গ্রীষ্মের ফলের পুষ্টিগুণ

Posted on by 0 comment

রাজিয়া সুলতানা

আনারস
PM2আনারস খুবই রসালো ও জনপ্রিয় একটি ফল। উৎপত্তিস্থল ব্রাজিল। ভারতবর্ষে আগমন ১৫৪৮ খ্রিষ্টাব্দে। বর্তমানে হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জ এর প্রধান উৎপাদন স্থান। গাছটি তেমন দীর্ঘজীবী নয়। খাটো কা-ে পাতা গুচ্ছবদ্ধ। গোটা একটি মঞ্জুরি ১০০-২০০ ফুল। সম্পূর্ণ মঞ্জুরিটিই মাংসল যৌগ ফলে রূপান্তরিত হয়। ফলের ওজন প্রায় ০.৫-৫ কেজি। পরিপক্ব ফল হতে সময় লাগে পাঁচ-ছয় মাস। সারা বছরই আনারস পাওয়া যায়। তবে গ্রীষ্মে এর আধিক্য বেশি।
পুষ্টিগুণ
পরিপক্ব ফলে রয়েছেÑ
®    প্রায় ১৪ শতাংশ চিনি।
®    প্রোটিন।
®    জারক উৎসেচক ব্রমলিন।
®    পর্যাপ্ত সাইট্রিক এসিড।
®    ভিটামিন ‘এ’ ও ‘বি’।

তাজা ফল সুস্বাদু। জ্যাম, জেলি ছাড়াও টিনে ভরা রস ও টুকরা ফল বাজারজাত হয়।

কামরাঙা
PM3কামরাঙা টক-মিষ্টি, সুস্বাদু ফল। কামরাঙা সম্ভবত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার (মালয় উপদ্বীপ থেকে ইন্দোনেশিয়ায়) উৎপন্ন ফল। এটি চীন, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া ও ভারতসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম জনপ্রিয় ফল। বাংলাদেশে বেশির ভাগ কামরাঙা বরিশাল বিভাগে ফললেও ইদানীং অন্যান্য এলাকায়ও এর চাষ হচ্ছে।

পুষ্টিগুণ
পুষ্টিগুণ বিচারে কামরাঙা উচ্চমানসম্পন্ন। কারণ এ ফলটি প্রচুর পরিমাণ ভিটামিন ‘সি’-সমৃদ্ধ। যা আমাদের দেহে তৈরি হয় না। কিন্তু অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। তাছাড়া ফলটি নানা খনিজ পদার্থ এবং ‘এ’, ‘বি’ ভিটামিনে ভরপুর। তবে কিছু কিছু গবেষণায় উঠে এসেছে কামরাঙা কিডনি রোগীদের জন্য খুবই ক্ষতিকারক।

সফেদা
PMএক প্রকার মিষ্টি ফল। সফেদা গাছ বহুবর্ষজীবী, চিরসবুজ বৃক্ষ। এর আদি নিবাস মেক্সিকোর দক্ষিণাংশ, মধ্য আমেরিকা এবং ক্যারিবীয় অঞ্চল। পেটেনেস ম্যানগ্রোভ ইকো-অঞ্চলের উপকূলীয় ইউকাতানে এই গাছ প্রাকৃতিকভাবে বিস্তার লাভ করে। স্প্যানিশ উপনিবেশ আমলে এটি ফিলিপাইনে নেওয়া হয়েছিল। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান ও মেক্সিকোতে এর ব্যাপক উৎপাদন হয়।
পুষ্টিগুণ
প্রতি ১০০ গ্রাম সফেদায়Ñ
®    ৮৩ কিলো ক্যালরি খাদ্য শক্তি।
®    ০.৭ গ্রাম প্রোটিন।
®    ২১.৪ গ্রাম কার্বোহাইড্রেট।
®    ০.০২ মিলিগ্রাম ভিটামিন বি-১।
®    ০.০৩ মিলিগ্রাম ভিটামিন বি-২।
®    ৬ মিলিগ্রাম ভিটামিন ‘সি’।
®    ০.৫ গ্রাম খনিজ।
®    ২৮ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম।
®    ৯৭ মাইক্রোগ্রাম ক্যারোটিন।

