বিভাগ: ইতিহাস : প্রবন্ধ

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার ১৯৭১

4-9-2019 6-18-02 PMএইচ. টি. ইমাম: স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র (Proclamation of Independence) হলো আমাদের স্বাধীনতার সনদ। এই ঘোষণায় সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে কেন, কোন ক্ষমতার বলে এবং পরিস্থিতিতে এই স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা হলো, যে রাষ্ট্রের নাম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ, (People’s Republic of Bangladesh); যার প্রথম রাষ্ট্রপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ঘোষণাটি (Proclamation)  করা হয় ১০ এপ্রিল ১৯৭১। বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম ঐ দিনই (১০ এপ্রিল) তাজউদ্দীন আহমদকে প্রধানমন্ত্রী করে পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট মন্ত্রিপরিষদ গঠন করেন। অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি এবং মন্ত্রীগণ ১৭ এপ্রিল ১৯৭১ স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের ভূমিতে (বৈদ্যনাথতলা, মেহেরপুর) আনুষ্ঠানিকভাবে শপথ গ্রহণ করেন। এই স্থানটিকে চিরস্মরণীয় রাখার জন্য এর নামকরণ করা হয় “মুজিবনগর”। এই শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানটি বিপুল সংখ্যক জনতার উপস্থিতিতে সেদিন ছিল উৎসবমুখর। কয়েকশত ভারতীয় এবং অন্যান্য দেশের সাংবাদিক এটি প্রত্যক্ষ করে গোটা বিশ্বে এই নতুন রাষ্ট্রের অভ্যুদয়ের কথা প্রচার করেন।
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে, ১০ এপ্রিল অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি কর্তৃক নিয়োগকৃত প্রধানমন্ত্রী ঐ দিনই কার্যভার গ্রহণ করেন এবং ১১ এপ্রিল জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দেন। ১০ এপ্রিলেই মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠক হয় এবং এরপর প্রতিদিনই তারা সভায় মিলিত হয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে এই সরকারের প্রধান কার্যালয় কলকাতায় স্থাপন করা হয় প্রধানত নিরাপত্তা এবং মুক্তিযুদ্ধে নির্বিঘেœ নেতৃত্ব দেওয়ার কারণে। আমাদের সরকারের বিভিন্ন কার্যাবলি পর্যালোচনা করলেই দেখা যাবে কত ব্যাপক এবং সুসংগঠিত ছিল সরকারের কর্মসূচি এবং গঠন-কাঠামো। এই সরকারের বৈশিষ্ট্য ছিল যে কলকাতায় অবস্থান করলেও এর কর্তৃত্ব গোটা বাংলাদেশেই ছিল, বিশেষ করে মুক্ত এলাকায় (রৌমারি, বেলোনিয়া ইত্যাদি)। বাংলাদেশের অভ্যন্তরেও বিশেষ কয়েকটি অঞ্চলে মুক্তিবাহিনী কখনও শত্রুকে প্রবেশ করতে দেয়নি।
এ প্রসঙ্গে একটি কথা বলা বিশেষ প্রয়োজন যে, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারকে কেবলই ‘মুজিবনগর সরকার’ নামে আখ্যায়িত করে (যেহেতু তার প্রধান কার্যালয় ভারতে অবস্থিত ছিল তাই) তাকে নানাভাবে হেয় প্রতিপন্ন করার অনেক অপচেষ্টা হয়েছে। স্বাধীনতাবিরোধীরা নানাভাবে চেষ্টা করেছে একে ‘পুতুল সরকার’ বলে পরিচয় দেওয়ার। বিশেষ করে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শহিদ হওয়ার পর থেকে ১৯৯৬ সালের জুলাই মাস পর্যন্ত এবং ২০০১ সালের অক্টোবর হতে ২০০৬ সাল পর্যন্ত এই স্বাধীনতাবিরোধী চক্র ইতিহাস বিকৃত করে লেখায়, আলোচনায়, টিভি, রেডিও ও সমস্ত প্রচারযন্ত্রকে ব্যবহার করে স্বাধীন সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশকে ছোট করার চেষ্টা করেছে। ইতিহাসকে তো আর বিকৃত করা যায় না, তবে স্বাধীনতা যারা চায়নি তারা এই অপপ্রয়াস অব্যাহত রাখবে এতে বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই। পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী তাদের পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে চাইবে, এটাই স্বাভাবিক। ইতিহাস-বিকৃতকরণে আমাদের মধ্যে মীরজাফরের মতো বিশ্বাসঘাতকদের অভাব নেই। যারা এই বিশ্বাসঘাতকতায় অংশগ্রহণ করেছে, তাদের নামের তালিকা ইতিহাসের পাতায় একদিন ঠিকই অন্তর্ভুক্ত হবে।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রচলিত সংজ্ঞায় একটি স্বাধীন দেশের সরকারের যেসব বৈশিষ্ট্য থাকা আবশ্যক, তার সবই ছিল গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের।
আওয়ামী লীগের মতাদর্শ এবং নির্বাচনী ঘোষণা (Manifesto) অনুসারে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশে সরকার গঠিত হয়েছিল সংসদীয় পদ্ধতির। প্রথম স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার প্রাদেশিক সরকার-কাঠামোর অবয়বে গঠিত হলেও তা ছিল সাবেক পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের সংক্ষিপ্ত সংস্করণ। হানাদার পাকিস্তানি বাহিনীর অতর্কিত আক্রমণ প্রতিহত করতে মুজিবনগরে গঠিত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারকে বহু প্রতিকূল অবস্থা অতিক্রম করতে হয়েছিল। মন্ত্রিসভার শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানের প্রায় দুই সপ্তাহ পরই পাকিস্তানি বাহিনী মুজিবনগরে আক্রমণ চালায়। এ জন্য মুজিবনগর প্রশাসনকে সুবিধাজনক মুক্তাঞ্চলে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু সব কাজকর্ম বাংলাদেশের প্রথম রাজধানী মুজিবনগরের নামেই পরিচালিত হতো। মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময় যুদ্ধের ক্যাম্প অফিস হিসেবে কলকাতার ৮ নম্বর থিয়েটার রোডের বাড়ি ব্যবহৃত হয়। মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথ গ্রহণের পর ১৮ এপ্রিল প্রথম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রিদের দপ্তর নিম্নরূপে বণ্টন করা হয়-

