ডেথ সার্টিফিকেট

49খালিদ মারুফ: মিসেস অবন্তী গুহ, বয়স ঊনপঞ্চাশ।
কাছে-দূরে থেমে থেমে গুলির আওয়াজের মধ্যে বিছানায় এপাশ-ওপাশ করে সারারাত নির্ঘুম কাটিয়ে সকালের কাছাকাছি সময়ে এসে সিদ্ধান্ত নিলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে জমানো তার স্বামীর প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকাগুলো যত দ্রুত সম্ভব তুলে ফেলবেন। তুলে ফেলবেন ইস্টার্ন ফেডারেল ইন্স্যুরেন্সের বীমার টাকাটাও। বেঁচে দিবেন তাদের যৌথ জীবনের বহু স্মৃতিবিজড়িত প্রথম ও একমাত্র পারিবারিক বাহন; কালো মরিস মাইনরটিও। কার্যত শহরে নির্বিচার গণহত্যা শুরুর প্রথম রাতটির পর থেকেই তিনি পালিয়ে বেড়াচ্ছেন তার পঞ্চদশবর্ষীয়া কন্যাটিকে নিয়ে। মরিস মাইনরটি পড়ে আছে তার স্বামীর নামে বরাদ্দকৃত এবং বর্তমানে পরিত্যক্ত বাড়িটির গ্যারাজে। পালিয়ে বেড়াচ্ছে তার ড্রাইভারও। সুতরাং অধ্যাপক মহোদয়ের স্মৃতিবিজড়িত ঐ গাড়ি এখন তার নিকট একটি বোঝা, তাই সেটাকে বেঁচে দেওয়াই শ্রেয় বলে মনে হচ্ছে। স্বামীর প্রভিডেন্ট ফান্ড, বীমা ও গাড়ি বিক্রির টাকা দিয়ে তিনি ঠিক করতে চান তা এখনও স্থীর করেন নি। ইতোমধ্যেই তার বিদেশি বন্ধুদের পাঠানো কয়েকটি সহমর্মিতামূলক চিঠি তার হাতে এসে পৌঁছেছে, সেইসব চিঠিতে সহমর্মিতা জানানোর পাশাপাশি দুজন বিলেতি বন্ধু তাকে দেশত্যাগ করে সেখানে গিয়ে আশ্রয় নেবার জন্য অনুরোধও করেছেন। এবং সেক্ষেত্রে সেখানে তার চাকরিপ্রাপ্তিসহ অন্যান্য সুবিধা-অসুবিধার বিষয়টিও সে বা তারা দেখবেন বলে চিঠিতে মিসেস গুহকে আশ্বস্ত করেছেন। তবে এই মুহূর্তে তিনি চাইলেও দেশত্যাগ করতে পারবেন না; কেননা মার্চের মাঝামাঝি তিনি তার ও তার কন্যার পাসপোর্ট দুটি নবীকরণের জন্য জমা দিয়েছিলেন। যা আর ফেরত পাননি।
বেশ কিছুদিন হয় মিসেস গুহ কন্যাটিকে মিশনারি-চালিত এতিমখানায় তুলে দিয়ে নিজে এসে আশ্রয় নিয়েছেন একই মিশনারি দ্বারা পরিচালিত হাসপাতালটিতে। প্রথম কিছুদিন তিনি উচ্চ রক্তচাপজনিত রোগের রোগী হিসেবে হাসপাতালের তিন তলায় ভেতরের দিকের একটি কেবিনে অবস্থান করছিলেন। একটু সুস্থ হবার পর, হাসপাতালের পরিচালক সিস্টার ফারাহ রোজারিও’র সাথে কথা বলে হাসপাতালের লাইব্রেরিটার দেখাশোনার দায়িত্ব নিয়ে তিন তলার কেবিন ছেড়ে নেমে এসেছেন নিচতলায়। