বিভাগ: যুদ্ধাপরাধ

নিজামীর ফাঁসির রায় বহাল : দুই রাজাকারের মৃত্যুদণ্ড

45উত্তরণ প্রতিবেদন: তিনি ছিলেন এক ভয়ঙ্কর খুনি বাহিনীর নেতা। স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম যখন প্রায় নিশ্চিত, তখন তিনি তার খুনে আল-বদর বাহিনীকে লেলিয়ে দেন। তার নীলনকশা অনুসারে পাকিস্তানি সেনাদের সহযোগিতায় আল-বদররা জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান বুদ্ধিজীবীদের বেছে বেছে হত্যা করে।
২০১৪ সালের ২৯ অক্টোবর ফাঁসির আদেশ দিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির মতিউর রহমান নিজামী সম্পর্কে এই কথাগুলোই বলেছিলেন। গত ৬ জানুয়ারি দেশের সর্বোচ্চ আদালতের রায়েও একই বক্তব্যের প্রতিফলন ঘটেছে। একাত্তরে বুদ্ধিজীবী হত্যার পরিকল্পনা এবং গণহত্যা, হত্যা ও ধর্ষণের দায়ে নিজামীর ফাঁসির সাজা বহাল রেখেছেন সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগ।
একাত্তরের বর্বর ও নৃশংস বুদ্ধিজীবী হত্যাকা-ের নকশাকার নিজামী কোনো দিন তার অপরাধের জন্য অনুশোচনা করেননি। বরং ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে তাকে পুনর্বাসিত করা হয়। ২০০০ সালে তিনি জামায়াতে ইসলামীর এদেশীয় শীর্ষ নেতা বা আমির হন। এমনকি ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের কৃষি ও শিল্পমন্ত্রী ছিলেন তিনি। এ নিয়ে ট্রাইব্যুনাল রায়ে বলেছিলেন, নিজামীকে এদেশের মন্ত্রী করার মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের ৩০ লাখ শহীদ ও সম্ভ্রমহারা ২ লাখ নারীর গালে চড় মারা হয়েছে। এটা জাতির জন্য লজ্জা, অবমাননা।
তবে ৪৪ বছর পর হলেও ন্যায়বিচার পাওয়ায় সন্তুষ্টি জানিয়েছেন শহীদ বুদ্ধিজীবীদের সন্তানরা।
নিজামী আলোচিত ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলায়ও ফাঁসির সাজা পাওয়া আসামি। ২০১৪ সালের ৩০ জানুয়ারি চট্টগ্রামের মহানগর দায়রা জজ আদালত দেশের সর্ববৃহৎ অস্ত্র চোরাচালানের এই ঘটনায় নিজামীকে ফাঁসির আদেশ দেন। এ মামলাটিও এখন হাইকোর্টে বিচারাধীন আছে।
একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় এ নিয়ে জামায়াতের পাঁচজন শীর্ষস্থানীয় নেতার আপিলের রায় ঘোষণা করা হলো। এর আগে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদ, নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী এবং দুই সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামান ও আবদুল কাদের মোল্লার মামলার রায় দিয়েছেন আপিল বিভাগ। এর মধ্যে শুধু সাঈদীর আমৃত্যু কারাদ- হয়েছে। বাকি তিনজনের ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছে।
আপিল বিভাগের রায় : এ মামলায় নিজামীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ যে ১৬টি অভিযোগ আনে, ট্রাইব্যুনালে তার মধ্যে ৮টি প্রমাণিত হয়। এর মধ্যে পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার বাউসগাড়ি ও ডেমরা গ্রামে ৪৫০ জনকে নির্বিচার হত্যা ও ধর্ষণ, করমজা গ্রামে ১০ জনকে হত্যা ও ৩ জনকে ধর্ষণ, ধুলাউড়ি গ্রামে ৫২ জনকে হত্যা এবং বুদ্ধিজীবী হত্যার পরিকল্পনার দায়ে (২, ৪, ৬ ও ১৬ নম্বর অভিযোগ) নিজামীকে মৃত্যুদ- দেন ট্রাইব্যুনাল।