সফেদায় রয়েছে প্রচুর পরিমাণে গ্লুকোজ, যা তাৎক্ষণিকভাবে শক্তি দেয়। ক্যালসিয়াম ও লৌহ হাড় ও দাঁত সুস্থ রাখে। পেটের নানান সমস্যা সমাধানের পাশাপাশি গ্যাস্ট্রিক ও কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা দূর করতে সাহায্য করে সফেদা। ক্যারোটিন চোখের সুস্থতা রক্ষা করে ও রাতকানা রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি কমায়। ওজন কমাতে সাহায্য করে। নিয়মিত খেলে স্থূলতাজনিত সমস্যা সমাধান হয়। সফেদা মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে। নিয়মিত খেতে পারলে অনিদ্রা, উদ্বেগ এবং বিষণœতা নিয়ন্ত্রণ হয়।

জামরুল
PM4হালকা সবুজ রঙের মিষ্টি ফল। লাল রঙের জামরুলও পাওয়া যায়। এই ফলটির আর একটি নাম হলো আমরুজ। দেশের কোনো কোনো অঞ্চলে সাদা জাম অথবা ম-ল হিসেবেও পরিচিত। এটি বাংলাদেশ, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, শ্রীলংকা, থাইল্যান্ড ইত্যাদি দেশে জন্মে।

পুষ্টিগুণ
প্রতি ১০০ গ্রাম জামরুলেÑ
®    জলীয় ৮৯.১ শতাংশ।
®    ক্যারোটিন আছে ১৪১ মাইক্রোগ্রাম।
®    ভিটামিন বি-১ আছে ০.১মিলিগ্রাম।
®    ভিটামিন বি-২ আছে ০.৫ মিলিগ্রাম।
®    ভিটামিন ‘সি’ ৩ মিলিগ্রাম।
®    ক্যালরি শক্তি ৫৬।
®    প্রোটিন ০.৫ থেকে ০.৭ গ্রাম।
®    কার্বোহাইড্রেট ১৪.২ গ্রাম।
®    খাদ্যআঁশ ১.১ থেকে ১.৯ গ্রাম।
®    ফ্যাট ০.২ থেকে ০.৩ গ্রাম।
®    ক্যালসিয়াম ২৯ থেকে ৪৫.২ মিলিগ্রাম।
®    ম্যাগনেসিয়াম ৪ মিলিগ্রাম।
®    ফসফরাস ১১.৭ থেকে ৩০ মিলিগ্রাম।
®    আয়রন ০.৪৫ থেকে ১.২ মিলিগ্রাম।
®    সোডিয়াম ৩৪.১ মিলিগ্রাম।
®    পটাশিয়াম ৩৪.১ মিলিগ্রাম।
®    কপার ০.০১ মিলিগ্রাম।
®    সালফার ১৩ মিলিগ্রাম।
®    ক্লোরিন ৪ মিলিগ্রাম।
®    আমিষ ০.৭ গ্রাম।
®    চর্বি ০.২ গ্রাম।
®    খনিজ পদার্থ ০.৩ গ্রাম।
®    খাদ্যশক্তি রয়েছে ৩৯ কিলোক্যালরি।

সহজলভ্য জামরুল স্বাস্থ্যের জন্য খুবই উপকারী। জামরুলের উচ্চমাত্রার ফাইবার হজমে দারুণ উপকারী। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং সুস্থ মানুষের দেহে ডায়াবেটিস বাসা বাঁধা ঠেকিয়ে দিতে দক্ষ জামরুল। জামরুলে রয়েছে ক্যানসার প্রতিরোধের উপাদান। ফাইবার ও পুষ্টি উপাদানের সম্মিলিত উপস্থিতি দেহের কোলেস্টেরলের মাত্রা কমাতে দারুণ কার্যকরি। হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক আর করোনারি রোগের ঝুঁকিও কমাতে জুড়ি নেই জামরুলের। মস্তিষ্ক ও লিভারের সুরক্ষায় জামরুল টনিক হিসেবে কাজ করে। ত্বকে ভাইরাস সংক্রমণ ঠেকায় এই ফল। লিভার আর কিডনির বিষ দূর করে বিপাকক্রিয়া সুষ্ঠু রাখতে যেন এক অব্যর্থ টোটকা এই জামরুল।

