বিভাগ: প্রতিবেদন, সংসদ

জাতিসংঘসহ বিশ্ব নেতৃবৃন্দের প্রতি আহ্বান

22

সংসদে সর্বসম্মত প্রস্তাব পাস : রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে

রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ফিরিয়ে নিয়ে নাগরিকত্ব অধিকার ও নিরাপদে বসবাসের ব্যবস্থা গ্রহণে মিয়ানমার সরকারের ওপর জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিকমহলের জোরাল কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগের আহ্বান জানিয়ে আনীত সাধারণ প্রস্তাব গত ১২ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হয়েছে।
সরকার ও বিরোধীদলের সংসদ সদস্যরা অভিন্ন কণ্ঠে রোহিঙ্গা ইস্যুতে জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনান কমিশনের রিপোর্ট পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নে বিশ্ব নেতৃবৃন্দকে মিয়ানমার সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টির আহ্বান জানিয়েছেন। মিয়ানমারকে বর্বর রাষ্ট্র আখ্যায়িত করে জাতিসংঘ শান্তি বাহিনীর মাধ্যমে দেশটিতে সেফ জোন তৈরি করে রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা প্রদানের দাবি জানিয়ে তারা বলেন, মিয়ানমারে যা হচ্ছে তা সম্পূর্ণ গণহত্যার শামিল। তারা মধ্যযুগীয় বর্বরতাকেও হার মানিয়েছে। তাই রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে মিয়ানমারে ফিরিয়ে নিয়ে নাগরিকত্বের অধিকার দিয়ে নিরাপদে বসবাসের ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। এ বিষয়ে মিয়ানমার সরকারের ওপর জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিকমহলের জোরাল কূটনৈতিক চাপ প্রয়োজন। যাতে তাদের নাগরিক ফেরত নিতে মিয়ানমার সরকার বাধ্য হয়। আর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মুসলমান বলে জায়গা দেননি, মানুষ হিসেবে সম্পূর্ণ মানবিক কারণে দেশে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছেন। তাই এই ইস্যুতে বিশ্ব নেতৃবৃন্দকে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আমাদের দেশের জঙ্গিগোষ্ঠীরা এসব রোহিঙ্গাকে তাদের ফায়দা হাসিলে ব্যবহার করতে না পারে সেজন্যও সরকারকে তাদের কঠোর নজরদারির মধ্যে রাখতে হবে।
স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে সংসদ অধিবেশনে কার্যপ্রণালি বিধির ১৪৭ বিধির আওতায় সন্ধ্যা সোয়া ৭টায় সাধারণ প্রস্তাবটি উত্থাপন করেন সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি এমপি। প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় অংশ নেন বিরোধী দলের নেতা রওশন এরশাদ, বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ এমপি, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী এমপি, সরকারি দলের শেখ ফজলুল করিম সেলিম এমপি, ড. মহিউদ্দীন খান আলমগীর এমপি, অ্যাডভোকেট আবদুল মতিন খসরু এমপি, ড. হাছান মাহমুদ এমপি, মেজর জেনারেল (অব.) এটিএম আবদুল ওয়াহহাব এমপি, সাইমুন সারোয়ার কমল এমপি, ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি ও বিমানমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন এমপি, জাসদের মইন উদ্দীন খান বাদল এমপি, শিরীন আক্তার এমপি, তরিকত ফেডারেশনের নজিবুল বশর মাইজভা-ারী এমপি ও বিরোধী দল জাতীয় পার্টির ফখরুল ইমাম এমপি। সরকার ও বিরোধী দলের সরব অংশগ্রহণে দীর্ঘ আলোচনা শেষে স্পিকার প্রস্তাবটি ভোটে দিলে তা সংসদে কণ্ঠভোটে সর্বসম্মতক্রমে গৃহীত হয়।
রোহিঙ্গা ইস্যুটি জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনে তুলে ধরা হবে