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাকে তার নিরাপত্তার স্বার্থে বাইরে বেরোনোর ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়ে রেখেছে। তবে সকাল হলে, শেষ রাতে নেওয়া সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রস্তুত হয়ে একটি কালো শাড়িতে শরীর আবৃত করে মাথার ঘোমটা যতটা সম্ভব টেনে নামিয়ে টহলরত মিলিটারিদের চোখ ফাঁকি দিয়ে দশটা বাজবার কিছুক্ষণ পূর্বেই তিনি হাজির হন বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার ভবনে। ভয়ে-আতঙ্কে মুখ শুকিয়ে থাকা ছাত্রবিহীন বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সরকারের নির্দেশ অনুযায়ী যথাসাধ্য অফিস চালিয়ে যাচ্ছেন। নিচতলা থেকে খোঁজ নিয়ে মিসেস গুহ সোজা উঠে এলেন তিন তলায় অবস্থিত রেজিস্ট্রার মহোদয়ের দফতরে। রেজিস্ট্রার মহোদয় তার দফতরেই ছিলেন। ফাঁকা দফতরের দরজায় নামানো পর্দা টেনে ভেতরে ঢুকে নিজের পরিচয় দিতেই রেজিস্ট্রার মহোদয় তাকে চিনতে পেরে বসতে বললেন এবং তার জন্য কমলা রঙের এক কাপ কফিরও ব্যবস্থা করলেন। মিসেস গুহ তার সামনে রেখে যাওয়া কফির পেয়ালায় পরপর দুটি চুমুক দিয়ে তার এখানে আসবার মূল কারণটি রেজিস্ট্রার মহোদয়কে জানালেন।
রেজিস্ট্রার মহোদয় খানিকটা আশ্চর্য হবার ভঙ্গিতে নাকের ওপর নেমে আসা রিমলেস মোটা চশমাটিকে ঠেলে ওপরে তুলে মিসেস গুহ’র দিকে ঝুঁকে এসে বললেন, ‘কী বলছেন? অধ্যাপক গুহ এখনও কাজে যোগ দেন নি! তিনি কি আর চাকরি করতে চান না? সরকার তো বলেই দিয়েছে যারা কাজে যোগ দিতে চায় তারা নির্দ্বিধায় যোগ দিতে পারে, তাদেরকে ক্ষমা করে দেওয়া হবে।’
রেজিস্ট্রার মহোদয়ের কথা শেষ হলে, মিসেস গুহ তাকে বললেন, ‘অধ্যাপক গুহ আর কাজে যোগ দিবেন না। যোগ দিতে পারবেনও না, কেননা তিনি মারা গেছেন।’ রেজিস্ট্রার মহোদয় তার গোঁফ ও চশমায় অবিশ্বাস ফুটিয়ে বললেন, ‘কী বলছেন! আমরা তো জানি অধ্যাপক গুহ পালিয়ে গেছেন। পালিয়ে তিনি আগরতলা চলে গেছেন।’
‘Ñ না। তিনি পালান নি। পালাতে চানও নি। তিনি মারা গেছেন। সেই রাতে তার মতো অন্য আটজন অধ্যাপকের মতোই। বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার হিসেবে আপনার সেটা জানা থাকা উচিত ছিল।’ মিসেস গুহ শেষ বাক্যটি ছুড়ে দেওয়ার পর রেজিস্ট্রার মহোদয়ের গোঁফ ও চশমাওয়ালা মুখে পুনরায় একটি ছোট্ট পরিবর্তন দেখা যায়। তিনি তার সামনে ঠা-া হয়ে আসা কমলা রঙের কফিতে একটি দীর্ঘ চুমুক দিয়ে খানিকটা পিছিয়ে নতুন তোয়ালে ঢাকা চেয়ারটিতে হেলান দিয়ে বসে বলেলন, ‘আচ্ছা। তবে চাইলেই তো আর প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা আপনি তুলে নিতে পারবেন না। আমার যতদূর জানা আছে, অধ্যাপক গুহ তার প্রভিডেন্ট ফান্ডের জন্য কোনো উত্তরাধিকার মনোনীত করে যাননি। যদিও আইন অনুযায়ী স্ত্রী হিসেবে আপনার সেটা পাবার অধিকার রয়েছে। সেক্ষেত্রে আপনাকে প্রথমত জমা দিতে হবে সাকসেশন সার্টিফিকেট, তারপর মিটিয়ে আসতে হবে অধ্যাপক গুহ-র নিকট বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল দেনা-পাওনা। সর্বোপরি জমা দিতে হবে তার ডেথ সার্টিফিকেট।’