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান    :    রাষ্ট্রপতি।
সৈয়দ নজরুল ইসলাম    :    উপ-রাষ্ট্রপতি         (অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি)।
তাজউদ্দীন আহমদ    :    প্রধানমন্ত্রী; প্রতিরক্ষা, তথ্য সম্প্রচার ও যোগাযোগ, অর্থনৈতিক বিষয়াবলি, পরিকল্পনা বিভাগ, শিক্ষা, স্থানীয় সরকার, স্বাস্থ্য-শ্রম-সমাজকল্যাণ, সংস্থাপন ও অন্যান্য যেসব বিষয় কারও ওপর ন্যস্ত হয়নি তার দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী।
খন্দকার মোশতাক আহমদ    :    পররাষ্ট্র, আইন ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়।
এম  মনসুর আলী    :    অর্থ, বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয়।
এ এইচ এম কামারুজ্জামান     :    স্বরাষ্ট্র, সরবরাহ, ত্রাণ ও পুনর্বাসন ও কৃষি মন্ত্রণালয়।
সরকারের দায়িত্ব পালনে নতুন প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি
মন্ত্রিবর্গের ওপর অর্পিত দায়িত্বসমূহ সম্পন্ন করতে প্রয়োজনীয় সহায়তা ও সহযোগিতার জন্য নতুন নতুন প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি করতে হয়েছিল। সুদূরপ্রসারী চিন্তা-ভাবনার ভিত্তিতে সৃষ্ট প্রতিষ্ঠানে অভিজ্ঞ, দক্ষ, কর্মঠ, স্বাধীনতার চেতনায় দীপ্ত নতুন কর্মকর্তা-কর্মচারী নিযুক্ত করা হয়েছিল। মন্ত্রিসভার সব সদস্য সরকারি প্রশাসনকে সচল রাখতে দিনরাত অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন। মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাস গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রত্যেক কর্মকর্তা-কর্মচারী নিজ নিজ অবস্থান থেকে স্বাধীনতার জন্য যে অবদান রেখেছেন তা বাংলাদেশের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লিখিত থাকবে। মাঠের যুদ্ধরত মুক্তিযোদ্ধাসহ প্রথম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সবাই মিলে স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রযন্ত্রকে সচল রেখেছিল বলেই আজও আমরা তার সুফল পাচ্ছি। স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের গঠন সম্পর্কে তৎকালীন মন্ত্রিপরিষদ সচিব (নিবন্ধকার) একটা প্রতিবেদন মন্ত্রিসভার সভায় উপস্থাপন করেছিলেন। তাতে স্বাধীন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মোট ১৫টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের কথা ছিল। এগুলো ছাড়াও কয়েকটি সংস্থা মন্ত্রিপরিষদের অধীনে কাজ করত।

