গৌরবে উৎসবে আনন্দে মুখর বিজয় দিবস

Posted on by 0 comment

45উত্তরণ প্রতিবেদন: গত ১৬ ডিসেম্বর সকাল থেকেই যেন চিত্রশিল্পীর রঙিলা ক্যানভাস হয়ে ওঠে শহর ঢাকা। নগরের চারপাশে দেখা গেছে বর্ণময়তার দৃশ্যকাব্য। নগরবাসী পথিকের সূত্র ধরে পথে পথে বয়ে গেছে আনন্দের ফল্গুধারা। আর এমন আনন্দের উপলক্ষ্য ছিল মহান বিজয় দিবস। সেই সুবাদে বাঙালির জাতিসত্তা প্রকাশের দিনটিতে দারুণ সরব ছিল নগরের সংস্কৃতি ভুবন। সেসব আয়োজনে স্মরণ করা হয়েছে স্বাধীনতার জন্য প্রাণ সঁপে দেওয়া শহীদদের। ভালোবাসা জানানো হয়েছে পূর্ব দিগন্তে সূর্য ওঠানো নতুন দেশের স্বপ্ন আঁকা বীর মুক্তিযোদ্ধাদের। দিনভর উচ্চারিত হয়েছে জয় বাংলার গান আর বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ। দিনটিতে যেন নতুন করে খোঁজা হয়েছে স্বাধীনতা শব্দটির তাৎপর্য। স্বদেশের প্রতি ভালোবাসায় বর্ণিল হয়েছে ঢাকার পথ-প্রান্তরসহ নানা মঞ্চ কিংবা মিলনায়তন। আর এসব আয়োজনে বিশিষ্টজনদের আলোচনা, নৃত্য, গীত ও কবিতার ছন্দে, নাটকের সংলাপে কিংবা শিল্পীর মনন আশ্রিত শিল্পকর্ম প্রদর্শনীর মাধ্যমে জানানো হয়েছে জাতির সূর্য-সন্তানদের প্রতি কৃতজ্ঞতা।

সাংস্কৃতিক জোটের বিজয় উৎসব
বিজয় দিবস উপলক্ষে রাজধানীর আট মঞ্চে সপ্তাহব্যাপী বিজয় উৎসবের আয়োজন করেছে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট। সে আয়োজনের অংশ হিসেবে ১৬ ডিসেম্বর সকালে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে বের হয় বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা। এ শোভাযাত্রার মূল প্রতিপাদ্য ছিল ‘৭ মার্চ মুক্তি ও স্বাধীনতার ডাক বাংলার ঘরে ঘরে/৭ মার্চ সম্পদ আজ বিশ্ব-মানবের তরে’। শোভাযাত্রার উদ্বোধন করেন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব সৈয়দ হাসান ইমাম ও রামেন্দু মজুমদার।
শোভাযাত্রা-পূর্ব বক্তৃতায় জোট নেতৃবৃন্দ বলেন, আমরা স্বাধীন হয়েছি। কিন্তু এখনও পরাধীনতা ও সাম্প্রদায়িকতা থেকে মুক্ত হইনি। অর্থনৈতিক বৈষম্য থেকেও মুক্ত হয়নি। অসম্পূর্ণ যে কাজগুলো আছে তা আমাদের পূর্ণ করতে হবে। আমাদের নতুন প্রজন্ম মুক্তিযোদ্ধাদের স্বপ্ন পূরণ করবে।
শোভাযাত্রায় দেশীয় বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে নেচে-গেয়ে আনন্দ-উচ্ছ্বাসে মেতে ওঠেন জোটভুক্ত শতাধিক সংগঠনে কয়েক হাজার সংস্কৃতিকর্মী ও সাধারণ মানুষ। সংস্কৃতিকর্মীদের অংশগ্রহণে স্বতঃস্ফূর্ত হয় শোভাযাত্রা। বিজয়ের আনন্দ ও চেতনা ছড়িয়ে দিতে নাটক, গান, আবৃত্তি ও নৃত্যাঙ্গনের সাথে সংশ্লিষ্টরা অংশ নেয় শোভাযাত্রায়। শোভাযাত্রা জুড়ে ছিল জাতীয় পতাকা ও একাত্তরের ৭ মার্চের বঙ্গবন্ধুর ভাষণের পোস্টার। ছিল বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ থেকে ঐতিহাসিক ২৪টি বাণী সম্বলিত ফেস্টুন। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে বের হয়ে শোভাযাত্রাটি শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনে এসে শেষ হয়।
মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর
বিজয় দিবস উপলক্ষে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর আয়োজিত সপ্তাহব্যাপী উৎসবের শেষ দিন ছিল বিজয় দিবস। এদিন সকালে আগারগাঁওয়ের জাদুঘর প্রাঙ্গণে জাতীয় সংগীত পরিবেশন ও জাতীয় পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে শুরু হয় কার্যক্রম। এরপর অনুষ্ঠিত হয় শিশু-কিশোরদের অংশগ্রহণে সাংস্কৃতিক পরিবেশনা।

