে হেরে গিয়ে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় শামিল হয়েছে।

বয়কট ও আগুন সন্ত্রাস নিয়ে
ক্ষমা না চেয়ে নির্বাচনে বিএনপি
গণতান্ত্রিক তথা ভোটের রাজনীতিতে একটা রেওয়াজ আছে যে, আগে ভুল বা ক্ষতিকর কিছু করলে ক্ষমা চাওয়া। দেশের ৪৭ বছরের রাজনীতির ইতিহাসে আন্দোলনের নামে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় এবং পরে এক বছর পূর্তিতে বিএনপি-জামাত জোট যে ধরনের হিংসাত্মক ও ধ্বংসাত্মক কাজে রাস্তায় নেমেছিল, তা কোনো দেশদরদি ও গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলের পক্ষে করা সম্ভব নয়। ক্ষমতার জন্য তারা দেশবাসীকে জিম্মি করেছিল। প্রশ্ন হলো এবারে যদি সংবিধানের ভিত্তিতে বিএনপি-জামাত জোট নির্বাচন করতে পারে, তবে গতবার নির্বাচন বয়কট করল কেন? কেন নিরীহ মানুষ-পুলিশ মারলো, কেন বাস-ট্রেন পুড়াল? এসব নিয়ে ক্ষমা চাওয়া দূরে থাক, কোনো উত্তর না দিয়ে বিএনপি-জামাত জোট নির্বাচনের মাঠে নেমেছে।
কেবল ক্ষমতায় থাকার সময়েই নয়, ক্ষমতায় থেকেও তারা ক্ষমতার প্যারালাল কেন্দ্র ‘হাওয়া ভবন’ প্রতিষ্ঠা করে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমিকে সন্ত্রাসী রাষ্ট্র, অকার্যকর রাষ্ট্র হিসেবে বিশ^সমাজে পরিচিত করেছিল। তারাই বলেছিল বাংলাভাই মিডিয়ার সৃষ্টি। কানাডার আদালত বিএনপিকে সন্ত্রাসী দল হিসেবে চিহ্নিত করেছে। আর অর্থ কেলেঙ্কারির ঘটনায়ও জিয়া পরিবার বিদেশে আদালতের রায়ে অভিযুক্ত। এতসব গণবিরোধী ও দেশবিরোধী অপকর্ম-দুষ্কর্ম করার পরও বিএনপি ক্ষমা চায়নি। জামাত মুক্তিযুদ্ধের সময় পাপ করে যেমন মাপ না চেয়ে যে উদাহরণ সৃষ্টি করেছে, সেই পাপের পথেই বিএনপি-জামাত জোট হাঁটছে। চোরে চোরে মাসতুতভাইÑ প্রবাদটা এ দুই দলের জন্য সত্য। দেশের মঙ্গল নয়, পরাজয়ের যারা প্রতিশোধ নিতে চায়, তারা কখনও ক্ষমা বা মাপ চাইতে পারে না।

