বিভাগ: অন্যান্য

চাইল্ড পার্লামেন্টের অভিমত

শিশু সুরক্ষায় রাজনৈতিক অঙ্গীকার : প্রেক্ষিত বাংলাদেশ

শিশু সুরক্ষায় রাজনৈতিক অঙ্গীকার : প্রেক্ষিত বাংলাদেশ

উত্তরণ ডেস্ক: বাংলাদেশে শিশু অধিকার প্রতিষ্ঠায় জাতীয় পর্যায়ে শিশুদের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন ন্যাশনাল চিলড্রেন’স টাস্কফোর্স বা এনসিটিএফ’র অ্যাডভোকেসি উইং হলো চাইল্ড পার্লামেন্ট। ২০০৩ সাল থেকে এটি নিয়মিত কাজ করছে।
বাংলাদেশ শিশু একাডেমির সহযোগিতায় সারাদেশের ৬৪ জেলায় এনসিটিএফ’র কার্যক্রম পরিচালিত হয়। বাংলাদেশে শিশু অধিকার প্রতিষ্ঠা ও সংরক্ষণে এনসিটিএফ জোরালোভাবে কাজ করে যাচ্ছে। চাইল্ড পার্লামেন্ট আয়োজনে আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে আন্তর্জাতিক সংস্থা সেভ দ্য চিলড্রেন ইন্টারন্যাশনাল এবং প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ।
স্বাস্থ্য, সুরক্ষা, পুষ্টি ইত্যাদি বিষয়ে এ পর্যন্ত চাইল্ড পার্লামেন্টের মোট ১৭টি অধিবেশন হয়েছে। গত ২৫ অক্টোবর ১৭তম অধিবেশনটি অনুষ্ঠিত হলো ঢাকায় গুলশানের একটি হোটেলে। এবারের মূল বিষয় ছিল ‘শিশু সুরক্ষায় রাজনৈতিক অঙ্গীকার’। এই আয়োজনে অংশ নেয় দেশের ৬৪ জেলার চাইল্ড পার্লামেন্ট সদস্য এবং ১৬টি সুবিধাবঞ্চিত অঞ্চলের শিশুসহ মোট ৮৭ শিশু প্রতিনিধি।
এবারের অধিবেশনে উপস্থিত ছিলেন বর্তমান সরকারের সমাজকল্যাণ মন্ত্রী এবং ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন এমপি, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাবেক প্রেসিডিয়াম সদস্য নূহ-উল-আলম লেনিন, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য এসএম কামাল হোসেন, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. মঈন খান, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের যুগ্ম মহাসচিব মুয়াজ্জেম হোসেন আলাল এবং জাতীয় পার্টির সভাপতিম-লীর সদস্য ব্যারিস্টার শামিম হায়দার পাটোয়ারী।
আরও উপস্থিত ছিলেন প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ’র কান্ট্রি ডিরেক্টর ওরলা এ মারফী এবং চাইল্ড রাইটস অ্যান্ড প্রোটেকশন বিভাগের প্রধান তানিয়া নুসরাত জামান, সেভ দ্য চিলড্রেনের কান্ট্রি ডিরেক্টর মার্ক পিয়ার্স ও ভারপ্রাপ্ত ডেপুটি কান্ট্রি ডিরেক্টর ডা. শামীম জাহান।
শিশু সুরক্ষায় রাজনৈতিক অঙ্গীকার চাই
* শিশুদের প্রতি রাষ্ট্রের দায়িত্ব ও কর্তব্যের কথা স্মরণ রেখেই, শিশু অধিকার ও শিশু সুরক্ষার নিশ্চয়তা দিয়েছে বাংলাদেশের সংবিধান।
* জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদে স্বাক্ষর করে শিশুর অধিকার নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করেছে বাংলাদেশ।
* শিশু আইন ২০১৩, যা পরবর্তীতে সংশোধিত শিশু আইন ২০১৮ প্রণয়ন করে এই আইনে শিশুদের জন্য সর্বোচ্চ সুরক্ষা সুনিশ্চিত করেছে বাংলাদেশ। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে, আইন ও বাস্তবতার মধ্যে দেখা যাচ্ছে বিস্তর ফারাক। আইনের খাতায় শিশুরা সুরক্ষিত হলেও প্রকৃতপক্ষে তারা বাস করছে নানাবিধ ঝুঁকিপূর্ণ বাস্তবতায়।