প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা শেখ হাসিনা মানবিক কারণে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গাদের সাময়িক আশ্রয় প্রদানের কথা তুলে ধরে বলেছেন, কে হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ বা খ্রিস্টান তা আমরা দেখিনি, আমরা মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখি এবং মানবিক কারণেই পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের সাময়িক আশ্রয় দিয়েছি। আমরা তো অমানুষ ও অমানবিক হতে পারি না বলেই সহিংসতার শিকার রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়িয়েছি। তবে মিয়ানমার সরকার এ সমস্যার সৃষ্টি করেছে, সমাধানও তাদেরই করতে হবে। প্রয়োজনে প্রতিবেশী দেশ হিসেবে আমরা তাদের সহযোগিতা করতে পারি। অবশ্যই বাংলাদেশে আসা তাদের প্রত্যেক নাগরিককে মিয়ানমার সরকারকে ফেরত নিতে হবে। প্রয়োজনে মিয়ানমারে সেফ জোন সৃষ্টি করে তাদের নিরাপদ বসবাস নিশ্চিত করতে হবে। মিয়ানমার সরকারকে অবশ্যই স্বীকার করতে হবে এদেশে আসা রোহিঙ্গারা তাদের দেশেরই নাগরিক। জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনানের তদন্ত প্রতিবেদন ও সুপারিশ বাস্তবায়নের দাবি জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, দুর্ভোগের শিকার হয়ে বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গা ইস্যুতে কেউ যেন রাজনীতি বা রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের চেষ্টা না করে। আবার কেউ যেন রোহিঙ্গাদের নিয়ে নিজেদের ভাগ্য গড়া বা ব্যক্তিগত ফায়দা লোটার চেষ্টা না করে। সাহায্য বা সহযোগিতা না করে কেউ বড় বড় স্টেটমেন্ট দেবেন, সেটি হবে না। আমরা দেশের ১৬ কোটি মানুষের মুখে খাবার তুলে দিচ্ছি। আর এই ৪-৫ লাখ লোকের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার ক্ষমতাও আমাদের রয়েছে। সত্যিকার যারা এসেছে তাদের আইডেনটিটি থাকবে, ছবি থাকবে। সাময়িকভাবে তাদের আশ্রয় দেওয়ার ব্যবস্থা নিয়েছি। এটা সাময়িক ব্যবস্থা। মিয়ানমারকে অবশ্যই তাদের নাগরিকদের ফিরিয়ে নিতে হবে। এই ইস্যুটি জাতিসংঘের আসন্ন সাধারণ অধিবেশনে জোরালভাবে তুলে ধরার কথাও জানান প্রধানমন্ত্রী।
স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে ১১ সেপ্টেম্বর সংসদ অধিবেশনে সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি কর্তৃক রোহিঙ্গা ইস্যুতে কার্যপ্রণালি বিধির ১৪৭(১) বিধি অনুসারে আনীত প্রস্তাবটি (সাধারণ) সমর্থন জানিয়ে বক্তব্য প্রদানকালে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। সন্ধ্যা সোয়া ৭টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত প্রায় পৌনে তিন ঘণ্টার সাধারণ আলোচনায় সরকার ও বিরোধী দলের মোট ১৬ জন বক্তব্য রাখেন। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য শেষ হলে স্পিকার প্রস্তাবটি ভোটে দিলে তা সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হয়।
আলোচনায় অংশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, রোহিঙ্গারা মিয়ানমারেরই নাগরিক। ১৯৫৪ সালেই মিয়ানমারের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রোহিঙ্গাসহ দেশটির সকল ক্ষুদ্র গোষ্ঠীকে সমান অধিকার প্রদানের ঘোষণা দিয়েছিলেন। অথচ তাদের নাগরিকত্ব কেড়ে নিয়ে এখন তাদের দেশ থেকে বিতাড়ন করা হচ্ছে। সেখানে রোহিঙ্গাদের ওপর যেভাবে অত্যাচার-নির্যাতন করা হচ্ছে তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। গোটা বিশ্ব বিবেকের হৃদয়কে নাড়া দিয়েছে এ ঘটনা।
তিনি বলেন, মিয়ানমার থেকে গত কয়েক দিনে কয়েক লাখ মানুষ এ দেশে আসতে বাধ্য হয়েছে। অত্যাচারের যে চিত্র দেখলাম তা বলার ভাষা খুুঁজে পাচ্ছি না। রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের নাগরিক। এটা তো সবাই জানে। ১৯৭৪ সালে মিয়ানমারের মিলিটারি জান্তা তাদের অধিকার কেড়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করে। ’৮১ ও ’৮২ সালে তারা যে আইন করে সেখানে চার স্তর বিশিষ্ট সিটিজেনশিপ চালু করে। এর উদ্দেশ্য ছিল তাদের অধিকার কেড়ে নেওয়া। একটা জাতির ওপর মিয়ানমার সরকার এ ধরনের আচরণ কেন করছে তা জানি না। আমরা বারবার রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ নিয়ে প্রতিবাদ করছি। আমি যে ক’বার মিয়ানমার সফর করেছি তাদের বলেছি আপনারা আপনাদের নাগরিক আমাদের দেশ থেকে ফিরিয়ে নিন। ফিরিয়ে নেওয়া তো দূরের কথা। তারা উল্টো তাদের ওপর অত্যাচার চালাতে লাগল।