বিভাগ: ইতিহাস : প্রবন্ধ

নারীর ক্ষমতায়ন ও নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠায় আওয়ামী লীগ

june2018সিমিন হোসেন রিমি: ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন আওয়ামী লীগের পথ চলার শুরু। দীর্ঘ এই পথ চলায় আওয়ামী লীগ এঁকেছে নতুন নতুন পদচিহ্ন। গণমানুষের সার্বিক মুক্তির লক্ষ্যে এই দল সংগ্রাম, ত্যাগ ও আদর্শ বাস্তবায়নে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ থেকে তৈরি করেছে অমোচনীয় দীপ্তিময় ইতিহাস। পাকিস্তানের ঔপনিবেশিক শাসনের ধারায় ভয়ঙ্কর দারিদ্র্য, চরম বৈষম্যে ভরা সমাজকে দেখিয়েছে অর্থনৈতিক মুক্তি, রাজনৈতিক স্বাধিকারের স্বপ্ন। এই স্বপ্ন বাস্তবায়নে সীমাহীন সংকট মোকাবিলা করতে করতে আওয়ামী লীগ পরিণত হয়েছে উদারপন্থি গণতান্ত্রিক দলে। এর নীতি, কর্মসূচি, সাংগঠনিক কাঠামো প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে এই দল গণমানুষের। এসব কিছুর পুরোভাগে থেকে যিনি মুক্তির কপোত ওড়ান, একের পর এক শৃঙ্খল ভেঙে এগিয়ে চলেন দৃঢ় পায়ে তিনি হয়ে ওঠেন সকলের বন্ধুÑ বঙ্গবন্ধু। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর সম্মোহনী নেতৃত্বে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা আওয়ামী লীগের শ্রেষ্ঠ অর্জন। আওয়ামী লীগ এ দেশের ইতিহাস-ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ১৯৪৯ থেকে ২০১৮, আওয়ামী লীগ উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর আরও। এ দেশের মানুষের সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা, সাফল্য-সৃষ্টি, উন্নয়ন, অর্জনÑ সব কিছুর সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে এই দল। বর্তমানে এই প্রতিষ্ঠান জননেত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী, সাহসী কর্মোদ্যোগী নেতৃত্বে বিশ্বসভায় আপন মহিমায় সমুজ্জ্বল।
আওয়ামী লীগের পথ চলা কখনোই মসৃণ ছিল না। রাজনৈতিক সংকট মোকাবিলা করতে হয়েছে পদে পদে। কিন্তু নীতি-আদর্শ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে দলীয় কর্মসূচিতে সকল সময় প্রাধান্য পেয়েছে মানুষ। মানুষের সার্বিক কল্যাণ-চিন্তা। উঠে এসেছে সমাজের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম প্রয়োজন এবং বাস্তবায়নের পরিকল্পনা।
সমাজের প্রধান অনুষঙ্গ মানুষ। মানুষের দুই রকম আদল নারী এবং পুরুষ। কাউকে বাদ দিয়ে কেউ নয়। এ যেন সভ্যতার দুটি হাত। একটি হাত অকেজো হলে এক হাত অক্ষম বহু কিছুতে। দল হিসেবে আওয়ামী লীগ নারীকে মর্যাদা দিয়েছে মানুষ হিসেবে একেবারে তার জন্মলগ্ন থেকেই। যার একটি সুন্দর উদাহরণ পাওয়া যায় ১৯৬৪ সালে পুনরুজ্জীবিত পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের খসড়া ম্যানিফেস্টোতে, সেখানে মৌলিক অধিকার অংশে বলা হয়েছেÑ “নারী-পুরুষ নির্বিশেষে পাকিস্তানের প্রতিটি নাগরিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে স্বীকৃত প্রতিটি মৌলিক অধিকার ভোগের অধিকারী। যথাÑ নাগরিকদের ধর্ম, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সভ্যতা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও সুষ্ঠু জীবনযাপনের অধিকার ও সুযোগ প্রতিষ্ঠা করতে হইবে। সকল নাগরিকের মৌলিক প্রয়োজনীয় খাদ্য, বাসস্থান, বস্ত্র, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও ন্যায়সংগত উপায়ে উপার্জনের ব্যবস্থা থাকিতে হইবে। আইনের চোখে সকলে সমান বলিয়া পরিগণিত হইবে।” [সূত্র : আওয়ামী লীগ ১৯৪৯-১৯৭১, পৃষ্ঠা-৩২৩, শ্যামলী ঘোষ]
