বিভাগ: উত্তরণ ডেস্ক

চীন ও ভারতকে পেছনে ফেলে ২০৩০ সালে সবচেয়ে বেশি এগোবে বাংলাদেশের অর্থনীতি

PMউত্তরণ ডেস্ক: বাংলাদেশের অর্থনীতির অনেক বড় সম্ভাবনা দেখছে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ব্যাংকিং ও আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান হংকং অ্যান্ড সাংহাই ব্যাংকিং কর্পোরেশন-এইচএসবিসি। প্রতিষ্ঠানটির এক প্রতিবেদনে বিশ্বে ২০৩০ সাল নাগাদ যেসব দেশের অর্থনীতির আকার দ্রুত বাড়বে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে সেই তালিকায় বাংলাদেশ রয়েছে সবার ওপরে। এই পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশকে ‘বিগেস্ট রাইজার্স বা সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির দেশ’ হিসেবে অভিহিত করেছে এইচএসবিসি গ্লোবাল রিসার্চ।
এইচএসবিসি বলেছে, বিশ্বের উন্নত, উন্নয়নশীল ও উদীয়মান ৭৫টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের জিডিপি সবচেয়ে বেশি হারে বাড়বে। জিডিপির আকার বিবেচনায় বর্তমানে বিশ্বে বাংলাদেশের অর্থনীতি ৪২তম। ২০৩০ সালে ১৬ ধাপ এগিয়ে বাংলাদেশ উঠে আসবে ২৬তম অবস্থানে। এখন এগিয়ে থাকা ফিলিপাইন, পাকিস্তান, মালয়েশিয়াসহ অনেক দেশকে ২০৩০ সালে ছাড়িয়ে যাবে বাংলাদেশ। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৮ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত পরবর্তী পাঁচ বছরে বাংলাদেশের গড় প্রবৃদ্ধি হবে ৭ দশমিক ৩ শতাংশ হারে। তার পরের পাঁচ বছর অর্থাৎ ২০২৩ থেকে ২০২৮ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের গড় প্রবৃদ্ধি হবে ৭ শতাংশ হারে। সব মিলিয়ে আগামী এক যুগে বাংলাদেশে গড়ে ৭ দশমিক ১ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি হবে। বাংলাদেশের মতো এত বেশি হারে প্রবৃদ্ধি আর কোনো দেশের হবে না।
সম্প্রতি প্রকাশিত ‘২০৩০ সালের বিশ্ব : ৭৫টি দেশের জন্য এইচএসবিসির প্রক্ষেপণ’ নামে ওই প্রতিবেদনে দেশগুলোর জনশক্তির আকার, মানবসম্পদ উন্নয়নে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় নেওয়া পদক্ষেপ, রাজনীতি, বাজার উন্মুক্তকরণ ও প্রযুক্তির ব্যবহারকে কোন দেশ কতটা প্রাধান্য দিয়েছে তা বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বৈশ্বিক পরিবর্তনগুলোকেও গুরুত্বের সঙ্গে মূল্যায়ন করা হয়েছে। এর সঙ্গে দেশগুলোর মাথাপিছু জিডিপি, কর্মক্ষম জনশক্তি, মোবাইল ফোন ব্যবহার, স্কুলে অন্তর্ভুক্তি, মানব উন্নয়ন সূচক, রাজনৈতিক অধিকার ও বাণিজ্য উদারীকরণ পরিস্থিতি বিবেচনা করা হয়েছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে, ২০১৭-১৮ অর্থবছর শেষে চলতি মূল্যে বাংলাদেশের জিডিপির আকার দাঁড়িয়েছে ২২ লাখ ৫০ হাজার ৪৭৯ কোটি টাকা বা ২৭০ বিলিয়ন ডলার। ওই অর্থবছরে ৭ দশমিক ৮৬ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি হয়েছে। চলতি অর্থবছরে সরকার ৭ দশমিক ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এইচএসবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগামী ১২ বছরে বাংলাদেশের অর্থনীতি বৈশ্বিক র‌্যাংকিংয়ে ১৬ ধাপ এগিয়ে ২৬তম অবস্থানে আসবে। ফিলিপাইন ১১ ধাপ এগিয়ে বর্তমানের ৩৮তম অবস্থান থেকে ২৭তম অবস্থানে উঠে আসবে। পাকিস্তান ১০ ধাপ এগিয়ে ৪০ থেকে ৩০-এ উঠবে। ভিয়েতনাম ৮ ধাপ এগিয়ে ৪৭ থেকে চলে আসবে ৩৯-এ। আর মালয়েশিয়া ৫ ধাপ এগিয়ে ৩৪ থেকে-২৯-এ উঠে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যদিকে বিশ্বের শীর্ষ পাঁচ অর্থনীতিতেও আসবে পরিবর্তন। ২০৩০ সালে বর্তমানে দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা চীন শীর্ষে উঠে আসবে। শীর্ষে থাকা যুক্তরাষ্ট্র দ্বিতীয়তে নামবে। সপ্তম অবস্থান থেকে তৃতীয় অবস্থানে চলে আসবে ভারত। তৃতীয় থেকে চতুর্থ অবস্থানে চলে যাবে জাপান। জার্মানি চতুর্থ অবস্থান থেকে পঞ্চম স্থানে গিয়ে দাঁড়াবে।
এইচএসবিসির এই পূর্বাভাসকে যথাযথ বলে মনে করেন পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য শামসুল আলম। বাংলাদেশ সরকার যে যথাযথ পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে তা এই প্রতিবেদনের তথ্যে প্রতীয়মান হয়েছে বলে মনে করেন তিনি। শামসুল আলম বলেন, সরকার ২০৪১ সালে উন্নত দেশ হওয়া এবং ২০৩০ সালের মধ্যে অতি দারিদ্র্য শূন্যে নামিয়ে আনার লক্ষ্যে কাজ করছে। সেভাবেই পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা ও প্রেক্ষিত পরিকল্পনা সাজানো হয়েছে। এইচএসবিসি-সহ অন্যান্য বৈশ্বিক সংস্থা বাংলাদেশের যে সম্ভাবনার কথা বলছে সেগুলো সরকারের লক্ষ্যের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ। তিনি বলেন, এই উন্নয়ন লক্ষ্য অর্জনের জন্য জ্বালানি, যোগাযোগ, শিক্ষা, তথ্যপ্রযুক্তি খাতে ব্যাপক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের লিড ইকোনমিস্ট জাহিদ হোসেন এ বিষয়ে বলেন, বিভিন্ন কারণেই বাংলাদেশের সম্ভাবনা রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ভৌগোলিক অবস্থান। ভৌগোলিক দিক থেকে বাংলাদেশ অনেক সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। চীন, ভারতের মতো উদীয়মান অর্থনীতির দেশ বাংলাদেশের পাশে। এছাড়া বিশ্বের ৬০ শতাংশ ভোক্তার বিশাল বাজার রয়েছে বাংলাদেশের চারপাশে। এই বাজার যেসব বিনিয়োগকারী ধরতে চান তাদের কাছে কৌশলগত বিবেচনায় বাংলাদেশ অনেক আকর্ষণীয়। পাশাপাশি বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীরা অংশীদারি করতে পারে বাংলাদেশে সেই ধরনের দক্ষ উদ্যোক্তা গড়ে উঠেছে। এছাড়া সাগরপথে যোগাযোগ, ব্যাপক কর্মক্ষম জনশক্তি বাংলাদেশের সম্ভাবনা। তবে এসব সম্ভাবনা কাজে লাগাতে ব্যবসা করার নিয়মকানুন, বন্দর, যোগাযোগ, জ্বালানি, নগরায়ণ, শিক্ষার মানে যে অগ্রগতি আনা দরকার সেগুলো সময়মতো করতে হবে। তাহলেই এইচএসবিসির এই পূর্বাভাস বাস্তবে রূপ নেবে।
সম্ভাবনার পাশাপাশি এইচএসবিসির গবেষণায় বাংলাদেশসহ অন্যান্য দেশের সামনে কিছু চ্যালেঞ্জও উঠে এসেছে। এসব চ্যালেঞ্জের মধ্যে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক অনেক ঘটনা সম্পৃক্ত। তবে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবেলা। এছাড়া বৈষম্যকেও একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

পাঠকের মন্তব্য:

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না। তারকাচিহ্নযুক্ত (*) ঘরগুলো আবশ্যক।

*