বিভাগ: সম্পাদকীয়

দেশ ও তরুণ প্রজন্মকে বাঁচাতে মাদকবিরোধী অভিযান

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে মাদক চোরাচালান, অবৈধ মাদক ব্যবসা এবং মাদকাসক্তি উদ্বেগজনক পর্যায়ে উপনীত হয়েছিল। মাদকাসক্তি একটা জাতীয় সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশের নগর-বন্দর-গ্রাম সর্বত্র মাদকের কালো থাবা বিস্তার লাভ করেছে। আমাদের তরুণ প্রজন্মকে মাদক তিল তিল করে এক ধরনের ‘গণহত্যার’ শিকারে পরিণত করেছে। মাদকের ক্রমবর্ধমান সর্বনাশা নেশার জন্য কেবল তরুণ প্রজন্মই ধ্বংসের কবলে পড়েনি। সমগ্র জাতি আজ এই জন্য মূল্য দিচ্ছে।
সম্প্রতি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মাদকের বিরুদ্ধে প্রকারান্তরে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন। তিনি ঘোষণা করেছেন, মাদকের প্রশ্নে কোনো ছাড় নেই। জিরো টলারেন্সের ঘোষণা দিয়ে প্রধানমন্ত্রী মাদক ব্যবসায়ী, চোরাচালানি চক্র ও সরবরাহকারীদের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সর্বাত্মক অভিযান পরিচালনার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে বলেছেন, আমরা আমাদের সন্তানদের ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিতে পারি না। সরকারের সুস্পষ্ট ঘোষণা রয়েছে, রাজনৈতিক দল ও মতামতের ঊর্ধ্বে মাদক সংশ্লিষ্ট অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ অভিযান চলবে।
গত ৩ মে র‌্যাবের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে মাদক নির্মূলে প্রধানমন্ত্রী নির্দেশনা দেওয়ার পর থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা করছে। মাদক ব্যবসায়ী ও চোরাচালানি চক্রও বসে নেই। তারা মাদকবিরোধী অভিযানকালে, তাদের সাম্রাজ্য হারানোর ভয়ে মরিয়া হয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে বন্দুকযুদ্ধে লিপ্ত হচ্ছে। ফলে গত ৪ মে থেকে ৩১ মে পর্যন্ত বন্দুকযুদ্ধে ১২৬ জন মাদক ব্যবসায়ী, চোরাচালানি নিহত হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীরও অনেক সদস্য আহত হয়েছেন। উদ্ধার হয়েছে বিপুল পরিমাণ মাদক (ইয়াবা, ফেনসিডিল, গাঁজা, হেরোইন প্রভৃতি) এবং অবৈধ অস্ত্র। ইতোমধ্যে সারাদেশে পরিচালিত চিরুনি অভিযানে গ্রেফতার হয়েছে ১০ সহ¯্রাধিক মাদক ব্যবসায়ী।
সরকারের এই মাদকবিরোধী অভিযানকে দেশবাসী স্বাগত জানিয়েছে। কিন্তু আমাদের প্রধান বিরোধী দল বিএনপি এবং ‘মানবাধিকারের সোল এজেন্ট’ হিসেবে পরিচিত কিছু এনজিও সংগঠন ও ‘বুদ্ধিমান’ ব্যক্তি তীব্র ভাষায় সমালোচনা করছেন। সরকারের মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য, নিহত মাদক ব্যবসায়ী-সন্ত্রাসীদের জন্য তারা চোখের জলে-হাঁটুর জলে বুক চাপড়িয়ে গণমাধ্যমের পর্দা ও পৃষ্ঠা ভিজিয়ে ফেলছেন। অথচ এই মানবাধিকার কারবারীদেরই দেখেছি, জিয়াউর রহমান যখন ১৯৭৬-৭৭ সালে কারাগারে আটক বিমান বাহিনী, সেনাবাহিনীর অগণিত সদস্য (এক হিসাবে ৬০০ জন)-কে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে সামরিক ট্রাইব্যুনালে বিচারের নামে কার্যত বিনাবিচারে ফাঁসিতে লটকিয়ে হত্যা করেছে, তখন কেউ ‘টুঁ’ শব্দটি পর্যন্ত করেনি। সামরিক শাসকের ভয়ে থরহরিকম্প মানবাধিকার কারবারীরা সেদিন নীরব ভূমিকা পালন করেছে। ২০০২ সালের ১৬ অক্টোবর থেকে ২০০৩ সালের ৯ জানুয়ারি পর্যন্ত খালেদা জিয়ার সরকার সেনাবাহিনী নিয়োগ করে অপারেশন ক্লিনহার্ট অভিযান পরিচালনা করেছে। তখন প্রায় প্রতিদিনই ঘোষণা করা হয়েছে ধৃত ব্যক্তি নিরাপদ হেফাজতে হার্ট অ্যাটাকে মৃত্যুবরণ করেছে। এভাবে সে যাত্রায় ৮৭ জন মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। খালেদা জিয়ার দুঃশাসনের সময়েই ১৪০০ মানুষকে ‘ক্রসফায়ারে’ হত্যা করা হয়েছিল।