ক. প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়
প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাজকর্ম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ স্বয়ং দেখতেন। সশস্ত্র বাহিনী দপ্তর এ মন্ত্রণালয়ের একটা প্রধান অঙ্গ হিসেবে ছিল। প্রধান সেনাপতি, চিফ অব স্টাফ, উপ-সেনাপতি ও বিমান বাহিনী প্রধান, ডিজি, মেডিকেল সার্ভিস ও বিভিন্ন পদবির স্টাফ অফিসার এ দপ্তরের সাথে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। সশস্ত্র বাহিনী দপ্তর থেকে বাংলাদেশের যুদ্ধে অবতীর্ণ অঞ্চলগুলোকে ১১টি সেক্টরে বিভক্ত করে সেসব অঞ্চলে সেক্টর কমান্ডার নিয়োগ করা হয়েছিল।

খ. পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়
যুদ্ধকালীন সময়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিদেশে মিশন স্থাপনের মাধ্যমে বহির্বিশ্বে অবস্থানরত বাংলাদেশের জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করেছিল। তাদের মাধ্যমে এই মন্ত্রণালয় বিদেশে জনমত তৈরি এবং বিদেশি রাষ্ট্রসমূহের সমর্থন লাভের জন্য কাজ করেছিল। বাংলাদেশের প্রথম পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দিল্লি, কলকাতা, ওয়াশিংটন, লন্ডন, নিউইয়র্ক, স্টকহোম প্রভৃতি স্থানে বাংলাদেশের মিশন প্রতিষ্ঠায় কাজ করেছিল। জাতিসংঘ, জাপান, সিরিয়া, আফগানিস্তান, লেবানন, নেপাল, বার্মা, শ্রীলংকা, থাইল্যান্ড প্রভৃতি দেশে প্রতিনিধি দল পাঠিয়ে বাংলাদেশের পক্ষে সমর্থন আদায়েরও চেষ্টা করেছিল।

বঙ্গবন্ধুর নিরাপত্তা ও মুক্তি
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ নিজে তদারকি করতেন। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের কারাগারে বন্দী এই তথ্য পাওয়ার সাথে সাথে আমাদের সরকার অত্যন্ত তৎপর হয়ে ওঠেন তার নিরাপত্তা এবং মুক্তির জন্য। এ বিষয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী নিজে বিশ্বব্যাপী সফর করে বিভিন্ন রাজধানীতে জাতির পিতার নিরাপত্তা ও মুক্তির জন্য পাকিস্তানের ওপর চাপ সৃষ্টি করেন। তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন ও অন্যান্য বন্ধুপ্রতীম সরকারগুলোও এ বিষয়ে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন।

গ. অর্থ, শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার যুদ্ধ পরিচালনার সময় শিল্প ও বাণিজ্য সংক্রান্ত উল্লেখযোগ্য কাজ করতে না পারলেও অর্থ-শিল্প-বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছিল। সরকারের আয়-ব্যয়ের হিসাবের জন্য বাজেট প্রণয়ন, বাংলাদেশের অভ্যন্তর এবং অন্যান্য উৎস থেকে প্রাপ্ত সম্পদের হিসাব তৈরি, বিভিন্ন সংস্থা ও ব্যক্তিগণকে অর্থ দেওয়ার জন্য নীতিমালা প্রণয়ন, আর্থিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা, রাজস্ব ও শুল্ক আদায় এবং আর্থিক অনিয়ম রোধে কমিটি গঠন করা হয়েছিল।
মন্ত্রিপরিষদ গঠিত হওয়ার পর মন্ত্রিসভায় সরকারের অর্থনৈতিক বিষয় নিয়ে আলোচনায় সরকারের নতুন নোট ছাপা না হওয়া পর্যন্ত পাকিস্তানি মুদ্রা ভারতীয় মুদ্রায় রূপান্তর কিংবা পাকিস্তানি মুদ্রার ওপর বাংলাদেশের সিলমোহর দিয়ে বাজারে ছাড়ার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল। সরকার পরিচালনার জন্য অধিকৃত বাংলাদেশের বিভিন্ন ব্যাংক বা ট্রেজারি থেকে নিয়ে আসা অর্থ সংরক্ষণের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গৃহীত হয়েছিল। ভারত সরকার ১০ কোটি রুপির একটি অর্থ সাহায্য দিয়েছিল। বিভিন্ন দেশ থেকে প্রাপ্ত সাহায্য সংরক্ষণের জন্য “বাংলাদেশ ফান্ড” নামে একটি তহবিল প্রতিষ্ঠা করে তা তিনজন সদস্যের স্বাক্ষরে খরচ করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল। বাংলাদেশের প্রকাশিত ডাকটিকিট বিক্রির অর্থ ও অন্যভাবে অর্জিত অর্থ বাংলাদেশ ফান্ডে জমা রাখা হতো। এই অর্থ মুক্তিসংগ্রামে নিয়োজিত যোদ্ধাদের বেতন, বেসামরিক প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন, মন্ত্রী ও জনপ্রতিনিধিদের বেতন-ভাতা ইত্যাদিতে ব্যয় করা হতো। প্রত্যেক ক্ষেত্রে ব্যয়িত অর্থের যথাযথ ব্যবহার তদারকির ব্যবস্থা ছিল। অর্থ মন্ত্রণালয়ের নিজেদের দপ্তরসহ সব মন্ত্রণালয়ের প্রয়োজনীয় অর্থের জন্য বাজেট প্রদানের ওপর গুরুত্ব দিয়েছিল। প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের বাজেট মন্ত্রিসভায় বিশ্লেষণের পর পাস করা হতো। অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাজ বিভিন্ন অফিসারের ওপর ন্যস্ত থাকায় প্রত্যেক বিভাগের কাজকর্মে গতিশীলতা ছিল। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয় যুদ্ধকালে ভারত ও বাংলাদেশের দ্বি-পাক্ষিক বাণিজ্যিক বিষয়াদির খুঁটিনাটি দিক পরীক্ষা করেছিল। স্বাধীন হওয়ার পর ভারত কীভাবে বাংলাদেশকে বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে সহায়তা করতে পারে সে-বিষয়ে তখনই চিন্তা-ভাবনা হয়েছিল। এই চিন্তা-ভাবনার ফলস্বরূপ স্বাধীনতার অব্যবহিত পরে দেশের ভারী শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো জাতীয়করণ করা হয়।

