‘জনগণের আদালতই সবচেয়ে বড় আদালত’

13

যে সংসদ রাষ্ট্রপতি মনোনয়ন করেন, সেই সংসদকে নিয়ে নানা কথা বলা হচ্ছে, এমনকি এমপিদের ক্রিমিন্যালও বলা হচ্ছে। সংসদকে হেয় করে কথা বলা হচ্ছে, এর অর্থ কী? আমরা অনেক সংগ্রাম ও রক্তের বিনিময়ে গণতন্ত্র ফিরিয়ে এনেছি।

প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগের প্রতি ইঙ্গিত করে প্রধান বিচারপতির করা মন্তব্যের কড়া সমালোচনা করে বলেছেন, সব কিছু সহ্য করা যায়; কিন্তু পাকিস্তানের সাথে তুলনা সহ্য করা যায় না। আর আমাকে হুমকি দিয়ে কোনো লাভ নেই। আইয়ুব-ইয়াহিয়া, জিয়া-এরশাদ-খালেদা জিয়া দেখেছি। আমি একমাত্র আল্লাহর কাছে সেজদা দেই, আর অন্য কারও কাছে মাথা নত করি না। জনগণের আদালতই সবচেয়ে বড় আদালত, জনগণের শক্তিই বড় শক্তিÑ এটা সবাই মনে রাখবেন। পাকিস্তানের কথা বলে হুমকি দেওয়ার বিচারের ভার আমি জনগণের ওপরই ছেড়ে দিলাম।
প্রধান বিচারপতি রাষ্ট্রপতির সব ক্ষমতা কেড়ে নিতে চান অভিযোগ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশকে স্বাধীন করেছিলেন বলেই তারা (বিচারপতি) ওই পদে বসতে পেরেছেন। যে রাষ্ট্রপতি প্রধান বিচারপতিকে নিয়োগ দেন, সেই রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা দেওয়া হচ্ছে না বলেই তাদের এত রাগ ও গোস্বা। দুর্নীতিবাজদের রক্ষা করা তো উচ্চ আদালতের দায়িত্ব না। সংসদ সদস্যদের সম্পর্কে অপমানজনক কথা বলাও তো আদালতের কাজ না। প্রধান বিচারপতি সংসদের সংরক্ষিত নারী আসন নিয়েও কথা বলেছেন। সংসদ সদস্যদের সাথে এসব সংরক্ষিত নারী এমপিও তো ভোট দিয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করেন। আর নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি প্রধান বিচারপতিকে নিয়োগ দেন। তাই সংরক্ষিত নারী আসন নিয়ে কথা বলার আগে প্রধান বিচারপতির তো উচিত ছিল পদ থেকে সরে যাওয়া। বলতে পারতেন, যেহেতু সংরক্ষিত নারী এমপি ভোট দিয়ে রাষ্ট্রপতি নিয়োগ দিয়েছেন, তাই আমি এই পদে থাকব না।
২১ আগস্ট ভয়াল গ্রেনেড হামলার ১৩তম বার্ষিকী উপলক্ষে খামারবাড়ির কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে আওয়ামী লীগ আয়োজিত আলোচনা সভায় সভাপতির বক্তব্য রাখতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী ষোড়শ সংশোধনী নিয়ে প্রধান বিচারপতির দেওয়া পর্যবেক্ষণের কিছু অসংগতি তুলে ধরে বলেন, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা নিয়ে বিএনপির ফরমায়েশি রিপোর্ট দেওয়া বিচারপতি জয়নুল আবেদনের দুর্নীতির তদন্ত দুদক যাতে না করতে পারে সেজন্য প্রধান বিচারপতি চিঠি লিখলেন। কিন্তু তদন্ত করা যাবে না কেন? একজন দুর্নীতিবাজকে রক্ষা করা তো প্রধান বিচারপতির কাজ নয়। এটা তো সংবিধান পরিপন্থী, লঙ্ঘনের শামিল। গণপরিষদের সদস্যদের করা আইন প্রধান বিচারপতির পছন্দ নয়, উনার পছন্দ অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করে মার্শাল ল’ অর্ডিন্যান্সের মাধ্যমে জিয়াউর রহমানের জারি করা সুপ্রিম জুডিসিয়াল কাউন্সিল! বিতর্কিত ও দুর্নীতিবাজদের রক্ষা করতেই কী তার জুডিসিয়াল কাউন্সিল পছন্দ? রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া এ কোন ধরনের দাবি? বিএনপি আমলে অনেক বিতর্কিত, দুর্নীতিবাজ, ভুয়া সনদধারীকে বিচারপতি নিয়োগ দিয়ে উচ্চ আদালতের পবিত্রতা নষ্ট করে গেছে। সুপ্রিম জুডিসিয়াল কাউন্সিল হলে তো কারোরই বিচার হবে না।
