বিভাগ: আন্তর্জাতিক

ত্রিপুরার উন্নয়নে কাজ করবে বিজেপির তরুণ তুর্কী বিপ্লব দেব

4-5-2018 7-25-46 PMসাইদ আহমেদ বাবু:১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীনতা অর্জন করলে, কংগ্রেস দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে জাতীয় কংগ্রেস নেতৃত্ব দান করেছিল। বর্তমানে কংগ্রেস দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল দুটির একটি, অন্য দলটি হলো ভারতীয় জনতা পার্টি। এটি বিশ্বের বৃহত্তম ও অন্যতম প্রাচীন রাজনৈতিক সংগঠন। ২০১৪ সালের হিসাব অনুসারে, ভারতের সংসদ ও রাজ্য বিধানসভাগুলোর প্রতিনিধি সংখ্যার দিক থেকে বিজেপি এখন ভারতের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল। প্রাথমিক সদস্যপদের দিক থেকে এটি বিশ্বের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল। বিজেপি একটি দক্ষিণপন্থি রাজনৈতিক দল। বিজেপির জন্ম হিন্দু মহাসভার গর্ভে, প্রথমে দলটির নাম ছিল জনসংঘ, এখন হয়েছে বিজেপি। শ্যামা প্রসাদ মুখার্জী এর প্রতিষ্ঠাতা। ১৯৭৭ সালে জরুরি অবস্থার পর জনসংঘ একাধিক রাজনৈতিক দলের সঙ্গে মিশে জনতা পার্টি গঠন করে। ভারতীয় জনসংঘ থেকে ভারতীয় জনতা পার্টি তথা বিজেপি তৈরি করেন, যা বর্তমানে ভারতের কেন্দ্রীয় ক্ষমতায় রয়েছে।
বিজেপি-কে বলা হয় সংঘ পরিবার পরিচালিত দল। ভারতে উগ্র হিন্দুত্ববাদ ও মৌলবাদের শক্তিশালী রেজিমেন্টেড সংগঠনের নাম হচ্ছে ‘রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘ’ বা আরএসএস। বিজেপির নেতৃত্ব এবং নীতি-নির্ধারণ করে আরএসএস। কংগ্রেস ভারতের স্বাধীনতা চেয়েছিল বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্য প্রতিষ্ঠা করে সবাইকে নিয়ে। কিন্তু আরএসএস বলতে থাকে, ভারতীয় সংস্কৃতি ও হিন্দু সংস্কৃতি সমার্থক। ভারতীয় জাতীয়তাকে হিন্দু জাতীয়তা হতে হবে। বিজেপি দক্ষিণ ভারত আর পূর্ব ভারতে দুর্বল ছিল। এখন দেখা যাচ্ছে সেখানেও তাদের বিজয় নিশান।
বাংলাদেশের প্রতিবেশী রাজ্য ভারতের ত্রিপুরায় ২৫ বছরের বাম দুর্গের পতন ঘটিয়ে বিধানসভা নির্বাচনে জয় ছিনিয়ে নিয়েছে কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন নরেন্দ্র মোদির দল বিজেপি। এ রাজ্যে মোট আসন ৬০টি। এর মধ্যে ৫৯টিতে নির্বাচন হয়েছে। নির্বাচনে ৪৩টি আসনে জয় পেয়েছে বিজেপি। বামফ্রন্ট পেয়েছে ১৬টি আসন। পশ্চিমবঙ্গে পতন ঘটার পরও ত্রিপুরায় লাল পতাকা উড্ডীন রেখেছিলেন মানিক সরকার; এবার বিজেপির কাছে সেই দুর্গ হাতছাড়া হলো বামদের। রাজ্যটিতে আগের নির্বাচনেও বিজেপি দলের কোনো অবস্থান ছিল না।
মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকার নিজের আসন ধরে রাখতে পারলেও তার মন্ত্রিসভার বেশিরভাগ সদস্যেরই ভরাডুবি হয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, দুর্নীতি রোধে ব্যর্থতা এবং আসামে বিজেপির উত্থানই মানিক সরকারের ভরাডুবির কারণ।
সৎ, নির্লোভ ভাবমূর্তির মানিক সরকারকে হটিয়ে ক্ষমতায় যেতে অর্থ ও গ্ল্যামারের তুমুল প্রদর্শনী ছিল বিজেপির পদ্মফুল মার্কাধারীদের। সেই হিসাবে এবার তাদের এই উত্থান উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজনীতিতে বড়সড় প্রভাব পড়বে বলেই মনে করা হচ্ছে। বাংলাদেশ সীমান্ত-লাগোয়া ও বাংলা ভাষাভাষি অধ্যুষিত এই রাজ্যের দখল নেওয়ার জন্য কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকার যে উত্তেজনার পারদ ছড়িয়েছিল তাতে আজ সুফল মিলেছে। ত্রিপুরা রাজ্যের মানুষ রাজনৈতিক পরিবর্তনের পক্ষে রায় দিয়েছে।
