বিভাগ: সম্পাদকীয়

জঙ্গিবাদ ও ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহার

ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহার থেকেই উগ্রপন্থা ও ধর্মীয় মৌলবাদের সৃষ্টি। প্রাচীন ও মধ্যযুগেও ধর্ম নিয়ে হানাহানি, রক্তপাত এবং ধ্বংসযজ্ঞ কম হয়নি। ভিন্ন ধর্মমতের প্রতি অসহিষ্ণুতা এবং জোর-জবরদস্তির কারণে সেমেটিক ৩টি ধর্মের প্রবর্তক, ইসলামের দৃষ্টিতে যারা ছিলেন আল্লাহর প্রেরিত পুরুষ তথা নবী, তাদের কম মূল্য দিতে হয়নি। হযরত মুসা (আ.) (মোজেস) ইহুদি ধর্মের প্রবর্তক। তার মাধ্যমে আসমানি কিতাব তাওরাত বা ওল্ড টেস্টামেন্ট, হযরত ঈসা (আ.) (যিশু খ্রিষ্ট)-এর মাধ্যমে ইঞ্জিল শরীফ বা বাইবেল তথা নিউ টেস্টামেন্ট এবং শেষ নবী হযরত মুহম্মদ (সা.)-এর মাধ্যমে পবিত্র কোরআন নাজিল হয়েছে। অন্য নবী ও মহামানবদের কথা বাদ দিলাম। এই তিনজনকে অসহিষ্ণুতা ও প্রতিহিংসার শিকার হতে হয়েছে। হযরত মুসাকে তার ধর্মমতের জন্য ফেরাউন শাসকরা মিসর থেকে প্যালেস্টাইনে চলে যেতে বাধ্য করে। হযরত ঈসা বা যিশু খ্রিষ্টকে ইহুদি উগ্রবাদীরা তার ধর্মমতের জন্য জেরুজালেমে ক্রুশিফাইড করে হত্যা করে। হযরত মুহম্মদ (সা.)-কে তার ধর্মমতের জন্য মক্কার কোরাইশদের হাতে নানাভাবে নিগৃহীত হতে হয় এবং শেষ পর্যন্ত হিযরত করে মদিনায় আশ্রয় নিতে হয়।
ইসলামের নবী হযরত মুহম্মদ তাই তার যুগান্তকারী মদিনা সনদে এবং মৃত্যুর আগে বিদায় হজের বাণীতে ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি না করা, প্রত্যেক নাগরিকের ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং ধর্মের নামে সকল প্রকার জবরদস্তি না করার কথা বলেন।
যিশু তার জীবন দিয়ে প্রতিহিংসা ও উগ্রপন্থার বিরোধিতা করেছেন। অথচ যেমন উগ্রপন্থি খ্রিষ্টান এবং তাদের অধীনস্ত রাষ্ট্রযন্ত্রের নিপীড়নমূলক কর্মকা-ের জন্য বারবার ইহুদিদের প্যালেস্টাইন ও জেরুজালেম থেকে বিতাড়িত হতে হয়েছে; তেমনি ইউরোপের খ্রিষ্টান ধর্মযাজক ও রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতিহিংসা ও আধিপত্যবাদী নীতির কারণে ২০০ বছরব্যাপী (১০৯৫ থেকে ১২৯২ খ্রিষ্টাব্দ) মুসলমানদের বিরুদ্ধে ‘ধর্মযুদ্ধ’ বা ক্রুশেডে হাজার হাজার নিরীহ মানুষকে প্রাণ দিতে হয়েছে।
ষোড়শ শতাব্দীর শুরুতেই স্পেন থেকে মুসলমান শাসনের অবসান ঘটে। স্পেনের নতুন খ্রিষ্টান রাষ্ট্রশক্তি অতীতের প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য স্পেনে দীর্ঘদিন পরিকল্পিত হত্যাযজ্ঞ চালায়, ইতিহাসে যা ‘ইনকুইজেশান’ হিসেবে পরিচিত। ইনকুইজিশন কেবল মুসলমানদের ওপরই নয়, ইহুদি ও শুদ্ধির নামে খ্রিষ্টানদের একটি অংশের ওপরও চলে বর্বর নির্যাতন, রক্তপাত।
দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধের শুরুর আগেই হিটলার এবং তার অনুগামীরা জার্মানি ও ইউরোপের দেশে দেশে সেমেটিসিজম বা ইহুদিদের নির্মূলের নামে লাখ লাখ মানুষকে হত্যা করে। মানবেতিহাসে যা হলোকাস্ট হিসেবে কলঙ্কিত হয়ে আছে।
ভারতীয় উপমহাদেশে শঙ্করাচার্যের নেতৃত্বে ব্রাহ্মণ্যবাদী শক্তি অষ্টম শতাব্দীতে ধর্মীয় শ্রেষ্ঠত্বের নামে বৌদ্ধদের ওপর নির্মূল অভিযান চালায়। তেমনি মধ্যযুগের শুরুতে দখলদার মুসলমান শাসকরাও বৌদ্ধ ও হিন্দুদের ওপর সমভাবেই নির্যাতন চালিয়েছে। অতঃপর দীর্ঘ মুসলমান শাসনামলে শাসকরা তাদের স্বার্থেই পুরাতন নির্মূল অভিযান বন্ধ করে। হিন্দু-মুসলমানদের মধ্যে এক ধরনের সামাজিক চুক্তির মাধ্যমে শান্তি ও সম্প্রীতি স্থাপিত হয়। কিন্তু আবার উনিশ শতকের শেষ এবং বিশ শতকে নতুন করে সাম্প্রদায়িকতা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। হাজার হাজার হিন্দু মুসলমানের রক্তের ধারায় সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে ভারত ভাগ হয়। ইসলামের নামে ‘পাকিস্তান’ এবং হিন্দু প্রাধান্যের ভারত ধর্মের ভিত্তিতে রাষ্ট্র বিভাজনের সবচেয়ে বড় নজির হয়ে আছে।
