বিভাগ: সংস্কৃতি

তথ্যচিত্র ও চলচ্চিত্রে বঙ্গবন্ধু

বঙ্গবন্ধুর ওপর অসাধারণ একটি কাজ প্রামাণ্যচিত্র ‘রহমান, দ্য ফাদার অফ বেঙ্গল’। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের কারণে গোটা বিশ্বে বাংলাদেশ একটি আলোচিত নাম। আর এই সাফল্যের শিরোমণি আর কেউ নন, স্বয়ং বঙ্গবন্ধু। বিশ্বের সর্বত্র আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু তিনি। বিখ্যাত জাপানি পরিচালক নাগাসি ওশিমা সে সুযোগ ছাড়বেন কেন? সময়কাল ১৯৭৩।

8-1-2017 9-11-18 PMতথ্যচিত্র ও চলচ্চিত্রে বঙ্গবন্ধু: সেই মধুমতি পাড়ের স্বপ্নময় এক কিশোর থেকে জাতির পিতা হয়ে ওঠা। হয়ে ওঠা ইতিহাসের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবন তো সিনেমার চেয়েও অনেক বেশি নাটকীয়। অথচ রাজনীতির এ মহানায়কের জীবনী নিয়ে আজও বাংলা ভাষায় কোনো পূর্ণাঙ্গ কাহিনিচিত্র নির্মিত হয়নি। বঙ্গবন্ধু বাংলা চলচ্চিত্রের উন্নতির প্রতি গুরুত্বারোপ করতেন। বাংলাদেশের চলচ্চিত্র উন্নয়ন সংস্থা এফডিসি’র প্রতিষ্ঠাতাও তিনি। ১৯৫৭ সালের ৩ এপ্রিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের শিল্পমন্ত্রী ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। তার হাত ধরেই এফডিসি (ইস্ট পাকিস্তান ফিল্ম ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন) প্রতিষ্ঠিত হয়। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের উন্নয়নের প্রতি গুরুত্ব দেন। পৃথিবীর দেশে দেশে জাতীয় নেতাকে নিয়ে চমৎকার চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। যেমনÑ মহাত্মা গান্ধী, লেনিন, চে-গুয়েভারা, আব্রাহাম লিংকনের মতো অনেককে নিয়ে বায়োপিক সিনেমা নির্মিত হয়েছে।
১৯৭১-এর আগে-পরে ছিল না এত টিভি চ্যানেল কিংবা উন্নত প্রযুক্তি। মোটের ওপর আশা ভরসা ছিল বিটিভি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে আমরা ভিডিওর মাধ্যমে যতটুকু দেখতে পাই তার সবটাই মূলত সাক্ষাৎকারভিত্তিক কিংবা তার প্রাত্যহিক রাজনৈতিক কর্মকা-। তবে অল্প কিছু কাজ হয়েছে তাকে নিয়ে যেগুলোতে তার আদর্শ, অর্জন, স্বপ্ন ইত্যাদি ফুটে উঠেছে বেশ স্পষ্টভাবে।
রহমান, দ্য ফাদার অফ বেঙ্গল : বঙ্গবন্ধুর ওপর অসাধারণ একটি কাজ প্রামাণ্যচিত্র ‘রহমান, দ্য ফাদার অফ বেঙ্গল’। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের কারণে গোটা বিশ্বে বাংলাদেশ একটি আলোচিত নাম। আর এই সাফল্যের শিরোমণি আর কেউ নন, স্বয়ং বঙ্গবন্ধু। বিশ্বের সর্বত্র আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু তিনি। বিখ্যাত জাপানি পরিচালক নাগাসি ওশিমা সে সুযোগ ছাড়বেন কেন? সময়কাল ১৯৭৩। চলে এলেন বাংলাদেশে। শুরু করলেন ডকুমেন্টারি নির্মাণের কাজ। অসাধারণ এ কর্মে ফুটে উঠেছে বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিগত জীবন, তার প্রাত্যহিক কর্মকা-, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাসহ বিবিধ বিষয়। প্রামাণ্যচিত্রটি মূলত ১৯৭২ সালের ১৬ ডিসেম্বর কেন্দ্রিক, যে সময় আমাদের মহান বিজয় দিবসের প্রথম বর্ষপূর্তি পালিত হচ্ছে। সেই সাথে এ দিনটি অন্য একটি কারণে মহিমান্বিত। আর তা হলো, এদিন বাংলাদেশের সংবিধান কার্যকর করা হয়। শুরুর দিকে সেই নতুন