জলেরা কাঁদছে

33ঘাটে এসে নৌকা ভেড়েÑ অমাবস্যা। ঘুটঘুটে রাত। আকাশে মেঘের ভিড়। চারদিকে কুঁচুটে অন্ধকার। চর্টের আলো জ্বেলে, হ্যারিকেন হাতে নিয়ে অনেকে এসে ভিড় করে ঘাটে। এর-ওর হাত ধরে আলোয় পথ চিনে সাবধানে প্রথমে গলুইয়ের মুখে তারপর কাঠের পুরু তক্তার ওপর পা রাখে ডা. হাফিজ। চাল বেয়ে উঠোনে উঠতেই হাঁপ ধরে যায় ওর। বুক হাঁপরের মতো ওঠানামা করে। বিরক্তি ওর কণ্ঠে, আর পারি না! বলেই কোমরের দু-কাঁখে হাত রেখে খানিক ডানে হেলে দাঁড়িয়ে থাকে। চোখেমুখে বড্ড ক্লান্তি আর আকাশের মেঘ যেন ছায়া ফেলেছে সে মুখে। তখুনি উত্তুরে জঙ্গলে কী এক পাখি ডেকে ওঠে খরখরে গলায়। চারপাশ হিস্ হিস্ করে ওঠে সে কণ্ঠে। গায়ে কাঁটা দেয়, বুকের রক্ত হিম হয়ে আসে। ফাতেমা খানিক সময় স্বামীর মুখের দিকে তাকিয়ে কেমন যেন আনমনা হয়ে যায়। মুখে রা সরে না। বুকে কেমন যেন কাঁপুনি ধরে। মুহূর্তে নানা চিন্তা এসে ভিড় করে। তোমার শরীর কি খুব খারাপ লাগছে?
ডা. হাফিজ মাথা নেড়ে না বললেও মুখ জুড়ে কেমন যেন যন্ত্রণার ছাপ। ফাতেমা আর দেরি না করে হাত ধরে স্বামীর, একটু একটু করে পা বাড়াও। কতক্ষণ এভাবে দাঁড়িয়ে থাকবে!
ঘাটের পাশে পুবের উঠোনজুড়ে এক থেকে আলো অনেকক্ষণ ধরে স্থির হয়ে আছে। সে আলো ঘিরে অনেক মানুষের জটলা। ডাক্তারকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ভিড় ছেড়ে একে একে উঠে আসে সাদেক, মজনু, দলু এমনি আরও অনেকে। ওদের মনেও উৎকণ্ঠা কাজ করে। কাহা! শইলডা বালা? মুখটা কেমন ব্যাজার ব্যাজার লাগতাছে। খাড়ই থাকলে অইব! ঘরে যান। কোমবেলা থাইক্যা বার অইছেন? অহন রাইত কত! আমনে কাহা এহনও কেমনে যে টিইক্যা আছেন ভাবলে মাতাডা ঠাইট ঘুরনা মারে। সলুর কথা ওর কানে গেল কি না বোঝা গেল না। আনমনা ডা. হাফিজ ওদের কথার কোনো উত্তর না দিয়ে ফাতেমার হাত ধরে একটু একটু করে পা বাড়াতে বাড়াতে বলে, জয় বাংলার খবর কী?
Ñ কাহা! আর কইয়েন না। পাক-আর্মি বহরে বহরে মারা পড়তাছে। এইভাবে যুদি মুক্তিরা লড়তে পারে, তাইলে কাহা চিন্তা কইরেন না, খুব জলদি দেশ স্বাধীন অইব।
ডা. হাফিজ মুখে মৃদুহাসি ছড়িয়ে বলে, তর স্বাধীন হইতে হইতে আমি আর বাঁচুম?
Ñ কী যে কন কাহা। লাশে-গাছে আমাদের যে দেহডা এই দেহের ভিতরে ঘুণে ধরবো এইডা ভাবলেন কী কইর‌্যা? আমরা এমনের আডুর বয়সী। অহনি রোগে-জারে ভাইঙ্গ্যা পড়ছি। আমনার বয়েসে আমগো হাড্ডি-গুড্ডিরও খোঁজ থাকবো না কয়বরে। আমনে তো তালগাছের মতো কেমনু খাড়া অইয়া আছেন! আমগো মতো দুই-চাইরডারে অহনও ইডালডা দশ হাত দূরে নিয়া ফালাইতে পারবেন।
এ কথা শেষ না হতেই ভেতরের উঠোন থেকে অনেকগুলো মানুষের হাসির শব্দ কানে আসে ওদের। ডা. হাফিজ একটু বিচলিত হয়ে বলে, জয়বাংলা রেডিও শুইন্যা অমন হাসে ক্যা? রাজাকার শুনলে অহনি খবর দিবো মিলিটারিরে। রেডিও জুড়ে উঠোনে অনেকে বসে কান পেতে স্বাধীন বাংলা বেতারের অনুষ্ঠান শুনছে। সন্ধ্যার খবর শেষ হয়ে এখন চলছে চরমপত্র। একসময় ডা. হাফিজের ঘরেই সন্ধ্যার এই আসর বসতো। খুব আগ্রহ নিয়ে অনুষ্ঠানটি শুনতো ডাক্তার। উপুড় হয়ে গায়ে গা মিলিয়ে রেডিওর গায়ে কান লাগিয়ে পুরো অনুষ্ঠান গোগ্রাসে গিলতো। কিন্তু আজ কয়েক মাস হলো সে আয়োজনে ভাটা পড়েছে। ডাক্তারের বয়েস পড়তির দিকে হলেও চিন্তা-চেতনা মননে আর তারুণ্যে এখনও বিশ বছরের। পঁচিশে মার্চ রাতে যেভাবে ঝাঁপিয়ে পড়লো লোকবল নিয়ে তা কেবল ওকেই মানায়। তারুণ্যে খলবলে মানুষটা আজ অমন নেতিয়ে পড়েছে কেন? রেডিওতে কান থাকলেও মনে অশান্তি ছুঁয়ে যায় অনেকেরই। কারও কারও মনোযোগে ছেদ পড়ে বারবার।
পঁচিশে মার্চ রাতে হঠাৎ খবর এলো ঢাকা ম্যাসাকার হয়ে গেছে। কোনো মানুষ বেঁচে আছে কি না সন্দেহ। শুধু আঘুন আর আগুন ঢাকা জুড়ে। জ্যান্ত কোনো মানুষ দেখা যায়নি পথে-ঘাটে। শুধু আর্মির কনভয় আর ট্যাংক দাপিয়ে বেড়াচ্ছে শহরময়। এ খবর ওয়্যারলেসে থানায় আসতেই মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ে থানা সদর ছাপিয়ে গ্রাম থেকে গ্রামে। তখনই ডা. হাফিজ সবাইকে ডেকে দলেবলে ভারি হয়ে দৌড়োতে থাকে রেললাইনের দিকে। আয়রে তোরা আয়! সড়কের পাড়ে আয়! রেললাইন না তুলতে পারলে জানে কেউ বাঁচবি না। পাক আর্মি আইতাছে বগি ভইর‌্যা ভইর‌্যা।
কথা বলে আর দৌড়াতে থাকে হাফিজ। গলা যদ্দুর সম্ভব চড়িয়ে ডেকে যায় ও। ওর পেছন পেছন অসংখ্য মানুষ দা, শাবল, খুন্তি, কুড়–ল আরও যার যা আছে তাই নিয়ে রেললাইনের দিকে দৌড়াতে থাকে। একসময় হেইও হেইও করে রেললাইন উপড়ে ফেলতে থাকে তারা। সিøপারের কাঠে আগুন ধরিয়ে দেয়। লাইনগুলো কাঁধে বয়ে নিয়ে দূরের বিলে ছুড়ে ফেলতে থাকে আর জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু মুখে মুখে।
অসংখ্য কণ্ঠো মুখে দা-দুড়োলের শব্দের পাশাপাশি হেইও হেইও ধ্বনি আর জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু স্লোগান মুখে নিয়ে সবাই যেন জিকির করছে। এইক ধ্বনিতে রেললাইন ধরে মাইলের পর মাইল মানুষ হুমড়ি খেয়ে পড়ে। মাঝে মাঝে ডা. হাফিজের কণ্ঠ অনুসরণ করে কেউ কেউ গলা চড়িয়ে বলে, বাঁচবি না-রে বাঁচবি না। হ¹লে আয়। পা চালাইয়া আয়। রেললাইন তুইল্যা কটকটি খাবি কেরে আয়। সময় নাইরে সময় নাই…। মিলিটারি আইলোরে মিলিটারি। পাকসেনারা আইলোরে পাকসেনারা। অফান্ডে মারা পড়বিরে মারা পড়বি। আয় রে… সময় নাই…।
সফলভাবে রেললাইন তোলার নেতৃত্ব দিয়েছিল সেদিন ডা. হাফিজ। ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথ মাইলের পর মাইল তুলে ফেলেছিল ওরা। এরপরে আর কখনও তাকে সুস্থির দেখা যায়নি। কী করে পাক আর্মিদের নিধন থেকে এ এলাকার মানুষদের রক্ষা করা যায়, কী করে মুক্তিযুদ্ধে পাঠানোর মতো ছেলেদের উদ্বুদ্ধ করা যায়, এ নিয়ে সারাক্ষণ তার ছুটোছুটি। সরকারি চাকরি থেকে অবসর নিয়ে গ্রামে চলে এসেছে ও। আজ বছর পাঁচ হবে। সেই থেকে এ-গ্রাম সে-গ্রাম, দূরের গ্রামে রোগী দেখে বেড়ায়। তাই চেনা-পরিচয়ের গ-ি ওর ছোট নয়, যতই দিন গেছে বরং এ গ-ি কেবলই বেড়েছে। দূর মূল্লকেও ওর শুভার্থী-শুভাকাক্সক্ষীর অভাব নেই।