ঘ. মন্ত্রিপরিষদ সচিবালয় ও সাধারণ প্রশাসন বিভাগ
মন্ত্রিপরিষদ সচিবালয়ের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ছিল বিভিন্ন প্রস্তাব উত্থাপন, সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন, পর্যবেক্ষণ ও লিপিবদ্ধকরণ। কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী ও মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে নিয়ে গঠিত মন্ত্রিপরিষদ সচিবালয়ের অন্যতম দায়িত্ব ছিল বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয় সাধন। মন্ত্রিপরিষদ সচিব (নিবন্ধকার) মুক্তিযুদ্ধ শুরুর দু-মাস পর আগরতলা থেকে মুজিবনগরে গিয়েছিলেন। তাই, ঐ সময়ের মন্ত্রিপরিষদ সভাগুলোর সিদ্ধান্ত প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদই নিজে লিখে রাখতেন। গোপনীয়তা রক্ষার জন্যও প্রধানমন্ত্রী সভার সিদ্ধান্ত নিজেই লিখতেন।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ের অধীনে সাধারণ প্রশাসন বিভাগ নিয়োগ-বদলি, পদায়ন-প্রবেশন, পদোন্নতি, চাকরি-বিধিমালা পর্যবেক্ষণ প্রভৃতি কাজ সম্পন্ন করত। সাধারণ প্রশাসন বিভাগের আওতায় আঞ্চলিক প্রশাসনিক কাউন্সিল গঠিত হয়েছিল।

ঙ. আঞ্চলিক প্রশাসন
আঞ্চলিক প্রশাসন স্থাপনা ও পরিচালনা ছিল একটি সম্পূর্ণ নতুন চিন্তাধারার ফসল। পূর্ণাঙ্গ একটি সরকার প্রতিষ্ঠা, যার অধীনে আঞ্চলিক প্রশাসনসহ বিভিন্ন বিভাগীয় কার্যক্রম চালু থাকবে, যার ভিত্তি হবে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া এবং মূল লক্ষ্য হবে যুদ্ধে নিয়োজিত সেক্টর কমান্ড এবং মুক্তিবাহিনীকে সর্বাত্মক সাহায্য এবং সহযোগিতা। এই লক্ষ্যে ১৯৭১ সালের ১১ জুলাই প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় ১১টি সেক্টরের সাথে ১১টি আঞ্চলিক পরিষদ (Zonal Councills) প্রতিষ্ঠা করা হয়। এই পরিষদগুলোতে নির্দিষ্ট এলাকার নির্বাচিত এমএনএ/এমপি-রা এবং অন্যান্য রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ সদস্য ছিলেন। তাদের মধ্য থেকেই চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন। এই কাউন্সিলকে প্রশাসনিক সাহায্য দেওয়ার জন্য একজন করে আঞ্চলিক প্রশাসনিক কর্মকর্তা (Zonal Administrative Officer) নিয়োগ করা হয়। সেই সাথে নিযুক্ত হন বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা। বাংলাদেশ সরকার মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জনের পর শাসনভার গ্রহণ করার পূর্ব পর্যন্ত এই প্রশাসনিক কাঠামো কার্যকর ছিল।
আঞ্চলিক পরিষদ এবং দপ্তরগুলো থাকার ফলে দেশ সম্পূর্ণভাবে শত্রুমুক্ত হওয়ার আগেই আমাদের নিজস্ব প্রশাসনিক কাঠামো সম্পূর্ণ প্রস্তুত ছিল। সে-কারণে ১৬ ডিসেম্বরই (কোনো ক্ষেত্রে তার আগেই) আমাদের নিয়োজিত সকল জেলা প্রশাসক/পুলিশ সুপার ও অন্যান্য কর্মকর্তা স্ব-স্ব পদে যোগদান করে কালবিলম্ব না করে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রশাসন প্রতিষ্ঠিত করেন। উল্লেখ্য, জোনাল প্রশাসনিক কাউন্সিলগুলোর অধীনে কিছু সাব-কমিটি যেমনÑ অর্থ উপ-কমিটি, ত্রাণ উপ-কমিটি, স্বাস্থ্য উপ-কমিটি, প্রচার উপ-কমিটি এবং শিক্ষা উপ-কমিটি কাজ করত। প্রতিটি জোনে একজন শিক্ষা, একজন ত্রাণ, একজন প্রকৌশলী, একজন তথ্য, একজন হিসাবরক্ষক ও একজন পুলিশ কর্মকর্তা সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত হয়ে জোনের দায়িত্ব পালন করতেন।