মিসেস গুহ রেজিস্ট্রার মহোদয়ের সকল কথাই মনোযোগ দিয়ে শুনলেন। তারপর বললেন, ‘অধ্যাপক গুহ-র সকল দেনা-পাওনার হিসেব আমাকে দিন, আমি মিটিয়ে দিচ্ছি।’ রেজিস্ট্রার মহোদয় তাকে জানালেন, ‘এসব কিছুর হিসাব পেতে আপনাকে যেতে হবে প্রধান হিসাবরক্ষকের কার্যালয়ে।’ মিসেস গুহ-ও ততক্ষণে ঠা-া হয়ে যাওয়া কমলা রঙের কফিতে শেষ চুমুকটি দিয়ে রেজিস্ট্রার মহোদয়কে ধন্যবাদ জানিয়ে নিচে নেমে গেলেন প্রধান হিসাবরক্ষকের কক্ষে। কর্মহীন হিসাবরক্ষক তার সুবিশাল হিসাবের খাতাটি উন্মুক্তাবস্থায় সামনে রেখে তাকিয়ে ছিলেন জানালার দিকে। জানালার লোহার সিকের ফাঁক গলে হয়তো তার দৃষ্টি তখন আরও দূরে; কোনো আপাত নিরাপদ গ্রাম-জনপদে, যেখানে তিনি রেখে এসেছেন প্রিয় স্ত্রী ও সন্তানদের।
মিসেস গুহ একটি ছোট্ট কাশি দিয়ে তার দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করলেন। হিসাবরক্ষক তাকে বসতে বলে সামনের খাতাটা বন্ধ করে পেছনের কাঠের আলমারি খুলে বের করলেন অমনই আরেকটি খাতা। পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা উল্টে খাতার মাঝামাঝি তিনি পেয়ে গেলেন অধ্যাপক গুহকে। চোখ তুলে বললেন, ‘ছেষট্টি সালে অধ্যাপক গুহ তার চাকরির বিপরীতে লোন নিয়ে বিলেত গিয়েছিলেন, লোনের পরিমাণ আট হাজার টাকা, এ পর্যন্ত শোধ হয়েছে সাড়ে পাঁচ হাজার, বাকি আছে দুই হাজার পাঁচশত টাকা। আর অধ্যাপক গুহ বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে পাবেন কেবল মার্চ মাসের বেতনটা।’
মিসেস অবন্তী গুহর মনে আছে সে কথা। অধ্যাপক গুহ নিজের পয়সায় ডক্টরেট করতে বিলেত গিয়েছিলেন, আর লোনটা নেওয়া হয়েছিল সেই সময়। মিসেস গুহ প্রস্তুত হয়েই এসেছিলেন। ব্যাগ হাতড়ে নিজের চেক বইটি বের করে বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে আড়াই হাজার টাকার একটি ক্রস চেক লিখে, তুলে দিলেন হিসাবরক্ষকের হাতে। চেকটা হাত বাড়িয়ে নিতে নিতে হিসাবরক্ষক আগ বাড়িয়ে তাকে বললেন, ‘সাকসেশন সার্টিফিকেট পেতে অধ্যাপক গুহর ট্যাক্স ক্লিয়ারেন্স প্রয়োজন হবে। আপনি আরেক দিন আসুন, আমি তার বেতন বিবরণী করিয়ে রাখব। তার আগে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক অধ্যাপক গুহর নামে বরাদ্দকৃত বাড়িটা বুঝিয়ে দিতে হবে আপনাকে। সে বাড়ির পাঁচটি ফ্যান, একটি টেলিফোন ফেরত দিতে হবে এবং ভাঙা দরজা ও পানির কলগুলো মেরামত করিয়ে দিতে হবে।’ হিসাবরক্ষক মহোদয়ের শেষ কথাগুলো মিসেস গুহকে কিছুটা উত্তেজিত করে তুলল, কেননা সেদিনের পর তিনি আর সে বাড়িতে যাননি, যেতে পারেন নি। ফ্যান-টেলিফোন-পানির কলের কী হয়েছে তা তিনি জানেন না, জানেন কেবল ভাঙা দরজার কথা; যেগুলো ভেঙে ছিটকে গিয়েছিল মিলিটারির রাইফেল ও ক্রমাগত বুটের ঘায়ে। যার দায়িত্ব কিছুতেই সে ঘরের বাসিন্দাদের ওপর বর্তায় নাÑ কথাগুলো যতটা সম্ভব নরম সুরে হিসাবরক্ষক মহোদয়কে জানালেন তিনি। তবে হিসাবরক্ষক মহোদয় তার এ ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট হলেন কি না সে বিষয়ে নিশ্চিত না হয়েই তিনি তাকে ধন্যবাদ জানিয়ে রেজিস্ট্রার ভবন থেকে দ্রুত নেমে গেলেন।
রেজিস্ট্রার ভবনের সামনে দাঁড়িয়ে ডানে-বাঁয়ে ভালো করে দেখে নিলেন রাস্তাটা, তারপর লম্বা পা ফেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাঁকা চত্বরটা পাড়ি দিয়ে সোজা উপস্থিত হলেন লাইব্রেরিতে। ছাত্র-শিক্ষকে মুখরিত হয়ে থাকা লাইব্রেরিটা আজ অস্বাভাবিক রকম ফাঁকা। হিসাবরক্ষক সাহেবের মতোই সমান আতঙ্ক আর দুশ্চিন্তা মুখে নিয়ে পুরাতন খবরের কাগজ পড়তে থাকা লাইব্রেরিয়ান মুখ তুলে তাকালেন মিসেস গুহর দিকে, তারপর খাতাপত্র ঘেটে বিভিন্ন সময়ে অধ্যাপক গুহর নেওয়া বইগুলোর একটি নাতিদীর্ঘ তালিকা তুলে দিলেন তার হাতে। তালিকাটি হাতে নিয়ে মিসেস গুহর মনে হলো এগুলো ফেরত দেওয়া সম্ভব। কেননা অধ্যাপক গুহ তার প্রয়োজনীয় বইপত্রসমূহ কোথায় রাখতেন তা তার জানা আছে।
লাইব্রেরি থেকে বেরিয়ে এবার তিনি এলেন অধ্যাপক গুহর বিভাগে; যেখানে তিনি পড়াতেন। যে কক্ষটিতে অধ্যাপক গুহ বসতেন তা এখন তালাবদ্ধ। কোনো ছাত্র নেই সেখানে, অধ্যাপকদের অধিকাংশ কক্ষই তালাবদ্ধ। একজন এসিসটেন্ট ও একজন এসোসিয়েটকে তিনি দেখলেন সেমিনার কক্ষে বসে গল্প করতে। তারা মিসেস গুহকে দেখে গাল হা করলেন এবং জানালেন, তারাও জানে অধ্যাপক গুহ পালিয়ে আগরতলা চলে গেছেন। এই এতদিন পর, অধ্যাপক গুহর দুজন অপেক্ষাকৃত তরুণ সহকর্মীর একযোগে হা হয়ে ওঠা মুখের দিকে তাকিয়ে মিসেস গুহর শুষ্ক ঠোঁটের প্রান্তে একটু হাসি ফুটে উঠল। সেমিনার থেকে চাবি নিয়ে মিসেস গুহ নিজেই খুললেন অধ্যাপকের কক্ষের তালা। পেছনের বড় জানালাটি বন্ধই আছে, বন্ধ করা আছে ফ্যান ও লাইট। তবু যেন কক্ষটি ধুলোয় আচ্ছন্ন। বন্ধ জানালা না খুলে লাইট জ্বালিয়ে টেবিলে-আলমারিতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা বইগুলো থেকে লাইব্রেরিয়ানের দেওয়া তালিকা অনুযায়ী বেশ কয়েকটি বই তিনি সেখানেই পেয়ে গেলেন। বইগুলো ব্যাগে ঢুকিয়ে কক্ষটিকে পুনরায় তালাবদ্ধ করে চাবিটি বুঝিয়ে দিয়ে তিনি রওনা হলেন তাদের ফেলে যাওয়া বাসভবনের দিকে।