যুদ্ধের এই সংকটকালে মানুষের আরও কাছাকাছি কী করে থাকা যায়, মানুষের মনে কী করে উদ্দীপনা জাগিয়ে রাখা যায় সে নিয়ে তার চিন্তা-উৎকণ্ঠা আর ব্যাকুলতার শেষ নেই। এমনি উচাটন মন নিয়ে যখন ও ছুটে বেড়াচ্ছে গ্রামে-গ্রামে, তখনই এক সন্ধ্যায় ফোরকান দফাদার এসে খবর দিল, ডাক্তার কাহা কই? থানা ক্যাম্পে যাওন লাগবো। আর্মি অফিসার সালাম দিচ্ছে। জরুরি কথা আছে। কাহার লগে। আমারে কইছে জরুরকে যাকে আর আয়েঙ্গে। বলিয়ে উসকো সাথ জরুর বাত হ্যায়! অহন ভাত না লুঠি, কি খাইব কেডা জানে! বলেই দফাদার চলে যেতেই থানার ওসি তার এক বিশ্বস্ত লোক পাঠায় খবর দিয়ে যে করেই হোক রাতের মধ্যে না-হয় খুব ভোরে বাড়ি ছেড়ে যেন চলে যায় ডা. হাফিজ। ওকে শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান করবে বলে পাক অফিসার ঠিক করেছে।
ডা. হাফিজের জনপ্রিয়তাই বুঝি তার কাল হলো। অসংখ্য মানুষ তার প্রতি অনুগত, বিশ্বস্ত এ খবর পাক আর্মিদের কাছে চাপা থাকেনি। ঠিকই খবর পৌঁছে গেছে জায়গায় জায়গায়। জনপ্রিয় এই মানুষটিকে শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান করার জন্যে উঠে-পড়ে লেগেছে ওরা। বাড়ির লোকজন ওসির পরামর্শমতো ভোরে আজানের আগেই ডাক্তারকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ে। এ-গ্রাম সে-গ্রাম পেরিয়ে সুদূর অজ এক গ্রামে ঝোপঝাড়ের ভিড়ে ওর আশ্রয় তৈরি করা হয়। ঝোপ না বলে জঙ্গল বলাই ভালো। তিন মাথা উঁচু অসংখ্য গাছের ভিড়ে ঝোপঝাড়ে মিলেমিশে আদিম এক পরিবেশ সৃষ্টি হয়ে আছে। সে সঙ্গে আছে ইঁদুর-বেজি-বাগডাস-গুইসাপ ছাড়াও গা হিম করা আরও কতসব প্রাণীকুলের আবাস। তার পাশেই ঝাঁপানো অসম্ভব উঁচু এক বটগাছ। দৈর্ঘ্য-েপ্রস্থে এক-দেড় মাইল জায়গাজুড়ে বটের ঝুরি নেমেছে। মাটির বুকে মোটা মোটা সব শেকড় জেগে আছে অজগরের মতো। গাছের ওপারেই দিঘি। দিঘির চারপাশ এমনি ঝোপঝাড় আর জঙ্গলে পুরু হয়ে আছে। পুরু ছায়ায় ঘেরা দিঘির চারদিক। সে ছায়ায় দিঘির জলও কেমন কালচে দেখায়। তাকালে ভয় হয়। তেমনি নিঃসীম পোড়ো জায়গায় রেখে আসা হলো ডা. হাফিজকে। সন্ধ্যা অবধি সেখানেই শোয়া বসা খাওয়া সবই চলে ওর। সন্ধ্যায় একদল মানুষের ভিড় লুকিয়ে লুকিয়ে বাড়ি এসে পৌঁছে ডা. হাফিজ। কোনোরকম রাতটা পার করে অন্ধকার থাকতেই আবার পথে বেরিয়ে পড়ে। একসময় হারিয়ে যায় সেই ঝোপের ভিড়ে। এভাবে কয়েক মাস চলার পর যখন বানের জল এসে ডুবিয়ে দিচ্ছিল চারপাশ, পথ-ঘাট। তখন পাশের এক কবরস্থানে জায়গা হলো ওর। সেখানেও ঘন জঙ্গল আর অনেক দিনের পুরনো একটি মসজিদের পাশে গোটা কয়েক কবর। বাঁধানো। এর মধ্যে তিনটে কবর আছে অস্বাভাবিক লম্বা। দীর্ঘদেহী মানুষের কবর। একেবারে পাথরে ঢালাই করা। তারপর ধাপে ধাপে নিচে নেমে চওড়া হয়ে গেছে। অনেকগুলো পাথরের খড়ম আছে কবরের পাশে ছড়িয়ে। মসজিদ কবর আর খড়মগুলো গায়েবি ইশারায় মাটি ভেদ করে উঠেছে অনেক বছর হলো। দীর্ঘ কবরগুলো বাদে অন্য কবরের গায়ে পুরু শ্যাওলা জমে কেমন এক আদিম ও ভৌতিক আবহ গড়ে উঠেছে চারদিকে। সেখানেই একটি কবর ঘেঁষে লুকিয়ে থাকে ডা. হাফিজ। সন্ধ্যার পর ডিঙ্গি নৌকো করে নিয়ে আসে বাড়ির লোকজন। আবার একইভাবে ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই ডিঙ্গি করে গোরস্তানে রেখে আসে তাকে। এ নিয়ে বিড়ম্বনার শেষ নেই। অনেক সময় দুপুরে যখন বাটি ভরে গামছায় বেঁধে ওর জন্যে খাবার পাঠানো হয়, প্রায়ই তা অনুসরণ করে অচেনা কজন লোক। একেক সময় একেক লোককে দেখেছে নৌকো করে ওদের বাড়ির আশপাশে নিচু এলাকায় ঘোরাঘুরি করতে। এমনি করে পুরো বর্ষায় ডিঙ্গি করে সকালে যায় ফিরে আসে রাতে ডা. হাফিজ। আজ সাত মাস একই রুটিন চলছে। ক্রমেই বিরক্তি আর বিতৃষ্ণা ওর জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলছে। কেন যেন গত কদিন ধরে একমই যেতে ইচ্ছে করছিল না ওর। কেবল গাইগুঁই, কেবল এড়িয়ে চলার চেষ্টা। কিন্তু বাড়ির লোকজন ওর প্রাণের কথা চিন্তা করে জোর করে নিয়ে যায়, দিয়ে আসে নির্বাসনে।
রোজ চলছে এমনি ধকল, উৎকণ্ঠা আর আতঙ্ক। অনেকদিন বিশ্রাম পায়নি বুড়োটে এ শরীর। তাই আজ ডা. হাফিজের শরীরের অমন খয়াটে ভাব দেখে ফাতেমার বেশ দুশ্চিন্তা হয়। একটা মানুষ আজ এতটা মাস ধরে এমন করে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। কতদিন আর সয়! শরীর তো মানুষের। বয়সও তো একেবারে কম হয়নি। তাকে নিয়ে আর্মিদের কেন যে এত শখ তা বোঝে না ফাতেমা। ওর দুশ্চিন্তা দেখে ডা. হাফিজ বলে, মরে গেলে মরে যাব, আমি আর একদিনও যাব না ওই জঙ্গলে। কোনোদিন সাপের কামড়েও তো মরে যেতে পারি, তার আগে আর্মিদের হাতে মরলেও শহিদ হবো। অন্তত মানুষ জানবে যে ওদের প্রলোভন আর প্ররোচনায় পা না-দেয়ায় ডা. হাফিজকে হত্যা করেছে পাক আর্মিরা। এ মৃত্যু গৌরবের। হারাবার কিছু নেই।
সে রাতে শোবার আগে নামাজ পড়ে কেন যেন ভীষণ কান্নাকাটি করে ডা. হাফিজ। একাগ্র মনে অনেক ঘোরের মধ্যে ডুবে ছিল যেন। স্বাধীনতা দেখার জন্যে তীব্র ব্যাকুলতা ছিল তার কণ্ঠে। সে ব্যাকুলতা, সে প্রত্যাশা আর স্বপ্নেরা প্রার্থনায় ঝরে ঝরে পড়ে কথা হয়ে। বাংলার স্বাধীনতা না দেখে যেন তার মৃত্যু না হয়। ব্যাকুল হয়ে করুণ সুরে মন থেকে যতদূর সম্ভব নতজানু হয়ে এ প্রার্থনা আওড়ে ছিল বারবার। মানুষের এ কষ্ট, ধ্বংস, হত্যা আর রক্ত আর দেখতে পারছি না খোদা। নারীদের লাঞ্ছনা আর সহ্য করতে পারছি না খোদা। শেষ কথা ছিল জালেমদের হাত থেকে বাংলাকে মুক্ত কর খোদা নানাভাবে, নানা ভঙ্গিমায়, নানা আকুতি নিয়ে এ কথাটি বারবার বলেছিল ডা. হাফিজ। আর ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের নিরাপত্তা। তাদের জীবন রক্ষার তাগিদ। এবং স্বাধীন বাংলাদেশ অর্জনে যেন ওরা বীরের মতো লড়ে যেতে পারে সে প্রার্থনা। প্রার্থনায় একে একে এমনি কথাগুলো তাওড়ে যাচ্ছিল ডা. হাফিজ। আর বুক তার ভেসে যাচ্ছিল চোখের ধারায়। কান্নার ঢেউ তার বুক নিংড়ে উঠে আসছিল অন্তরের গভীর থেকে। দীর্ঘ সময় ধরে এ প্রার্থনায় গভীরভাবে মগ্ন ছিল সে। প্রার্থনার প্রতিটি বাণী বারবার আওড়েও যেন তার তৃপ্তি আসছিল না মনে। প্রার্থনা শেষে উঠোনে পায়চারি করে জুলহাসকে ডাকলো একবার; আর কোনো খবর আছে জুলহাস!
