বিভাগ: সম্পাদকীয়

তৃণমূলের নেতাকর্মীরা দলের প্রাণস্পন্দন

গত ২৩ জুন, দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে নতুন অফিস উদ্বোধন এবং জেলার বিভিন্ন স্তরের আমন্ত্রিত ৬ সহস্রাধিক নেতাকর্মী এবং ৩০ জুন তৃণমূল পর্যায়ের নেতাদের বিভাগওয়ারি সমাবেশে সভাপতি শেখ হাসিনা যে দিক-নির্দেশনামূলক ভাষণ দিয়েছেন, তা আওয়ামী লীগের ধমনিতে রক্তপ্রবাহ যেমন বাড়িয়ে দিয়েছে, তেমনি বাড়িয়েছে দলের হৃদস্পন্দন। টানা দুই মেয়াদে ক্ষমতায় থেকেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে ক্ষমতার মোহে অন্ধ হয়ে জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন নি, জনগণের আশা-আকাক্সক্ষা, তাদের মন-মানসিকতা যে ভুলে যান নি, এই দিক-নির্দেশনামূলক বক্তব্যে তা সুস্পষ্টভাবে অভিব্যক্ত হয়েছে।
তৃণমূলের নেতাকর্মীরা হচ্ছে দলের প্রাণ। বাংলাদেশের ৬৫ হাজার গ্রামে রয়েছে আওয়ামী লীগের শেকড়। গ্রাম-ওয়ার্ড-ইউনিয়ন হচ্ছে এক কথায় তৃণমূল। অবশিষ্ট স্তরগুলো হলো উপজেলা/শহর, জেলা/মহানগর এবং সর্বোচ্চ স্তরে রয়েছে কেন্দ্র ও কেন্দ্র সংশ্লিষ্ট অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ। এই বিভিন্ন স্তরের সাথে দেশবাসী বিশেষত, সাধারণ মানুষের সম্পর্কেরও রয়েছে তারতম্য। যে মানুষগুলো দুর্গম কোনো নিভৃত পল্লিতে অথবা বিচ্ছিন্ন কোনো ছোট্ট শহরের পাড়ায়-মহল্লায় বসবাস করে, কার্যত তারাই হচ্ছে বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ। এই সংখ্যাগরিষ্ঠ সাধারণ মানুষের সাথেই মিলেমিশে থাকেন আওয়ামী লীগের তৃণমূলের নেতাকর্মীরা। তারাই দলের কর্মসূচি বলুন, সভানেত্রী শেখ হাসিনার কথা বলুন এবং স্থানীয় উপজেলা/জেলা পর্যায়ের নেতাদের কথা বলুন, জনগণের মধ্যে প্রচার করেন। এই তৃণমূলের নেতা-কর্মীদেরই আবার সরকারের বিভিন্ন কর্মকা-ের জন্য সরাসরি মানুষের কাছে জবাবদিহি করতে হয়। কেবল সরকারের কর্মকা- না, ইউনিয়ন, উপজেলা, এমপি, মন্ত্রী ও জেলা এবং কেন্দ্রীয় নেতাদের কার্যকলাপ, আচার-ব্যবহার, ভালো-মন্দ, সুনীতি-দুর্নীতি, তারা দলের পক্ষে বা দলবিরোধীÑ দেশের স্বার্থবিরোধী যে কোনো কাজ করেন, তার জন্য এই তৃণমূলের নেতা-কর্মীদেরই সরাসরি সাধারণ মানুষের প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়। তাদের মতামত শুনতে হয়। তাদের চাওয়া-পাওয়া, আশা-আকাক্সক্ষার কথা শুনতে হয়। এমনকি দলের ওপর আঘাত এলে তাদেরকেই প্রথম রুখে দাঁড়াতে হয়। বিপদে-আপদে, সুখে-দুঃখে তারা সাধারণ মানুষের সাথে একাত্ম হয়ে থাকেন। কার্যত তৃণমূলের রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা কোনো ভিন্ন জাতের মানুষ নন। তারা সাধারণ মানুষেরই অংশ। বলা যেতে পারে রাজনৈতিক সচেতন অংশ।
দীর্ঘ ৩৭ বছর একটানা দলের সভাপতি এবং তিন দফায় প্রায় ১৫ বছর প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বভার পালন করলেও জননেত্রী শেখ হাসিনা তৃণমূলের সাথে তার নিজের সম্পর্ক যেমন অটুট রেখেছেন, তেমনি তাদের শক্তি-দুর্বলতাগুলোও সম্যক অবহিত আছেন।
