বিভাগ: সম্পাদকীয়

জাতীয় ঐক্যের রাজনীতি ও বিদেশিদের কাছে ধর্না

সম্পাদকের কথা: একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে স্বাভাবিকভাবেই দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন ক্রমেই সরগরম হয়ে উঠছে। একদিকে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোট যেমন তাদের গত ১০ বছরের সাফল্যের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার লক্ষ্যে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। অন্যদিকে নানা কিসিমের বিরোধী দলগুলো জোটবদ্ধ হওয়ার চেষ্টা করছে। ইতোমধ্যে সাবেক রাষ্ট্রপতি বদরুদ্দোজা চৌধুরীর নেতৃত্বে ঐক্য প্রক্রিয়া এবং ড. কামাল হোসেনের উদ্যোগে ‘জাতীয় ঐক্য’ অভিন্ন মঞ্চে শামিল হয়েছে। সর্বশেষ এই জাতীয় ঐক্যের উদ্যোগের সঙ্গে শামিল হয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলÑ বিএনপি। নিঃশর্তভাবে তারা ড. কামাল হোসেন ও ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরীর নেতৃত্ব মেনে নিয়ে তাদের ভাষায় ‘বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য’ গড়ে তোলার কথা বলছেন। যদিও কামাল হোসেন ও বদরুদ্দোজা চৌধুরী বলেছেন জামাতকে নিয়ে তারা কোনো ঐক্য করবেন না; তবুও এর সম্ভাবনা বিএনপি কিন্তু উড়িয়ে দেয়নি। তারা কোনো-না-কোনো ফর্মে জামাতকে সাথে রাখার কথা মাথায় রেখেই বলেছে, জাতীয় ঐক্য হলে ২০-দলীয় জোটও তার অঙ্গীভূত হবে।
এর পাশাপাশি বামদলগুলোও বিশেষত সিপিবি-বাসদ এর সাথে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আরও কয়েকটি ‘বাম’দল ‘বিকল্প শক্তি’ গড়ে তোলার লক্ষ্যে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। বামদলের নেতা মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম আওয়ামী লীগ ও বিএনপি’কে এক পাল্লায় মেপে সমদূরত্বের নীতি যেমন নিয়েছে তেমনি স্পষ্ট করেই বলেছে তারা বিএনপি বা আওয়ামী লীগ, কারও সাথেই জোটবদ্ধ হবে না। অথচ মজার বিষয়, সম্প্রতি ঢাকা মহানগর নাট্যমঞ্চে অনুষ্ঠিত ‘জাতীয় ঐক্যের’ আনুষ্ঠানিক সমাবেশে বামপন্থি জোটের জোনায়েদ সাকি ও প্রকৌশলী শহীদুল্লাহ কেবল উপস্থিত হননি, ঘোষণাও পাঠ করেছেন।
এই তিন মেরুকরণের বাইরেও আরও কিছু ছোট ছোট দল জোটবদ্ধ হওয়ার চেষ্টা করছে। এসব জোটবদ্ধতা নিয়ে গণতান্ত্রিক শক্তির তেমন উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। অন্ধ, কালা, কানা, ল্যাংড়া, খোঁড়া এবং  বুদ্ধি প্রতিবন্ধীদের ঐক্যের ডাক তাদের প্রতিবেশীদের কানেও পৌঁছায় না। গণভিত্তিহীন এসব নাম ও নেতাসর্বস্ব দল ঐক্যবদ্ধ হলেই বা কী, না হলেই বা কী! কিন্তু এ-কথা সত্য এই পঙ্ক্তিতে বিএনপি পড়ে না। নিঃসন্দেহে বিএনপি একটি বড় দল। যদিও এই দলটি ক্রমশ সংকোচিত হচ্ছে এবং তাদের গণধিকৃত চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া দুর্নীতির দায়ে আদালতের রায়ে শাস্তি ভোগ করছেন এবং বিএনপির বয়সে জুনিয়র কিন্তু পদাধিকারে সিনিয়র তারেক রহমান মানিলন্ডারিং-এর মামলায় দ-প্রাপ্ত হয়ে আদালতের ভাষায় পলাতক। খালেদা-তারেক তাদের পাপের শাস্তি ভোগ করছেন। শীঘ্রই আরও মামলার রায় বেরুলে তাদের পাপের বোঝা এতটাই ভারী হবে যে, অলৌকিক কিছু না ঘটলে তাদের রাজনৈতিক জীবনও বিপন্ন হয়ে পড়বে।
বিএনপি ও জামাতে ইসলামি রাজনীতির এই বাস্তবতা সম্যক উপলব্ধি করে। তাদের কাছে এটা পরিষ্কার যে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলে বিএনপি নেত্রী খালেদা ও তারেক শাস্তি এড়াতে পারবে না, আর যদি উচ্চ আদালতের এই রায় বহাল থাকে, তাহলে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রতিক্রিয়ায় জামাত এখন অস্তিত্বের সংকটে ভুগছে। যে কোনো প্রকারে আওয়ামী লীগ এবং শেখ হাসিনাকে ক্ষমতা থেকে (এমনকি দুনিয়া থেকেও) সরিয়ে দিতে পারলেই তারা তাদের ‘পুরনো স্বর্ণযুগ’ ফিরে পেতে পারে।