ক্ষমা চাওয়া দূরে থাক
ঘৃণ্য পথেই হাঁটছে বিএনপি-জামাত জোট
বিএনপির প্রার্থী মনোনয়ন পর্ব এবং প্রার্থী দেখে স্থির বিশ^াস হয় যে, ২০০১-০৬ শাসনামলের সেই ঘৃণ্য হিংসাত্মক পথেই হাঁটছে দলটি। দেশের সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে দ-িত পলাতক আসামি হাওয়া ভবন ও খোয়াব ভবন খ্যাত পাকিস্তানি গোয়েন্দা ও ডন ইব্রাহীমের সাথে সরাসারি সংযুক্ত তারেক রহমান ধানের শীষ মার্কা নিজ দল বিএনপি, জামাত ও ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থীদের বিলি করেছে। জামাত-বিএনপি-কামাল জোটের তারেকই সর্বেসর্বা এবং তা হাওয়া ভবনের দুঃশাসন ফিরে আসার ইঙ্গিত দেয়।
কেবল তা-ই নয় উগ্র-জঙ্গিবাদীদের যারা মদদ দিয়েছিল তাদেরও দ-প্রাপ্ত এই নেতা নমিনেশন দিয়েছে। ২০০৭ সালের প্রথম আলো, ইত্তেফাক-সহ পত্র-পত্রিকার খবর বিশেষত ‘বাংলাভাই’র জবানবন্দি থেকে জানা যায়, ‘শুরুতে রাজশাহী জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শীষ মোহাম্মদের বাসায় তাদের একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ঐ বৈঠকে তৎকালীন ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী ব্যারিস্টার আমিনুল হকের সঙ্গে কয়েকবার মোবাইল ফোনে কথোপকথন হয়। ব্যারিস্টার আমিনুল হক ছাড়াও তৎকালীন ভূমি উপমন্ত্রী রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু, গৃহায়ন ও পূর্ত প্রতিমন্ত্রী আলমগীর কবির, সংসদ সদস্য নাদিম মোস্তফা, শামছুদ্দিন প্রামাণিক ও ডা. ছালেক চৌধুরী ও রাজশাহী সিটি মেয়র মিজানুর রহমান মিনুর সঙ্গে সার্বক্ষণিক মোবাইল ফোনে যোগাযোগ হতো। প্রতিমন্ত্রী আলমগীর কবিরের সাথে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ হওয়ার সময় তিনি বহুবার তার বাড়িতে যাওয়ার অনুরোধ করেছিলেন। অভিযান চলাকালে সংসদ সদস্য নাদিম মোস্তফা জেএমবির তহবিলে ৩০ হাজার টাকা দিয়েছিলেন। এই টাকা তিনি পুঠিয়া থানার ওসির মাধ্যমে তার কাছে পৌঁছে দেন। তৎকালীন ভূমি উপমন্ত্রী রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু তাকে ১০ হাজার টাকা দিয়েছিলেন।’ যেখানে উগ্রজঙ্গি ও এর উগ্রজঙ্গি মদদদাতাদের কার্যকলাপের জন্য বিএনপির ক্ষমা চাওয়া উচিত, সেখানে তাদের নমিনেশন দেওয়া হয়েছে। এ ধরনের প্রার্থীর মনোনয়ন প্রমাণ করে, দেশকে আবারও ‘সন্ত্রাসী রাষ্ট্র’, ‘অকার্যকর রাষ্ট্র’ বানাতে চায় বিএনপি।