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০১২ সালে ও ২০১৬ সালে দুষ্কৃতকারীরা তাদের পুলিশের ওপর হামলা চালায়। এর জেরে সাধারণ মানুষদের ওপর অত্যাচার চালানো শুরু করে। শিশুর লাশ নাফ নদীতে ভাসছে। গুলি খাওয়া মানুষ আছে। মেয়েদের ওপর পাশবিক অত্যাচার করা হয়েছে। আমরা তো মানুষ। তাদের আশ্রয়ে নিষেধ করব কীভাবে? আমাদের তো অভিজ্ঞতা রয়েছে। ১৯৭১ সালে আমাদের সঙ্গে পাকিস্তানিরা যে ঘটনা ঘটিয়েছিল সেসব চিত্র চোখের সামনে ভেসে উঠেছে। আমরা তো ভুক্তভোগী ছিলাম। আমিও তো ছয় বছর ধরে রিফিউজি হয়ে ছিলাম। রিফিউজি হয়ে থাকার কষ্ট আমরা জানি। তাই এদের আশ্রয় দিয়েছি মানবিক কারণে, অন্য কোনো কারণে নয়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রত্যেক দেশের সঙ্গে আমরা সুসম্পর্ক বজায় রেখে চলতে চাই। মিয়ানমার সরকারকে বলতে চাই, রোহিঙ্গাদের ভোটের অধিকার কেড়ে নেওয়া, হঠাৎ রোহিঙ্গাদের দেশ থেকে বিতাড়িত করার ফলাফল কি হতে পারে সেটা কি তারা চিন্তা করছে। তিনি বলেন, আমরা কখনই এ ধরনের কর্মকা-কে সমর্থন করব না। উদাহরণ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে অশান্ত পরিবেশ ছিল। এই অশান্ত পরিবেশ মোকাবেলা করতে সামরিকভাবে সমাধানের চেষ্টা করা হতো। ’৮১ সালে দেশে এসে ঘোষণা দিয়েছিলাম এটা সামরিকভাবে সমাধান করা সম্ভব নয়। রাজনৈতিকভাবে সমস্যার সমাধান করতে হবে। পরে সরকারে এসে আমরা শান্তিচুক্তি করি। ভারতে থাকা আমাদের সকল নাগরিককে ফেরত এনে তাদের পুনর্বাসন করি। তিনি বলেন, আমাদের দেশের নাগরিক অন্য দেশে রিফিউজি হয়ে থাকবে এটা মোটেই দেশের জন্য সম্মানজনক নয়। মিয়ানমার সরকারকে এটা আমরা বার বার বলেছি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মুসলমানদের ওপর হামলা-নির্যাতনের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে মুসলমানদের ওপর হামলার ঘটনা দেখতে পাই। সমস্ত মুসলিম উম্মাহ যদি এটা অনুভব করত বা ঐক্যবদ্ধ থাকত তাহলে এ ধরনের ঘটনা ঘটত না। তিনি বলেন, অং সান সু চি নিয়ে অনেকে কথা বলেছেন। মিয়ানমারে কেবল গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু হয়েছে। কিন্তু আইন করে সু চি’কে ক্ষমতা দেওয়া হয়নি। তাকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এ হিসেবে সেখানে সেনাবাহিনীর প্রতিনিধি বেশি। এখানে অং সান সু চি’রই বা ক্ষমতা কতটুকু সেটাও ভেবে দেখা দরকার। তিনি বলেন, মিয়ানমারের এক জেনারেল ঘোষণা দিয়েছেন এরা সব বাঙালি। বাঙালি তো পৃথিবীর অনেক দেশেই রয়েছে। আর বাঙালি বলেই কি এভাবে নির্যাতন করবে, তাড়িয়ে দেবে? তারা তো বছরের পর বছর সেখানে বাস করছে।
বাংলাদেশের মাটি ব্যবহার করে প্রতিবেশী দেশে কোনো সন্ত্রাসী কর্মকা- পরিচালনা করতে না দিতে তার সরকারের দৃঢ় অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যারা (দেশটির সন্ত্রাসী গোষ্ঠী) মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও পুলিশ ব্যারাকে হামলা চালিয়েছে তারা কি অর্জন করছে? তারা এটা কি বোঝে না তাদের কারণে আজ লাখ লাখ মানুষের ওপর পাশবিক অত্যাচার হচ্ছে। এ অবস্থা কেন তারা সৃষ্টি করে দিচ্ছে? যারা তাদের অস্ত্র জোগান দিচ্ছে হয়তো তারা লাভবান হচ্ছে। তাদের সন্ত্রাসী কার্যক্রমের কারণে আজ মিয়ানমারের সাধারণ নাগরিক কষ্ট পাচ্ছে। এসব বন্ধ করতে হবে। আমি বলেছি, প্রয়োজনে সন্ত্রাসীদের ধরতে যৌথভাবে কাজ করতে পারি। তবে গুটিকয়েক সন্ত্রাসীর কারণে লাখ লাখ নিরীহ মানুষের ওপর অত্যাচার-নির্যাতন কেন? শিশু-নারীরা কি অপরাধ করেছে? এটা আমরা মানতে পারি না, মানতে চাই না। যারা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে তাদের প্রত্যেককে ফিরিয়ে নিতে হবে। প্রয়োজনে সেফ জোন করে তাদের থাকার ব্যবস্থা করতে হবে। রাখাইন রাজ্য থেকে যাদের বিতাড়ন করা হয়েছে তাদেরও ফেরত নিতে হবে। আনান কমিশন রিপোর্ট বাস্তবায়ন করতে হবে। এই সমস্যা মিয়ানমার সৃষ্টি করেছে এর সমাধান মিয়ানমারকেই করতে হবে।

পাঠকের মন্তব্য:

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না। তারকাচিহ্নযুক্ত (*) ঘরগুলো আবশ্যক।

*