নারীদের জীবনযাত্রার চালচিত্র

Posted on by 0 comment

Mfdউত্তরা ইপিজেড: জাহাঙ্গীর আলম সরকার: বাংলাদেশের উত্তর জনপদের একটি জেলার নাম নীলফামারী। যেখানে অবস্থিত উত্তরা ইপিজেড। জননেত্রী শেখ হাসিনা নীলফামারীর সাধারণ মানুষের অভাব, মঙ্গা দূর করে নারীর ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে ২০০১ সালে উত্তরা ইপিজেড প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। প্রতিষ্ঠার প্রায় ১৮ বছর পর নীলফামারীর নারীদের জীবন মানে কী রকম পরিবর্তন ঘটেছে সে বিষয়টি এই লেখার উপজীব্য। বিগত প্রায় দুই দশকে নীলফামারীর নারীদের জীবনে এসেছে ইতিবাচক পরিবর্তন। এখানে নারীরা ক্ষমতায়িত হওয়ার পাশাপাশি আধুনিক সুযোগ-সুবিধাগুলো গ্রহণ করতে শুরু করেছে। উত্তরা ইপিজেড প্রতিষ্ঠার পূর্বে নীলফামারীতে অধিকাংশ নারীরা পরিবারের বোঝা হিসেবে পরিগণিত হতো। তারা চিহ্নিত হতো অতিরিক্ত হিসেবে। শুধু তাই নয়, বরং তাচ্ছিল্যের শিকার হতো প্রতিনিয়ত।
নীলফামারীতে ইতোমধ্যে নারী জীবনের এই দীর্ঘ স্থিতাবস্থার পরিবর্তন ঘটেছে। ইপিজেডসহ নানা শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠায় নীলফামারীর আর্থ-সামাজিক অবস্থার পরিবর্তনের পাশাপাশি এ অঞ্চলের নারীদের ক্ষমতায়িত করা সম্ভব হয়েছে। এখানে উল্লেখ্য যে, গত এক দশক ধরে নীলফামারীর সমাজে রাজনৈতিক এবং আর্থ-সামাজিক অধিকার অর্জনের জন্য যে প্রচেষ্টা চলছে, নারীমুক্তি অর্জন তার অন্যতম। শেইলা রাওবোথাম বলেছেন, ‘নারীর ইতিহাস ছিল লুকিয়ে’; কিন্তু সাম্প্রতিককালে নারী ক্রমশ সবক্ষেত্রেই দৃশ্যমান হয়ে উঠেছেন (দি পলিটিক্যাল রিডার ইন জেন্ডার স্টাডিজ ১৯৯৪:১)। ইদানীং নীলফামারীর প্রান্তিক এলাকাতেও এর প্রভাব ব্যাপকভাবে অনুভূত হচ্ছে। নীলফামারীতে নারীরা এখন আর ঘরে বসে নেই; বরং দলবল নিয়ে ছুটছে। সকালবেলা নারীদের ছুটে চলার দীর্ঘ লাইন দেখে সেটি সহজেই অনুমান করা যায়।
উত্তরা ইপিজেড বদলে দিচ্ছে নীলফামারীর নারীদের জীবনের চালচিত্র। এখানে বর্তমানে কর্মসংস্থান প্রায় ৩২ হাজার নারী-পুরুষের। বিগত ১০ বছরে নীলফামারীর আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে উত্তরা ইপিজেড গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। প্রচুর কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হওয়ায় এ অঞ্চল থেকে মঙ্গা দূর হয়েছে। উত্তরা ইপিজেড ও পার্শ্ববর্তী এলাকার জনগণের আগে দৈনিক গড় উপার্জন ছিল ৪০ টাকা বা তার নিচে। কিন্তু ইপিজেড স্থাপনের ফলে এ এলাকার মানুষের বর্তমান দৈনিক গড় উপার্জন ২৮০-৩২০ টাকায় পৌঁছেছে। এখানে কর্মরত শ্রমিকদের মধ্যে মজুরি-ভাতা বাবদ প্রতিমাসে প্রায় ৩৫ কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে। অর্থপ্রবাহ বৃদ্ধি পাওয়ায় স্থানীয় অর্থনীতিতে অন্যান্য ব্যবসার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। ইপিজেডের সার্বিক কর্মকা- বৃদ্ধি পাওয়ায় ইপিজেড সংলগ্ন এলাকায় বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠার পাশাপাশি প্রচুর বাণিজ্যিক ও আবাসিক ভবন গড়ে উঠছে। গত দুই দশকে বাংলাদেশের সামাজিক অবকাঠামোর প্রতিটি স্তরে ব্যাপক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে, যেখানে বেঁচে থাকার জন্য আর নিজেদের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতির লক্ষে মানুষকে একাধিক পন্থায় উপার্জনের পথ অনুসন্ধানে নিরন্তর ব্যস্ত থাকতে হচ্ছে।
