বিভাগ: সম্পাদকীয়

গুজব সন্ত্রাস ও সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম

ভিত্তিহীন বা কল্পকাহিনিকে বিশ্বাসযোগ্যভাবে প্রচারের ইতিহাস দীর্ঘদিনের। তবে পরিকল্পিতভাবে গুজব ছড়িয়ে বিশেষ রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধনের ইতিহাস খুব বেশিদিনের না। অরাজনৈতিক গুজব, যেমন- পীর দরবেশ, সাধু সন্ন্যাসীর অলৌকিক ক্ষমতা, মৃত ব্যক্তির জীবন লাভ, স্বপ্নাদেশ এবং নানারকমের কুসংস্কার প্রচারের কাহিনি অনেক পুরনো। কিন্তু উনিশ ও বিশ শতকে এই উপমহাদেশে ভয়ঙ্কর সব গুজব ছড়িয়ে হিন্দু-মুসলমানদের দাঙ্গা বাধানোর কথা খুব বেশি পুরনো নয়।
১৯৬৪ সালে উপমহাদেশে ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়। ভারতের কাশ্মীরে গুজব ছড়িয়ে পড়ে কাশ্মীরের রাজধানী শ্রীনগরের ‘হযরত বাল’ মসজিদ থেকে হিন্দুরা নবী করিম হযরত মুহম্মদের ‘সংরক্ষিত চুল’ চুরি করে নিয়ে গেছে। স্বভাবত মুসলমানদের ধর্মানুভূতিতে আঘাত লাগে। লেগে যায় রক্তক্ষয়ী হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গাÑ যা ভারত ও পাকিস্তানে (পূর্ব বাংলাসহ) ছড়িয়ে পড়ে।
তবে অতীতে গুজব ছড়াত মানুষের মুখে মুখে। সেক্ষেত্রে গুজব ছড়িয়ে পড়তে কিছুটা সময় লাগত। অনেক সময় গুজবের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে বা সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার সময় পাওয়া যেত।
কিন্তু রেডিও, টেলিভিশন, টেলিফোন এবং মোবাইল ফোনের মাধ্যমে সামাজিক গণযোগাযোগমাধ্যম শক্তিশালী এবং তাৎক্ষণিক জগৎজুড়ে ছড়িয়ে দেওয়ার হাতিয়ার হয়ে ওঠার পর গুজব এখন বাতাসের গতির চেয়েও বেশি গতিতে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ছে।
গত এক দশকে ‘গুজব সন্ত্রাস’ ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। সাত-আট বছর আগে রামুতে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে স্থানীয় উগ্রপন্থি কিছু লোক প্রচার করে যে, রামুর বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের লোকজন হযরত মুহম্মদের এবং কোরআনের বিরুদ্ধে গণমাধ্যমে স্ট্যাটাস দিয়েছে। সত্য-মিথ্যা যাচাই না করেই ঐ মহলটি পরিকল্পিতভাবে রামুর সুদৃশ্য বৌদ্ধ মন্দিরে এবং বৌদ্ধদের বসতভিটায় আক্রমণ চালায়, অগ্নিসংযোগ করে সবকিছু ধুলোয় মিশিয়ে দেয়।
সাঈদীর বিচারের পর বগুড়া, গাইবান্ধা এলাকায় এবং ২০১৩ সালে হেফাজতে ইসলামের শাপলা চত্বরের সমাবেশকে কেন্দ্র করে গুজব ছড়ানোর কথা সবাই জানেন।
সম্প্রতিকালে দুটি অরাজনৈতিক ছাত্র আন্দোলনকে বিপথগামী করা এবং আন্দোলনের সুযোগে অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টির অসৎ উদ্দেশ্যে গুজব সন্ত্রাসের সৃষ্টি করা হয়। প্রথমটি ঘটে কোটাবিরোধী আন্দোলনে। রাতে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে প্রচার করা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্যের বাসায় কয়েকজন ছাত্রকে আটক করা হয়েছে। তাদের লাশ পড়ে আছে। ইত্যাদি। এই উসকানিমূলক গুজব প্রচারিত হওয়ার পর আন্দোলনকারী ছাত্র-ছাত্রীদের একটি অংশ উপাচার্যের বাসায় হামলা চালিয়ে নারকীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি করে।