আলোচনায় অংশ নেন আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ও শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু এমপি, বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ এমপি, দলটির সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এমপি, সভাপতিম-লীর সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম এমপি, জনপ্রশাসনমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম এমপি, ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি ও বিমানমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন এমপি, জাসদ সভাপতি ও তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু এমপি, সাম্যবাদী দলের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক শিল্পমন্ত্রী দিলীপ বড়–য়া, তরিকত ফেডারেশনের চেয়ারম্যান নজিবুল বশর মাইজভা-ারী এমপি, জাসদের কার্যকরী সভাপতি মইন উদ্দীন খান বাদল এমপি, কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলন ও আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম এমপি। সভা পরিচালনা করেন কেন্দ্রীয় প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ এমপি ও উপ-প্রচার সম্পাদক আমিনুল ইসলাম আমিন। আলোচনা সভা শেষে অনুষ্ঠানস্থলে উপস্থিত ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় নিহতদের পরিবার ও আহত নেতাকর্মীর সাথে কথা বলেন এবং তাদের সার্বিক খোঁজখবর নেন।
প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে ষোড়শ সংশোধনী নিয়ে উচ্চ আদালতের পর্যবেক্ষণের সমালোচনা করে বলেন, হঠাৎ করেই দেখছি উচ্চ আদালত থেকে নানা কথাবার্তা বলা হচ্ছে, লেখা হচ্ছে এবং হুমকি দেওয়া হচ্ছে। যে সংসদ রাষ্ট্রপতি মনোনয়ন করেন, সেই সংসদকে নিয়ে নানা কথা বলা হচ্ছে, এমনকি এমপিদের ক্রিমিন্যালও বলা হচ্ছে। সংসদকে হেয় করে কথা বলা হচ্ছে, এর অর্থ কী? আমরা অনেক সংগ্রাম ও রক্তের বিনিময়ে গণতন্ত্র ফিরিয়ে এনেছি। তিনি বলেন, পুরো দায়িত্বই যেন নিতে চাইছেন।
তিনি বলেন, একটি আইন পাস করতে গেলে অনেক পর্যায় পার হতে হয়। সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটের মাধ্যমে সংবিধান সংশোধন পাস করা হয়। আর আদালত এক খোঁচায় তা বাতিল করে দেয়। এত সংসদ সদস্য, প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা তাদের কারোরই কোনো জ্ঞানবুদ্ধি নেই, জ্ঞানবুদ্ধি আছে শুধু এক বা দুজনের? অন্য বিচারকরা স্বাধীনভাবে মতামত তুলে ধরতে পেরেছে কি না, এটা নিয়েও কথা আছে। ড. কামাল হোসেনের কঠোর সমালোচনা করে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন একজন আইনজীবী সর্বোচ্চ আদালতের সামনে দাঁড়িয়ে অ্যাটর্নি জেনারেলকে যে ভাষায় গালিগালাজ করেছেন, তা কোনো সভ্য মানুষ করতে পারে না। তারা আদালতকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন?
‘সংসদ কতদিন চলবে তা ক্যাবিনেট সিদ্ধান্ত নেয়’Ñ প্রধান বিচারপতির পর্যবেক্ষণে এ দাবি অসত্য উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ক্যাবিনেটে সংসদ কতদিন চলবে তা নিয়ে কখনই কোনো আলোচনা বা সিদ্ধান্ত হয় না। সংসদ সম্পর্কে এতটুকু ধারণা থাকলে এ কথা বলতে পারতেন না। ক্যাবিনেট নয়, স্পিকারের সভাপতিত্বে কার্যোপদেষ্টা কমিটির বৈঠকে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় সংসদ কতদিন চলবে, কি কি বিষয়ে আলোচনা হবে। এমন বহু অবান্তর কথা বলা হয়েছে পর্যবেক্ষণে। আমরা পূর্ণাঙ্গ রায় ভালো করে পড়ছি এবং অসংগতিগুলো নোট নিচ্ছি। সংসদে এ বিষয়ে আলোচনা হবে। সময় এলে নিশ্চয় সব কিছু জাতির সামনে তুলে ধরা হবে। এটা নিয়ে জাতিকে বিভ্রান্ত করা হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সংসদ সদস্যরা দায়বদ্ধ দেশের জনগণের কাছে। পাঁচ বছর পরপর আমাদের জনগণের আদালতের সামনে দাঁড়াতে হয়। একটি রাজনৈতিক দল যদি নির্বাচনে না আসে সেই দায়িত্ব কার? এটা তো ওই রাজনৈতিক দলেরই সিদ্ধান্তের