হিমালয়ের পাদদেশের সমতল ভূমির মানুষগুলোর একাংশের বসবাস কৃষিনির্ভর নীলফামারীতে। অনাদিকাল থেকে কৃষিনির্ভর নীলফামারী সম্প্রতি শিল্পায়নের দিকে ঝুকেছে। ফলে কৃষিনির্ভর নীলফামারীর অর্থনীতিতে নতুন মাত্রা সংযোজন হয়েছে। সংগত কারণেই নীলফামারীর অর্থনীতি বদলে যাচ্ছে। বিষয়টি অর্থনীতির হলেও এর প্রতিক্রিয়া শুধু অর্থনীতির ভাবুক মহলে সীমাবদ্ধ নেই। থাকার কথাও নয়। কেননা যে কোনো সমাজে অর্থনীতি হচ্ছে সমাজের মূলভিত্তি। নীলফামারীও এর ব্যতিক্রম নয়। এই মূলভিত্তিকে কোনো পরিবর্তন অবশ্যই আর্থ-সামাজিক অবস্থা ও চিন্তাচেতনার উপরি কাঠামোতে প্রভাব ফেলবে। নীলফামারীর সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় তা-ই ঘটেছে। বর্তমানে নীলফামারী জেলার বদলে যাওয়া অর্থনীতি জানান দিচ্ছে অতীতের মঙ্গাপীড়িত নীলফামারী এখন একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির দিকে ধাবমান।
নীলফামারী জেলার অর্থনীতির এই ইতিবাচক পরিবর্তন নীলফামারীর সমাজের প্রচলিত অন্যান্য ক্ষেত্রের ওপর প্রভাব ফেলেছে। এই জেলায় সব শ্রেণি বা পেশার মানুষই ভালো বা মন্দভাবে প্রভাবিত হয়েছে, এমনকি শিল্প সংস্কৃতির চিন্তায়ও পড়েছে মুক্তবাজারের ছায়া। যে কবি এতদিন শুধু পৃথিবীর রূপ, রং বা প্রিয়ার সৌন্দর্য নিয়ে কাব্য রচনা করতেন, তিনিও আজ অর্থনীতি নিয়ে লিখতে শুরু করেছেন, ব্যবসায়ীরা নতুন করে হিসাব মেলানোর চেষ্টা করছেন, রাজনীতিবিদরা নতুন উপায় খুঁজে বের করার চেষ্টা করছেন। ফলে আলোচ্য নিবন্ধের উদ্দেশ্য নীলফামারীর অর্থনীতিতে ও নারীজীবনে উত্তরা ইপিজেডের প্রভাব। উত্তরা ইপিজেড নীলফামারী জেলার অর্থনীতিতে নতুন এক মাত্রা সংযোজন করার পাশাপাশি নীলফামারীর নারীদের জীবনে গুণগত পরিবর্তন আনতে পেরেছে। এখন নারীরা ঘর থেকে বেরিয়ে অফিসে বসে কাজ করছে, পরিবারের জন্য বাড়তি আয় রোজগার করছে। এখন তারা কর্মব্যস্ত দিন কাটায়।
প্রতিদিন সকালে নীলফামারীতে হাজার হাজার নারী সাইকেল ও ভ্যানে উত্তরা ইপিজেডের দিকে ছুটে চলে। এই নারীদের কাজে আসার চিত্রই বলে দেয় নীলফামারীর নারীরা এখন আর পরনির্ভরশীল নয়। নীলফামারীর অর্ধেক জনগোষ্ঠী, যারা অনাদিকাল থেকেই শুধুমাত্র সংসারের কাজ করেছেন মজুরি ছাড়াই। সেই নারীরাই আজ প্রতিমাসে রোজগার করছেন। নারীদের এই রোজগার পরিবারের শিশুদের উন্নত ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে কাজ করে যাচ্ছে। নারীরা উপার্জনক্ষম হওয়ায় পরিবারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করতে পারছেন। ফলে নীলফামারীতে একটি জেন্ডারবান্ধব শক্তিশালী কাঠামো সৃষ্টি হচ্ছে। এটাই হচ্ছে বদলে যাওয়া নীলফামারীর বর্তমান চিত্র।
অথচ মাত্র দুই যুগ পূর্বেও এখানকার নারীরা বাড়ির বাইরে বের হতো না। পরপুরুষের সাথে কথা বলত না। উন্নয়নে নীলফামারীর নারীরা আজ উত্তরা ইপিজেডে কাজ করছেন, ফলে বদলে যাচ্ছে এখানকার জীবনধারা। এই বদলে যাওয়ার মধ্যে একটি ইতিবাচক বার্তা রয়েছে। ধীরে ধীরে নারীর ক্ষমতায়নে নীলফামারীর উত্তরা ইপিজেড রোল মডেলে পরিণত হয়েছে। পিছিয়ে পড়া এ অঞ্চলের মেয়েরা কাজের মাধ্যমে নিজেদের অবস্থার পরিবর্তনের সুযোগ পেয়েছে। নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনের পাশাপাশি তারা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।
উত্তরা ইপিজেড নীলফামারীর নারীর জীবনের চালচিত্র বদলে দেওয়ার পাশাপাশি বদলে দিচ্ছে নীলফামারীর কৃষিনির্ভর অর্থনীতিকে। এই প্রতিষ্ঠানে কাজ করে নীলফামারীর হাজার হাজার নারী ও পুরুষ নিজেদের খারাপ দিন বদলাতে পেরেছে, ভাগ্যের পরিবর্তন করতে পেরেছে। এভাবে জননেত্রী শেখ হাসিনার হাত ধরে হাজার হাজার নারীর ভাগ্যের পরিবর্তনের পাশাপাশি নীলফামারীর অর্থনীতির একটি ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে। আর এই পরিবর্তনটি ঘটছে নীরবে।

Category:

Leave a Reply