বিভাগ: ছোট গল্প

তিন বিল্লি গেলাম দিল্লি

8-6-2018 7-38-41 PMনিয়ামত শাহ: রম্য রচনার প্রতীকী প্রয়োজনে আমরা তিনজন হয়ে গেলাম তিন বিল্লি। ক’দিন আগে গিয়েছিলাম দিল্লি।
কেন? কেন? প-িতি ভাষায় ‘কার্যকারণ কী’?
শুঁটকি। শুঁটকি। বাংলাদেশে আমরা ২০০৭ সনের ১১ জানুয়ারি থেকে ডাইরেক্ট শুঁটকি থেকে বঞ্চিত। এই শুঁটকি পাওয়ার জন্য কত কী যে করলাম। কত ম্যাঁওয়াও। কত ঘ্যাঁওয়াও। নখদন্ত। আঁচড়। হ্যাঁচোর প্যাঁচোর। মনুষ্যভাষায় আগুনে বোমা, জ্বালাও পোড়াও, অবরোধ, চালক-যাত্রী আগুনে পুড়ে খাক করে দেয়া। আরও কত কী। বিদেশি দূত বিল্লি, স্বদেশী ‘সুশীল’ মার্জার, মিডিয়া টাইকুন ভেলকি। তবু হায় মেলেনি শুঁটকি।
২০০৮। ২০১৪। শুঁটকি মিলল না অনেক ম্যাঁওয়াও কাইজার পরও। পদ্মাসেতু আটকাবার সব ফন্দিফিকিরও ফক্কিকার হয়ে গেল। আমাদের গোত্রপ্রধানা বললেন, পদ্মাসেতুতে কেউ উঠবেন না। ওটা জোড়াতালি দিয়ে বানানো। ভেঙে পড়বে। একেবারে একটি সেতু কোনো জোড়া না লাগিয়ে তৈরি করবার নির্মাণ বিজ্ঞান পৃথিবীতে কোথাও নেই। তাই বিশ্ববিজ্ঞানীরা মুচকি হাসেন। হাসুক।
এখন চাই শুঁটকি। যে করেই হোক শুঁটকি চাই। ২০১৮-১৯ এর পর্বে আমাদের যে ক্ষমতা নামক শুঁটকি ছাড়া কোনো উপায় নেই। আর পারি না।
আমাদের দেশি-বিদেশি ‘চিন্তাপুকুর’ মহামতিবৃন্দ এক হলেন। এখন কী করা যায়। সবশেষে এই ঠিক হলো দিল্লির মহাবিল্লিরা আমাদের দেশের শুঁটকি ব্যাপারটিতে যেহেতু একটা কিছু, অতএব সেই দিল্লিওয়ালা মহাবিল্লিদের দিল ভিজানো ছাড়া গতি নেই। ‘চিন্তাপুকুররা’ অনেক ভেবেচিন্তে আমাদের তিন বিল্লিকেই দিল্লিতে হাজিরা-নজরানা দেবার জন্য ঠিক করলেন।
হায় হায় কী করি! কী করি!! কেননা শুঁটকির আন্তর্জাতিক আর আঞ্চলিক হিসাবে আমরা যে অনেক জট পাকিয়ে ফেলেছি। একসময় বলেছি এদেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ বাসিন্দাদের আজান, নামাজ, কোরআন কিছুই থাকবে না যদি শুঁটকির তহবিলদারি আমাদের হাতে না থাকে। পার্বত্য চট্টগ্রাম চলে যাবে দিল্লির হাতে।
২০০১ সনে শুঁটকির তহবিলদারি আমাদের হাতে তুলে দিতে দিল্লিও অনেক আশা করে যোগ দিয়েছিল পশ্চিমা মহা মহা বিল্লিদের সাথে। গ্যাস দেবার কথা দিয়েও হিম্মত হলো না আমাদের। বরং দিল্লিরাজকে আউলা-ঝাউলা করতে জাহাজে-ট্রাকে করে বিপুল অস্ত্র সেঁধিয়ে দিলাম ওদের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে। তদুপরি ওদের দেশের একজন সর্বদলীয় গণ্যমান্য রাষ্ট্রীয় ব্যক্তিত্বের সঙ্গে মোলাকাত করার দিন-তারিখ-সময় অনেক আগে থেকেই ঠিক করার পরও তুচ্ছ অজুহাতে দেখা করলাম না। কূটনৈতিক ভাষা কী জানি না, এ যে এক বিশাল থাপ্পড়সম। কার বুদ্ধিতে গোত্রপ্রধান এমন অকা-টা করলেন, সেই ‘চিন্তাপুকুরে’ কারা কারা হাবুডুবু খেতেন তখন জানি না। সেই যে আমাদের মুখ পুড়ল, আর ভবি ভুলল না। ২০১৪ সালে শুঁটকির গন্ধ পেয়ে পেয়েও হঠাৎ পপাত ধরণীতল।