ডিগবাজি খেলার ওস্তাদরা
বিএনপি-জামাত জোটের রক্ষাকর্তা
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে দেশের রাজনীতিতে ডিগবাজির খেলা যা হলো, তা অতীতের অনেক রেকর্ডকে ভঙ্গ করেছে। নিছক মনোনয়ন পাওয়া, জিতে জনপ্রতিনিধি তথা এমপি-মন্ত্রী হওয়ার জন্য উল্টোমুখী হওয়াটা সার্কাসের জোকারের ডিগবাজির কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। অতীতের কথা যদি বাদ দিয়ে যদি বাংলাদেশের ৪৭ বছরের রাজনীতির ইতিহাস পর্যালোচনা করা যায়, তবে দেখা যাবে নির্বাচনের সময় বাদে আরও একটি সময়ে রাজনীতিতে ডিগবাজির খেলা জমেছে। সময়টা হচ্ছে হত্যা-ক্যুয়ের পর এবং সেনাশাসকদের দল করার সময়ে। এই বিবেচনায় দেশের প্রথম ডিগবাজির খলনায়ক হচ্ছে খুনি মোস্তাক আর তার দুই সহযোগী সাথী ওবায়েদুর রহমান ও শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন। ডিগবাজিতে অবশ্য অঘটনঘটনপটিয়সী মওদুদ ও মইনুল হোসেন অনেক খেলা দেখিয়েছে। প্রথমোক্ত দুজনকে যমে টেনে নিলেও মাঝের দুজন এবারে নির্বাচনে ধানের শীষের প্রার্থী এবং শেষজন মহিলাদের উদ্দেশ্যে অবমাননা কথা বলার কারণে জেলে।
বহু বছর পর হলেও একই পথ ধরেছেন ড. কামাল ও তার সাথীরা। মাত্র ৩৬ বছর বয়সে বঙ্গবন্ধু যাকে পররাষ্ট্র বানিয়েছিলেন, যিনি হয়েছিলেন আওয়ামী লীগের রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী, নৌকা নিয়ে যিনি নির্বাচন করেছেন; ‘রুগ্ণ রাজনীতি’ দূর করার সেই দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ও অকুতোভয় কা-ারি (!) এখন প্রত্যক্ষভাবে বিএনপি এবং পরোক্ষভাবে যোগ দিয়েছেন যুদ্ধাপরাধী দল জামাতের সাথে। হায় রে ড. কামালের ‘সুস্থ রাজনীতি’! জাতিসত্তাবিরোধী রাজনীতি বা নির্বাচন সামনে রেখে ডিগবাজি কখনও ‘সুস্থ রাজনীতি’ কিংবা ‘গণতন্ত্র রক্ষার রাজনীতি’ হতে পারে না।
একই সাথে বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী, অধ্যাপক আবু সাইদ, সুলতান মো. মনসুর প্রমুখরাও এবারে ডিগবাজির খেলা ভালোই দেখিয়েছেন। তবে আ স ম আবদুর রব ও মাহমুদুর রহমান মান্না ডিগবাজির খেলায় তাদেরও ছাড়িয়ে গেছেন। রব সাহেব আওয়ামী লীগ থেকে ডিগবাজি দিয়ে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের নায়ক হতে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন জাসদ, তারপর ডিগবাজি দিয়ে হয়েছিলেন সেনাশাসক এরশাদের আমলে বিরোধীদলীয় নেতা তথা ‘গৃহপালিত পশু’, তারপর আওয়ামী লীগের আমলে মন্ত্রী হয়েছিলেন। এ নিয়ে এই নেতার ডিগবাজির সংখ্যা হলো চার। এক্ষেত্রে মান্না সাহেব অবশ্য একটু পিছিয়ে আছেন। তিনি দিলেন তিনবার ডিগবাজি। বিপ্লব-নৌকা-ধানের শীষ! একমাত্র মোস্তফা মহসীন মন্টু দিতে পারেন তাদের সাথে পাল্লা। মাঝে তিনি যোগ দিয়েছিলেন সরাসরি বিএনপিতে। ১৯৬৯ সালে এক হত্যা মামলার রায়ে প্রাণদ- হয়েছিল তার। বঙ্গবন্ধু টেলিগ্রাম করেছিলেন ইয়াহিয়ার কাছে। প্রাণ তার বেঁচে গিয়েছিল।
কৃতজ্ঞতা দূরে থাকুক, এমপি-মন্ত্রী তথা হালুয়া-রুটির লোভে এসব তথাকথিত জনবিচ্ছিন্ন নেতাদের ডিগবাজি বাংলাদেশের ইতিহাসে কলঙ্কের কালিতে লিপিবদ্ধ থাকবে। ডিগবাজির এই রাজনীতি চারটা জনবিরোধী দেশবিরোধী কাজ করল। প্রথমত; দেশের মাটিতে জামাতকে আবারও ভিন্ন রূপে রাজনীতি করার সুযোগ জিইয়ে রাখল। দ্বিতীয়ত; উগ্র-জঙ্গি ও লুণ্ঠনের কেন্দ্র হাওয়া ভবনের নায়ক ও কুশীলবদের আবারও রাজনীতিতে টিকে থাকার ব্যবস্থা করল। তৃতীয়ত; দেশের রাজনীতিতে পাকিস্তানি গোয়েন্দাদের নাক গলাবার জায়গাটা অবারিত রাখল। সর্বোপরি বিএনপিকে ক্ষমা না চেয়ে জনতার দরবারে দাঁড় হওয়ার সুযোগ করে দিল।

