বিভাগ: প্রতিবেদন

জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার রায়: খালেদার ৭ বছর জেল

উত্তরণ প্রতিবেদন: জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় কারাবন্দি বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে সাত বছরের সশ্রম কারাদ- দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে অন্য তিন আসামিকেও সাত বছরের সশ্রম কারাদ- প্রদান করেছেন আদালত। খালেদা জিয়াসহ প্রত্যেককে ১০ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। জরিমানা অনাদায়ে আরও ছয় মাসের কারাদ-ের আদেশ দিয়েছেন আদালত। এছাড়া ট্রাস্টের নামে কেনা কাকরাইলে ৪২ কাঠা জমি বাজেয়াফত করে তা রাষ্ট্রের অনুকূলে নেওয়ার আদেশ দেওয়া হয়েছে। মামলার অন্য আসামিরা হলেনÑ খালেদা জিয়ার তৎকালীন রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরী, বিআইডব্লিউটিএ’র নৌ নিরাপত্তা ও ট্রাফিক বিভাগের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক জিয়াউল ইসলাম মুন্না এবং ঢাকার সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকার একান্ত সচিব মনিরুল ইসলাম খান। ঢাকার নাজিমুদ্দিন রোডের পুরনো কেন্দ্রীয় কারাগারের ভেতরে বসানো পঞ্চম বিশেষ জজ আদালতের অস্থায়ী এজলাসে পিনপতন নীরবতার মধ্যে বিচারক ড. মো. আখতারুজ্জামান গত ২৯ অক্টোবর এই রায় ঘোষণা করেন। ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারা এটিই সর্বোচ্চ শাস্তি। একই সঙ্গে দ-বিধির ১০৯ ধারায় আসামিদের শাস্তি দেওয়া হয়। বিচারক রায়ে ১৫টি বিবেচ্য বিষয় ছাড়াও পর্যবেক্ষণে বলেছেন, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতায় থেকে অপরাধমূলকভাবে ব্যক্তিগত ট্রাস্টের অনুকূলে অবৈধভাবে অর্থ সংগ্রহ করে তিনি (খালেদা জিয়া) যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, তা কখনও কাম্য হতে পারে না। ভবিষ্যতে যাতে ওই পদে (প্রধানমন্ত্রী) দায়িত্বে থেকে কেউ যাতে আর অপরাধ না করে তাই এই মামলায় অপরাধীদের সর্বোচ্চ সাজা দেওয়া উচিত বলে আদালত মনে করছেন।
খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতিতে সংক্ষিপ্ত এই রায় দেওয়া হয়। তবে কারাগারে থাকা দুই আসামি জিয়াউল ইসলাম মুন্না এবং মনিরুল ইসলাম খান রায় ঘোষণার সময় আদালতে উপস্থিত ছিলেন। গত ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতির মামলায় খালেদা জিয়াকে পাঁচ বছরের কারাদ- দিয়েছেন একই আদালত। বেলা ১১টা ২৫ মিনিটে বিচারক এজলাসে উপস্থিত হয়ে বিচারকার্য শুরু করেন। শুরুতে দুদকের আইনজীবী মোশারফ হোসেন কাজল বলেন, এই আদালতে দীর্ঘদিন ধরে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ হয়েছে। উচ্চ আদালতের পর আপিল বিভাগে আজ (২৯ অক্টোবর) বিচারকার্য স্থগিতের আবেদন খারিজ করে দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, এই আদালতে আপনার রায় বিচারের আদেশ হিসেবে বহাল থাকবে। আমি রায় পাঠ করে শোনানোর আবেদন জানাচ্ছি। এরপর বিচারক ড. মো. আখতারুজ্জামান সংক্ষিপ্ত রায় পাঠ করা শুরু করেন। এ সময় তিনি আড়াই বছর ধরে চলমান এই বিচারকার্যের সংক্ষিপ্ত বিবরণী পাঠ করেন। অরাজনৈতিক এক ব্যক্তিকে ট্রাস্টি হিসেবে যোগ করা হয়েছে। তাছাড়া সাক্ষী হিসেবে রাখা হয়েছিল আরেকজন অরাজনৈতিক ব্যক্তিকে। তখন খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেশের দায়িত্ব পালন করছিলেন। আর এই ট্রাস্টের সঙ্গে তার দুই ছেলে ছাড়া যারা কাগজ-কলমে জড়িত ছিল তারা সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক ব্যক্তি। খালেদা জিয়া সম্পূর্ণরূপে ক্ষমতার অপব্যবহার করে তার রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরীকে দিয়ে টাকা আত্মসাৎ করিয়েছেন। এক্ষেত্রে হারিছ চৌধুরীর পক্ষে কাজ করেছেন তার ব্যক্তিগত সচিব জিয়াউল ইসলাম মুন্না। তাছাড়া সোনালী ব্যাংকের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে যে টাকাগুলো জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্টের অ্যাকাউন্টে যোগ করা হয়েছে, তাও অবৈধ ছিল। তাছাড়া এই টাকার কোনো প্রমাণ বা দলিল নেই। ব্যাংক হিসাবে খালেদা জিয়ার ট্রাস্টি হিসেবে একক স্বাক্ষর ছিল। এসব কাজে ঢাকার সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকার এপিএস মনিরুল ইসলামও ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন। জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্টের ঠিকানা খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত আবাসস্থলের ঠিকানা ব্যবহার করা হয়েছে। কোনো ট্রাস্টের ঠিকানা এ-রকম হতে পারে না। উনি উনার ব্যক্তিগত বাসাতে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সব সুযোগ-সুবিধা ভোগ করতেন।
আদালত আরও বলেন, প্রসিকিউশনে দাখিলকৃত তথ্য প্রমাণে আসামিদের অপরাধ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। ট্রাস্ট গঠনের একটি উদ্দেশ্যও তারা বাস্তবায়ন করতে পারেন নি। ট্রাস্টের নামে ক্ষমতার অপব্যবহার করে খালেদা জিয়া বিভিন্ন ফান্ড থেকে টাকা জমা করেছেন। আদালত ১৫টি বিষয় বিবেচনায় নিয়ে এই রায় দেন। এর আগে সকালে জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতিতে কারা আদালতে বিচার চলবে সংক্রান্ত আদেশের বিরুদ্ধে করা আবেদন খারিজ করেছেন আপিল বিভাগ। প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বে সাত সদস্যের আপিল বিভাগের বেঞ্চ ২৯ অক্টোবর এই আদেশ দেন। এই আদেশের ফলে জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে রায় ঘোষণা করতে আর কোনো বাধা নেই বলে জানিয়েছেন আইনজীবীরা। আপিলের আদেশের পর বিচারিক আদালত জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার রায় ঘোষণা করা হয়।

পাঠকের মন্তব্য:

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না। তারকাচিহ্নযুক্ত (*) ঘরগুলো আবশ্যক।

*