কিছু তাতেও সাম্প্রদায়িকতার এবং উগ্র ধর্মান্ধতার অবসান ঘটেনি। সাম্প্রদায়িক দ্বিজাতিতত্ত্বের ফাঁদ ভেঙে অভ্যুদয় ঘটে ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশ নামক জাতি-রাষ্ট্রের।
কিন্তু ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহার বিশ ও একুশ শতাব্দীতেও মানব সভ্যতার সবচেয়ে ভয়ঙ্কর সংকট হিসেবে আজও হিংসা ও রক্তপাতের প্রধান কারণ হয়ে আছে। সোভিয়েত সমাজতন্ত্রের পতনের পর ইরানে ইসলামি বিপ্লব ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহারকারীদের প্রবলভাবে উৎসাহিত করে। অতঃপর আফগান প্রপঞ্চ। নাইন ইলেভেন, আফগানিস্তানে বিন লাদেন ও তালেবানি হিংস্রতা, পাকিস্তানের মদদে জঙ্গিবাদী মৌলবাদের উত্থান, মধ্যপ্রাচ্যে সেকুলার রাষ্ট্রগুলোকে পদানত করে মার্কিন ও পশ্চিমা মদদে মুসলমান মৌলবাদী-জঙ্গিবাদীদের উত্থান, সর্বশেষ ইরাক ও সিরিয়ায় খিলাফত প্রতিষ্ঠার নামে মধ্যযুগীয় ধর্মরাজ্য প্রতিষ্ঠার ব্যর্থ প্রয়াস বিশ^ব্যাপী অশান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে এখন যুদ্ধটা মুসলমান মুসলমানে। পাকিস্তান ও বাংলাদেশেও উগ্র জঙ্গিবাদীদের টার্গেট ভিন্ন মতাবলম্বী মুসলমান এবং অন্য ধর্মের নিরীহ মানুষ। মুসলমান জঙ্গিবাদের উত্থান বিশ^ব্যাপী শান্তির ধর্ম ইসলামের মর্যাদাকে ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছে। কেবল মুসলমান নয়, খ্রিষ্টান জগতেও অসহিষ্ণু মৌলবাদী-সন্ত্রাসী শক্তির উত্থান ঘটেছে। সম্প্রতি নিউজিল্যান্ডের মসজিদে হামলা ও হত্যাকা-, ফ্রান্স, যুক্তরাষ্ট্রসহ উন্নত বিশে^র দেশগুলোতেও মুসলমান বিদ্বেষ সভ্যতাকে কলঙ্কিত করছে।
প্যালেস্টাইনে জায়নবাদী আধিপত্য মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ীভাবে অশান্তি ও অস্থিতিশীলতার কারণ হয়ে আছে। সর্বশেষ প্রতিশোধকামী আইএস-এর সহায়তায় শ্রীলংকায় খ্রিষ্টান গির্জায় ও হোটেলে হামলা এবং তিন শতাধিক মানুষ হত্যা ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহারের নিকৃষ্টতম উদাহরণ।
জননেত্রী শেখ হাসিনার সরকার জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের নীতি গ্রহণ এবং ধর্মের রাজনৈতিক অপব্যবহার রোধে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ থাকায় আমাদের দেশ এই বিপদ থেকে অনেকটাই মুক্ত। কিন্তু তারপরও মৌলবাদ-জঙ্গিবাদের বিপদ এবং ধর্ম ব্যবসায়ীদের কারসাজি শেষ হয়ে যায়নি। প্রতিটি ধর্মের মর্মবাণীকে রক্ষা, সভ্যতা, গণতন্ত্র, মানবাধিকারকে সুসংহত করতে হলে ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহার বন্ধ করার কোনো বিকল্প নেই। বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক শক্তিকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় পবিত্র ধর্মের রাজনৈতিক অপব্যবহারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ও ভাবাদর্শগত সংগ্রামকে আরও সুসংহত করতে হবে।

পাঠকের মন্তব্য:

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না। তারকাচিহ্নযুক্ত (*) ঘরগুলো আবশ্যক।

*