ক্রন্দন-কালচার চালু হলো
ক্ষমা আড়াল করতে
নির্বাচন সামনে রেখে রাজনীতির ক্রন্দন-কালচারে শামিল হলেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। দলের প্রধান কোনো নেতার এ ধরনের ফুপিয়ে কান্নার কালচার অন্তত দেশে ছিল না। বাংলাদেশ সংগ্রাম-আন্দোলনের দেশ। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের আগ পর্যন্ত যখন রক্ত ঝরেছে, ৩০ লাখ মানুষ যখন শহিদ হয়েছে তখন রাজনীতির অঙ্গনের নেতাকর্মীরা কেউ ফুপিয়ে কাঁদেনি। ‘কাঁদো বাঙালি কাঁদো’Ñ বাঙালি কবি কবিতা লিখেছে, মাঠের নেতাকর্মীরা ব্যানার লিখেছে, সেøাগান দিয়েছে। কিন্তু কাঁদেনি। বিক্ষোভে ফেটে পড়েছে।
স্মৃতি যদি বিশ^াসঘাতকতা না করে, তবে যতটুকু মনে পড়েÑ দেশের রাজনীতিতে প্রথম ক্রন্দন-কালচার আমদানি করেন অবৈধভাবে ব্যবহৃত ক্যান্টনমেন্টের বাড়ি হারিয়ে বিএনপির ‘আপসহীন নেত্রী’ খালেদা জিয়া। সেই কান্না ছিল সম্পত্তির কান্না! সহানুভূতি আদায়ের সাথে অসহায়ত্ত ও লোক দেখানো কান্না! সেদিনই তিনি উচ্চারণ করেছিলেন বিএনপির নেতারা হচ্ছে ‘আঙ্গুল চোষা’। দলের প্রধান নেতা যেখানে বের করবেন আন্দোলনের কৌশল এবং উজ্জীবিত করে ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত নেতাদের রাস্তÍায় নামাবেন, তিনি যদি নিজের দোষের ব্যাপারে অবুঝ থেকে অন্যদের দুষেন বা গালি দেন, তবে আর থাকেটা কী! এক নম্বর নেতা কাঁদলে দু-নম্বর নেতা তো কাঁদতেই পারেন।
বলাই বাহুল্য খালেদা জিয়ার এই কান্নার সাথে পুত্র কোকোর অকাল মৃত্যুর পর কান্না মেলানো যাবে না। মা হিসেবে কান্নাই স্বাভাবিক। এই কান্না হৃদয়কে স্পর্শ করে যায়। প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনাও ঘাতকের নিষ্ঠুর আঘাতে নিহত পিতা-মাতা-ভাই-ভ্রাতৃবধূ ও আত্মীয়দের স্মরণে বক্তৃতা দেওয়ার সময় কাঁদেন। মানুষও কাঁদে। শোক ও দুঃখের কান্না আর অসহায়ত্ত ও লোক দেখানো কান্না ভিন্ন। রাজনৈতিক নেতাদের তা মানায় না। স্থান-কাল-ব্যক্তিভেদে খালেদা জিয়ার কান্না আর মির্জা ফখরুলের কান্না একই প্রকৃতির। কোনো মর্যাদা ও গণ-আস্থাসম্পন্ন দলের নেতারা অসহায়ের মতো এভাবে কাঁদতে পারেন না। বাস্তবে দেশবাসীকে বিভ্রান্ত করতে এই ক্রন্দন-কালচার আমদানি করা হয়েছে। দেশ ও জাতিবিরোধী কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা বা মাপ চাওয়াটাকে ঢাকা দেওয়া বা আড়াল করার জন্যই আসলে এই ক্রন্দন-কালচারকে রাজনীতিতে বিএনপির দুই প্রধান নেতা আমদানি করেছেন।