সংবিধানের আলোকে শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানের দুর্লভ মুহূর্ত ধারণ করা হয়েছে। এই ডকুমেন্টারিতে একটা উল্লেখযোগ্য অংশ বঙ্গবন্ধুর কনিষ্ঠ সন্তান শেখ রাসেলের উপস্থিতি। প্রায় সকল রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানেই তার উপস্থিতির কারণে সাক্ষাৎকার গ্রহণকারীর এক প্রশ্নের জবাবে বঙ্গবন্ধু বলছেন, ‘আমার ছোট ছেলে জন্মানোর পর থেকেই আমি বেশিরভাগ সময় জেলে কাটিয়েছি। সে আমাকে তেমন একটা কাছে পায় নি। ফলে সে সবসময় আমাকে হারানোর ভয়ে থাকে, তাই আমার সঙ্গে সঙ্গে থাকার চেষ্টা করে।’ অবশ্য, ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টের কালরাত থেকে রাসেলের আর বাবাকে হারানোর ভয় নেই। সে বাবার সাথেই আছে সেই সময় থেকে। এ ছাড়াও বঙ্গবন্ধুর সপরিবারে নাস্তা শেষ করে অফিসের উদ্দেশে যাত্রা, সংবিধান কার্যকর উপলক্ষে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সম্মানে পার্টিতে যোগদান এবং বিকেলে ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জনসভার ফুটেজ সংযোজিত হয়েছে এই প্রামাণ্যচিত্রে। সেই সাথে প্রাসঙ্গিক বিভিন্ন বিষয় যেমনÑ ১৯৭১-এ টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধুর গ্রামের বাড়ি পাকিস্তানি আর্মি কর্তৃক পুড়িয়ে দেওয়ার প্রসঙ্গ, নতুন প্রণীত সংবিধানের বৈশিষ্ট্য, ‘বঙ্গবন্ধু’ ও ‘জাতির জনক’ উপাধি, বাঙালি জাতির গর্বের বিষয়Ñ এসব বিষয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন এ মহান ব্যক্তি। বঙ্গবন্ধুর বাবার স্বপ্ন ছিল তিনি গ্রামেই থাকবেন তার ছেলে ও নাতি-নাতনী নিয়ে, ঢাকায় আসবেন না। একদম শেষ অংশে ধারাভাষ্যকার সংশয় প্রকাশ করেন, তার বাবার এই স্বপ্ন কখনও পূরণ হবে না। কারণ এই ব্যক্তি তার অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সবকিছু উজাড় করে দিয়েছেন এ দেশের জন্য।
বাংলাদেশ! : ১৯৭২ সালে আরেকটি আলোচিত প্রামাণ্যচিত্র ‘বাংলাদেশ!’ যেটি প্রযোজনা করেছিলেন এবিসি টিভি। এটি সে সময় যুক্তরাষ্ট্রে প্রচারিত হয়। এখানে বঙ্গবন্ধুর যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ গড়ায় দৃঢ় প্রত্যয় ও সংকল্পের প্রমাণ পাওয়া যায়। তিনি অকুণ্ঠচিত্তে ঘোষণা দেন তার প্রথম লক্ষ্য এ দেশের মানুষের অন্ন সংস্থান করা, তাদের ধ্বংস হওয়া ঘরবাড়ি পুনর্নির্মাণ, যোগাযোগ ব্যবস্থা পুনর্স্থাপন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি। যুদ্ধকালীন বিজয় লাভের সন্ধিক্ষণে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবে রাশিয়ার ভেটো প্রদানকে তিনি কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করেন। একই সাথে তিনি অন্য দেশের সাথেও সম্পর্ক স্থাপনের মনোভাব ব্যক্ত করেন। তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেনÑ তার লক্ষ্য জোটনিরপেক্ষ, স্বাধীন, পররাষ্ট্রনীতি। মার্কিন সাংবাদিক হাওয়ার্ড টাকনার এবং পিটার জেনিংসের সাথে সাক্ষাৎকারে উঠে আসে তার এসব পরিকল্পনার কথা। এই প্রামাণ্যচিত্রের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো যুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশের মানুষের বেঁচে থাকার সংগ্রাম, মাথা তুলে দাঁড়ানোর প্রচেষ্টা।
