ডাউন সিনড্রোম বা ডাউন শিশু

Posted on by 0 comment

58ডা. রেজাউল করিম কাজল: ডাউন সিনড্রোম (Down syndrome) বা ডাউন শিশু প্রকৃতির খেয়ালে তৈরি এক বিশেষ ধরনের শিশু। প্রতি ৫০০ হতে ৭০০ শিশুর মধ্যে একটি শিশু ডাউন সিনড্রোম বা ডাউন শিশু হিসেবে জন্মগ্রহণ করতে পারে। আমেরিকায় প্রতিবছর প্রায় ৬ হাজার ডাউন শিশুর জন্ম হয়। বলা হয়ে থাকে, আমাদের দেশে প্রায় ২ লাখ ডাউন শিশু আছে আর প্রতিদিন জন্ম নেয় প্রায় ১৫টি। ডাউন শিশুরা সাধারণত আমাদের সমাজে প্রতিবন্ধী শিশু হিসেবে বেঁচে থাকে। সারাবিশ্বে ২১ মার্চ ‘বিশ্ব ডাউন সিনড্রোম দিবস’ পালিত হয়।
আমাদের শরীর গঠনের সবচেয়ে ক্ষুদ্র অংশকে কোষ বা সেল বলা হয়। প্রতিটি মানব কোষের মধ্যে ২৩ জোড়া ক্রোমোজম নামের অঙ্গাণু থাকে যার অর্ধেক আসে মায়ের কাছ থেকে আর অর্ধেক আসে বাবার কাছ থেকে। কোটি কোটি ডিএনএ-এর সমন্নয়ে এক একটি ক্রোমোজম তৈরি হয়। এই ডিএনএ-কে বলা হয় আমাদের বংশগতির ধারক ও বাহক। অর্থাৎ আমাদের শারীরিক ও মানসিক বৈশিষ্ট্য যেমনÑ আচার-আচরণ, বুদ্ধিমত্তা, চেহারা, উচ্চতা, গায়ের রং সব কিছুই এই ডিএনএ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। অন্যদিকে মানব শরীরে এই ডিএনএ বা ক্রোমোজমের অসামঞ্জস্য দেখা দিলে নানারকম শারীরিক ও মানসিক ত্রুটি দেখা দেয়, যাদের আমরা সাধারণভাবে জন্মগত ত্রুটি বা জেনেটিক ত্রুটি বলে থাকি। ডাউন সিনড্রোম বা ডাউন শিশু সে রকম একটি জেনেটিক ত্রুটিযুক্ত মানব শিশু, যার শরীরের প্রতিটি কোষে ২১নং ক্রোমোজমটির সাথে আংশিক বা পূর্ণভাবে আর একটি ক্রোমোজম (Trisomy 21) সন্নিবেশিত থাকে। আর এই অতিরিক্ত ক্রোমোজমটির কারণে ডাউন শিশুর বিশেষ কিছু শারীরিক ও মানসিক ত্রুটি লক্ষ্য করা যায়। চেহারা একই রকম হয় বলে খুব সহজেই ডাউন শিশুদের চেনা যায়।
ডাউন শিশুদের শারীরিক বৈশিষ্ট্য : ডাউন শিশুদের কিছু নির্দিষ্ট শারীরিক বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায়। যেমনÑ
১. মাংশপেশির শিথিলতা- Reduced muscle ton
২. বামন বা কম উচ্চতা- Short stature
৩. চোখের কোণা ওপরের দিকে উঠানো- Upward slanting Eyes
৪. চ্যাপ্টা নাক- Flattened Nose
৫. ছোট কান- Short Ear
৬. হাতের তালুতে একটি মাত্র রেখা- Single Palmar Crease
৭. জিহ্বা বের হয়ে থাকা ইত্যাদি- Single Palmar Crease
ডাউন শিশুদের মানসিক জটিলতা : অন্য শিশুদের চেয়ে ডাউন শিশুরা শারীরিক ও মানসিকভাবে দেরিতে বেড়ে ওঠে। বেড়ে ওঠার মাইলফলকগুলো যেমন বসতে শেখা, দাঁড়াতে শেখা, হাঁটতে শেখা, কথা বলতে শেখাÑ এসব দেরিতে ঘটে। আবার কেউ কেউ কোনো একটি কখনই শেখে না। ডাউন শিশুরা বেশির ভাগই বুদ্ধি প্রতিবন্ধী হয়ে থাকে। অনেক সময় এরা অত্যন্ত হাসিখুশি ও সংগীতপ্রিয় হয়ে থাকে।