এইসব পটভূমি তো সবারই জানা। দিল্লির পিঠ-চাপড়ানিতে ২০০১ সনে শুঁটকি-মহাজন হয়েও ‘বেইমানি’ করার দায়ে পড়েছি এই বেকায়দায়। এখন আমরা মুখপোড়া বিল্লি প্রজাতি। ‘চিন্তাপুকুর’ ক’জনা বললেন, বাস্তব মেনে নিতে হবে। অতএব পোড়ামুখের লজ্জা নিয়েই রওনা হলাম দিল্লি।
পোড়ামুখে ঘষামাজা পেইন্ট মেকাপ করে অবশেষে হাজির হলাম দিল্লির মহাম্যাঁওয়াওদের নানা দফতরে। সামনের পদযুগলকে হাতজোড় করে আমরা তিনজনই একযোগে মৃদু মিউঁ মিউঁ মিনতিতে ভেসে গেলাম। শুঁটকি চাই। যে করেই হোক আপনাদের মন পেতে চাই। এই দেখুন সামনের ডান পায়ে বাঁ কান ধরি, বাঁ পায়ে ডান কান ধরি। ভুল হয়ে গেছে। বেয়াদবি করেছি। শুঁটকি পেয়েও বেইমানি করেছি। আপনাদের মহামান্যকে অপমান করেছি।
দিল্লিওয়ালারা অতঃপর বললেন : তোমাদের ওখানে কে শুঁটকির ভার পেল না পেল তা আমাদের ব্যাপার নয়। কিন্তু শুঁটকি পেয়েই যে তোমরা আমাদের স্বার্থে আঁচড় কাটো সেখানেই তো বড় গ্যাঞ্জাম। যে আঁচড় কেটেছ তার দাগ শুকাতে দাও। আমাদের পড়শির সাথে গোপন লেনদেন আর নয়। এবং ধৈর্য ধরো। ধৈর্য ধরো। সবুরে শুঁটকি মেলে।
কাকুতি মিনতি করলাম। আর কতাসবুর করিব, হে মহাম্যাঁওয়াও জন, আর কত? সহিতে পারিতেছি না। গোত্রপ্রধান কারাগারে। ইহার একটি হিল্লা করুন। গোত্র যুবরাজ আজ শরণার্থী হইয়া লন্ডনে নানাবিধ লণ্ঠন জ্বালাইতে জ্বালাইতে অধীর অস্থির হইয়া পড়িয়াছে। দেশে খুন খারাবি আগুনের মামলা সামলাইতে সামলাইতে হাজার হাজার আমাদের অনুসারীরা দম ফেলিবার ফুরসৎ পাইতেছে না।
দিল্লিওয়ালারা কহিলেন, ভাবিয়া করিও কাজ। করিয়া ভাবিলে দ্রুত সমাধান হইবে না। দেশি-বিদেশি যাহাদের তালে নাচিয়াছ, তাহাদের কাছে নারিকেল মার্কা শুঁটকির সন্ধান করিতে পার। তবে শুনো, আগের দুনিয়া নাই। আগের হিসাব নাই। তোমরা দুনিয়ার বড় বড় হিসাববিদ ভাড়া করো। অধীর হইও না। জঙ্গি দিয়া আমাদের নিরাপত্তাকে উসকাইও না। ভালা হইয়া যাও। অতঃপর আমরা ভাবিব। তোমাদের গোত্রপ্রধানা কারাগারে? আর তোমরা? প্রতিপক্ষকে ঝাড়ে বংশে ১৯৭৫ সনে শেষ করিয়াছ। ২০০৪ সনে অবশিষ্টদের শেষ করিবার নৃশংস কারবার করিয়াছ। তোমরা তোমাদের ইতিহাসের মহত্তম ব্যক্তির মৃত্যুদিনকে তোমাদের গোত্রপ্রধানার মিথ্যা জন্মদিন বানাইয়াছ। শুঁটকির তহবিলদারি পাইয়া বেসামাল হইয়া গিয়াছ।
অতঃপর আমরা কী করিলাম জানেন হে পাঠক।
দিল্লির দরবারে আমরা ভেউ ভেউ কাঁদিলাম, অশ্রুপাত করিলাম। ঘণ্টার পর ঘণ্টা। অবশেষে উহারা আমাদের পৃষ্ঠদেশ চাপড়াইয়া দিল সান্ত¦নার ভঙ্গিতে।
আর তুষ্ট সেই পৃষ্ঠদেশ তিনটি দেশে ফিরে ‘চিন্তাপুকুর’দের দেখালাম। ওরা দেখলাম চিন্তাকে গভীরতর করতে পুকুরে নতুন করে ড্রেজিং যন্ত্রপাতি নামিয়ে দিল।
এই হলো আমাদের দিল্লি সফরনামার ইতিবৃত্তান্ত।

বি. দ্র. : ১৯৫৪ সনে প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের মঞ্চে গাওয়া গীতটির একাংশ স্মরণ করুন :
সকল খোপের কইতর (কবুতর) খাইয়া,
চলছে বিড়াল হজ্বে ধাইয়া।

পাঠকের মন্তব্য:

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না। তারকাচিহ্নযুক্ত (*) ঘরগুলো আবশ্যক।

*