জুলহাস শুয়ে পড়েছিল। তড়িঘড়ি ঘর থেকে বেরিয়ে আসে। না কাহা, তাজা খবর ওই একগই। মাইন ফুইট্টা পাক সেনার ট্রাক উইড়া গেছে।
আর কোনো খবর পাস নাই তাইলে? এরপর বিড়বিড় করে কী যেন বলে ডা. হাফিজ। উঠানজুড়ে পায়চারি করে অনেক সময় ধরে। তখন কেন যেন বারবার আকাশ দেখছিল।
রাত তখন বেশ গভীর। ফাতেমার কেবলই মনে হচ্ছে জলে বৈঠার শব্দ। অনেকগুলো বৈঠা একের পর এক উঠছে-নামছে। আর হুপ হুপ শব্দ উঠছে ভরা বর্ষার জলে। সে শব্দে ফাতেমার বুক দুরু দুরু কেঁপে ওঠে। বিছানায় আর গা রাখতে পারছিল না এক মুহূর্তের জন্যে। একসময় পায়ে পায়ে উঠে আসে ও। ঘরের এক কোণে টিমটিম করে জ্বলছে হ্যারিকেন। মৃদু আলো হ্যারিকেনের আশপাশে। হ্যারিকেনের আলোয় ফাতেমার শরীরের দীর্ঘ ছায়া সারাঘরে ছড়িয়ে পড়ে। আচমকা সে ছায়া দেখে নিজের ভেতরেই কেমন যেন কুঁকড়ে যায় ফাতেমা। ভয় কাজ করে ওর। পুরো ঘরজুড়ে নিজেকে ছড়িয়ে দরজার সামনে এসে দাঁড়ায় ফাতেমা। পাল্লা সামান্য ফাঁক করে বাইরে দেখার চেষ্টা করে। ঘুটঘুটে অন্ধকার যেন গিলে খেয়ে আছে সবকিছু। অন্ধকারের মধ্যে আরও গাঢ় আরও গভীর অন্ধকার হয়ে দাঁড়িয়ে আছে গাছগুলো। কোনটুক জল আর কোনটুক মাটি, বোঝাই যায় না। অনেকটা সময় চোখ রেখে কোনো নৌকা দূরে থাক কারও বাড়ির একটি কোষা নাও কিংবা কোন্দাও দেখল না ফাতেমা। তবে বৈঠার ছপ ছপ শব্দ কিসের! কোত্থেকে আসে এ শব্দ। বুঝতে চেষ্টা করে। চোখ রেখে কান পেতে ভালোভাবে বোঝার চেষ্টা করে ব্যাপারটি। একসময় দরজার খিল এঁটে খাটের কাছে এসে দাঁড়ায় ফাতেমা। বাঁ হাতে হ্যারিকেনটা তুলে ধরে ওপরে। একে একে ঘুমন্ত মানুষগুলোর মুখ দেখে ও। যুদ্ধের সময় নাতিরা দেশে এসেছে। এসেছে ছেলেমেয়ে সবাই। কার মুখ থেকে লাল ঝরছে। কার গলা কে বেড় দিয়ে আঁকড়ে ধরেছে, কার পিসি চেপেছে, তা নড়চড় দেখলেই বোঝে ফাতেমা। এমনি করে ছোট-বড় সবাইকে দেখে স্বামীর পাশে এসে দাঁড়াতেই বুক ধক্ করে ওঠে ওর। দু-পায়েরই হাঁট ভাঁজ করা। তবে এক পা খাড়া। আরেক পা ইলয়ে আছে। দু-হাত বুকের ওপর সমান্তরাল রাখা। মুখ বেশ উজ্জ্বল। চোখ দুটো বুজে আছে। যেন পরম তৃপ্তির একটা ভাব। সারাটা দিনই বুকে না-কি ব্যথা হয়েছে। কিন্তু ওই জঙ্গল থেকে আর খবর পাঠায় কীভাবে। তাই ব্যথা সয়েই জঙ্গলবাস করে এসেছে। কিন্তু রাতে শোবার আগে ব্যথাটা না-কি ফের বেড়েছে। চারদিকে ধু-ধু জল। জল ছড়িয়ে নানা জায়গায় পাকসেনাদের পাহারা। যখন তখন স্পিডবোটে এসে হাজির হয় ওরা। সামান্য সন্দেহ হলেই গুলি চালিয়ে দেয়। ঝোপেঝাড়ে উঁচু সড়কে পাহারায় আছে রাজাকার। তখন কোত্থেকে ডাক্তার আনবে দূরের এই গ্রামে। ডাক্তার হাফিজ নিজের ডিসপেনসারির ইমার্জেন্সি ওষুধ থেকে কী একটা ওষুধ খেয়ে নিল। তারপরও চোখে-মুখে অসহ্য এক যন্ত্রণার ছাপ ছিল ওর। কিন্তু এখন যেন পরম শান্তি আর তৃপ্তি নিয়ে ঘুমোচ্ছে। কোনো যন্ত্রণা নেই বুঝি শরীরে। বুকের খুব গভীর থেকে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে ফাতেমার। কিন্তু পেট উঠছে নামছে কই? শ্বাস-প্রশ্বাসের কোনো নমুনা তো চোখে পড়ছে না। তবে কী ভুল দেখছে চোখ। এক লাফে খাটে উঠে বসে ও। ডা. হাফিজের পাশে বসে ও গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে। না, কোনো ওঠানামা তো চোখে পড়ছে না। বুকে হাত দেয়। কোনো ধুকপুক নেই। চোখের পাতা খোলার চেষ্টা করে, পারে না। পায়ে হাত দিতেই ঠা-া কিসের অস্তিত্ব ওর হাতে ঠেকে। সঙ্গে সঙ্গে চিৎকার দিয়ে ডা. হাফিজের বুকের ওপর আছড়ে পড়ে ফাতেমা।
সে চিৎকার ঘর ছাড়িয়ে উঠোন, উঠোন ছাড়িয়ে পাশের ঘর আর উঠোন, তারপর এ-বাড়ি ও-বাড়ি, ছাড়া বাড়ি, পুব বাড়ি, পশ্চিম বাড়ি ছড়িয়ে পড়ে মুহূর্তে। এবার সত্যি সত্যি অগুনতি নৌকো ছপ ছপ বৈঠা ফেলে ডাক্তার বাড়ির দিকে ছুটে আসতে থাকে। সেসব নৌকা থেকে বেশ কটি নৌকা আবার চলে গেছে দূরের আত্মীয়-স্বজনদের খবর দিতে ভিন গাঁয়ে।
বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ডাক্তার বাড়ি ভিড় বাড়ে মানুষের। উপচেপড়া ভিড়। সে ভিড়ে একসময় এসে যুক্ত হয়Ñ হাশিম, নূর আলি, মাকসুদ আর লতিফ। ওরা এলাকায় রাজাকার সদস্য। হাশিম প্লাটুন কমান্ডার। হিংস্র কুকুরের চেয়ে ভয়াবহ তাদের আচরণ। ওদের নৃশংসতার খবর শুনে যে কারও বুক হিম হয়ে আসে। মানবতার ‘ম’ নেই ওদের আচরণে চিন্তায় কাজেকর্মে। নৃশংসতার দিক থেকে অনেক সময় ওদের ভূমিকা পাকহানাদারদের চেয়েও কম না। কোনো জনমে ওরা বাঙালি ছিল কি না সংশয় আছে মানুষের মনে। ওদের দেখে মানুষজন এদিক-ওদিক ছুটোছুটি করতে থাকে। কেউ ভেতর বাড়ি কেউ আড়ালে চলে যেতে থাকে। মুহূর্তে সামনের উঠোনের ভিড় হালকা হয়ে আসে রাজাকারদের ভয়ে! প্রবীণদের কয়েকজন এগিয়ে যায় ওদের কাছে। বাঁ হাতে রাইফেলের পুরো শরীর আর ডান হাতের আঙুল ট্রিগারে আছে কমান্ডার :
Ñ এইহানে এত ভিড় ক্যা গো।
Ñ মানুষ মারা গেছে গো।
Ñ কেডায়?
