বিভাগ: কূটনীতি

জাতিসংঘ মহাসচিব ও বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্টের বাংলাদেশ সফর

জিম ইয়ং কিম বলেন, আমি সংকটের ভয়াবহতা প্রত্যক্ষ করেছি। আমি নারী ও পুরুষদের সঙ্গে কথা বলেছি, যাদের কঠিন পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছে এবং নিজেদের গ্রামে ফিরে যাওয়ার সুযোগের অপেক্ষায় এখনও দৃঢ় রয়েছে।

PM6মো. রাজীব পারভেজ: দুদিনের সফরে জুলাই মাসের শুরুতে বাংলাদেশে এসেছিলেন জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস ও বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিম। জাতিসংঘের মহাসচিব ও বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠক করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত এমপির সঙ্গে বৈঠকে তারা দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন নিয়ে কথা বলেন। তাদের এই সফরে সর্বাধিক গুরুত্ব পেয়েছে রোহিঙ্গা সংকট। তারা দুজনই কক্সবাজারের বিভিন্ন শরণার্থীশিবির ঘুরে দেখেন। রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে তাদের জীবন বাঁচানোর জন্য জাতিসংঘের মহাসচিব ও বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর প্রশংসা এবং ধন্যবাদ জানান।
সেনাবাহিনীর দমন-পীড়নের মুখে পালিয়ে গত বছরের ২৫ আগস্টের পর মিয়ানমারের রাখাইন থেকে ৭ লাখ রোহিঙ্গা মুসলিম সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে ঢুকেছে। তারা শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নিয়েছে। এর আগে আসা ৪ লাখের মতো রোহিঙ্গা গত কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশে রয়েছে। এখন ১১ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে শরণার্থী। মিয়ানমার সেনাবাহিনীর রাখাইনে রোহিঙ্গা নিধন অভিযানকে জাতিসংঘ ‘জাতিগত নির্মূল অভিযান’ বলে আসছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এই রোহিঙ্গা সংকটকে এশিয়ার এ অঞ্চলে সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে বড় শরণার্থী সমস্যা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দুই প্রধানের বৈঠক
বাংলাদেশ সফরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস ও বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিম। রোহিঙ্গা সংকট প্রশ্নে বাংলাদেশকে জাতিসংঘ এবং বিশ্বব্যাংকের সমর্থন অব্যাহত রাখার প্রতি জোর দিয়েছে বৈঠকে বলেছেন গুতেরেস ও কিম। রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানে মিয়ানমারের ওপর আরও চাপ দেওয়ার কথা বলেছেন জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। তিনি বলেন, আমরা মিয়ানমারের ওপর চাপ অব্যাহত রেখেছি। আমাদের এই চাপ আরও বাড়াতে হবে, যাতে রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানে কী করা উচিত তা মিয়ানমার বুঝতে পারে। রোহিঙ্গা সমস্যা শুধু বাংলাদেশ নয় বিশ্ব-সমস্যা। মিয়ানমারের আরাকান থেকে ১৯৭৭ সালে প্রথম রোহিঙ্গাদের পালিয়ে বাংলাদেশে আসার কথা এবং পরে ১৯৮২ ও ১৯৯১ সালের বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশে তাদের প্রবেশের কথা বৈঠকে তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমার সরকার যে চুক্তি করেছে, তা বাস্তবায়নে কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে বলে মনে হচ্ছে না।
জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো কয়েক মাস থেকে বলে আসছেÑ বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়ে থাকা শরণার্থীরা যাতে স্বেচ্ছায়, নিরাপদে এবং সম্মানের সঙ্গে নিজেদের দেশে ফিরে যেতে পারে এবং এই প্রত্যাবাসন যাতে আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুসরণ করে হয়, তা নিশ্চিত করার পরিবেশ তৈরি করতে হবে মিয়ানমারকে। এরই মধ্যে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে সহযোগিতা দিতে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের সঙ্গে আলাদা চুক্তি করেছে