বিশ্ববিদ্যায়ের প্রধান রাস্তাটায় উঠে একটি গা ছমছমে অনুভূতির মুখোমুখি হলেন তিনি, কেননা সেখান দিয়ে তখন মিলিটারির তিনটি সাঁজোয়া যান সারিবদ্ধভাবে চলে যাচ্ছে উত্তর দিকে তবে গাড়িগুলো ততক্ষণে বেশ কিছুদূর চলে গেছে এবং সেগুলো চলেই গেল। মিসেস গুহ কিছুটা ভারমুক্ত হয়ে ঢুকে পড়লেন হোস্টেলের সীমানায়। শিক্ষকদের আবাসিক ভবনগুলোর দিকে যেতে পাড়ি দিতে হয় বড় মাঠটি। সেটা পেরিয়ে যেতে যেতে তার চোখ পড়ল মাঠের শেষ দিকে, যেখানে সে রাতে হত্যার শিকার ছাত্র-শিক্ষকদের মাটিচাপা দেওয়া হয়েছিল। মিসেস গুহ দেখলেন, লাশগুলো মাটিচাপা দেওয়া জায়গাটির ওপর ইতোমধ্যেই ফুলের চাষ শুরু হয়েছে। এবং ততদিনে পঁচে যাওয়া লাশগুলো থেকে তৈরি হওয়া জৈব সারে আরও বেশি উর্বর হয়ে ওঠা মাটির ওপর তরতর করে বেড়ে উঠেছে গাঁদা ও গোলাপের চারাগুলো যদিও এখনও ওগুলিতে ফুল আসেনি। কর্মরত মালিরা দূর থেকে তাকে চিনতে পারল এবং তাদের মধ্য থেকে বুড়িয়ে কুঁজো হয়ে আসা রতন মালি দ্রুতপায়ে এগিয়ে এসে গড় হয়ে মিসেস গুহকে প্রণাম করলেন, তারপর উঠে গিয়ে কয়েক থোকা রঙ্গন ছিড়ে, ‘মা ফুলগুলো নিন’Ñ বলে তুলে দিলেন মিসেস গুহর হাতে। তার চলমান জীবনের এমনতর সময়ে ফুলের উপযোগিতা কি তা ঠিক বুঝে উঠতে না পারলেও মিসেস গুহ হাত পেতে ফুলগুলিকে গ্রহণ করলেন।
হাত ভরা থোকা-থোকা রঙ্গন নিয়ে পরিত্যক্ত বাড়িটির সমানে কোমর সমান উঁচু লোহার নিরাপত্তা বেষ্টনি ঠেলে সোজা ওপরে উঠে গেলেন। সিঁড়ি দিয়ে উঠবার সময় পায়ের নিচে মিসেস গুহ গড়িয়ে যাওয়া শুকনো রক্তের দাগ দেখলেন তবে সে রক্ত দিয়ে কোনো গন্ধ উদগীরিত হচ্ছে না। রক্ত মাড়িয়ে ওপরে উঠতে উঠতে তার মনে হলো : এগুলো পরিসংখ্যানের ঐ অধ্যাপক ও সেই রাতে তার ঘরে অবস্থানরত অপর তিনজন পুরুষের শরীর থেকে বেরুনো রক্ত, যাদের ঘর থেকে টেনে বের করে সিঁড়ির ওপর এনে গুলি করা হয়েছিল। বাসার নিচে গুলি খেয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে থাকা অবস্থা থেকে তুলে আনতে আনতে অধ্যাপক গুহর শরীরের ছুটন্ত রক্তধারাটি অনেকটাই ক্ষীণ হয়ে গিয়েছিল, সুতরাং সিঁড়ির ওপর ছড়িয়ে থাকা রক্ত তার নয়। ভাঙা দরজা দিয়ে ঢুকে মিসেস গুহর প্রথমেই চোখ গেল বসবার ঘরের ছাতের দিকে, একটি ফ্যান তখনও সেখানে ঝুলতে দেখে তিনি কিছুটা আশ্বস্ত হলেন এবং একে একে সবগুলো কক্ষের ফ্যানগুলোই অক্ষত অবস্থায় ঝুলতে দেখলেন। ততক্ষণে অধ্যাপক গুহর কর্মহীন ড্রাইভারটি তার পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে। হয়তো সে আশেপাশেই ঘুরছিল, মালিদের কাছে মিসেস গুহর আগমনের খবর পেয়ে