রাজ্যের মাত্র দুটিতে দীর্ঘদিন ধরে নেতৃত্ব দিয়ে আসছিল বামপন্থিরা। বিজেপির কোয়ালিশন জোটের মারপ্যাঁচে হেরেছে বামরা। তা নিয়ে বাম রাজনীতিতে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ, ভারতের ত্রিপুরায় নিজেদের এমন ভরাডুবির কোনো কারণই খুঁজে পাচ্ছে না বামপন্থিরা।
এদিকে দলের পরাজয়ে কোনোভাবেই মানিক লালকে দোষতে পারছেন না দলের নেতাকর্মীরা। মানিক লাল ভারতের ইতিহাসে অন্যতম সৎ ব্যক্তিত্ব। শুধু তাই নয়, ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি-সিপিএম নেতা মানিক সরকার পরপর চারবার মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছেন কেবল তার সততা আর মানবপ্রেমের জোরে। বামফ্রন্টের ২৫ বছরের শাসনক্ষমতার ২০ বছরই ত্রিপুরা শাসিত হয়েছে তার নেতৃত্বে। তার সততা নিয়ে বিরোধীদের মনেও কোনো প্রশ্ন নেই। ত্রিপুরায় বিদ্রোহীদের তৎপরতা নিরসন আর শিক্ষার হার বৃদ্ধির মতো গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি এসেছে তার হাত ধরে। তবুও কেন ক্ষমতা ছাড়তে হলো বামফ্রন্টকে?
১. বামপন্থিদের পরাজয়ের কারণ হিসেবে দলটির দুর্বলতা নয়; বরং বিজেপির অ্যাডভান্স নির্বাচনী প্রচারণাকেই দায়ী করছে ভারতীয় গণমাধ্যমগুলো। বিশেষ করে নির্বাচনী প্রচারণাকালে বিজেপি হিন্দুদের ভোট টানার পাশাপাশি খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদেরও মনোযোগের কেন্দ্রে চলে আসে।
২. মানিক সরকারের অন্যতম শক্তি ছিল রাজ্যের সংখ্যাগুরু বাঙালি ভাষাভাষির ভোটার। তবে বিজেপি বাঙালিদের সরকারি চাকরির সুযোগ দেওয়ার পাশাপাশি সপ্তম পে-কমিশন বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দেয়। মানিকের বাম সরকার কর্মচারীদের জন্য চতুর্থ পে-কমিশনে বেতন দিয়ে আসছে।
৩. ত্রিপুরার এই নির্বাচনে কেন্দ্রের শাসক দল বিজেপি আঞ্চলিক দল আদিবাসী পিপলস ফ্রন্ট অব ত্রিপুরার (আইপিটিএফ) সঙ্গে নির্বাচনী জোট বাঁধে। ত্রিপুরার সংগঠনটি আদিবাসীদের জন্য পৃথক রাজ্যের দাবি করে থাকে। ত্রিপুরার আদিবাসীদের এই গোষ্ঠীটি-ই মূলত বামদের হারিয়ে দিয়েছে। জানা যায়, ত্রিপুরায় আদিবাসী জনসংখ্যা ৩১ শতাংশ। আর বিধানসভা নির্বাচনে আদিবাসীদের জন্য ২০টি আসন সংরক্ষিত রয়েছে। বিজেপির এই জোট একটি সফল নির্বাচনী কৌশল হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে।
৪. এসব নির্বাচনে বিজেপি উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ব্যাপক অবকাঠামো উন্নয়নের পুরস্কার তুলে নিচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে রেলপথ ও সড়কপথ উন্নয়নে ব্যাপক প্রকল্প গ্রহণ করেছে বিজেপি। এর পাশাপাশি বিজেপির মতাদর্শিক অভিভাবক আরএসএস তাদের ‘ব্যাপক জনসংযোগ’ উদ্যোগের মাধ্যমে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জনতাকে বিজেপির বিষয়ে সচেতন করে তুলতে সক্ষম হয়েছে।
৫. বিজেপি তরুণ প্রজন্মের একটা বড় অংশের ভোট পেয়েছে এবার। এদের শিক্ষা-দীক্ষা রয়েছে; কিন্তু হাতে কোনো কাজ নেই। শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা এ রাজ্যে প্রায় ৫ লাখ। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ত্রিপুরায় প্রচারে গিয়ে, স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন তরুণদের হাতে কাজ দেওয়ার। বিজেপির পক্ষে এবং বামফ্রন্টের বিপক্ষে এটা একটা বড় ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
ত্রিপুরা বিজয়ের পর নিজের ভাষণের তারুণ্যের জয়গান করেছিলেন নরেন্দ্র মোদি। গর্ব করে বলেছেন, ত্রিপুরায় বিজেপির বেশিরভাগ বিধায়কই তরুণ। তরুণদের নিয়ে যখন একের পর এক শৃঙ্গ জয় করছে গেরুয়া শিবির, তখন বার্ধক্যের ভারে জরাজীর্ণ রাজ্যের সিপিআইএম। দলের তরুণ নেতাদের দায়িত্ব না নিলে আগামী প্রজন্ম উঠে আসবে কীভাবে? সে প্রশ্নও উঠছে।