Ñ ডাক্তারে!
Ñ মানে হাফিজ ডাক্তার!
Ñ হ্যারে খুঁজতে খুঁজতে আমগো চোখখু দুইডা আন্ধা হওনের যোগাড়। এই চুদির পুতে এফি আইলো কহন মরতে।
Ñ একটু ভাইভ্যা কথা কইয়েন পিসি সাব। উনি একজন সম্মানিত মানুষ ছিলেন। এখন মৃত। মরা মাইন্যেরে গাইল পাড়েন ক্যা। নিজেও তো মরবেন একদিন! হেই ভাওমত কতা কইয়েন!
সঙ্গে সঙ্গে দুই রাজাকার রাইফেল তাক করে ওদের দিকে। কথা বাড়ইলে গুলি মারুম। দেশবেচইন্যা পুংগির পুতেরা সব এইহানে জোট বানছে। জলদি জলদি বিদায় কর হগলরে, এত মানু এক ফাই থাওন যাইব না। যে যেমতে আইছে খালি বিদায় করেন। হাফিজ ডাক্তার, হেই মরলি তো মরলি, আমগো ঘুম হারাম কইরা তবে মরলি। মাইন্যের কাতারে তরে হিসাব করণও হারাম। জাহান্নামের আগুন।
একসময় অগুনতি নৌকা ছুটে চলে ডা. হাফিজের লাশ নিয়ে। চারদিকে উঁচু মাটি নেই কোথাও। সব ডুবে আছে জলে। তাই এতদিন পুরনো যে কবরস্থানে লুকিয়ে ছিল ও। সেখানেই কবর দেয়ার কথা ভেবে রেখেছে বাড়ির লোকজন! ওদিকেই মানুষ চলেছে নৌকা নিয়ে। অগুনতি নৌকা এসে দরগার মসজিদের ঘাটে ভিড় করে। রাজাকার বাহিনিও আসে ওদের সঙ্গে। আরও কজন রাজাকার মসজিদ লাগোয়া চা-স্টলে অপেক্ষা করছিল। ওরা তাড়া দেয়। চালাইয়া কাম সারেন। দেরি করণের কোনো ভাও নাই! কিন্তু গোর দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। কবলের জল যত সেঁচে ততই নতুন জল ওঠে। প্রায় হাঁটু অবধি জল কবরে। জায়গাটি বেশ উঁচু। পুরনো সব কবর চারদিকে। বাঁধানো কবরগুলোর দেয়াল শ্যাওলায় ঢেকে আছে। কোনোটার পলেস্তারা খসে গেছে অনেকদিন। ইটের ফাঁকে ফাঁকে লতানো গাছ বেরিয়ে আছে। কোনো কোনো কবরের গায়ে মৃতের নাম লেখা থাকলেও তা আজ বিলুপ্তির ঠিকানায়। এমনি এক প্রাচীন কবরেও জল আর জল। সেচে কুলোতে পারছে না তিন তিনজন মানুষ। এদিকে রাজাকররা বারবার তাগাদা দিচ্ছে দাফন সেরে ভিড় কমানোর জন্যে। ওদের বাস্তবতা বুঝিয়ে বললে বলে, এইডা কী মানুষ বড়! লেপতোষক জাজিম লাগবো। মরা লাশ আর মরা গরুর মাঝে ফারাক আছে কুনো। গরুরে যদি পানিতে ভাসান দেওয়া যায়। তয় মরা মানুরে আডা পানির মাঝে শোয়াইতে কী এমুন অসুবিধা। রাজাকার নূর আলি কথাগুলো বলে তাকায় আশপাশের মানুষের দিকে। দেখে কেউ কোনো প্রতিবাদ করছে কি না। কথার ঘায়ে ডাক্তারের শীতল শরীর ক্ষত-বিক্ষত করে যেতে পারলেই যেন যত সুখ। ডাক্তার অইলো দোজখের খড়ি। কই হেরে দিয়া আগুন জ্বালাইব খোদায় আর পাগল গুলান হেরে মাতায় রাখব না বুকে রাখব হুশ করতে পারে না। আল্লার ভাও বুঝলে তো জাহান্নামের খড়ি অইয়া মরে নাÑ নাওজুবিল্লা মিন…। আবারও তাকায় রাজাকারগুলো। না কেউ মুখ খুলছে না। আসলে ওদের মুখের সামনে কে মুখ খুলবে!
রাজাকারগুলো ফের তাড়া দেয়, চালাইয়া কাম সারেন গো চালাইয়া! পরে কিন্তু খান সাবরা আইলে গুল্লি করা ছাড়া উপায় থাকব না। আন্ধা-গুন্ধা যেমনে পারমু গুল্লি ছাড়–ম। আমাগো ভালা মানু পাইয়া হিসাবেই আনতাছ না গো। চোখটা পাল্ডি দিমু তহন বুঝবা কত ধানে কত চাইল। এমন ডা. হাফিজরে কুত্তা দিয়া খাওনের কতা। বেইমান পাক দেশের দুসমন হের লেইগ্যা আবার দাফন। আবার ঘণ্টায় ঘণ্টায় সময় দেওয়ন। কী মামাবাড়ির আবদার? অই নুরু, মকসু পারলে গিয়া ডাক্তারের লাশ এট্টু মুইত্যা দিয়ায়। মাইন্যের মুত দিয়াই হেরে গোসল দেওনের কাম। হেয় হেইডারই কাবিল! বলেই হাসু একটা ব্ল্যাঙ্ক ফায়ার করে! লোকজনের একটু ছুটোছুটি দেখে ভীষণ আনন্দ হয় ওর। অন্য রাজাকারদের চোখেমুখেও তৃপ্তির আভা!