গত দুই দফায় টানা প্রায় ১০ বছর ক্ষমতায় থেকে বাংলাদেশের যে বিস্ময়কর উন্নয়ন হয়েছে, গরিব-মেহনতি মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের ধারার সূচনা হয়েছে এবং বিশ্বে বাংলাদেশ উন্নয়নের রোল মডেল হয়ে উঠেছে, তার সুদূরপ্রসারী গভীর তাৎপর্য সম্পর্কে জনগণকে কিন্তু তেমনভাবে সচেতন-শিক্ষিত করা হয়নি। ফলে তথ্যের স্বল্পতা, উন্নয়নের আলটিমেট ফলাফল এবং বিরোধীপক্ষের অপপ্রচারের ফলে সৃষ্ট বিভ্রান্তির কারণে আওয়ামী লীগের সাথে ভোটারদের একাংশের সাথে কিছুটা দূরত্ব সৃষ্টি হয়। এত বিশাল উন্নয়নের পরও কোথাও, স্থানীয় নির্বাচন হোক আর জাতীয় নির্বাচন হোক, আওয়ামী লীগ প্রার্থী যদি জয়লাভ করতে না পারে। সেজন্য কাকে দায়ী করবেন?
জননেত্রী শেখ হাসিনা তৃণমূল নেতাদের সে কথাটিই নানাভাবে বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করেছেন। তৃণমূল নেতারা যেমন সাধারণ মানুষকে আওয়ামী লীগের পক্ষেÑ নৌকার পক্ষে সংগঠিত করবেন, তেমনি তৃণমূল নেতা-কর্মীদেরও সংগঠিত করার দায়িত্ব দলের উপজেলা ও জেলার নেতৃবৃন্দের। দেশকে কী দিতে পারলাম এবং ভবিষ্যতে কী কী দিতে পারব, সমস্বরে এই কথাগুলো যদি মানুষকে বলা না যায়, তার বদলে ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়া, দলের অভ্যন্তরের দলাদলি, ভুল বুঝাবুঝি অথবা জনগণের পছন্দ নয়, এমনসব বিষয় নিয়েই যদি নেতাকর্মীরা ব্যস্ত থাকেন, তাহলে শত ভালো কাজ করেও জনগণের আস্থা অর্জন সম্ভব হবে না। সে জন্যই প্রধানমন্ত্রী কোনো রাখঢাক বা ভণিতা না করে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেছেন, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়-পরাজয় নির্ভর করবে তৃণমূল নেতা-কর্মীদের ওপর। তিনি সর্বস্তরের নেতা-কর্মীদের সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, নির্বাচনে সহজে বাজিমাত করা যাবে না। নির্বাচনকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। প্রতিপক্ষকে দুর্বল ভাবা ঠিক না। দেশবাসীকে সরকারের বহুমুখী উন্নয়নের কথা, মানুষের কল্যাণে গৃহীত নানা ব্যবস্থা এবং তার সুফলসমূহ চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখাতে হবে। বাংলাদেশের মানুষ অবিবেচক নয়। তবে তারা সহজে অপপ্রচারে বিভ্রান্ত হতে পারে। অতএব, জনগণকে যাতে কেউ বিভ্রান্ত করতে না পারে, তারা যেন উন্নয়ন ও সাফল্যের কথাগুলো ভালোভাবে জানে এবং ক্ষমতায় আওয়ামী লীগের ধারাবাহিকতা না থাকলে দেশ যে আবার অন্ধকারের অতল গহ্বরে তলিয়ে যেতে পারে, সে কথাগুলো তৃণমূল পর্যায় থেকে সর্বস্তরে ব্যাপক প্রচার চালিয়ে দেশবাসীকে জানাতে হবে। তাদেরকে জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সংগঠিত করতে হবে। একইসঙ্গে নিজেদের ভুল-ত্রুটিগুলি সংশোধন এবং দলে কোনো সুবিধাবাদী-অনুপ্রবেশকারী ভিন্ন আদর্শের লোক ঢুকে থাকলে তাদের কালো থাবা থেকে দলকে মুক্ত করতে হবে।
জননেত্রী শেখ হাসিনা দলের কর্মীদের পালস্ বুঝেছেন এবং হৃদস্পন্দন শুনতে পান। অতএব, নেত্রীর দিক-নির্দেশনা মনে রেখে ঐক্যবদ্ধভাবে নির্বাচনী সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়–ন। তার কথা শুনুন। তার হাত শক্তিশালী করুন। বিজয় আমাদের অনিবার্য।

পাঠকের মন্তব্য:

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না। তারকাচিহ্নযুক্ত (*) ঘরগুলো আবশ্যক।

*