চ. স্বাস্থ্য ও কল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং তথ্য মন্ত্রণালয়
মুক্তিযুদ্ধের সময় একজন মহাপরিচালকের নেতৃত্বে প্রথম স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কাজ শুরু করেছিল। স্বাস্থ্য বিভাগের দুটি ভাগ ছিল, সেনাবাহিনীর জন্য চিকিৎসাসেবা এবং বেসরকারি চিকিৎসাসেবা। দুটি বিভাগই প্রয়োজনীয় চিকিৎসক নিয়োগ, আহত/নিহতদের জন্য পরিবহন ব্যবস্থা করা, প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র সংগ্রহ করা, মাঠ পর্যায়ে চিকিৎসক দল প্রেরণের ব্যবস্থা করত।

ছ. স্বাধীন বাংলা বেতার
প্রথম স্বাধীন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য ও বেতার মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠাও একটি উল্লেখযোগ্য অবদান। যুদ্ধের ৯ মাস বাঙালি জনগণের মনোবল বৃদ্ধি করায় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের ভূমিকা সর্বজনবিদিত। ১৯৭১ সালের ২১ মার্চ চট্টগ্রাম কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে শুরু করে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত এই বেতার কেন্দ্র অসাধারণ অবদান রেখেছে।

জ. স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সৃষ্টি
প্রথম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মুক্তাঞ্চল ও শরণার্থী ক্যাম্পে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোতে শৃঙ্খলা বজায় রাখার দিকে লক্ষ্য রাখত। প্রথমে আইজিপি, পরে সচিব হিসেবে নিযুক্ত জনাব আবদুল খালেক এই মন্ত্রণালয়কে প্রধানত ৩টি ভাগে বিভক্ত করে কাজকর্ম নিয়ন্ত্রণ করতেন। যুদ্ধকালে এই মন্ত্রণালয় পুলিশের পোশাক, ব্যাজ, মনোগ্রাম ইত্যাদি নির্ধারণ করে। পুলিশের গোয়েন্দা সংগঠনও প্রথম বাংলাদেশ সরকারের আমলে গড়ে তোলা হয়েছিল। এই মন্ত্রণালয় ভারতে অবস্থানকারী বাংলাদেশিদের জন্য ভ্রমণ-দলিল ইস্যু করার কাজও করত।

ঝ. শরণার্থী সমস্যা সমাধানে ত্রাণ কমিটি ও বোর্ড গঠন
শরণার্থী সমস্যা মোকাবিলায় ত্রাণ ও পুনর্বাসন বিভাগ সৃষ্টি তৎকালীন বাংলাদেশ সরকারের অন্যতম কাজ ছিল। সরকার দুটি কমিটির মাধ্যমে প্রধানত শরণার্থী সমস্যা মোকাবিলা করত। দুটি কমিটির একটি ত্রাণ ও পুনর্বাসন কমিটিতে জনাব জে.জি. ভৌমিককে রিলিফ কমিশনার নিযুক্ত করা হয়েছিল। প্রত্যেক আঞ্চলিক প্রশাসনিক ইউনিটের আওতায় এই কমিটি কাজ করত। অন্য কমিটি উদ্বাস্তু কল্যাণ বোর্ড শরণার্থীদের পুনর্বাসনে নিয়োজিত বিভিন্ন সংগঠনকে সমন্বিত করার দায়িত্ব পালন করত। সংগঠনগুলোর অন্তর্ভুক্ত ছিল বাংলাদেশ রেডক্রস সমিতি, বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি, বাংলাদেশ স্বেচ্ছাসেবক সংস্থা ইত্যাদি। এসব সংস্থার প্রধান হিসেবে যথাক্রমে ডা. আসহাবুল হক এমপিএ, জনাব কামরুজ্জামান এমএনএ এবং ব্যারিস্টার আমীর উল ইসলাম দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