ত্রিপুরায় বিজিপির জয়ের নেপথ্যে কে এই বিপ্লব দেব
ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী বিপ্লব দেবের বয়স ৪৮। বিপ্লবের আদি বাড়ি বাংলাদেশের চাঁদপুর কচুয়ায়। উপজেলার মেঘদাইর গ্রামের হিরুধন দেব ও মিনা রানী দেবের একমাত্র ছেলে তিনি। ১৯৭১ সালে বাবা-মা’র সঙ্গে ত্রিপুরায় চলে যান। এরপর সেখানেই স্থায়ী বাসিন্দা হন। তবে বিপ্লবের অনেক আত্মীয়স্বজন এখনও কচুয়ায় বসবাস করেন। তার আপন চাচা প্রাণধন দেব এখন কচুয়া উপজেলা হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
ত্রিপুরার নবনির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রী বিপ্লব কুমার দেব শপথ নেওয়ার কিছুক্ষণ আগে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফোন করেছেন। এ সময় তিনি বাংলাদেশের সহযোগিতা চান। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও তাকে সার্বিক সহযোগিতার আশ্বাস দেন। তিনি ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় ত্রিপুরার জনগণের নানা ধরনের সহযোগিতার কথা কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করেন।
শপথের পর ত্রিপুরার জনগণকে উন্নয়নের নানা ধরনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন বিপ্লব। তিনি বলেন, ত্রিপুরাবাসীকে আমি ভালোবাসি। কমিউনিস্ট ও মানিক সরকারকেও ভালোবাসি। কিন্তু আমি হতাশ হয়েছি যে, তারা (সিপিআই-এম) অনেক সময় পেলেও রাজ্যের উন্নয়নে সম্পদের সদ্ব্যবহার করেনি। আমি ত্রিপুরাবাসীর উন্নয়নের জন্য রাজনীতি করব।

পাঠকের মন্তব্য:

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না। তারকাচিহ্নযুক্ত (*) ঘরগুলো আবশ্যক।

*