এই ম্যানিফেস্টোর শিক্ষা অংশে বলা হয়েছে, “পাকিস্তানের প্রত্যেক নাগরিকের শিক্ষার অধিকারের বাস্তব রূপ দানের জন্য প্রাথমিক শিক্ষা অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক করিতে হইবে। মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এরূপ ব্যাপকভাবে প্রসারিত ও এরূপ সহজলভ্য ও সুলভ করিতে হইবে যাহাতে প্রতিটি দরিদ্র নাগরিকের ছেলেমেয়ে এই শিক্ষা লাভের সুযোগ গ্রহণ করিতে পারে। যুগের ও দেশের চাহিদানুসারে কারিগরি শিক্ষার ব্যাপক প্রসার করিতে হইবে, এই জন্য দেশে পর্যাপ্ত সংখ্যক কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের এবং বিদেশে ট্রেনিং প্রাপ্তির ব্যবস্থা করিতে হইবে।” [সূত্র : আওয়ামী লীগ ১৯৪৯-১৯৭১, পৃষ্ঠা-৩২৩, শ্যামলী ঘোষ]
আওয়ামী লীগ গতানুগতিক চিন্তার ঊর্ধ্বে উঠে নারীকে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে এগিয়ে নেওয়ার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে। যে চিন্তা সবকালেই আধুনিক, যৌক্তিক মানুষের চিন্তা। যে চিন্তায় মৌলিকত্বের আশ্বাস এবং নিশ্চয়তা মেলে। নারীকে অনগ্রসর রেখে সমাজ উন্নত হতে পারে না। নারী শিক্ষা লাভ করবে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হবে। অর্থনৈতিক কর্মকা-ে অংশ নেবে, স্বাবলম্বী হবে। আওয়ামী লীগ শুরু থেকেই এক্ষেত্রে স্পষ্ট এবং অকপট।
এ কারণেই হয়তো আমরা দেখি আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অঙ্গনে কখনও নেপথ্যে আবার কখনও প্রকাশ্যে নারীর বিশাল অবদান। বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক চড়াই-উৎরাই জীবনের ছায়াসঙ্গী ছিলেন তার আজন্ম সাথী বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিব। স্বাধীনতার পূর্বে বঙ্গবন্ধুর দীর্ঘ কারাবাসের সময় তিনি হয়ে উঠেছিলেন অসংখ্য নেতাকর্মীর আশ্রয় ও ভরসাস্থল। নিজ পরিবারকে সুচারুরূপে পরিচালনা করা এবং একই সঙ্গে বহু কিছুতে আমৃত্যু তার ভূমিকা ছিল দৃঢ়তায় ভরা অনন্য।
প্রায় জন্মলগ্ন থেকেই আওয়ামী লীগে নারীর অংশগ্রহণ ছিল। ভাষা আন্দোলনে যেসব ছাত্রী ও শিক্ষয়িত্রী অংশগ্রহণ করেছিলেন, পরবর্তীতে তাদের অনেকেই আওয়ামী লীগের সক্রিয় সদস্য হিসেবে ভূমিকা পালন করেছেন। ১৯৫৪ সালের প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের ব্যানারে ৯ জন নারী নেত্রী নির্বাচিত হয়েছিলেন। এদের মধ্যে আনোয়ারা বেগম, দৌলতুন্নেসা, নূরজাহান মুর্শিদ, বদরুন্নেসা আহমেদ, সেলিনা হোসেন এবং আমেনা বেগম পরবর্তীকালে জাতীয় আন্দোলনের মূলধারার নেত্রী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন।
১৯৬৬ সালে ৬-দফা আন্দোলনের সময় যখন বঙ্গবন্ধুসহ দলের অধিকাংশ কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ কারাগারে বন্দী, সেই সময় দলের মহিলা বিষয়ক সম্পাদিকা আমেনা বেগম দলকে এগিয়ে নিতে বিশাল ভূমিকা রাখেন।
ষাটের দশকের এই পর্বে কারাগারে বন্দী আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের স্ত্রী সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দীন রাজবন্দি সাহায্য কমিটি যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে রাজপথের আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।