ঞ. সংসদ বিষয়ক বিভাগ এবং কৃষি বিভাগ সৃষ্টি
একটি দেশের সরকার জনগণের স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট যেসব কাজ করতে দায়বদ্ধ, তার সবই প্রথম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার দায়িত্ব নিয়ে সম্পাদন করেছিল। সরকার এজন্য পররাষ্ট্র ও আইন মন্ত্রণালয়ের অধীন সংসদ বিষয়ক বিভাগ প্রতিষ্ঠা করেছিল। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গঠনে সংসদ বিষয়ক বিভাগের সঙ্গে যুক্ত এমএনএ বা এমপিএ দায়িত্ব পালন করতেন।
যুদ্ধকালে কৃষি বিভাগের তেমন কোনো কাজ না থাকলেও যুদ্ধোত্তর কালে স্বাধীন বাংলাদেশের কৃষি-ব্যবস্থার রূপরেখা প্রণয়নে কৃষি বিভাগ সৃষ্টি করেছিল প্রথম বাংলাদেশ সরকার। জনাব নূরুদ্দিন আহমদকে কৃষি সচিব হিসেবে নিয়োগ দিয়ে সরকার বাংলাদেশে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি, বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ, সহজ শর্তে ঋণ দান প্রভৃতি কর্মসূচি গ্রহণ করে।

ট. প্রকৌশল বিভাগ, পরিকল্পনা সেল সৃষ্টি
পাক-বাহিনীর হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত যোগাযোগ-ব্যবস্থা দ্রুত মেরামতের জন্য এবং সেক্টর কমান্ডারদের নিজ নিজ এলাকায় প্রকৌশল বিষয়ক সমস্যা সমাধানে কিছু প্রকৌশলীকে নিয়োগ প্রদান করে প্রকৌশল বিভাগ সৃষ্টি করেছিল সরকার। যুদ্ধ শেষে এই বিভাগ বড় রেলসেতু এবং সড়কসেতু মেরামতের ব্যবস্থা গ্রহণ করে।
বাংলাদেশ সরকার বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ঘোষণাপত্র বিশেষ করে হাই কমান্ডের পরামর্শের ভিত্তিতে পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা সেল গঠন করেছিল। পাকিস্তান শাসনামলে উন্নয়ন বঞ্চিত সেক্টরসমূহ চিহ্নিত করে সেসব ক্ষেত্রে উন্নয়নের ব্যবস্থা যাতে করা যায়, এ নিমিত্তেই উক্ত সেল গঠিত হয়েছিল। পরবর্তীতে অবশ্য এই সেল পরিকল্পনা কমিশনে রূপান্তরিত হয়। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রশাসনিক কাঠামো নির্মাণে পরিকল্পনা কমিশন নীতিমালা তৈরি করেছিল। পরিকল্পনা কমিশনের চেয়ারম্যান নিযুক্ত হয়েছিলেন ড. মোজাফ্ফর আহমদ চৌধুরী। সদস্যবৃন্দের মধ্যে ছিলেনÑ ড. খান সরওয়ার মুর্শেদ, ড. মোশাররফ হোসেন, ড. এসআর বোস এবং ড. আনিসুজ্জামান। প্লানিং কমিশনের অর্থনীতিবিদ হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন সিনিয়র লেকচারার সনৎকুমার সাহাকে।
আমাদের পরিকল্পনা বোর্ড ভারতীয় পরিকল্পনা কমিশনের সহায়তায় মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে আগস্ট মাস থেকে যুদ্ধবিধ্বস্ত স্বাধীন দেশের পুনর্গঠন পরিকল্পনা প্রণয়নে ব্যস্ত ছিল। বেসামরিক প্রশাসন পুনস্থাপন সংক্রান্ত সচিব কমিটির সাথে আমাদের কয়েকজন শ্রদ্ধেয় মুক্তিযোদ্ধা অধ্যাপককে সংশ্লিষ্ট করা হয়েছিল। বাংলাদেশ যখন শত্রুমুক্ত ও স্বাধীন হওয়ার দ্বারপ্রান্তে উপনীত তখন ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর ভারতীয় প্লানিং কমিশনের সদস্য ড. সুখময় চক্রবর্তী আমাদের প্লানিং বোর্ডের সাথে বসে সরবরাহ-ব্যবস্থা, শরণার্থী ও বাস্তুহারা মানুষের প্রত্যাবর্তন ও পুনর্বাসন এবং পুনর্গঠনের পরিকল্পনা চূড়ান্ত করতে সহযোগিতা করেছিলেন। উল্লেখ করা প্রয়োজন, বাংলাদেশের প্রত্যেক জেলায় আমাদের নিজস্ব ডেপুটি কমিশনার এবং পুলিশ সুপার নিয়োগ করে তাদের নিজ নিজ কর্মস্থলে যোগদানের নির্দেশও দেওয়া হয়েছিল। মুক্ত স্বাধীন বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোর জন্য সম্ভাব্য ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে প্রস্তুত থাকার নির্দেশও প্রথম বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়া হয়েছিল। ঢাকা বিমানবন্দরের গুরুত্বপূর্ণ পদ সিভিল অ্যাসোসিয়েশন ডিরেক্টর। আমাদের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি উইং কমান্ডার মির্জা (অব.) যিনি যুবশিবির দপ্তর পরিচালনা করেছিলেন, তাকে বিমান বন্দরের জাতীয় সম্পদ রক্ষণাবেক্ষণ করার ব্যবস্থা করতে ১৮ ডিসেম্বর ঢাকায় প্রেরণ করা হয়েছিল। তিনি তৎকালীন গ্রুপ ক্যাপ্টেন খন্দকারের সহায়তায় তার দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