ডাউন শিশুর শারীরিক জটিলতা : বেশির ভাগ ডাউন শিশুর জন্মগত হার্টের সমস্যা থাকে, যার কারণে অনেকেই জন্মের পর মারা যায়। কারও কারও হার্টের অপারেশনের প্রয়োজন হয়। শুধু তাই নয়, ডাউন শিশুদের অনেকেই লিউকেমিয়া, থায়রয়েড সমস্যা, দৃষ্টিশক্তি ও শ্রবণশক্তির সমস্যা, পরিপাকতন্ত্রের সমস্যা, জীবাণু সংক্রমণ, শারীরিক স্থূলতা ইত্যাদি জটিলতায় ভুগতে পারে। ডাউন শিশুদের গড় আয়ু সাধারণ মানুষের চেয়ে কম।
কী কারণে ডাউন শিশুর জন্ম হয় : ঠিক কী কারণে মায়ের গর্ভে ডাউন শিশুর জন্ম হয়, তা সম্পূর্ণ জানা যায়নি। তবে এ কথা প্রমাণিত, যে কোনো নারী যত অধিক বয়সে মা হবেন, তার সন্তান ডাউন শিশু হওয়ার সম্ভাবনাও তত বেশি হবে। যেমন ২৫ বছর বয়সের প্রতি ১ হাজার ২০০ গর্ভবতী মায়ের মধ্যে একজনের, ৩০ বছর বয়সের প্রতি ৯০০ মায়ের মধ্যে একজনের ডাউন শিশু হতে পারে। কিন্তু ৩৫ বছর বয়সের পর ঝুঁকি দ্রুত বাড়তে থাকে। ৩৫ বছর বয়সের প্রতি ৩৫০ গর্ভবতী মায়ের মধ্যে একজনের এবং ৪০ বছর বয়সের প্রতি ১০০ মায়ের একজনের ডাউন শিশু হতে পারে। অধিক বয়সের মায়ের গর্ভে ডাউন শিশু হওয়ার সম্ভাবনা বাড়লেও যেহেতু যুবতী বয়সেই বেশির ভাগ নারী মা হয়ে থাকেন, তাই যুবতী বয়সের মায়েদের মধ্যেই ডাউন শিশু সচরাচর দেখা যায়। তার মানে যে কোনো বয়সের মায়ের ডাউন শিশু হতে পারে। অন্যদিকে কোনো মায়ের আগে একটি ডাউন শিশু থাকলে পরবর্তীতে ডাউন শিশু হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে। পরিবেশ দূষণ, গর্ভবতী মায়ের ভেজাল খাদ্যে ও প্রসাধনী গ্রহণ, তেজস্ক্রিয়তা ইত্যাদি কারণেও ডাউন শিশুর জন্ম হতে পারে বলে ধারণা করা হয়। অনেক সময় বাবা-মা ত্রুটিযুক্ত ক্রোমোজমের বাহক হলে তাদের সন্তানও ডাউন শিশু হতে পারে।
কীভাবে ডাউন শিশু শনাক্ত করা যায় : একজন চিকিৎসক যে কোনো বয়সের শিশুকে দেখেই ডাউন শিশু কি-না তা সন্দেহ করতে পারেন। কারণ তাদের কিছু নির্দিষ্ট শারীরিক বৈশিষ্ট্য থাকে। বাবা-মায়েরা যখন দেখেন তাদের সন্তানের চেহারা একটু ভিন্ন ধরনের, শিশুর গায়ে শক্তি কম, নির্ধারিত বয়সে বসতে, দাঁড়াতে বা হাঁটতে শিখছে না, শারীরিক বৃদ্ধি কম, কম বুদ্ধিসম্পন্ন, তখন তারা চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন। চিকিৎসক শিশুর রক্তের ক্রোমোজম সংখ্যা বা ক্যারিওটাইপিং পরীক্ষার মাধ্যমে ডাউন শিশু কি-না তা নিশ্চিত করেন।
প্রসূতি মায়ের ডাউন শিশু জন্ম নেওয়ার ঝুঁকি নির্ণয় পরীক্ষা : ১১ থেকে ১৪ সপ্তাহের মধ্যে গর্ভবতী মায়ের রক্তে প্যাপ-এ, এইচসিজি এবং ১৬ থেকে ২০ সপ্তাহের মধ্যে এএফপি, ইসট্রিয়ল, এইচসিজি ইত্যাদি রাসায়নিক পদার্থের মাত্রা পরীক্ষা করে ডাউন শিশুর জন্ম হওয়ার ঝুঁকি সম্পর্কে ধারণা করা যায়। তা ছাড়া আল্ট্রাসনোগ্রাফি করে মায়ের পেটে ১১ থেকে ১৪ সপ্তাহের শিশুর ঘাড়ের পিছনের তরলের মাত্রা (Nuchal Translucency), নাকের হাড়ের (Nasal Bone) উপস্থিতি, ‘ডাকটাস ভেনোসাস (Ductus Venosus)’ নামক প্রাথমিক রক্তনালীর রক্তপ্রবাহ ইত্যাদি নির্ণয়ের মাধ্যমেও ডাউন শিশু জন্ম নেওয়ার ঝুঁকি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। পরীক্ষা-নিরীক্ষার রিপোর্ট অনুযায়ী উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত মায়েদের ডাউন শিশুর নিশ্চিত পরীক্ষা করার উপদেশ দেওয়া হয়।