সর্বশেষ ঘটনা ঘটে গত ৪ ও ৫ আগস্ট। নিরাপদ সড়কের দাবিতে স্কুল-কলেজের কোমলমতি ছাত্রদের একটি স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনকে বিভ্রান্তির পথে ঠেলে দেওয়ার উদ্দেশ্যে ঝিগাতলা মোড়ে একজন ছাত্রী উচ্চৈঃস্বরে প্রচার করে আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর ধানমন্ডিস্থ কার্যালয়ে কয়েকজন ছাত্রকে হত্যা করা হয়েছে এবং কয়েকজন ছাত্রীকে ধর্ষণ করে আটকে রাখা হয়েছে। এই গুজব সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক গণমাধ্যমে ‘লাইভ’ প্রচারে সারাদেশে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। এমনকি শহিদুল আলম নামে দৃক গ্যালারির একজন বিতর্কিত আলোকচিত্রী আল-জাজিরায় সাক্ষাৎকার দিয়ে এই মিথ্যা কথা প্রচার করে। স্বভাবতই এই গুজব সাধারণ ছাত্র-ছাত্রী এবং নাগরিকদের মধ্যে প্রচ- প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। সরকার অত্যন্ত ধৈর্যের সাথে পরিস্থিতি মোকাবিলা করে। ছাত্রলীগ সভাপতি সাধারণ ছাত্রদের মধ্যে গিয়ে এবং তাদের সভানেত্রীর ধানমন্ডিস্থ কার্যালয়ে ডেকে এনে কার্যালয় ঘুরিয়ে দেখালে উত্তেজনা প্রশমিত হয়। কিন্তু সারাদেশের কোথাও কোথাও অনাকাক্সিক্ষত অরাজকতা দেখা দেয়।
অভিজ্ঞতা বলছে, এসব গুজবের পেছনে একটি রাজনৈতিক শক্তি সুসংগঠিতভাবে এবং পরিকল্পিত উপায়ে কাজ করেছে। খুবই স্বাভাবিক যে, এর পেছনে জামাত-শিবির এবং বিএনপির মদত রয়েছে। সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের মস্তিষ্কপ্রসূত ছিল না এসব গুজব রটনা এবং নৈরাজ্য সৃষ্টির চেষ্টা। এসব হিংসাত্মক গুজবকেই দেশবাসী ‘গুজব সন্ত্রাস’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এই গুজব সন্ত্রাস ইতিবাচক কোনো আন্দোলন গড়ে তোলার পরিপন্থী। গুজব সন্ত্রাস রক্তপাত, অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর, হামলা ও সংঘাত সৃষ্টির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আমরা মনে করি, যারা উদ্দেশ্যমূলকভাবে গুজব সন্ত্রাস সৃষ্টি করছে বা করবে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা যেমন গ্রহণ করতে হবে, তেমনি এ ব্যাপারে দেশবাসীকেও সচেতন সতর্ক করতে হবে। ভবিষ্যতে গুজব সন্ত্রাসের পুনরাবৃত্তি রোধে আইনি ব্যবস্থার পাশাপাশি গণপ্রতিরোধ গড়ে তোলার কাজে এগিয়ে আসার জন্য দলমত নির্বিশেষে সর্বস্তরের জনগণের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি। গুজব সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সচেতন হোন, গুজব সন্ত্রাস প্রতিরোধ করুন।

পাঠকের মন্তব্য:

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না। তারকাচিহ্নযুক্ত (*) ঘরগুলো আবশ্যক।

*