ডেভিড ফ্রস্ট প্রোগ্রাম ইন বাংলাদেশ : কিংবদন্তি ব্রিটিশ সাংবাদিক ডেভিড ফ্রস্ট যুদ্ধের ঠিক পরপর ১৯৭২-এর জানুয়ারিতে বঙ্গবন্ধুর একটি সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন, যা ‘ডেভিড ফ্রস্ট প্রোগ্রাম ইন বাংলাদেশ’ নামে বিশ্বজুড়ে পরিচিত। এ সাক্ষাৎকারে বঙ্গবন্ধুর গ্রেফতারের মুহূর্ত, পাকিস্তানের কারাগারে বন্দিদশা, বিচার প্রক্রিয়া, পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হত্যা, লুণ্ঠন, ধর্ষণসহ যাবতীয় বর্বরতা ইত্যাদি প্রসঙ্গ উঠে এসেছিল বেশ ভালোভাবেই। একই সাথে তার রাজনৈতিক জীবনে অসংখ্য কারাগারবাস, রাজনৈতিক আদর্শ, বিশ্বনেতাদের প্রসঙ্গ যাদের তিনি অনুপ্রেরণার উৎস মানেন, সেসব বিষয়ও আলোচিত হয়েছে। এ সাক্ষাৎকারেই প্রথম বঙ্গবন্ধু জানান যে, বাংলাদেশে গণহত্যার শিকার মানুষের সংখ্যা ৩০ লাখ। তিনি বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশের পাশে এসে দাঁড়াতে আহ্বান জানান এ আলাপচারিতায়।
দ্য স্পিচ : বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ এবং এর বিশ্লেষণ নিয়ে আরেকটি তথ্যবহুল প্রামাণ্যচিত্র ‘দ্য স্পিচ’। পরিচালনায় ছিলেন ফখরুল আরেফিন। এই ভাষণ বাঙালি জাতির জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যময়। কারণ এর মাধ্যমেই স্বাধীনতাযুদ্ধের দিক-নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সেই সময়ে সামরিক শাসন জারি ছিল। এমন প্রতিকূল পরিস্থিতিতে একটি জাতির উদ্দেশ্যে এমন বিস্তৃত খোলামেলা ভাষণ দেওয়া দুরূহ ব্যাপার। আরও দুঃসাধ্য সেটি ভিডিও করা এবং যুদ্ধদিনে সংরক্ষণ। ‘দ্য স্পিচ’ প্রামাণ্যচিত্রে সেই ইতিহাসটা তুলে ধরা হয়েছে। সাক্ষাৎকারভিত্তিক এই প্রামাণ্যচিত্রে আমরা জানতে পারি কীভাবে শুরু হলো ভাষণ ভিডিও করার পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন এবং কঠোর গোপনীয়তায় সংরক্ষণ, যা পরবর্তীতে আমাদের ইতিহাসভিত্তিক উপাদানে এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ যোগ করেছে। আর এসব ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গকে ক্যামেরার সামনে হাজির করা হয়েছে তাদের ঐ সময়কার কর্মকা- সম্পর্কে জানতে। যেমনÑ মূল পরিকল্পনাকারী তৎকালীন এমএনএ (মেম্বার অফ ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি) আবুল খায়ের, ডিএফপি (ডিপার্টমেন্ট অফ ফিল্ম)-এর ক্যামেরাম্যান আবুল খায়ের এবং এমএ মোবিন।
তা ছাড়া আবদুুল গাফ্ফার চৌধুরীর ‘পলাশী থেকে ধানমন্ডি’, তারেক মাসুদের গান, বিশ্বজিৎ সাহার ‘বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ’ প্রসংশিত। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর রাজনৈতিক বৈরী পরিস্থিতির কারণে এবং ভালো পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে ‘বঙ্গবন্ধু’ এবং ১৫ আগস্টের নির্মমতার ওপর কোনো সম্পূর্ণ সিনেমা নির্মিত হয়নি, যা হওয়া বাঞ্ছনীয় ছিল। এখন বোধকরি সময় এসেছে ‘বঙ্গবন্ধু ও তার শহীদ পরিবার’-এর ওপর উন্নতমানের তথ্যচিত্র ও পূর্ণ দৈর্ঘ্য সিনেমা নির্মাণের। আশা করি তা আমরা অচিরেই দেখতে পাব।

পাঠকের মন্তব্য:

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না। তারকাচিহ্নযুক্ত (*) ঘরগুলো আবশ্যক।

*