১৯৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থানের ফলে বঙ্গবন্ধু বীরের বেশে মুক্তির দিশারি রূপে মুক্ত হলে শুধু আওয়ামী লীগ নয়, সমগ্র পূর্ব পাকিস্তান যেন প্রাণ ফিরে পায়। বঙ্গবন্ধুর মনের গভীরে সুখী সমৃদ্ধশালী সোনার বাংলার চিত্র ছিল আঁকা, তাতে তিনি যুক্ত করেছিলেন প্রগতিশীল চিন্তার বিশিষ্ট নারীদের। ১৯৭১ সালে গৌরবময় আত্মত্যাগের মহান মুক্তিযুদ্ধে নারী সমাজের ভূমিকা ছিল বিশেষভাবে স্মরণযোগ্য। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে নারীদের বিশেষভাবে সংগঠিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। সে সময় কলকাতার সন্নিকটে গোবড়া ক্যাম্পে নারীদের প্রশিক্ষণের ও সংগঠিত করার কাজে নেতৃত্ব দিয়েছেন বেগম সাজেদা চৌধুরী। তার সাথে আরও অনেক নারী নেত্রী যুক্ত ছিলেন। স্বাধীন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত হন মিসেস বদরুন্নেসা আহমেদ, মিসেস নূরজাহান মুরশিদ।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে নির্মমভাবে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর দেশের ওপর নেমে আসে দুর্দিন। আড়াই মাস পর নভেম্বরের ৩ তারিখে হত্যা করা হয় জেলে বন্দী জাতীয় চার নেতা বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহকর্মী সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, এম মনসুর আলী এবং এএইচএম কামারুজ্জামানকে। এরপর অবৈধ সামরিক শাসনের বেড়াজালে আবদ্ধ থাকে সমস্ত রাজনৈতিক কর্মকা-। ১৯৭৬ সালের আগস্ট মাসের শেষ ভাগে আওয়ামী লীগকে পুনর্গঠনের লক্ষ্যে দলের সাবেক সিনিয়র সহ-সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদকে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি এবং মহিলাবিষয়ক সম্পাদিকা বেগম সাজেদা চৌধুরীকে ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব অর্পণ করা হয়। এর তিন মাস পর বেগম সাজেদা চৌধুরীসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দকে কারারুদ্ধ করা হয়।
এরপর ১৯৭৭ সালের এপ্রিল মাসে আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনে সর্বসম্মতিক্রমে সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দীনকে আহ্বায়ক করে ৪৪ সদস্য বিশিষ্ট একটি সাংগঠনিক কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত হয়। এই সম্মেলনে সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দীন তার বক্তব্যে বলেন, আওয়ামী লীগ একটি আদর্শভিত্তিক সংগঠন। এ ধরনের সংগঠনের মৃত্যু নেই। তিনি আরও বলেন, জাতি আজ এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। বর্তমানে স্বাধীনতার ইতিহাস বিকৃত করার চেষ্টা চলছে। কিন্তু ইতিহাস বিকৃত করা যায় না। শুধু রক্তপাত দিয়ে স্বাধীনতা আসে না। যদি তা হতো তাহলে ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহ সফল হতো। নেতৃত্ব ছাড়া স্বাধীনতা সংগ্রাম হয় না। ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধুর ডাকেই স্বাধীনতা সংগ্রাম হয় এবং তা সফল হয়। [সূত্র : মূলধারার রাজনীতি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কাউন্সিল ১৯৪৯-২০১৬, পৃষ্ঠা-১৮৪-৮৫, হারুণ-অর-রশিদ]
সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দীন উল্কাবেগে ছুটে চলেন জনগণের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে আওয়ামী লীগকে নতুন জাগরণে সংগঠিত করতে। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে তিনি থাকেন দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। ’৭৮ সালে কাউন্সিল অধিবেশনে তিনি তার সাংগঠনিক রিপোর্ট তুলে ধরেন। সেখানে তিনি উল্লেখ করেন ৫৭টি সাংগঠনিক জেলার দলীয় কর্মী সমাবেশে তিনি যোগ দেন। তার বক্তব্যের অন্যান্য উল্লেখযোগ্য বিষয় ছিল সরকারের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে মাইক ব্যবহার এবং এটিকে আন্দোলনের শুরু হিসেবে বর্ণনা করা, বঙ্গবন্ধুকে মহান শিক্ষক হিসেবে আখ্যায়িত করা, আওয়ামী লীগকে গড়ে তুলতে বঙ্গবন্ধুর দীর্ঘ দিনের ত্যাগ ও সংগ্রাম, শোষণমুক্ত সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠাকে বঙ্গবন্ধুর দ্বিতীয় বিপ্লবের লক্ষ্য হিসেবে উল্লেখসহ রাজনৈতিক সামাজিক প্রয়োজনীয় প্রায় সব বিষয়ের উল্লেখ করে নেতা-কর্মীদের ভবিষ্যৎ আন্দোলনের ইঙ্গিত দিয়ে সেজন্য মানসিক প্রস্তুতির আহ্বান জানান। [সূত্র : মূলধারার রাজনীতি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কাউন্সিল ১৯৪৯-২০১৬, পৃষ্ঠা-১৮৪-৮৫, হারুণ-অর-রশিদ]
১৯৮১ সানে ঐক্যের প্রতীক, উজ্জ্বল তারকা রূপে আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে নিজ দেশে ফিরে এসে দলের হাল ধরেন জননেত্রী শেখ হাসিনা। এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ করার মতো একটি দিক হলো, দলের দীর্ঘ পরিক্রমায় রাজনৈতিক সংকটকালে অনেক নেতা দল ছেড়েছেন, দলের বিরুদ্ধাচারণ করে দলকে বিপদে ফেলেছেন। কিন্তু এই বিপথগামীদের দলে কোনো নারী কখনোই ছিলেন না। আওয়ামী লীগের নারী রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের দলের প্রতি ভালোবাসার এই নজির অনন্যই নয় শুধু, অনুকরণীয়ও বটে।
সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দীন স্বাধীনতার পূর্বে যেমন ভূমিকা রেখেছেন তেমনি পরবর্তীতে দলের ক্রান্তিকালে হাল ধরেছিলেন। দেশ ও দলের প্রতি ভালোবাসা ছিল তার জীবনের ধ্যান-ধারণা। আমৃত্যু একনিষ্ঠভাবে দলের সাথে জড়িয়ে ছিলেন। বেগম সাজেদা চৌধুরী দলের সুদিনে-দুর্দিনে দলকে করেছেন সংগঠিত। দলের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন, এখনও মিশে আছেন দলের সাথে। আইভি রহমান নারী নেতৃত্বের এক উজ্জ্বল নাম। অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিলেন নারীদের সংগঠিত করার ক্ষেত্রে। তার সংগঠনের প্রতি ভালোবাসা ছিল অমলিন। প্রাণ উৎসর্গ করেছেন ঠাঁই নিয়েছেন হৃদয়ে। আরও আছে অসংখ্য উদাহরণ। প্রতিটি জেলা-উপজেলায় ছড়িয়ে আছেন নিবেদিত প্রাণ নারী। প্রতিকূল পরিবেশ, সামাজিক নানা ধরনের বৈষম্যকে ঠেলে আঁকড়ে আছেন দলের সাথে।
১৯৮১ সালে স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর এক বৈরী পরিবেশে বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনাকে লড়াই করতে হয়েছে। একদিকে দলকে সুসংগঠিত করা অন্যদিকে সামরিক শাসনের শৃঙ্খলমুক্ত করে জনগণের ভোট ও ভাতের অধিকার প্রতিষ্ঠার দুরূহ সংগ্রামে জীবনবাজি রেখে অকুতোভয় সংগ্রাম। এই সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় ১৯৯৬ সালে ২১ বছর পর আওয়ামী লীগকে রাষ্ট্রভাষায় অধিষ্ঠিত করেন তিনি।
বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার, চার জাতীয় নেতার হত্যাকা-ের বিচার কার্যক্রম শুরু, গঙ্গার পানির ন্যায্য হিস্যা আদায় এবং পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি প্রতিষ্ঠার মতো ঐতিহাসিক সাফল্যে উজ্জ্বল হয়ে আছে ১৯৯৬-২০০১-এর শাসনামল। তিনিই প্রথম ‘নারীনীতি’ প্রণয়ন করেন। পিতার নামের পাশাপাশি মায়ের নাম লেখার আইন কার্যকর করেন। সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনের সর্বক্ষেত্রে, নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার বহুমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।
২০০৯ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত একটানা প্রায় ১০ বছর জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের লজ্জা ঘুচিয়ে এখন উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা অর্জন করেছে। আওয়ামী লীগের এই তিনবারের শাসনামলে বাংলাদেশে নারীর অবস্থান মৌলিকভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। আমি বিস্তারিত বিবরণ না দিয়ে মাত্র কয়েকটি ক্ষেত্রের উল্লেখ করছিÑ
১. বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলের নেতা ও জাতীয় সংসদের স্পিকার নারী।
২. সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমান বাহিনী ও পুলিশ বাহিনীতে কেবল সাধারণ সৈনিক পদে নয়, উচ্চপদে এখন অসংখ্য নারী যোগ্যতার সাথে দায়িত্ব পালন করছেন।
৩. সুপ্রিমকোর্টের বিচারপতি নিম্ন আদালতের বিচারক, মন্ত্রণালয়ের সচিব, অতিরিক্ত সচিব, যুগ্ম সচিব, জেলা প্রশাসক পদে এবং রাষ্ট্রদূত পদে নিয়োজিত আছেন বহুসংখ্যক নারী। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদেও এই প্রথম নারী দায়িত্ব পেয়েছেন।
৪. সরকারি কাজে নিয়োজিত নারীর মাতৃত্বকালীন ছুটি বৃদ্ধি, শিশুর জন্য ডে-কেয়ার সেন্টার, বিধবা ভাতা, বয়স্ক ভাতা প্রচলনের পাশাপাশি মাতৃমৃত্যুর হার দক্ষিণ এশিয়ার সর্বনিম্নে নামিয়ে আনা হয়েছে।
৫. নারীর ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসন ৪৫ থেকে ৫০-এ উন্নীত করেছে। ইউনিয়ন ও পৌরসভা স্থানীয় সরকারের সংরক্ষিত নারী আসনে সরাসরি নির্বাচন প্রথা চালু করেছে।
৬. দ্বিতীয়ত নারী শিক্ষার ক্ষেত্রে বিনামূল্যে বই বিতরণ স্নাতক শ্রেণি পর্যন্ত মেয়েদের বিনা বেতনে পড়ার সুযোগ এবং মেয়েদের উপবৃত্তি প্রচলনের ফলে বাংলাদেশে নারী শিক্ষার ব্যাপক বিস্তার ঘটেছে। প্রাথমিক থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত ছাত্র-ছাত্রীদের হার-এ ছেলেদের ছাড়িয়ে গেছে মেয়েরা। প্রায় ৫৫ শতাংশ শিক্ষার্থী এখন মেয়ে।
৭. খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকা-েও মেয়েরা সমানতালে এগিয়ে চলেছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের প্রমীলা ফুটবলাররা বয়সভিত্তিক আন্তর্জাতিক ফুটবলে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। বাংলাদেশের মেয়ে নিশাত মজুমদার এবং ওয়াসফিয়া নাজরীন এভারেস্ট জয় করেছেন।