শিল্পকলা একাডেমি
বিজয় দিবসের সন্ধ্যায় একাডেমির জাতীয় নাট্যশালা মিলনায়তনে ছিল আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকীর অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রবীণ সাংবাদিক ও স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শব্দসৈনিক কামাল লোহানী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদের ডিন ড. আবু মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন। সাংস্কৃতিক পর্বে প্রখ্যাত শিল্পীদের পাশাপাশি প্রতিশ্রুতিশীল শিল্পীরা দেশের গান, নাচ ও আবৃত্তি পরিবেশন করেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগের শিক্ষার্থীরা এক ব্যতিক্রমধর্মী অনুষ্ঠান আয়োজন করে। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে যেভাবে আত্মসমর্পণ করেছিল ঠিক সেভাবেই প্রতীকী আত্মসমর্পণের আয়োজন করা হয় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’ কবিতা অবলম্বনে একটি নাটক পরিবেশন করে যশোরের একটি নাট্য দল। অনুষ্ঠান শেষে উপস্থিত মুক্তিযোদ্ধারা নতুন প্রজন্মের হাতে জাতীয় পতাকা তুলে দেন।

বাংলা একাডেমি
বিজয় দিবসের বিকেলে একাডেমির নজরুল মঞ্চে প্রবন্ধ পাঠ, আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে বাংলা একাডেমি। এতে মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক পটভূমি, বিজয় ও বিজয়ের মহানায়ক শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক হারুন-অর-রশিদ। স্বাগত বক্তব্য দেন একাডেমির ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন। আলোচনায় অংশ নেন রামেন্দু মজুমদার, খুশী কবির ও নাদীম কাদির। সভাপতিত্ব করেন একাডেমির সভাপতি ইমেরিটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামান।

শিশু একাডেমি
বিজয় দিবসের বিকেলে ‘আমার ভাবনায় ৭ মার্চ’ শীর্ষক শিশুদের আঁকা চিত্র প্রদর্শনী, আলোচনা, পুরস্কার বিতরণ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে শিশু একাডেমি। এ অনুষ্ঠানে শেখ রাসেল আর্ট গ্যালারি উদ্বোধন করেন মহিলা ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি। সভাপতিত্ব করেন একাডেমির চেয়ারম্যান কথাশিল্পী সেলিনা হোসেন। স্বাগত বক্তব্য দেন একাডেমির পরিচালক আনজীর লিটন।
ছায়ানট
ছায়ানটের আয়োজনে বসেছিল দেশের গানের আসর। এর যৌথ আয়োজক ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠ সবাই জাতীয় পতাকার লাল-সবুজের পোশাকে রাঙিয়ে তুলেছিল। সবাই একসাথে গেয়ে ওঠে ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’। শিল্পীরা আসেন লাল শাড়ি আর পাঞ্জাবি গায়ে। দর্শকরা এসেছিলেন সবুজ শাড়ি আর পাঞ্জাবি পরে। বেলা পৌনে ৪টায় অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ আখতারুজ্জামান, ছায়ানটের সভাপতি সন্জীদা খাতুন ও দীপ্ত টেলিভিশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী জাহেদুল হাসান।
মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর। আগারগাঁওয়ের মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে ছিল শিশু-কিশোরদের পরিবেশনায় বর্ণাঢ্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এতে অংশ নেয় দেশবরেণ্য শিল্পীদের পাশাপাশি রাজধানীর কয়েকটি স্কুলের শিক্ষার্থী শিল্পীরা।

কেন্দ্রীয় কচি-কাঁচার মেলা
সেগুনবাগিচার কচি-কাঁচা মিলনায়তনে আলোচনা সভা ও আনন্দ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে কচি-কাঁচার মেলা। অনুষ্ঠানে শিশু-কিশোরদের মুক্তিযুদ্ধের বীরত্বগাথা শোনান স্থপতি মোবাশ্বের হোসেন। সভাপতিত্ব করেন মেলার ক্ষুদে সদস্য আদিবা কিবরিয়া।

বাংলাদেশ শর্ট ফিল্ম সোসাইটি
১৫ ডিসেম্বর বিকেলে শহীদ বুদ্ধিজীবী ও মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করেছে বাংলাদেশ শর্ট ফিল্ম সোসাইটি। রাজধানীর শাহবাগের আজিজ সুপার মার্কেটে বাংলাদেশ ফিল্ম সেন্টার অডিটোরিয়ামে প্রদীপ প্রজ্বলনের মাধ্যমে প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন ফোরামের উপদেষ্টা মনজারে হাসিন মুরাদ। প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি বলেন, যখনই মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতির চেষ্টা করা হয়েছে তখনই সংস্কৃতিকর্মীরা সিনেমাকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে প্রতিবাদ করেছে। পরে জাহিদুর রহিম অঞ্জন পরিচালিত মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্র মেঘমল্লার এবং তারেক মাসুদ ও ক্যাথরিন মাসুদ নির্মিত মুক্তির গান প্রদর্শিত হয়। বিজয় দিবসের দিনে দেখানো হয় ইয়াসমিন কবিরের স্বাধীনতা, নাসির উদ্দিন ইউসুফের গেরিলা এবং মানজারে হাসিন নির্মিত এখনও ’৭১।
বিজয়ের ৪৬ বছর উদযাপনে দিনটি রাজধানীর সংস্কৃতি অঙ্গন ছিল আনন্দমুখর। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, সাভারের স্মৃতিসৌধ অভিমুখে ছিল মানুষের স্রোত। শিশু-কিশোররা ছুটেছে আগারগাঁওয়ের মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে। অনেকে ভিড় করেন ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরে। জাতীয় জাদুঘরের দ্বার ছিল সবার জন্য উন্মুক্ত। নগরীর মঞ্চে মঞ্চে ছিল একাত্তরের প্রেরণা সঞ্চারী সংগীত, দেশাত্মবোধক গান, নাচসহ নানা আয়োজন।

Ñ সরদার মাহামুদ হাসান রুবেল

Category:

Leave a Reply