একসময় দাফন শেষ হলে সবাইকে তাড়া করে ঘাটে নিয়ে দাঁড়া করায় রাজাকারগুলো। হুইসেলের পর হুইসেল বাজিয়ে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে ওরা। শোনেন, একেক নাও একেক ফাই যাইব। সব নাও এক ফাই যাইতো পারবো না। একটা নাও পুবে যাইবে তার দশ মিনিট বাদে আরেক নাও খাড়া পশ্চিমে। নাও বাইবা। আর দল পাকাইবা তা অইবো না! বলেই রাজাকারটা গুড়–ম গুড়–ম দু রাউন্ড ফাঁকা গুলি করে। মুহূর্তে ভয়ার্ত পরিবেশের সৃষ্টি হয় আশাপাশে। ঠিকই দশ মিনিটের আগে একটা নৌকাও যেতে দিচ্ছে না। সব মানুষ জড়ো হয়ে আছে ঘাটে। ঘাটের পাড়ে। ওরা নিরস্ত্র। রাজাকারদের হাতে অস্ত্র। যে কোনো সময় যে কারও বুকে গুলি চালিয়ে দিলেও কারও বলার কিছু নেই, ওরা সব পারে। ভেবে মানুষগুলোর মুখ শুকিযে আমচুর। চোখেমুখে হতাশা কখনও আতঙ্ক। শেষে লাশ গোর দিতে এসে ওরাই বুঝি লাশ হতে যাচ্ছে। একসময় ভিড় হালকা হয়ে এলে রাজাকারদের নৌকো তরতর করে এগিয়ে যায় থানা সদরের দিকে।
ডাক্তার হাফিজের গুণগ্রাহীর অভাব নেই। চিকিৎসা দিয়ে সেবা করবে বলে যে অবসরের পর ঢাকা শহর ছেড়ে গ্রামে চলে আসে, তার শুভাকাক্সক্ষীর তো অভাব হতে পারে না। যে রোগী ওষুধ কিনতে পারে না তাকে ওষুধ দেয় নিজের ডিসপেনসারি থেকে বিনে পয়সায়। তখন তার চল্লিশায় মানুষ তো হবেই। মানুষের ওপর মানুষ। চারদিকে থই থই জল। আর জল ছাপিয়ে আসছে মানুষ ডাক্তার বাড়িতে। থই থই মানুষ বাড়িজুড়েÑ যেন কোনো দ্বীপের হাটে মানুষের ভিড়। দ্বীপের চারপাশে জল আর জল। দুপুরের আগখানে সে ভিড় উপচে পড়বে যেন। নৌকোর সারি। তার সঙ্গে আছে কোষা, কোন্দা, ভেলা কতকী জলবাহন মানুষ আসছে। যেদিক তাকাও মানুষ। এমনিতে জল আর যুদ্ধ মানুষেকে ঘরবন্দি করে রেখেছে। সুযোগ নেই যখন তখন ঘরের বাইরে যাবার। পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার এ এক মোক্ষম সুযোগ যেন। মৃতের সৎকার অনুষ্ঠান। সেখানে কোনো ভয় নেই। তার সঙ্গে অনেকের ঘরে খাবার জুটছে না ঠিকমতো। বর্ষায় ফসল নেই। খাবার নেই। কাজও নেই, যুদ্ধ চলছে দেশে। সে সঙ্গে ডাক্তারের প্রতি ভালোবাসা। সব মিলিয়ে মানুষ আসছে। বেশুমার আসছে। আয়োজকদেরও এ নিয়ে ভাবনা নেই। ডা. হাফিজের চল্লিশায় মানুষ আসবে না তো কার ওখানে আসবে? এমনকি ধারণা সবার। সে পরিকল্পনা নিয়েই চুলো বেঁধেছে উঠোনজুড়ে। হাঁড়ি চড়িয়েছে এক দুই তিন… গুনে শেষ করা যায় না। নদীর ওপার থেকেও হাড়ি জোগাড় করা হয়েছে লোক পাঠিয়ে।
দুপুর যখন একটু হেলছে। ছায়ারা একটু একটু করে বড় হচ্ছে। প্রথম ব্যাচে লাইন ধরে মানুষ বসেছে উঠোনজুড়ে। কুকুর আর কাকের উৎসব চারদিকে। তখনই তিন তিনটে হেলিকপ্টার পত পত পত করে উড়ে এলো তিন দিক থেকে। একটা হেলিকপ্টার অনেক নিচে নেমে এলো। ওপর থেকে ইশারা দিল নোকজনকে সরে যেতে। উঠোন ছেড়ে মানুষ ছড়িয়ে পড়তেই হেলিকপ্টারটা নেমে আসে। ল্যান্ডিং করে উঠোনে। কপ্টারের পাখার প্রচ- ঘূর্ণিতে মানুষের শরীরে কাঁপন ধরে যাবার জোগাড়। গায়ের কাপড় উড়ে যাবে যেন। একসময় পাখা শান্ত হতেই সাত-আটজন পাকসেনা স্টেনগান, এলএমজি এমনি অত্যাধুনিক অস্ত্র তাক করে নেমে আসে লাইন ধরে। মেজর রুশদিকে ঘিরে অন্য সৈন্যরা দাঁড়িয়ে পড়ে। সবার চোখেমুখে বাঘের হিংস্রতা। চোখ ফেটে পড়বে যেন ক্রোধে। রক্ত জমাট বেঁধে আছে সবকটি চোখের মণিতে। মেজর রুশদি গর্জে ওঠে,
Ñ ইধার কায়া হো রাহা হ্যায়? ইত্না আদমি কিউ?
যাদের মুখে দাড়ি আছে পাঞ্জাবি পরনে মাথায় টুপি অর্থাৎ দেখতে মৌলভি গোছের। বোঝা যায় ওরা মুসলমান, এমনি পাঁচ-ছ’জন মরুব্বি এগিয়ে যায়। মুরুব্বিরাও দেখতে পাঞ্জাবিদের মতো। লম্বায় ছ-ফুট প্রত্যেকেই। এদের মধ্যে প্রথমে এগিয়ে গেল রফি হক, তার পেছনে রিয়াজ। এরপর করিম ব্যাপারি ও তার ছেলে জামাল। ফের কর্কশ কণ্ঠে কঁকিয়ে ওঠে মেজর রুশদি। কেয়া হুয়া? কোই বাত নেহি কারনে হো? আসলে সবাই দীর্ঘদেহী হলেও কারও মুখ থেকে কথা সরছে না। আতঙ্ক তো আছেই, তার ওপর ভাবছে ওরা উর্দুতে বললে হয়তো কোনো বিপদ হবে না। কিন্তু উর্দুতো আর ওরা তেমন জানে না। ছোটবেলায় মাদ্রাসায় এক-আধুটা পড়েছে। তার ওপর মিলিটারি সামনে। বন্দুক তাক করা, তাই মুখে কিছু উঠছেও না এখন।
Ñ কেয়া বাথ হ্যায়, খামোশ কিউ হু? ইধার ক্যোয় মুক্তি কা ট্রেনিং হো রাহা হ্যায়? ইয়ে কেয়া তুম লগোকা মুক্তিকা ট্রেনিং ক্যাম্প হ্যায়? শা…লা কো বাচ্ছে!
Ñ ইয়ে এক মসুলিম ক্যা ঘর হ্যায়। ইধার এক মুরদা কা চেহলাম হো রাহা হ্যায়।
Ñ কিয়া মুরদা?
Ñ এক আদমি ইন্তেকাল ফরমাইয়ে উসকো চেহলাম।
Ñ কসিকা চেহলাম হ্যায়!
Ñ এক ডক্টর! বহুত পরহেজগার অর সাচ্চা মুসলমান হো। লোগেকে বহুত কাম আতে হে। ডক্তারকা ইন্তেকাল হো গেয়া, উনকা চেহলাম।
Ñ কিসকা চেহলাম?
Ñ ডক্টর সাবকো!
Ñ ডক্টর সাব! নাম কিয়া থা?
Ñ ডক্তটর হাফিজ!
ডাক্তার হাফিজ! সাচ্চা মুসলমান থে? ইয়াকিন নেহি আতা! বলেই ঠাস করে এক চড় কষায় রফি হকের গালে। অপ্রস্তুত রফি। অত বড় শরীর সামলাতে পারে না। হেলে যায় শরীর। উয়ো সাচ্চা মুসলমান থা? উয়ো মালাউন থা, উতো মুক্তি লোগোকা সাথ বেতাথা; ইনকে চারপুস্ত মালাউন হ্যায়। উয়ো ইন্ডিয়ান সরকারকে এজেন্ট থা। অর তুম উনকো সাচ্চা মুসলমান কা নাম দে রেহে হো। তুম শালা নিমকহারাম। ঝুটে! বলেই হাঁটু বরাবার লাথি ঝাড়ে মেজর। এবার হুমড়ি খেয়ে পড়ে রফি। রিয়াজ দু-হাত করজোড়ে অসহায় হয়ে বলল, উনকো মারিয়া মাত, উয়ো চিটার হ্যায়, হেড টিচার! উ বহাত খানদানি আদমি হ্যায়!
Ñ কেয়া বোলা তম উ চিটার হ্যায়?
Ñ হ্যাঁ ইয়ে আদমি টিচার হ্যায় হেড টিচার।
Ñ নেহি, উ, টিচার নেহি, উ চিটার হ্যায়। তুম বাঙালি লোগো মে টিচার, ডাক্তার, জার্নালিস্ট সবকে সব বেইমান, নিমকহারাম, মুসলমান কে দুশমন হো!