বিএনপি-জামাতের আন্তর্জাতিকভাবে ভাবাদর্শগত মিত্র ও প্রভু পাকিস্তান। পাকিস্তান সুযোগ পেলেই বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে যে অতীতে নানাভাবে হস্তক্ষেপ করেছে এটা আমাদের জানা আছে। আঞ্চলিক রাজনীতি তাদের অনুকূলে আনার জন্য বাংলাদেশে একটি পাকিস্তানপন্থি সরকার প্রতিষ্ঠা জরুরি। এজন্য লন্ডনে অবস্থানরত তারেক রহমানকে তারা, বিশেষত পাকিস্তানি সামরিক গোয়েন্দা বাহিনীÑ আইএসআই সর্বতোভাবে মদদ দিয়েছে। এখন বাংলাদেশের সাধারণ নির্বাচনকে সামনে রেখেও তারা সর্বাত্মক চেষ্টা করবে, যাতে আওয়ামী লীগকে হটিয়ে বিএনপি-জামাতকে পুনরায় ক্ষমতায় নেওয়া যায়। এজন্য বৈধ-অবৈধ কোনো পথই তারা বাদ দেবে না।
পাকিস্তানের নীলনকশায় বিএনপি, বদরুদ্দোজা চৌধুরী, কামাল হোসেন গং-এর সাথে তথাকথিত বামদের একাংশকে মিলাবার জন্য দৃশ্যত জামাতকে আড়ালে রেখেই তথাকথিত জাতীয় ঐক্য গড়ার চেষ্টা করছে। এই ঐক্য যে একটা ষড়যন্ত্রমূলক তৎপরতা, তা বোঝার জন্য কারও পা-িত্যের প্রয়োজন পড়ে না। বিএনপি ও জাতীয় ঐক্যের সংবিধানবিরোধী নির্বাচনকালীন সরকারের ফর্মুলা, শেখ হাসিনার অধীনে কোনো নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করার ঘোষণা এবং আল্টিমেটাম দিয়ে সরকার উৎখাতের হুঙ্কার প্রভৃতি কারণেই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এই ঐক্যকে ষড়যন্ত্রমূলক আখ্যা দিয়েছেন। সংবিধানবহির্ভূত কোনো দাবি বা ফর্মুলা যে সরকার মানবে না, এটা বুঝেও তারা জনগণকে বিভ্রান্ত করার উদ্দেশ্যে প্রচারণা চালাচ্ছে। তারা দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করে ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করতে চাইছে।
কেবল এসব করেই তারা ক্ষ্যান্ত থাকছে না। বিদেশে গিয়ে জাতিসংঘ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিম্নপদস্থ কর্মকর্তাদের কাছে ধর্না দিচ্ছেন। দেশের ভেতরে বিদেশি দূতাবাসের কর্মকর্তাদের দাওয়াত দিয়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে তাদের হস্তক্ষেপ করার জন্য অনুরোধ-উপরোধ ও আর্তনাদ করছেন। এটা যে আশি বা নব্বইয়ের দশকের মতো ‘শীতল যুদ্ধের যুগ নয়, বাংলাদেশের জনগণ যে অতীতের মতো এখন আর বিদেশিদের মুখাপেক্ষী নয়, সর্বোপরি বিশ্ব রাজনীতির ডায়নামিকস যে পরিবর্তন হয়ে গেছে, আত্মসম্মানবোধহীন বিএনপি নেতারা এই কা-জ্ঞানটুকুও হারিয়ে ফেলেছে। কোনো বিদেশি শক্তি (পাকিস্তান ও দোসররা ছাড়া) যেমন বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করতে আগ্রহী নয়, তেমনি তাদের কারও মাতব্বরী বাংলাদেশে জনগণ মেনে নেবে না।
বিএনপি-জামাত যে স্বপ্ন দেখছে, তা দুঃস্বপ্ন হয়েই থাকবে। বাংলাদেশের জনগণ অতীতের যে কোনো সময়ের তুলনায় জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ। কোনো ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত বাংলার মাটিতে কার্যকর হবে না। চক্রান্ত-ষড়যন্ত্র বাদ দিয়ে সকল রাজনৈতিক দল-জোটের উচিত সংবিধানের কাঠামোর মধ্যেই একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া। সকল দলের অংশগ্রহণে একটি অবাধ নিরপেক্ষ শান্তিপূর্ণ নির্বাচনই পারে যে কোনো রাজনৈতিক সংকট এড়াতে। আমরা আশা করব, বিরোধী দলগুলোর শুভবুদ্ধির উদয় হবে। তারা যত খুশি জোট বা এলায়েন্স করুন, সেটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে শক্তিশালীই করবে, যদি না ষড়যন্ত্র ও অসাংবিধানিক পথ পরিহার করা হয়। আমরা উৎসবমুখর পরিবেশে সবাইকে নির্বাচনী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার আহ্বান জানাচ্ছি।

পাঠকের মন্তব্য:

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না। তারকাচিহ্নযুক্ত (*) ঘরগুলো আবশ্যক।

*