৮. সমাজ ও রাষ্ট্রের এই পরিবর্তনের প্রভাব রাজনৈতিক দলেও প্রতিফলিত। ২০২১ সালের মধ্যে সকল রাজনৈতিক দলের কর্মকর্তা পর্যায়ে ৩৩ শতাংশ নারীকে নির্বাচিত করার বিধান রয়েছে রাজনৈতিক দলবিধিতে। এ মুহূর্তে ৩৩ শতাংশ না হলেও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সংসদসহ সকল স্তরে নারীর অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। দলের সভাপতিম-লী, সম্পাদকম-লী ও কার্যকরি সংসদে রয়েছেন উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারী। এই হার ২০ শতাংশের ওপরে।
৯. দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশের নারীদের গড় আয়ুষ্কাল এখন সবচেয়ে বেশি।
১০. দেশে কর্মজীবী নারীর সংখ্যা ১ কোটি ৬০ লাখ ছাড়িয়েছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প উদ্যোক্তাদের মধ্যে নারীর সংখ্যা ১৬ হাজার ছাড়িয়েছে। বিদেশে বিভিন্ন পেশায় কর্মরত রয়েছে ৮২ হাজারের বেশি নারী। এ ছাড়া বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের প্রধানতম ক্ষেত্র গার্মেন্টস খাতের ৮০ শতাংশ কর্মীই নারী। দেশের ৯০ শতাংশ ক্ষুদ্র ঋণ ব্যবহারকারীও নারী। নানা প্রতিকূলতা, বাধা ডিঙিয়ে তার এখন কৃতিত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।
অঙ্গ সহযোগী সংগঠনগুলোতেও দিন দিন এই হার বৃদ্ধি পাচ্ছে। নারীরা যোগ্যতার সাথে দায়িত্ব পালন করে প্রমাণ করেছেন, কর্মগুণ বিচারে নারী-পুরুষের পার্থক্য বিচার করা এখন অবান্তর। উন্নত দেশগুলোর তুলনায় আমাদের দেশে সামাজিক-অর্থনৈতিক পশ্চাৎপদতা সত্ত্বেও রাজনীতিতে, প্রশাসনে এবং কর্মবৃত্তে নারীর অশংগ্রহণ দিন দিন বাড়ছে। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের সেই অমোঘ বাণী ‘বিশ্বের যা কিছু মহান, চিরকল্যাণকর, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।’Ñ এই উচ্চারণ এখন আর নিছক, স্বপ্ন-কল্পনা নয়। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, জাতির পিতার প্রদর্শিত পথ এবং বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে নারী-পুরুষের বৈষম্যমুক্ত এক উন্নত সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে উঠছে।
এসব কিছু সম্ভব হয়েছে জননেত্রী শেখ হাসিনার পরিকল্পিত দৃঢ় নেতৃত্বের কারণে। জাতির পিতার অসমাপ্ত স্বপ্নকে বাস্তব সোনার বাংলা তথা দারিদ্র্যমুক্ত ক্ষুধামুক্ত উন্নত দেশের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন তিনি। শুধু নারী নয় সকল মানুষের জন্য অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব জননেত্রী শেখ হাসিনা। প্রতিষ্ঠার প্রায় ৬৯ বছর পর আজও আওয়ামী লীগ অসামান্য জনপ্রিয়তা নিয়ে জাতীয় রাজনীতিতে নেতৃত্ব দিয়ে দেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রাকে এগিয়ে নিয়ে চলেছে।
শেষ করি জননেত্রী শেখ হাসিনার কথা দিয়েÑ “আমাদের লক্ষ্য আরও বিস্তৃত। সুদূর আগামীর বাংলাদেশ নিয়েই আমাদের সুদীর্ঘ পরিকল্পনা। তাই ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে আধুনিক শান্তিপূর্ণ, সমৃদ্ধ ও উন্নত দেশে পরিণত করতে চাই।” [সূত্র : মূলধারার রাজনীতি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কাউন্সিল ১৯৪৯-২০১৬, পৃষ্ঠা-৪৫২-৪৫৫, হারুণ-অর-রশিদ]
লেখক : সংসদ সদস্য

পাঠকের মন্তব্য:

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না। তারকাচিহ্নযুক্ত (*) ঘরগুলো আবশ্যক।

*