ঠ. বুদ্ধিজীবী হত্যা করে শূন্যতা সৃষ্টির মুখেও সরকারের দৃঢ় অবস্থান
পাকিস্তানি সেনাবাহিনী যখন বুঝতে পারল যে, বাংলাদেশ স্বাধীন হয়ে যাচ্ছে তখন তারা যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ যাতে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে না পারে, সে জন্য পরিকল্পিত উপায়ে দেশের বহু বুদ্ধিজীবীকে হত্যা করেছিল। কিন্তু প্রথম বাংলাদেশ সরকার এসব প্রতিকূলতার তোয়াক্কা না করে তার তৎকালীন ছোট পরিসরের প্রশাসনিক কর্মীবৃন্দকে নিয়ে দেশ পরিচালনা করেছিলেন। প্রশাসনযন্ত্র আরও গতিশীল করতে বাংলাদেশ সরকারের প্রতি অনুগত সব সহকর্মীকে বিভিন্ন পদে নিযুক্ত করা হয়েছিল। শেরে বাংলা নগরস্থ তথাকথিত বন্দিশিবিরে আটক বন্ধুবর আইয়ুবুর রহমান (সিএসপি ১৯৬৭), আ. ন. ম. ইউসুফ (সিএসপি ১৯৬১), সৈয়দ রেজাউল হায়াত (সিএসপি ১৯৬৭), নূরুল মোমেন খান (পিএসপি ১৯৬১), লোকমান হোসেন (ডিরেক্টর, ডাক ও তার বিভাগ), শাহ মোহাম্মদ ফরিদ (সিএসপি ১৯৬৮) এবং আরও অনেককে সরকারি বিভিন্ন পদে নিয়োগ করা হয়েছিল। এতে সরকারি কাজ গতিশীল হয়।

ড. বাণিজ্য বোর্ড গঠন
শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে বাণিজ্য বোর্ড নামে একটি সংস্থা গঠিত হয়েছিল প্রথম বাংলাদেশ সরকারের আমলে। বাণিজ্য বোর্ড মুক্তিযুদ্ধ চলাকালেই ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সম্ভাবনা সম্পর্কে আলোচনা করে। বাংলাদেশ শত্রুমুক্ত হওয়ার পর সোভিয়েত বাণিজ্যিক প্রতিনিধি দল ঢাকায় আসে এবং বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বিষয়াদি নিয়ে আলোচনা করে। প্রথম বাংলাদেশ সরকারের উদ্যোগের কারণে পরবর্তীতে বাংলাদেশের পাট ও পাটজাত দ্রব্য অতি দ্রুত সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোতে রপ্তানি হতে শুরু করে। বাংলাদেশের চামড়া ও চা বিদেশে রপ্তানির বিষয়েও প্রথম সরকার উদ্যোগ নিয়েছিল।