‘নিরপেক্ষ’ সুশীলরা ক্ষমা আড়াল
করতে গুজব ছড়াচ্ছেন
রাজনীতি ও সমাজ-জীবনে ভয় সৃষ্টিকারী গুজব জনগণকে রাজনীতিতে নিরুৎসাহিত করে এবং সহিংসতার পরিবেশ সৃষ্টিতে ইন্ধন জোগায়। এই বিচারে গুজব ও সহিংসতা হচ্ছে জমজ দুই ভাই। বর্তমানে সব দলের অংশগ্রহণের ভেতর দিয়ে দেশবাসী যখন নির্বাচনী উৎসবে শামিল হয়েছে, তখন ‘নিরপেক্ষ’ দাবিদার সুশীলরা গুজব ছড়াচ্ছেন। ‘এই নির্বাচন যদি না হয় তবে ভয়াবহ পরিণতি হতে পারে’, ‘নির্বাচন সুষ্ঠু না হলে’ তরুণরা ভিন্নভাবে ‘সমাধানের পথ খোঁজে নৃশংস’ হবে প্রভৃতি সব কথা তোলা হচ্ছে নিরপেক্ষ সুশীল গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে। গত ২ ডিসেম্বর সেগুনবাগিচার একটি রেস্তোরাঁর আলোচনা সভায় কথাগুলো প্রথম বলেছেন নিরপেক্ষ দাবিদার সুশীল সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তি ‘সুশাসনের জন্য নাগরিক’-সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার।
সুজন সম্পাদকের উক্তিটি যদি খবরের লাইমলাইটে তার থাকার কারণে হয়ে থাকে, তবে রক্ষা। তবে গুজব ছড়িয়ে যদি ঘোলা পানিতে মৎস্য শিকারের উদ্দেশ্য থাকে, তবে বলতে হবে তিনি আগুন নিয়ে খেলছেন। প্রসঙ্গত; নবম জাতীয় সংসদের আগে সুজনদের সুশীল গোষ্ঠী ছিল ফখরুদ্দীন-মঈনউদ্দিনের পক্ষে এবং ‘মাইনাস টু’ ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত কার্যকর করে কিংস পার্টি গঠনের পাঁয়তারা তারা করেছিল। দশম সংসদ নির্বাচনের আগে ২০১৪ সালে নিরপেক্ষ দাবিদার সুশীল সমাজ ছিল সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচনের বিপক্ষে এবং বিএনপি-জামাত জোটের পক্ষে। তাই আগুন সন্ত্রাস নিয়ে তারা প্রতিবাদ করা দূরে থাক, কার্যত প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে বিএনপি-জামাতকে ইন্ধন জুগিয়েছিল। দেশবাসী তাই এখন তাদের কথা বেশ সন্দেহের সাথে বিবেচনায় নিচ্ছে।
এটা সকলেই জানা যে, সুশীল সমাজ হচ্ছে জাতির বিবেক। নিরপেক্ষ অবস্থান থেকে বিবেক হিসেবে নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপিকে তাদেরই বলা উচিত, হাওয়া ভবনের নেতৃত্বে বিএনপি-জামাত শাসনামলের লুণ্ঠন-সন্ত্রাস বিশেষত উগ্র-জঙ্গি তৎপরতা, দশ ট্রাক অস্ত্র চোরাচালান, বাংলাভাই ও মুফতি গংদের বাড়বাড়ন্ত, রাজখোর-পরেশ বড়–য়াদের দেশের মাটি ব্যবহার করতে দেওয়া, সংখ্যালঘু নির্যাতন, কিবরিয়া-আহসানউল্লাহ মাস্টার প্রমুখদের হত্যা করা, ২১ আগস্টসহ অন্যান্য হামলা প্রভৃতি দেশ ও জনবিরোধী অপকর্মের জন্য দেশবাসীর কাছে ক্ষমা চাওয়ার কথা। কিন্তু তারা সেদিকে না গিয়ে আওয়ামী লীগ-বিরোধী জিগির তুলে জামাত-বিএনপি-কামালের পক্ষ নিয়ে সহিংসতা উসকে দিতে ভয় সৃষ্টিকারী গুজব ছড়াচ্ছেন। এই গোষ্ঠী কিং মেকার ভেবে বিএনপি-জামাত জোটের নবজাগরণ সৃষ্টির পাঁয়তারায় ঢাল হিসেবে কাজ করছেন।

নৌকার পক্ষে গণজোয়ার সৃষ্টিই
হচ্ছে এর প্রকৃষ্ট জবাব
বিজয়ের মাস ডিসেম্বরে হচ্ছে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এই মাসে নির্বাচন সামনে রেখে জাতি স্বাধীনতার রজতজয়ন্তী ও বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী যথাযোগ্য মর্যাদার সাথে পালনের শপথ গ্রহণ করছে। এ অবস্থায় জাতি আজ ঐক্যবদ্ধ ও উদ্দীপ্ত। দেশবাসী আরও সংকল্পবদ্ধ এজন্য যে, জাতিসংঘ ঘোষিত সহস্রাব্ধ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ইতোমধ্যে অর্জিত হয়েছে। দেশ এখন ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত, মানুষের আয়ু ও আয় বেড়েছে, সবার জন্য শিক্ষা সুনিশ্চিত, ঘরে ঘরে আজ বিদ্যুৎ পৌঁছে যাচ্ছে। ডিজিটাল বাংলাদেশ স্বপ্ন পূরণের পথে রয়েছে দেশ। এ অবস্থায় নৌকার পক্ষে গণজোয়ার সৃষ্টির মাধ্যমে ধানের শীষকে ধরাশায়ী করে যদি সম্পূর্ণ গণবিচ্ছিন্ন করা যায়, তবেই হবে দেশবাসীর কাছে বিএনপি-জামাত জোটের ক্ষমা প্রার্থনার অতি উত্তম উপায়।

পাঠকের মন্তব্য:

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না। তারকাচিহ্নযুক্ত (*) ঘরগুলো আবশ্যক।

*