ইউএনএইচসিআর। কক্সবাজারে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের জন্য স্বাস্থ্যসহ সকল সেবা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে যেসব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে; সেগুলো বৈঠকে তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, টেকনাফে এই বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেওয়ায় স্থানীয় জনগণের অসুবিধা হচ্ছে। উন্নত বাসস্থান সুবিধা দিতে প্রায় ১ লাখ রোহিঙ্গাকে ভাসানচরে স্থানান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশে আশ্রয় দেওয়ায় শেখ হাসিনা সরকারের প্রশংসা করেন গুতেরেস। বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গারা যেন উগ্রপন্থায় জড়িয়ে না পড়ে; এটাই তাদের মূল উদ্বেগের বিষয়। রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে জাতিসংঘের সহায়তা অব্যাহত রাখায় আন্তোনিও গুতেরেসের প্রশংসা করেন শেখ হাসিনা।
আন্তোনিও গুতেরেস জাতিসংঘ মহাসচিব পদে দায়িত্ব নেওয়ার বেশ আগে থেকেই রোহিঙ্গা সংকট সম্পর্কে জানতেন। তিনি ২০০৫ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনার (ইউএনএইচসিআর) হিসেবে রোহিঙ্গাসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে শরণার্থী সংকট নিয়ে কাজ করেছেন। গত বছরের ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে নতুন করে নিধনযজ্ঞ শুরুর পর পরিস্থিতি তুলে ধরে ২ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ মহাসচিব জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদকে নজিরবিহীন এক চিঠি লেখেন।
বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিম উন্নয়ন ও মানবিক ইস্যুতে একসাথে কাজ করার কথা বলেছেন। কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সহায়তায় বিশ্বব্যাংক ইতোমধ্যে বাংলাদেশকে ৪৮ কোটি ডলার দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। বাংলাদেশ এবার বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অঙ্কের ঋণ পাচ্ছে জানিয়ে জিম ইয়ং কিম বলেন, এতেই প্রমাণ হয় যে শেখ হাসিনার নেতৃত্বের প্রতি তাদের আস্থা রয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট সাক্ষাৎকালে বলেছেন, এলডিসি থেকে উত্তরণের পরও বিশ্বব্যাংকের বোর্ডে তিনি বাংলাদেশকে কনসেশন রেটে ঋণ দেওয়ার কথা বলবেন। বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিম বাংলাদেশের বর্তমান উন্নতি দেখে খুবই অভিভূত। তিনি বলেন, বাংলাদেশ অল্প সময়ে বেশ উন্নতি করেছে। দেশ বর্তমানে অন্যান্য দেশের অনুকরণীয়। প্রেসিডেন্ট আরও বলেন, দেশের উন্নয়নে সব সময়ে পাশে থাকবে বিশ্বব্যাংক। এ বছর বাংলাদেশকে ৩ বিলিয়ন ডলার (প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকা) ঋণ দেবে বিশ্বব্যাংক। রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী এবং দেশের জনগণের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতে আস্তোনিও গুতেরেস ও জিম ইয়ং কিম দুজনই বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রশংসা করেন। জঙ্গি নির্মূলে বাংলাদেশের কার্যক্রমেরও প্রশংসা করেন জাতিসংঘের মহাসচিব।
মানবিক কারণে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিলেও বাংলাদেশের পক্ষে তাদের ভরণপোষণ ও যতদিন এখানে অবস্থান করবেন ততদিন সুস্থ জীবন নিশ্চিত করা কষ্টকর হয়ে পড়েছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে রোহিঙ্গাদের সহায়তায় তাদের পাশে এসে দাঁড়ানোর জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিশ্বনেতাদের আহ্বান জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর আহ্বানে সাড়া দিয়ে এরই মধ্যে বিভিন্ন দেশ ও দাতা সংস্থা এগিয়ে এসেছে। দুই বিশিষ্ট ব্যক্তির সফরে মিয়ানমারকে যারা সমর্থন করে আসছেন তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি হবে এবং দ্রুত রোহিঙ্গা সংকট নিরসন হবে বলে আশা করা যায়।