সামগ্রিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও পর্যালোচনা করে চাইল্ড পার্লামেন্টের সদস্যরা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। শিশু হত্যা, ধর্ষণ, সকল প্রকার যৌন নিপীড়ন, গণপরিবহনে হয়রানি, শিশুদের প্রতি শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, বাল্যবিবাহ, রাজনৈতিক কর্মকা-ে শিশুদের ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবহারের বিরুদ্ধ সুস্পষ্ট অবস্থান নিতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোকে অঙ্গীকারাবদ্ধ হতে তাগিদ দিচ্ছে চাইল্ড পার্লামেন্ট। আর এ লক্ষ্যেই চাইল্ড পার্লামেন্টের এবারের অধিবেশনে উঠে এসেছে সুস্পষ্ট কিছু সুপারিশ। যথাÑ
* শিশু হত্যার সঙ্গে জড়িত অপরাধীদের দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে।
* গণপরিবহনে শিশুদের ভোগান্তি কমাতে এবং রাস্তাঘাটে তাদের যৌন নিপীড়ন থেকে রক্ষা করতে বিদ্যালয়ে শিশুদের জন্য পৃথক পরিবহনের ব্যবস্থা করতে হবে।
* শিশুর প্রতি সহিংসতা বন্ধে শিশু হেল্পলাইন ১০৯ কার্যকর করতে অর্থ বরাদ্দ বাড়াতে হবে।
* শিশুদের ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন বন্ধে আইনের বাস্তবায়ন ও মনিটরিং জোরদার করতে হবে।
* সুরক্ষার দিক থেকে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে সুবিধাবঞ্চিত শিশুরা। যারা পাহাড় অঞ্চলে, যৌন পল্লীতে, চরে, হাওরে এবং পথে বাস করে তাদের অবস্থা আরও ভয়াবহ। তাদের সুরক্ষার আওতায় তো আসছেই না; বরং প্রতিনিয়তই লঙ্ঘিত হচ্ছে তাদের মানবাধিকার। তাই সুরক্ষার পাশাপাশি সুবিধাবঞ্চিতদের জন্য সব অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।
* প্রতিবন্ধী শিশুরাও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের মধ্যে একটি বিশেষ অংশ। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও শিশু সুরক্ষার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধীবান্ধব অবকাঠামো না থাকার ফলে তাদের সুরক্ষা ব্যাহত হচ্ছে। তাই প্রতিবন্ধী শিশু, পার্বত্য এলাকার শিশু, পথশিশু, যৌনপল্লীর শিশু এবং ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিশুদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও তার বাস্তবায়ন করতে হবে।
* শিশুদের রাজনৈতিক কর্মকা-ে ব্যবহার না করার প্রসঙ্গে আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী দলগুলোকে তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকার করতে হবে।
* জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থাকে কার্যকর ও শক্তিশালী করার জন্য দায়িত্ববাহকদের জবাবদিহিতার ক্ষেত্রগুলোকে কার্যকর করতে হবে এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ করতে হবে।
* শিশু আইন বাস্তবায়নের জন্য বিধিমালা প্রণয়ন করতে হবে।

শিশুর সুরক্ষা, বিকাশ, স্বাধীনতা ও অংশীদারিত্বকে নিশ্চিত করতে আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারে সুস্পষ্ট দিক-নির্দেশনা দেখার দাবি জানাচ্ছে চাইল্ড পার্লামেন্ট।

পাঠকের মন্তব্য:

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না। তারকাচিহ্নযুক্ত (*) ঘরগুলো আবশ্যক।

*