তুম ভি শালা দালাল, উন লোগোকে বারে মে, বাত কারণে আয়ে হো। বলেই রফিকের নাক বরাবর এক ঘুষি মারে মেজর। মুহূর্তে কলকলিয়ে রক্ত ঝরতে থাকে নাক গলিয়ে। তুমলোক সবকে সব ঝুটে হো। তুম লোগোকে সারছেগাও তাত্ ঝুট হি ঝুট, তোম লোক কা পাকিস্তান কে হারামকে অওলাদ হো।
ওদের তুলনায় জামানের বয়স কিছুটা কম। ওর হাত নিশপিস করে। বড় দুই মামার গায়ে এভাবে হাত তোলায় দারুণ যন্ত্রণায় পুড়ছে ও। বিবেকের কাছে ক্ষত-বিক্ষত হচ্ছে। একবার নিজের হাতের দিকে তাকায়। একবার আকাশের দিকে তাকায়। আকাশে একটা হেলিকপ্টার তখনও চক্কর দিচ্ছে। আরেকটা চলে গেছে কখন যেন। জামান তড়িঘড়ি জল নিয়ে রিয়াজের নাকে ছিটাতে থাকে।
Ñ ইয়ে পাহলোয়ান, তুমকে কিসমে বোলা পানি দেনে কে লিয়ে। তোমকা মুক্তি হো? গর্জে ওঠে মেজর রুশদি।
Ñ নেহি, ইয়ে আদমি গভ. অফিসার হ্যায়, ব্যাংক কে ম্যানেজার।
Ñ কেয়া বোলা তুম মে, ব্যাংক ম্যানেজার! শালা বেইমান কা বাচ্চা, খাতারনাক তুমলোক খ্যাতে হো পোহেনাতে হো পাকিস্তানক্যা, অর ইন্ডিয়াকো রুপিয়া ভেস্তে হো, শুয়োর কা বাচ্চা, তোমলোক সবকেসব ঝুঁটে মাক্কার। বলেই রফির পাছায় লাথি ঝাড়ে জোরসে। রক্তাক্ত মুখ নিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ে ও উঠোনে।
এবার করিম ব্যাপারি এগিয়ে যায়। মেজর সাব, ইধার সব মুসলমান হ্যায়। আপ ভি তো মুসলিম হ্যায়! ইয়া এক মুসলমান আদমি কা চেহেলাম চালরাহা হ্যায়। আপকো কোই গলদ ফাহেমি হুয়া হ্যায়। ইধার কোই পাকিস্তান কো দুশমন নেহি হ্যায়। আপ খামোখা সবকো দারা রেহে হ্যায়। খোদা কো লিয়ে আপলোক সামঝিয়ে ইধার সব সাচ্চা মুসলমান হ্যায়। আপলোক জুলুম করনা বান্ধ কি জিএ।
Ñ কেয়া বোলা তুম মে, জুলুম!
Ñ কিসকো তুম জুলুম কারনা বলতে হো? তুম মুক্তিলোক হামলোগোকো তাংকাররোহে হো, আমলোগোকো ক্যাম্প জ্বালারেহে হো, হামলোগোকে গাড়ি জ্বালালেহে হো, এক কে বাদ এক ক্ষতিকাররেহে হো অর সাচ্চা মুসলমানলোগোকো তুম জানছে মাররেহে হো? এরপর চোখে ইঙ্গিত করে সিপাহীদের বলল, ইয়ে সাচ্চা মুসলমানলোগোকো থোরা খেল দিখা দো। ওর ইঙ্গিত পেয়ে আর্মিরা করিমকে ফুটবল বানিয়ে খেলতে থাকে। এক লাথিতে এদিকে ফেলে তো আরেক লাথিতে ওদিকে হুমড়ি খেয়ে পড়ে।
জামান এবার এগিয়ে যায়। ওকে কাছে আসতে দেখে মেজর চুকচুক করে ওঠে! পাহলোয়ান সাব তুম কিউ ইধার আ রেহে হো, কুচ বলনেকা হেয়?
Ñ ইয়ে আদমি মেরা আব্বু হ্যায়। আপলোক কিউ সব লোগোকে সামনে উনকো বেইজ্জত করর‌্যাহে হেয়। আব্বু এক সাচ্চা মুসলমান হ্যায়, পাচ ওয়াকত নামাজ কোরান পারতেহো।
Ñ পাহলোয়ান সাব ইধার আও। তুম কিয়া মুক্তি হো!
করিম ব্যাপারি ছ-ফুটের বেশি লম্বা। ফর্সা। চাপ দাড়ি নাভি ছাড়িয়ে পড়েছে। দিঘল চোখ। সে চেবাখে পবিত্র এক আলো। তারই অবিকল জামান। কেবল ওর মুখে দাড়ি নেই। ওকে ফের কাছে ডাকে ইধার আও পাহলোয়ান। তুম মুক্তি হ্যায়?
Ñ নেহি সাব! ম্যায় বিজনেস কারতে হ্যায়।
Ñ বিজনেস! কিসকে বিজনেস?
Ñ মেরা খুদকা পাট কা বিজনেস হ্যায়!
জুট! ঠোঁট কামড়ে মাটিতে জোরে একটা ঠেকা দিল বুট জুতো দিয়ে। ঠকাস করে শব্দ হতেই চমকে ওঠে অনেকেই।
Ñ ইধার তো সবলোক কো গাদ্দার হ্যায়। ইস সময় তুম পাকিস্তান ম্যা জুট না ভেস্কে তুম ইন্ডিয়ামে ভেসরেহে হো। মালাউন লোগো কে সাত দোস্তি বারারেহে হো!
Ñ নেহি সাহাব! যুদ্ধ কে লিয়ে সব কামকাজ বন্ধ হ্যায়।
Ñ কে বোলা তুমি মে যুদ্ধ! কাঁহা দেখা তুম মে যুদ্ধ!
Ñ যুদ্ধ ক্যা মতলব ওয়্যার? তোতলাতে থাকে জামান!
Ñ ওয়্যার! তুম কাঁহা দেখা? পুরা বাঙ্গাল মুল্লুক মে শান্তি হ্যায়। আর তুম লোক মালাউন কে সাত মিলকে যুদ্ধ যুদ্ধ বলকে, তামাম জাঁহা মে আগুয়া ফ্যায়লা রাহো হো। সাচ বাদ ইয়ে তো কি হ্যায় তুমলোক ইন্ডিয়াকা এজেন্ট হো। অর ইন্ডিয়াকে লিয়ে কাম কাররাহে হো। মুচকি হেসে তোমরা কাপড়া ওঠাও।
Ñ ম্যায় সাচ্চা মুসলমান মেরা খাতনা হুয়া হ্যায়। ক্ষোভে, ক্রোধে, ভয়ে রীতিমতো কাঁপতে থাকে জামান।
Ñ পাহেলে পাঞ্জাবি কা হতা গোটাও।
জামান পাঞ্জাবির হাতা গুটিয়ে ওপরে তোলে। কনুইয়ের ভাঁজ হাত দিয়ে ঘষে ঘষে দেখে মেজর। এরপর ফের লুঙ্গি তুলতে বলে! জামান অবাক হয়ে তাকায়! ভাবে সত্যি সত্যি ওর লিঙ্গ দেখতে চাচ্ছে মেজর সাব! তাই বাধ সাধে ও, হাম সাচ্ বাদ বল রাহা হে, মেরা খাৎনা হুয়া হ্যা! মেজর একটু মুচকি হেসে বলে, না না, হাঁটুকা ওপার মে তোলো।
জামান হাঁটু অবধি লুঙ্গি তোলে। হাঁটুর ভাঁজে খসখসে পুরু চামড়া বারবার হাতে ঘষে দেখে মেজর। সামরিক প্রশিক্ষণ নিয়েছে কি না তার প্রমাণ খোঁজে হাঁটু-কুনুইয়ের ভাঁজে-ভাঁজে। এরপর পাঞ্জাবি খুলতে বললে তা-ও খুলে দেখায় জামান। ওঠো ঠিক হ্যায়।
বাড়িজুড়ে থই থই মানুষ, উপচে পড়া মানুষ হলেও সবাই মুখে কলুপ এঁটেছে। কারও মুখে কথা নেই। নীরব দর্শক সবাই। শুনশান নীরবতা চারদিকে। এত মানুষের ভিড়ে এমন নিঃসীম নীরবতা নেমে আসে কেমন করে। যেন ভুতুড়ে বাড়ি এটা। জনমানব শূন্য। এমনিতে উত্তর-দক্ষিণ, পূর্ব-পশ্চিমে যতদূর জলাভূমি, নামাভূমি বিল আর হাওড় আছে, সবখানে লাশ আর লাশ। যুদ্ধের শুরু থেকে এ এক নিত্যকার চিত্র। লাশর ওপর লাশ। নদীতে ভেসে যাচ্ছে লাশ। নারী পুরুষ শিশুর লাশ আর লাশ। গরু ভেড়া ছাগল এমনি কত মড়া ভেসে যাচ্ছে গলিত অর্ধগলিত, উলঙ্গ, চোখহীন, অঙ্গহীন অসংখ্য লাশ ভাসছে। লাশ জমে আছে স্তূপ হয়ে অনেকগুলো আবার বাঁশের চালির মতো দড়ি দিয়ে পাশাপাশি বাঁধা। ওদের হাত বাঁধা। চোখ বাঁধা। লাশের সারি নদীর স্রোত ধরে নেমে যাচ্ছে ভাটির টানে। লাশ ঠুকরে ঠুকরে মাংস খেয়ে মাছেরাও এখন ক্লান্ত।