মাদক একটা কালান্তক ব্যাধি। সমাজের উঁচু-নিচু কোনো স্তরের তরুণরাই এ সংক্রামক থেকে মুক্ত নয়। আমাদের স্মৃতিতে জ্বলজ্বল করছে মাদকাসক্ত স্কুলছাত্রী ঐশীর কথা। ঐশী মাদকাসক্ত হয়ে তার পুলিশ কর্মকর্তা বাবা ও মাকে হত্যা করতে দ্বিধা করেনি। দেশের নানা প্রান্ত থেকে প্রায়শই সংবাদপত্র-টেলিভিশন ও সামাজিক গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়, মাদকের টাকা না পেয়ে ছেলে তার মাকে, বাবাকে হামলা করেছে, হত্যা করেছে। আমরা এ খবর দেখি ইয়াবা খেয়ে বাস চালানোর কারণে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটিয়ে কতজনের প্রাণ অকালে ঝরে যাচ্ছে। মাদকাসক্তির কারণে একটা মেধাবী প্রজন্মের তরুণ-তরুণী অসুস্থ হয়ে পড়ছে। তার প্রভাব পড়ছে লেখাপড়ায়, ইভটিজিংয়ে, চুরি-ডাকাতি-ছিনতাই প্রভৃতি অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধিতে। অতএব, এই মারাত্মক কালগ্রাস ব্যাধি থেকে, এই তিলতিল গণহত্যা থেকে প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশÑ আমাদের তরুণ প্রজন্মকে যে-কোনো মূল্যে রক্ষা করতে হবে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তি একসময় চীনের জনগণকে আফিম খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখার পরিকল্পিত চক্রান্ত করেছিল। জাগ্রত চীনের জনগণ সেই আফিমের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামে পর্যন্ত নামতে বাধ্য হয়েছিল। মানবেতিহাসে চীনের ‘আফিম যুদ্ধ’ বা ‘অপিয়াম ওয়্যার’ হিসেবে খ্যাত সেই যুদ্ধে হাজার হাজার মানুষকে প্রাণ দিতে হয়েছিল। হাজার হাজার চীনা সৈনিক-জনযোদ্ধা তাদের প্রাণ দিয়ে কোটি কোটি চীনা জনগণ এবং চীনা জাতিকে আফিমের অভিশাপ থেকে রক্ষা করেছিল। আজকের বাংলাদেশেও আমাদের সেই আফিম যুদ্ধের মতোই মাদকবিরোধী যুদ্ধে জয়লাভ করতে হবে। এর জন্য কিছু প্রাণ যাবে না তা নয়। কিন্তু আজ যদি মাদকবিরোধী অভিযান ব্যর্থ হয়, তা হলে কোটি কোটি বাঙালি তিলতিল করে অনিবার্য মৃত্যুর কাছে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হবে।
আমরা কেবল আইনি ব্যবস্থাকে একমাত্র নিদান মনে করছি না। আমরা মনে করি, মাদক ব্যবসায়ী চোরাচালানি চক্রকে উৎখাতের বর্তমান অভিযান একটা সীমিত অভিযান। কেননা, মাদকের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে না পারলে, মাদক চোরাচালানিদের আন্তর্জাতিক চক্রকে সমূলে উৎখাত এবং এর পেছনের গডফাদারদের ধরে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে না পারলে একে নির্মূল করা যাবে না। সাময়িকভাবে হয়তো মাদক ব্যবসায় ভাটা পড়বে অথবা মাদকাসক্তির প্রকোপ কমবে। কিন্তু স্থায়ী ব্যবস্থা করতে না পারলে আবার এই সংক্রামক ব্যাধি মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে। অতএব, আমরা চলমান অভিযানের যেমন সাফল্য চাই, তেমনি সামাজিক প্রতিরোধ ও স্থায়ী প্রতিরোধের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ দেখতে চাই। বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনার প্রতি দেশবাসীর আস্থা আছে। কেবল তিনি একাই মাদকের করাল গ্রাস থেকে দেশকে রক্ষা করতে পারবেন না। দলমত নির্বিশেষে সমগ্র জাতিকে মাদকের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।

পাঠকের মন্তব্য:

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না। তারকাচিহ্নযুক্ত (*) ঘরগুলো আবশ্যক।

*