ব্যাপার। বিএনপি তো সবসময় উত্তরপাড়ার দিকে তাকিয়ে থাকে। কিন্তু উত্তরপাড়া তাকে কোনো সাড়া দেয়নি। আর ড. কামাল হোসেন তো কোনোদিন সরাসরি ভোটে জিততে পারেন নি। বঙ্গবন্ধুর ছেড়ে দেওয়া একটি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় তিনি নির্বাচিত হয়েছিলেন। নিজে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়ে আবার বড় বড় কথা বলেন কীভাবে? নির্বাচনী আইনেই রয়েছে কোনো আসনে অন্য কোনো প্রার্থী না থাকলে মনোনয়নপত্র দাখিলকারী প্রার্থীই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হবেন। কোনো দল নির্বাচনে না এলে কিংবা প্রার্থী না দিলে সংসদের বৈধতা বা অবৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে না।
দেশবাসীর ওপর বিচারের ভার ছেড়ে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যে পাকিস্তানকে আমরা যুদ্ধ করে পরাজিত করেছি, লাখো শহীদের মহান আত্মত্যাগের বিনিময়ে পেয়েছি স্বাধীনতা। যে পাকিস্তান এখন ব্যর্থ রাষ্ট্র সেই দেশটিকে নিয়ে তুলনা করার বিচারের ভার দেশের জনগণের। কারণ, জনগণের আদালতই হচ্ছে সব বড় আদালত। স্বাধীনতা ভালো; কিন্তু তা বালকের জন্য নয়। বালকসুলভ আচরণ ভালো নয়। রাজাকার-আলবদর কিংবা শান্তি কমিটির সদস্যরা ক্ষমতায় এলে দেশের কোনো উন্নয়ন হয় না। একমাত্র মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি ক্ষমতায় থাকলে দেশের উন্নয়ন হয়; আমরা তা প্রমাণ করেছি।
‘কয়েকটা ফ্লাইওভার বা রাস্তা হলেই উন্নয়ন হয় না’ এমন মন্তব্যের সমালোচনা করে শেখ হাসিনা বলেন, কয়েকটা ফ্লাইওভার কিংবা রাস্তা নয়, আমরা দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন করেছি। দেশের মানুষ দুবেলা খেতে পারছে, চিকিৎসা পাচ্ছে, গ্রামের মানুষের আয় বৃদ্ধি পেয়েছে, দেশের ৮০ শতাংশ মানুষ বিদ্যুৎ সুবিধা পাচ্ছে, শতভাগ শিক্ষার্থী স্কুলে যাচ্ছে। এসব উন্নয়ন কি চোখে পড়ে না আমাদের প্রধান বিচারপতির। সারাবিশ্বে আমরা দেশের সম্মান নিয়ে এসেছি। বাংলাদেশ এখন সারাবিশ্বের কাছে উন্নয়নের রোলমডেল। সংবিধান লঙ্ঘন করে কেউ ক্ষমতা দখল করলেই কি উন্নয়ন হবে? সেই অবস্থা আর নেই। সংবিধান লঙ্ঘন করে কেউ ক্ষমতায় এলে তার বিচার হবে। জনতার আদালত সবচেয়ে বড় আদালত, মনে রাখবেন।
২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার জন্য বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও তার পুত্র তারেক রহমানকে দায়ী করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, খালেদা জিয়া, তারেক রহমান, তার মন্ত্রিসভার সদস্য ও গোয়েন্দা সংস্থার লোকরা এ হামলার সাথে জড়িত। আমাকেসহ পুরো আওয়ামী লীগের নেতৃত্বকে নিশ্চিহ্ন করতেই যুদ্ধক্ষেত্রে সশস্ত্র বাহিনীরা যে গ্রেনেড ব্যবহার করে, তা আমাদের সমাবেশে ব্যবহার করা হলো। হামলার পর পিন্টুর ভাই ও কারারক্ষীকে বিমানে পালিয়ে যেতে সাহায্য করা হয়।
তিনি বলেন, ধানমন্ডির ৫ নম্বর রোডে তারেক রহমানের শ্বশুরবাড়ি। ওই বাড়িতে সে দীর্ঘদিন থেকে কি করছিল? ১ আগস্ট ওই বাড়ি ছেড়ে তারেক রহমান ক্যান্টনমেন্টের বাসায় যায়। হামলার আগের দিন ২০ আগস্ট রাতে তারেক রহমানের শ্বশুরবাড়িতে কয়েকটি বড় বাক্স-পেঁটরা নামানো হয়। কিছু সময় পর সেগুলো সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। কি ছিল তাতে? সুপরিকল্পিতভাবে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিকে নিশ্চিহ্ন করতেই এই হামলা চালানো হয়েছিল। ট্রাকের গায়ে না লেগে গ্রেনেডটি যদি ভেতরে পড়ত তবে আমরা কেউ-ই বাঁচতে পারতাম না। আল্লাহ আমাকে রক্ষা করেছেন, মোহাম্মদ হানিফসহ নেতারা মানববর্ম রচনা করে আমাকে রক্ষা করেছেন।

Category:

Leave a Reply