সেসব লাশের ওপর নজর পড়েছে চিল শকুন আর কাকের। দিনভর এরা উড়ে বেড়ায় চালায় নামার ভূমিতে জমে থাকা বর্ষার জলের ওপর। মাছের দিকেও ওদের দৃষ্টি। যখন তখন ছোঁ মেরে মাছ তুলে নিচ্ছে জলের গভীর থেকে। তাই দিনভর ডাক্তার বাড়ির সামনের খোলা প্রাঙ্গণে জলের ওপর কাকের ডাক, চিলের কান্না আর শুকনের কুঁই কুঁই ডাক। আজ ওদের ভিড় আরও বেড়েছে। ওদের ডাক আরও চড়া সুরে বাজছে খোলা চাতালজুড়ে। অনেকগুলো গরু কাটা হয়েছে। কাটা হয়েছে খাসি। মুরগিও ধড়ফড় করে নীরব হয়ে গেছে চিরতরে অসংখ্য। সুতরাং ভুঁড়ি ভোজের আয়োজন শুধু আজ ডাক্তারবাড়ি জুড়ে নয়, সে আনন্দ কাক ছিল, শকুন আর কুকুরদের প্রাণেও ছড়িয়েছে। ডাকাডাকি আর কলরব চারদিকে মুখর করে রেখেছে ওরা। কিন্তু পাকসেনারা আসার পর ডাক্তারবাড়ির শ্মশান নীরবতা ওদেরও যেন ছুঁয়ে গেছে পলে পলে। ছুঁয়ে যাচ্ছে সারাবাড়ির আতঙ্ক আর নিঃশব্দতাকেও। সবদার বাড়ির জঙ্গলে উঁচু বাঁশঝাড়ে কয়েকটা শকুন দিনভর কোঁকাচ্ছিল। কাঁদছিল যেন শিশুর মতো। সেই শকুনগুলো যেন হঠাৎ সব ডাক ভুলে গেছে। ভুলে গেছে ওড়াউড়ি। মাঝেমাঝে গলা উঁচিয়ে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছিল। ফের স্থির। একই চিত্র নুরুদের তালগাছের মাথায় বসে থাকা শকুনগুলোর বেলায়ও। চিলেরা দু’ডানা ছড়িয়ে কেবল দিঘল ছায়ায় ঢেকে দিচ্ছে জল। কোনো ডাকাডাকি নেই। শিকারের পাঁয়তারা নেই। ওড়ার কোনো ছন্দ নেই। গতি নেই কেবল দু’ডানা ছড়িয়ে সমান্তরাল উড়ে চলেছে। অনেকদূর চলে গিয়ে ফের ফিরে আসছে। কেমন হাহাকার যেন ওদের আচরণে উড়ে যাওয়ার মাঝেÑ সবখানে। গোরু খাসির বর্জ্য পড়ে আছে পেছনে এক পরিত্যক্ত ঘাটে। কিন্তু সেখানে মুখ দেয়ার, খুঁটে দেখার কোনো আগ্রহ নেই চিল আর কাকেদের। বিশেষ করে কুকুরগুলো হঠাৎ হঠাৎ সমস্বরে কুঁই কুঁই করে ডেকে উঠছে প্রলম্বিত সুরে। তখন বেহাগের করুণ সুর যেন চারদিকের সকল অস্তিত্বকে ভেঙে চুরমার করে দিচ্ছে। অনেকগুলো নেড়ি কুকুর দূরে বসে লেজ নাড়ছে কেবল। চোখে পিটুটি না জল ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। এমনিতে ভরা বর্ষায় খাবার না পেয়ে দূরে কোথাও যেতে না পেরে কুকুরগুলোর ত্রাহী ত্রাহী অবস্থা। তারপরও খাবারের প্রতি আজ ওদের বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই। বরং মনে হচ্ছে বর্জ্যগুলো পাহারা দিচ্ছে বিশ্বস্ততার সঙ্গে। সবখানে গাঢ় এক নীরবতা। সব উদ্দাম, উচ্ছলতা আর প্রগলভতা হারিয়ে ওরা যেন দিকশূন্য। কিংবা চরিত্র শূন্য হয়ে ওরা ভুলে গেছে কেন এসেছে এ পৃথিবীতে। কী তার কাজ। কি তার ভূমিকা। তার আচরণই বা কী। নীরব নিশ্চয়ল গতিহীন গতিহারা পথভুলো হয়ে যেন ওরা পাক খাচ্ছে এখানে-ওখানে। নিঃশব্দে। নিঃসীম নীরবে।
মেজরের ইশারায় পাকসেনাদের সবকটি মাথা কাছাকাছি হয়। কী যেন শলাপরামর্শ করে। তারপর সব লোকজনদের বলে লাইন করে দাঁড়াতে। তখন মনির খান তাদের আপ্যায়নের অনুরোধ জানায়।
তোমাদের জন্য সবাই না খেয়ে আছে। তোমরা আমাদের সঙ্গে খেলে আমরা খুশি হবো এটা মুসলমানের অনুষ্ঠান!
Ñ ফের তুম খুদ কো মুসলমান বোল বেহে হো। তুম কোই ভি মুসলমান নেহি হ্যায়। তুমলোক মালাউনকা বাচ্চা হো!
বলেই সবাইকে লাইন ধরতে বলে। তার আগে রফি, রিয়াজসহ প্রথম পাঁচজনকে আলাদা করে লাইন করে দাঁড় করায়। এরপর শয়ে শয়ে মানুষের লাইন। ওরা আটজন আর্মি দুদিকে গেটের মতো দাঁড়িয়েছে। ওদের মাঝখান দিয়ে একজন একজন করে পার হচ্ছে। খুব কাছ থেকে দেখছে সবাইকে। যাচাই করছে তীক্ষè চোখে। তারপর যাকে সন্দেহ হচ্ছে তাকে আলাদা করে লাইনে দাঁড় করাচ্ছে। এমনি করে বাছাই পর্ব শেষ হতে হতে সন্ধ্যা উৎরে যায়। এরই মধ্যে আরও একটা হেলিকপ্টার আসে। দুটো হলিকপ্টার থেকে সার্চলাইট ফেলা হয় উঠোনে। এমনি করে আগের পাঁচজনসহ আরও ষোলোজনকে এক লাইনে দাঁড় করায়। এবার একুশজনকে বলে, ইজি হয়ে দাঁড়াও। মার্চ করো। মার্চ করতে করতে পশ্চিম বাড়ির ঘাটে এনে দাঁড় করায় ওদের। ঘাটের ডান পাশে ঢিবি মতো উঁচু জায়গা। ওখানে এ বাড়ির মসজিদ আর মক্তব।
মসজিদ দেখিয়ে করিম ব্যাপারি বলে,
Ñ তোম লোগোকো ইয়েকিন নেহি আতা হ্যায় তো চালো মাসজিদ মে চলো। তোমলোক দোখমে উধার আমপারা হ্যায়, কোরান মজিদ হ্যায়। সব বাচ্ছে লোক ইধার আকে কোরান মজিদ পাড়তে হ্যায়। নামাজ পাড়তে হ্যায়।
Ñ রাখদো তোমারা কোরান! ওয়াক্ত আনেসে দেখ লেংগে।
এ ঘাটটি পশ্চিম উঠোনের পাড়ে বাঁধা হয়েছে। খেজুর গাছ, তালগাছ আর মোটা মোটা সব গাছের গুঁড়ি ফেলে ঘাটটি তৈরি। এমনি আরেকটি ঘাট আছে পুববাড়ির শেষে। বর্ষার জলে স্নান করা ধোয়া-মোছার সব কাজ চলে এ ঘাটে। সময়ে নৌকো কোষা ডিঙ্গি এসে ভেড়ে।
ওদের সঙ্গে সঙ্গে হেলিকপ্টার দুটোও চলে আসে ঘাটের কাছে। সার্চলাইট মাঝে মাঝে জ্বালছে আবার নিভিয়ে দিচ্ছে। হেলিকপ্টারের বাতাসে জলে তোলপাড়। বেশ বড় বড় ঢেউ উঠছে। ঢেউ এসে মাথা কুটছে ঘাটে। উঠোনের পাড়ে পাড়ে। কখনও লাইটের আলোয় অনেকদূর চোখে পড়ে। ধু-ধু জল চারদিকে। কপ্টারের বাতাস যদ্দুর যাচ্ছে কেবল ঢেউ আর ঢেউ। একুশজন মানুষ কেউ কারও দিকে তাকাচ্ছে না। নিশ্চয় মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে। কী বলছে ওদের মন, পড়া যাচ্ছে না। পাকসেনাদের মতিগতিও বোঝা যাচ্ছে না। কেন এত মানুষ থেকে ওদেরকে বাছাই করল, কেন লাইন করে ওদের নিয়ে এলো। কেন দাঁড় করিয়ে রাখছে। কী করতে চায় কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। পিনপতন নীরবতা চারদিকে। ওদের পেছন পেছন আসা মানুষেরা কেউ কাছে যেতে পারছে না। আবার না বলা পর্যন্ত এ স্থান ছেড়ে যাওয়াও নিষেধ। তাই সবাই দূর থেকে দেখছে সব। ওদের কণ্ঠ শুকিয়ে কাঠ। চোখ পাথরের মতো খরখরে আর স্থির। চোখে-মুখে আতঙ্ক। শরীরে রক্ত নিশ্চল, জমে আছে যেন। ভেতর বাড়িতে কারা যেন ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। সে কান্না থামাতে কেউ কেউ আবার ফিসফিসিয়ে বোঝাচ্ছে। সব মিলিয়ে এক গুমোট আবহ। তখনই এক হুজুর কোষায় চড়ে ঘাটে এসে ওঠে। তাকে দেখামাত্র কাছে ডাকে মেজর।
Ñ তুম কিয়া চ্যাতে হো।
Ñ ম্যায় ইস মসজিদকা মোয়াজ্জেম হো। মাগরিবকা ওয়াকতা হুয়া হ্যায়। ম্যায় আজান দুংগা।
Ñ আজান! কাফের লোগোকা আজান দিয়া? তোমলোগোকা কিসকা নামাজ। তামাশা কাররেহে হো। গোলি মার দেঙ্গে শালা।
মোয়াজ্জিন আর কথা না বাড়িয়ে যন্ত্রের মতো স্থির হয়ে যায় মুহূর্তে।
Ñ ইধার আও, অর ইধার-ওধার মাত দেখো সিধে সামনে যাও!