পেটের সন্তান ডাউন শিশু কি-না তার নিশ্চিত পরীক্ষা : গর্ভাবস্থার ১১ থেকে ১৪ সপ্তাহের মধ্যে প্রাথমিক গর্ভফুল থেকে কোষকলা সংগ্রহের (Chorionic Villus Sampling) মাধ্যমে অথবা ১৫ থেকে ১৮ সপ্তাহের মধ্যে গর্ভের বাচ্চার চারপাশের তরল পদার্থ সংগ্রহের (Amniocentesis) মাধ্যমে বাচ্চার ডিএনএ পরীক্ষা করে গর্ভের বাচ্চাটি ডাউন শিশু কি-না তা ১০০ শতাংশ নিশ্চিত করা যায়। এ সময় বাচ্চার আকার হয় প্রায় ২-৪ ইঞ্চির মতো। কাজেই রিপোর্ট অনুযায়ী বাবা-মা গর্ভাবস্থা চালিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
প্রতিরোধের উপায় : সুযোগ ও সচেতনতার অভাবে আমাদের দেশে এখনও বেশির ভাগ গর্ভবতী মা চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে থাকতে পারেন না। অন্যদিকে চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে থাকলেও গর্ভবতী মাকে ডাউন শিশু সম্পর্কে বা অন্য কোনো জন্মগত ত্রুটি সম্পর্কে ধারণা দেওয়ার ব্যাপারটি উপেক্ষিত। তা ছাড়া দেশের সব জায়গায় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার সুযোগ নেই। অনেক প্রতীক্ষার পর কোনো বাবা-মায়ের যখন একটি ডাউন শিশুর জন্ম হয় তখন ওই সংসারে আনন্দের বদলে চরম হতাশা নেমে আসে। ডাউন শিশু পরিবার, সমাজ ও দেশের বোঝা। কাজেই সচেতন হওয়া ছাড়া প্রতিরোধের কোনো উপায় নেই। উন্নত বিশ্বে প্রত্যেকটি গর্ভবতী মাকে ডাউন শিশু এবং অন্যান্য সম্ভাব্য জন্মগত ত্রুটি ও তা নির্ণয়ের পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পর্কে ধারণা দেওয়া চিকিৎসকের জন্য বাধ্যতামূলক। যেহেতু মায়ের বয়স বাড়ার সাথে সাথে ডাউন শিশু হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ে, তাই চিকিৎসাবিজ্ঞানে অধিক বয়সে, বিশেষ করে ৩৫-ঊর্ধ্ব বয়সে মা হওয়াকে নিরুৎসাহিত করা হয়। মেধাবী শিশুর জন্ম নিশ্চিত করতে হলে ডাউন শিশুর মতো প্রতিরোধযোগ্য প্রতিবন্ধী বা জন্মগত ত্রুটির বিষয়টি পাঠ্যবইতে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। গর্ভবতী মাকে সেবাদানের ক্ষেত্রে অনাগত শিশুর জন্মগত ত্রুটির বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতে হবে। আশার কথা, মায়ের গর্ভে ডাউন শিশু নির্ণয়ের যাবতীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা এখন দেশেই হচ্ছে। চাই শুধু সচেতনতা।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়

Category:

Leave a Reply