শরণার্থী ক্যাম্পে গুতেরেস এবং কিম
বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের বাস্তবচিত্র দেখতে কক্সবাজারের উখিয়ায় শরণার্থী ক্যাম্পে আসেন জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এবং বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিম। গত ২ জুলাই সকালে উখিয়ার বালুখালী ক্যাম্পে পৌঁছে তারা প্রথমেই ক্যাম্পের ট্রানজিট পয়েন্ট পরিদর্শন করেন। তারপর কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্প এবং নারীদের আলাদা আশ্রয়স্থল পরিদর্শন করেন। জাতিসংঘের মহাসচিব ও বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট পরে রোহিঙ্গাদের কয়েকটি ক্যাম্প ঘুরে দেখেন। এর আগে জাতিসংঘের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা রোহিঙ্গা ক্যাম্প সফর করে গেলেও সংস্থাটির মহাসচিব এই প্রথম তাদের দেখতে গেলেন। পরিদর্শন শেষে কুতুপালং এক্সটেনশন ক্যাম্পে সংবাদ সম্মেলন করে তাদের দৃষ্টিতে দেখা সার্বিক চিত্র তুলে ধরেন সফররত জাতিসংঘের মহাসচিব ও বিশ্বব্যাংক-প্রধান। মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের দুঃখ-দুর্দশা নিজের চোখে দেখা ও নিজের কানে শোনার পর জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেছেন, তারা বিচার চায়। নিরাপদে ঘরে ফিরে যেতে চায়। কক্সবাজারের কুতুপালং শরণার্থীশিবির ঘুরে দেখেছেন তিনি। এ-সময় তিনি রোহিঙ্গাদের মুখ থেকে শুনেছেন তাদের পালিয়ে আসার কাহিনি।
আন্তোনিও গুতেরেস বলেছেন, রোহিঙ্গাদের যে দুঃখ কষ্ট তিনি দেখেছেন তাতে তার হৃদয় ভেঙে গেছে। ছোট ছোট রোহিঙ্গা শিশুদের দেখে আমার নাতি-নাতনিদের কথা মনে পড়ে গেছে। তাদের অবস্থাও যদি এমন হতো তা হলে কী রকম হতো, বলেন গুতেরেস। জাতিসংঘ মহাসচিব জানান, রোহিঙ্গারা যাতে দেশে ফিরে যেতে পারেন সেজন্য তারা কাজ করছেন। তবে তিনি বলেছেন, তাদের ফিরে যাওয়া শুধু সেখানে অবকাঠামো তৈরির বিষয় নয়। তারা যাতে সম্মানের সাথে ফিরে যেতে পারে সেটা নিশ্চিত করতে হবে। মিয়ানমারে পরিকল্পিতভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘন করা হচ্ছে উল্লেখ করে বলেন, এ অবস্থা এভাবে চলতে পারে না। এর একটা সমাধান করতে হবে।
জিম ইয়ং কিম বলেন, আমি সংকটের ভয়াবহতা প্রত্যক্ষ করেছি। আমি নারী ও পুরুষদের সঙ্গে কথা বলেছি, যাদের কঠিন পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছে এবং নিজেদের গ্রামে ফিরে যাওয়ার সুযোগের অপেক্ষায় এখনও দৃঢ় রয়েছে। বাংলাদেশ সরকার তার সীমান্ত উন্মুক্ত রেখে এবং শরণার্থীদের সহায়তা দিয়ে মহান কাজ করেছে। তবে আরও অনেক কিছুই করা দরকার। বর্ষাকালের অব্যাহত বৃষ্টিপাত ও আসন্ন ঘূর্ণিঝড়, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও রোগব্যাধি ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ছে। এ অবস্থায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরও সহায়তা নিয়ে এগিয়ে আসা প্রয়োজন।
দেশে ফিরে এক বিবৃতিতে বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্ট রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ায় বাংলাদেশের মহানুভবতার প্রশংসা করে শরণার্থী ও তাদের আশ্রয় প্রদানকারী স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সহায়তায় বিশ্বব্যাংকের প্রতিশ্রুতির প্রতি গুরুত্ব আরোপ করেন। তিনি বলেন, ব্যাপক শরণার্থী আগমনের মাধ্যমে সৃষ্ট ভয়াবহ পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশকে তার চমকপ্রদ উন্নয়ন অগ্রগতি ধরে রাখতে সহায়তা করবে বিশ্বব্যাংক। আমরা ৪৮ কোটি ডলার অনুদান দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি, যা এই সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশের সক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক হবে।
রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের জন্য সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত একটি ঘটনা। জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস ও বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিমের বাংলাদেশ সফর ও রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গুরুত্ব পাবে। আমরা আশা করছি, তাদের এই সফর প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে ভূমিকা রাখবে।

পাঠকের মন্তব্য:

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না। তারকাচিহ্নযুক্ত (*) ঘরগুলো আবশ্যক।

*