পেঁপে
PM5পেঁপে এমন একটি ফল, যা কাঁচা তথা সবুজ অবস্থায় সবজি হিসেবে এবং পাকা অবস্থায় ফল হিসেবে খাওয়া হয়। এর অনেক ভেষজ গুণও রয়েছে। এর ইউনানী নাম পাপিতা, আরানড খরবুজা। আয়ুর্বেদিক নাম অমৃততুম্বী। পেঁপে বাংলাদেশ, ভারত, আমেরিকা, ব্রাজিল ইত্যাদি দেশে হয়।
পুষ্টিগুণ
প্রতি ১০০ গ্রাম পাকা পেঁপেতে পাওয়া যায়Ñ
®    আমিষ ০.৬ গ্রাম।
®    স্নেহ ০.১ গ্রাম।
®    খনিজ পদার্থ ০.৫ গ্রাম।
®    ফাইবার ০.৮ গ্রাম।
®    শর্করা ৭.২ গ্রাম।
®    ভিটামিন ‘সি’ ৫৭ মিলিগ্রাম।
®    সোডিয়াম ৬.০ মিলিগ্রাম।
®    পটাসিয়াম ৬৯ মিলিগ্রাম।
®    আয়রন ০.৫ মিলিগ্রাম।
®    খাদ্যশক্তি ৩২ কিলোক্যালরি।

সুমিষ্ট পাকা পেঁপে রং, সুবাস আর স্বাদে অতুলনীয়। পেঁপে খেলে ওজন কমে, ত্বক পরিষ্কার হয়। অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট আর নানা উপকারী উপাদানে ভরপুর পেঁপে খেলে একদিকে স্বাস্থ্য যেমন ভালো থাকে, তেমনি চুল আর ত্বকের জন্যও উপকারী। খাবারে তাই পেঁপে রাখাটা জরুরি। এছাড়া এর যে এনজাইম থাকে, তা হজমে সহায়তা করে। পেঁপে ডায়াবেটিসে উপকারী। কারণ ডায়াবেটিস প্রতিরোধক উপাদান আছে পেঁপেতে। পেঁপেতে আছে ক্যারোটিনাইডস নামের উপাদান, যা চোখের জন্য উপকারী। এছাড়া চোখের মিউকাস মেমব্রেনকে সবল করতে ও ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করতে যে ধরনের উপাদান দরকার, পেঁপেতে তা অধিক পরিমাণে আছে। বিশেষ করে বেটা ক্যারোটিন, জিয়াক্সনাথিন ও লুটেইনের মতো উপাদান কোলন ও প্রোস্টেট ক্যানসার প্রতিরোধে এটি উপকারী।
আমাদের সব দেশি ফলই অত্যন্ত পুষ্টিগুণসম্পন্ন। সব ফলের পুষ্টির কথা বলে শেষ করা যাবে না। এটা প্রকৃতির অপার দান। তবে প্রয়োজন জনসচেতনতার। জনগণ যদি ফলের সঠিক পুষ্টিগুণ জানে এবং এদের প্রয়োগ নিশ্চিত করেÑ তবে তারা আর ফলজনিত অপুষ্টিতে ভুগবে না।
সর্বোপরি বলা যায়, বাংলাদেশে পুষ্টি সমস্যা সমাধান, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার জন্য গ্রীষ্মের ফল তথা ফল বৃক্ষের কোনো তুলনা হয় না। ফল গাছ সংরক্ষণ, সুষম বণ্টন, এদের উন্নতি সাধন সচেতন নাগরিক হিসেবে আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।

লেখক : শিক্ষক, পিএইচডি গবেষক, প্ল্যান্ট প্যাথলজি, শেরে বাংলা কৃষি ইউনিভার্সিটি, শেরে বাংলা নগর, ঢাকা-১১০০
ৎধুরধংঁষঃধহধ.ংধঁ৫২@মসধরষ.পড়স

Category:

Leave a Reply