এখানে এসে দাঁড়িয়েছে। মিসেস গুহ তাকে ফ্যানগুলো খুলে নিয়ে যেভাবে হোক রেজিস্ট্রার ভবনে পৌঁছে দেবার নির্দেশ দিলেন। তারপর ঢুকলেন অধ্যাপক গুহর কক্ষে, একসাথে থাকাকালীন যে ঘরটিতে তিনি খুব কমই ঢুকতেন। সংসারবোধ ততটা তীব্র না হলেও স্ত্রী-কন্যার প্রতি অধ্যাপক গুহর ভালোবাসায় কোনো কমতি ছিল না। সেজন্যই তার মগ্নতায় কখনও ব্যাঘাত ঘটাতে চাইতেন না মিসেস গুহ। অধ্যাপক গুহর বেতের ছাউনিওয়ালা ইজি চেয়ারটির ওপর দিয়ে গড়িয়ে যাওয়া রক্ত সিঁড়িতে ছড়িয়ে থাকা রক্তের মতোই শুকিয়ে লেপ্টে আছে। সেদিকে বিশেষ না তাকিয়ে ইতোমধ্যে কয়েক দফা ভাঙচুর ও লুটের শিকার হওয়া অগোছালো ঘরটি হাতড়ে লাইব্রেরি থেকে আনা বইগুলোর আরও কয়েকটি সেখানে খুঁজে পেলেন। তবে তন্ন-তন্ন করে খুঁজেও ওয়েবস্টারের দুটি খ-ের কোনো হদিস করতে পারলেন না। নিরাশ্রয় হয়ে যাবার পর মিসেস গুহ প্রথমে আশ্রয় নিয়েছিলেন অন্য একটি হাসপাতালে। তবে কিছুদিন পর ঐ হাসপাতালের স্বত্বাধিকারীর পালিয়ে গিয়ে প্রবাসী সরকারে যোগ দেওয়ার খবর রেডিওতে প্রচার হবার পরদিন থেকে সেটা এখন আলবদরের হেডকোয়ার্টার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। হয়তো সেই জায়গায় খুঁজলে ওয়েবস্টারের খ- দুটি পাওয়া যেতে পারে। তবে তা অসম্ভব। তিনি ঘর ছেড়ে বারান্দা দিয়ে ঘুরে নিচে নামলেন। বারান্দায় পড়ে থাকা ফুলের টবগুলোর দিকে দৃষ্টি গেল তার। তিনি দেখলেন, অজ্ঞাত কারণে অধ্যাপক গুহর প্রিয় বোগেনভেলিয়ার চারাটি তখনও বেঁচে আছে। বাকিগুলো শুকিয়ে কাঠ। এবং নিচে নামতে নামতে তার মনে হলো মালির দেওয়া রঙ্গনের থোকাগুলো তিনি ফেলে এসেছেন অধ্যাপক গুহর প্রিয় ইজি চেয়ারটার ওপর।
মিসেস গুহ আবার লাইব্রেরিতে এলেন। খুঁজে পাওয়া বইগুলো লাইব্রেরিয়ানের হাতে দিয়ে জানালেন, ‘ওয়েবস্টার দুটো খুঁজে পাওয়া যায়নি এবং যাবেও না।’ লাইব্রেরিয়ান তাকে বললেন, ‘সেক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণ হিসেবে আপনাকে পুরো চৌদ্দ খ-ের দাম দিতে হবে।’ লাইব্রেরিয়ানের দেওয়া চরম অস্বস্তিকর ক্ষতিপূরণের দাবি শুনে তার দ্বারা যতটা সম্ভব বচসা চালিয়ে তিনি স্থান ত্যাগ করলেন।
তারপর তার মনে হলো সাকসেশন সার্টিফিকেটের কথা। দাঁড়িয়ে তিনি একদ- ভেবে নিলেন, এই কাজে ঠিক কে তাকে সাহায্য করতে পারবে। তার স্বামীর বন্ধু, ইংরেজি পত্রিকার সিনিয়র সাংবাদিক জনাব গণি সাহেবের কথা মনে হলো তারÑ যার স্ত্রী ব্যক্তিগত পর্যায়ে মিসেস গুহর বন্ধু হন; সিদ্ধান্ত নিলেন তার দ্বারস্থ হবেন। হেঁটে বিশ্ববিদ্যালয় পাড়ি দিয়ে পেট্রল পাম্পটির সামনে এসে বয়সের ভারে ন্যুব্জ হয়ে পড়া