মোয়াজ্জিন পড়িমরি করে ভেতর বাড়ির দিকে ছুট দেয়। এবার একে একে ঘাটের দিকে নামিয়ে আনে একুশজনকে। এক লাইনে জায়গা হয় না সবার।
দুসরা লাইন কোরো। দুসরা লাইন। এক সৈনিকের আদেশে ওরা তালগাছ, খেজুর গাছের গুঁড়িতে দু-লাইনে দাঁড়ায়। তখন হেলিকপ্টারের সার্চলাইট বেশ কবার জ্বলে-নেভে। হঠাৎ দূরের মানুষগুলোকে তাড়া দেয় পাকসেনারা। জমে থাকা মানুষেরা আরও দূরে সরে গেলে হঠাৎ মেজর বাদে বাকি সাত আর্মি মুহূর্তে ব্রাশফায়ারে কাঁপিয়ে তোলে পুরো তল্লাট। কিছু মানুষের তীব্র আর্তনাদ মুহূর্তে স্তব্ধ হয়ে যায়। কিছু মানুষ কোঁকাতে থাকে তীব্র যন্ত্রণায়। কার মুখ থেকে যেন পানির জন্যে আকুতি ফোটে। কিন্তু ঠিক বোঝা যায় না। বোঝা গেলেও কিছু করার নেই। সীমার বনে গেছে সবাই। পাথরের মতো কঠিন। এছাড়া আর কোনো পথ নেই! একুশটি মানুষের রক্তে একাকার হয়ে যায় ঘাটের জল। কালচে জলে এখন লালচে আভা। গভীর সংবেদনশীল এক রং এসে যেন মেশে সে জলে। পানি পানি বলে এতক্ষণ কোঁকাচ্ছিল, কাতর সে কণ্ঠও একসময় নীরব হয়ে আসে। তখনই দূর থেকে ভেসে আসে আজানের ধ্বনি। তবে হেলিকপ্টারের তীব্র কর্কশ শব্দে সে ধ্বনি হারিয়ে যায়। শেষবারের মতো লাশগুলো ফের যাচাই করে দেখে পাকসেনারা। কোনো লাশের বুকে বুট দিয়ে চেপে ধরে। কোনোটার মাথায় কিক মারে জোরসে। কারও পেটের ওপর লাফাতে থাকে। শেষে এক হাবিলদার বলে, সব কে সব খতম হো যায়া স্যার। থ্যাঙ্কু, বলে তৃপ্তির হাসি হাসে মেজর। এবার একটু একটু করে দুটো কপ্টারই নেমে আসে নিচে। ল্যান্ডিং করে না। ওপর থেকে মই নামিয়ে দেয় নিচে। তরতর করে দুভাগে ভাগ হয়ে পাকসেনারা উঠে যায় ওপরে। কপ্টারের আলোয় যদ্দুর চোখ যায়, শুধু রক্ত আর রক্ত, ভরা বর্ষার জলে। লালচে জল ঢেউ হয়ে ছড়িয়ে পড়ে, ঘাটে এসে আছড়ে পড়ে কী এক কষ্টে। কপ্টারের পাখার বাতাসে জলের বুকে মুধু তোলপাড়। জলে শুধু রক্তের কাঁপন! কাঁপা কাঁপা জল! কাঁপা কাঁপা ঢেউ এসে বারবার মাথা কুটছিল ঘাটে। ফের তলিয়ে পড়ছিল গড়িয়ে পড়ছিল কালচে রক্ত ধারা।
হঠাৎ যখন একঝাঁক গুলির শব্দে একুশটি প্রাণ ঝরে পড়ল অকালে। তখন সব নীরবতা ভেঙে রাতের অন্ধকার খান খান করে সব মগ্নতা ছাপিয়ে চিল-শকুনেরা সরব হয়। কিন্তু এ ডাক কান্নার চেয়ে ভয়ঙ্কর। এ ওড়া, ডানা ঝাপটানো কেমন ভৌতিক আর পৈশাচিক। দীঘল পাখার ছায়ায় অনেকদূর ঢেকে যায়। যেন বুকের খাঁজ ভেঙে ভেঙে ভেতরে সেধিয়ে যাচ্ছে সে কান্না। পাখিদের ভৌতিক ছায়া সারা শরীরে কাঁপন ধরিয়ে দেয়। কান্না ওদের থামে না। প্রহরের পর প্রহর কেটে যায়। ওরা কেঁদেই চলেছে রাতের নীরবতাকে ছাপিয়ে। সেসব কান্নার সঙ্গে মিলে যখন শকুনেরাও কান্না জুড়ে দেয়, তখন মনে হয় বর্ষার ধু-ধু জল, জলের গভীরে লুকিয়ে থাকা মাছ, শ্যাওলা, কচুরিপানা, গাছের পাতা, গাছের কা-, গাছের ছায়া স-ব সব কিছু এক গভীর শোকে একাকার হয়ে মিশে যাচ্ছে অন্ধকারে।
প্রকৃতির সঙ্গে মিশে থাকা, অস্তিত্বের সঙ্গে একাকার হয়ে যাওয়াÑ এসব অনুষঙ্গের এমনই যন্ত্রণা অনেকের মনে এত গভীর ছায়া ফেলে যে, মুখে কোনো কথা সরে না তাদের। সোলেমান নীরবে লাশগুলো দেখছিল তন্ময় হয়ে। চুলো খোঁড়া থেকে খড়ি চেলা করা, মাংস কাটা সর্বকাজের সঙ্গে গতকাল থেকে জড়িয়েছিল সোলেমান। রফির কথামতো সব করছিল ও অথচ সেই মানুষটা এখন নীরব। ওর তাজা রক্ত জলের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে একটু একটু করে। বিড়বিড় করে বলে, খবিশ, পাষ-! পশুপাখিরও দয়া মায়া আছে। কেমন তড়পাইতাছে বুক ফাটতাছে বুঝি। কে কয় পশুপাখি বেবুঝ, সব বুঝে হেরা। বেজন্মাগুলির তাও নাই। পশুর চাইতে অধম এরা। খাড়ার উপরে এককুড়ি একটা মানুষরে লাশ বানাইয়া দিল। এত মাডি কই, গোর দিব ক্যামনে! মহা দুঃশ্চিন্ত কাজ করে সোলেমানের মনে।
একুশটি শরীর এর ওর ওপর পড়ে আছে। কোনোটা অর্ধেক ডুবে আছে জলে। কোনোটা ভাসছে। ততক্ষণে অনেকগুলো হ্যারিকেন আর হ্যাজাক বাতির আলো এসে ভিড় করেছে ঘাটে। কিন্তু গভীর কষ্টের ভিড়ে সে আলো ম্লান হয়ে যায় মুহূর্তে। অনেক মানুষের ভিড় সেখানে। ওরাও জানে না কেন এসে দাঁড়িয়েছে এই অবেলায় ঘাটে। দূর থেকে, বহুদূর থেকে শুধু কেঁপে কেঁপে রক্তজল আসছে। কালচে লাল সে জলে ভাসছে একুশটি লাশ। জলগুলো ছুঁয়ে ছুঁয়ে কী এক ভালোবাসায় যেন ভিজিয়ে দিচ্ছে একুশটি শরীর। ঢেউগুলো কেঁপে কেঁপে কী এক যন্ত্রণায় যেন ভেঙে পড়ছে বারবার!

Category:

Leave a Reply