ঢ. যুবশিবির : মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকা
ভারতে আগত শরণার্থীদের সেদেশের সরকার আশ্রয়, খাদ্য, চিকিৎসা দিচ্ছিলেন। সেজন্য প্রয়োজন ছিল বিপুলসংখ্যক তাঁবু, খাবার রেশন এবং সামান্য কিছু অর্থ সাহায্য। আমাদের সরকারের তরফ থেকেও সাধ্যমতো সবরকম সাহায্য করা হচ্ছিল। এই শরণার্থীদের মধ্যে বিরাট একটি অংশ ছিল ছাত্র, যুবক, শ্রমিক, কৃষক, বিভিন্ন দলের রাজনৈতিক কর্মী (আওয়ামী লীগ/ছাত্রলীগের সংখ্যা ছিল সর্বাধিক)। এরা আশ্রয়ের জন্য ভারতে যায়নি, গিয়েছিল দেশমাতৃকার ডাকে, দেশকে মুক্ত করার লড়াইয়ে অংশগ্রহণ করতে। তার জন্য প্রয়োজন শৃঙ্খলাবোধ, প্রশিক্ষণ এবং অস্ত্র। প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র দিলেই শেষ নয়Ñ তার চেয়ে বড় বিষয় শৃঙ্খলাবোধ থেকে নিয়মনীতির মধ্যে সশস্ত্র সংগ্রামে অংশগ্রহণ। আরেক কথায়, একটি শৃঙ্খলা-ক্রমে (Chain of Command) থেকে নির্ধারিত সমরকৌশল অবলম্বন করে যুদ্ধ।
বৈশিষ্ট্য
১.    আশ্রয়গ্রহণকারী জনসংখ্যার মধ্যে যারা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে ইচ্ছুক তাদের জন্য ভিন্ন শিবির স্থাপন।
২.    প্রথম স্তরে যে শিবিরে তাদের নেওয়া হবে সেগুলো হবে অভ্যর্থনা-শিবির (Reception Camp), এখানে তাদের দেওয়া শারীরিক শিক্ষা (Physical Training), মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধকরণ প্রশিক্ষণ (Motivation) এবং শৃঙ্খলাবোধ (Discipline).
৩.    প্রশিক্ষণ শেষে বাছাই করে যে যে রকম উপযুক্ত সেভাবে নিয়োগ করা হবে। একদল যাবে মূল বাহিনীতে (Base Training); আরেক দল যাবে নিয়মিত বাহিনীর (Regular Force)
সাথে উপযুক্ত প্রশিক্ষণ নিতে; কোনো দল যাবে তথ্য সংগ্রহ ও রেকি (Intelligence Reconaissance) করতে; অন্য আরেকটি বিশেষ দলকে, যারা ছাত্রলীগের সদস্য, তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে ছাত্র-যুব নেতাদের কমান্ডে।
৪.    ভারত-সরকারের জন্য একটি কোনো অতিরিক্ত বোঝা হবে না, বাড়তি খরচও হবে না। যে তাঁবু আর রেশন ছেলেরা পেত শরণার্থী-শিবিরে, সেগুলোকেই অন্যত্র সরিয়ে পৃথক অভ্যর্থনা-শিবিরে সরবরাহ করলেই চলবে।
৫.    উদ্বুদ্ধকরণ (Motivation) এবং শৃঙ্খলা সম্বন্ধে জ্ঞানদান ও শিক্ষা দেওয়ার দায়িত্ব আমাদের।
৬.    পরবর্তীকালে মিলিটারি প্রশিক্ষণ (অধিকাংশই গেরিলা) এবং অস্ত্র সরবরাহ করার দায়িত্ব থাকবে আমাদের ও ভারত সরকারের ওপর যৌথভাবে। সেক্টর কমান্ডাররা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করবেন। শুধুমাত্র পূর্বাঞ্চলেই জুলাই মাসে ৩৩টি যুবশিবির প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

এদের পাশাপাশি ভারতীয় বাহিনীও যুবশিবির থেকে বাছাই করে গেরিলাদের নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করত। রাজনৈতিক ভাবধারায় বিশেষভাবে উদ্বুদ্ধ এবং ছাত্রলীগের সদস্যদের নিয়ে পৃথক বাহিনী গঠন করা হয়েছিল, যার নাম ছিল মুজিব বাহিনী। এদের সংগঠক ছিলেন শেখ ফজলুল হক মণি, জিরাজুল আলম খান, তোফায়েল আহমেদ, আ. স. ম. আবদুর রব, আবদুল কুদ্দুস মাখন, শাহজাহান সিরাজ, নূরে আলম সিদ্দিকী প্রমুখ প্রখ্যাত এবং বিপ্লবী ছাত্রনেতা।

১৯৭১-এর ২৬ মার্চ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন; সেই সাথে দেশ শত্রুমুক্ত না হওয়া পর্যন্ত সশস্ত্র যুদ্ধের আহ্বান জানিয়েছিলেন। সেই ডাকে সাড়া দিয়ে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে বাংলার আপামর জনসাধারণ একটি সফল জনযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। এই সার্থক জনযুদ্ধ পরিচালিত হয়েছিল জাতির পিতার নামে, তার স্বপ্ন ও আদর্শ হৃদয়ে ধারণ করে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার দেশকে শত্রু-মুক্ত করেছিলেন ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ এবং পিতাকে মুক্ত করে এনেছিলেন ১০ জানুয়ারি ১৯৭২। এটিই ছিল আমাদের গর্বের গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সাফল্য।

পাঠকের মন্তব্য:

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না। তারকাচিহ্নযুক্ত (*) ঘরগুলো আবশ্যক।

*