এক প্রবীণ রিকশাওয়ালার রিকশায় চেপে তিনি এলেন সাংবাদিক গণি সাহেবের বাসায়। গণি সাহেবের স্ত্রীর সাথে অসংখ্য দুর্দশার কথা ভাগাভাগি করে তিনি তার আসল কথাটি পাড়লেন। মিসেস গণি টেলিফোন তুলে শহরের অভিজাত ও নিরাপদ এলাকায় বসবাসরত এক ডাকসাইটে ব্যারিস্টারকে ফোন করলেন। কথা শেষে জানালেন, সাকসেশন সার্টিফিকেট পাওয়া সম্ভব। অধ্যাপক গুহর ট্যাক্স পরিশোধ করে এগারোশত টাকার স্ট্যাম্প ও ছয়শত টাকা ফিস জমা দিলে সাকসেশন সার্টিফিকেট হয়ে যাবে। মিসেস গুহ, মিসেস গণির সাথে আরও কিছুক্ষণ কথাবার্তা বলে বিদায় নিলেন।
দুদিন পর, একই রকম উৎকণ্ঠা বুকে নিয়ে লম্বা ঘোমটা টেনে তিনি হাজির হলেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সাত নম্বর ওয়ার্ডে। পায়ে পায়ে হেঁটে গিয়ে দাঁড়ালেন দুই নম্বর বেডটির শিয়রে; যেটি তখন ফাঁকা। এবং বেডটির গায়ে তখনও সাঁটানো আছে ‘বুলেট ইনজুরড’ লেখা কাগজের লেবেলটি। বুঝতে পারলেন, অধ্যাপক গুহর পর ছয় মাস কেটে গেলেও এই বেডে কোনো রোগী ভর্তি করা হয়নি; হয়তো রোগীর স্বল্পতার কারণেই। ওয়ার্ডে কর্তব্যরত নার্সদের সাথে কথা বলে জানলেন, সে সময় যে চিকিৎসকÑ অধ্যাপক গুহর শরীরে তিন দিনব্যাপী ব্যর্থ চিকিৎসা চালিয়েছিলেন তাকে বদলি করা হয়েছে। ভারতী নামের এক নার্স তাকে চিনতে পেরে নিয়ে গেলেন নতুন দায়িত্ব পাওয়া চিকিৎসকের কাছে। নতুন চিকিৎসক প্রথমেই জানতে চাইলেন, তখন কেন ডেথ সার্টিফিকেট নেওয়া হয়নি? মিসেস গুহ তাকে জানালেন, তিনি ডেথ সার্টিফিকেট চেয়েছিলেন, তবে তাকে তা দেওয়া হয়নি। কেন দেওয়া হয়নি তা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষেরই জানবার কথা। শুধু তখন নয়, পরেও দু-একবার মিসেস গুহ তার স্বামীর ডেথ সার্টিফিকেট চাইতে এসেছেন। একজন চিকিৎসক তাকে জানিয়েছিলেন, ডেথ সার্টিফিকেট প্রস্তুত করা হয়েছে, তবে যিনি স্বাক্ষর করবেন তিনি উপস্থিত নেই।
নতুন চিকিৎসক একটু নড়েচড়ে বসলেন। তারপর বললেন, ‘তাকে যেখানে সমাহিত করা হয়েছে সেখান থেকে কোনো সার্টিফিকেট কিংবা মানি রিসিপ্ট পেয়েছিলেন কি না?’ মিসেস গুহ বললেন, ‘তাকে কোথাও সমাহিত করা হয়নি। কেননা সেই মুহূর্তে হাসপাতাল থেকে একটি মৃতদেহ শ্মশানে নিয়ে পোড়াবার মতো পরিস্থিতি ছিল না। তাছাড়া, চেতন থাকা অবস্থায় অধ্যাপক গুহ চেয়েছিলেন তার লাশটা যেন মেডিকেলের ছাত্রদের ব্যবহারের জন্য দিয়ে দেওয়া হয়। আমি তার এমন ইচ্ছার কথা সেই ডাক্তারকে জানিয়েছিলাম, তবে তিনি অধ্যাপক গুহর এমনতর ইচ্ছার অনুকূলে কোনো লিখিত দলিল না থাকায় সে বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারবেন না বলে আমাকে জানিয়েছিলেন।’ চিকিৎসক একটু পিছিয়ে বসে তাকালেন নার্স ভারতীর দিকে, ভারতী মিনমিনে গলায় তার কর্তাকে যা জানালো তা এরূপ : অধ্যাপক গুহর লাশটা দুদিন যাবৎ বারান্দায় একটি স্ট্রেচারের ওপর পড়ে ছিল। এবং গুলি খেয়ে মরা ইপিআর ও অন্যান্য কিছু লাশের সাথে তারা ‘বাবু’র লাশটাও আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামের গাড়িতে তুলে দিয়ে চেয়েছিল। তবে মিলিটারি প্রহরার ভেতর দিয়ে একটি ধুতি জড়ানো লাশ বয়ে নেবার ঝুঁকি তারা নিতে রাজি হয়নি। এবং নদীর ওপার থেকে বিপদসংকুুল পথ পাড়ি দিয়ে তারপর দিন ভারতী আর হাসপাতালে আসতে পারেনি এবং একদিন পরে কাজে যোগ দিয়ে ভারতী বারান্দার সেই স্ট্রেচারটিকে ফাঁকা দেখতে পায়।
কর্তব্যরত চিকিৎসক এবার যেন খানিকটা আন্তরিক হয়ে উঠলেন। তিনি মিসেস গুহকে সাথে নিয়ে হিমঘরে প্রবেশ করলেন এবং বিরাট সব লোহার আলমারির দেরাজ খুলে একটা একটা করে লাশের মুখ মিসেস গুহকে দেখালেন। মিসেস গুহ দেরাজে আটকানো লাশগুলোর কোনোটির সাথে নিজের স্বামীর মুখের আদল মেলাতে ব্যর্থ হয়ে ফিরে এলেন নতুন চিকিৎসকের কক্ষে। নতুন চিকিৎসক তার কণ্ঠে আশ্বস্তের স্বর ফুটিয়ে মিসেস গুহকে বললেন, ‘আপনি আগামীকাল একবার আসুন।’
তারপর দিন সকালে মিসেস গুহ হাসপাতালে না গিয়ে গেলেন ট্যাক্স অফিসে এবং অধ্যাপক গুহর বকেয়া ট্যাক্স মিটিয়ে রিটার্ন স্লিপ পেতে পেতে বিকেল হয়ে পড়ায় তিনি ফিরে গেলেন তার বর্তমান আশ্রয়; মিশনারি হাসপাতালের নিচতলার আলোহীন কক্ষটিতে। পরদিন সকালে সাত নম্বর ওয়ার্ডে এসে ভারতীকে না পেয়ে সোজা ঢুকে গেলেন সেই ডাক্তারের কক্ষে। ডাক্তার তার সিটেই অবস্থান করছিলেন, মনে হলো তিনি অধ্যাপক গুহর ডেথ সার্টিফিকেটটা হাতে নিয়েই বসে আছেন। বাড়িয়ে দেওয়া কাগজটা হাতে নিয়ে মিসেস গুহ একটি তৃপ্তির নিঃশ্বাস ছাড়লেন। যাক, অবশেষে এটা অন্তত প্রমাণ করা গেল যে, অধ্যাপক গুহ পালিয়ে যাননি, তিনি মারা গেছেন। ডাক্তারকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানিয়ে মিসেস গুহ বেরিয়ে এসে দাঁড়ালেন দুই নম্বর বেডটির পাশে। সেখানে তখনও ‘বুলেট ইনজুরড’ লেখা কাগজটি ঝুলে আছে। ততক্ষণে বেড়ালের মতো নিঃশব্দ পায়ে নার্স ভারতী তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। ভারতীর মুখের ওপর থেকে দৃষ্টি নামিয়ে মিসেস গুহ এবার চোখ দিলেন তার হাতে ধরা ‘মৃত্যুর প্রমাণপত্র’টির ওপর। সেখানে নাম, পিতার নাম, ঠিকানা, বয়স, ভর্তির তারিখ ও সময়, মৃত্যুর তারিখ ও সময় যথাযথ লেখা থাকলেও কারণ হিসেবে লেখা আছে, ‘নিউমোনিয়াজনিত শ্বাসকষ্টে ভুগে মৃত্যু।’

Category:

Leave a Reply