আপিল বিভাগ গত ৬ জানুয়ারি করমজা গ্রামে ১০ জনকে হত্যা ও ৩ জনকে ধর্ষণের দায় (৪ নম্বর অভিযোগ) থেকে নিজামীকে খালাস দেন। বাকি তিন অভিযোগে তার ফাঁসির দ- বহাল রাখেন।
এ ছাড়া একাত্তরে পাবনা জিলা স্কুলের প্রধান শিক্ষক কছিমুদ্দিনসহ তিনজনকে হত্যা, ঢাকার মোহাম্মদপুরের শারীরিক শিক্ষা কেন্দ্রে নির্যাতন ও হত্যা, সোহরাব আলীকে হত্যা এবং গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা বদি, রুমি ও আজাদ এবং সুরকার আলতাফ মাহমুদকে হত্যার দায়ে (১, ৩, ৭ ও ৮ নম্বর অভিযোগ) নিজামীকে যাবজ্জীবন কারাদ- দিয়েছিলেন ট্রাইব্যুনাল। এর মধ্যে কছিমুদ্দিনসহ তিনজনকে হত্যা এবং শারীরিক শিক্ষা কেন্দ্রে নির্যাতন ও হত্যার দায় (১ ও ৪ নম্বর অভিযোগ) থেকে নিজামীকে খালাস দিয়েছেন আপিল বিভাগ।
প্রতিক্রিয়া : এই রায়ে রাষ্ট্র ন্যায়বিচার পেয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। রায়ের পর নিজ কার্যালয়ে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, সবচেয়ে স্বস্তি অনুভব করছি যে, বুদ্ধিজীবী হত্যার ব্যাপারে নিজামীর যে ভূমিকা ছিল, তার দায় প্রতিষ্ঠিত হলো। নিজামীকে মৃত্যুদ-ে দ-িত করার পরিপ্রেক্ষিতে জাতি স্বস্তি অনুভব করছে। এই রায়ের মাধ্যমে বুদ্ধিজীবী পরিবারগুলো স্বস্তি অনুভব করছে। তিনি বলেন, বুদ্ধিজীবী হত্যাকা-ের বিচারের দাবি দীর্ঘদিনের। মুজাহিদের রায়ের মাধ্যমে কিছুটা হলেও তা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। আল-বদরের সর্বোচ্চ নেতা নিজামীর দ- প্রদানের মাধ্যমে সেই বিচার পাওয়ার আশা পূরণ হলো।
বুদ্ধিজীবী হত্যার নকশাকার : নিজামীর বিরুদ্ধে মামলার পর্যবেক্ষণে ট্রাইব্যুনাল বলেছিলেন, আল-বদর বাহিনী যে বুদ্ধিজীবী হত্যাকা- চালিয়েছিল, তার ওপর নিজামীর প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণ ছিল। রাষ্ট্রপক্ষের দাখিল করা বিভিন্ন নথি এবং মৌখিক সাক্ষ্য বিশ্লেষণ করে ট্রাইব্যুনাল পর্যবেক্ষণে বলেন, একাত্তরের মে মাসে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বাঙালি নিধনযজ্ঞে যোগ দেয় জমিয়তে তলাবা (জামায়াতের তৎকালীন ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘ)। মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিহত করার জন্য ছাত্রসংঘ দুটি আধাসামরিক জঙ্গিবাহিনী গঠন করে আল-বদর ও আল-শামস। এর মধ্যে আল-বদরে যোগ দেয় জমিয়তে তলাবার বিপুলসংখ্যক সদস্য। এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন মতিউর রহমান নিজামী; কারণ, তিনি ছিলেন জমিয়তের নাজিম-এ-আলা (প্রধান)। ১৯৬৬ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত নিজামী ছিলেন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রসংঘের সভাপতি, এরপর তিনি নিখিল পাকিস্তান ছাত্রসংঘের সভাপতি হন। ১৯৭১ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নিজামী ছাত্রসংঘের প্রধান ছিলেন।
রায়ের পর্যবেক্ষণে আরও বলা হয়, ১৯৭১ সালের ১৪ নভেম্বর জামাতের মুখপত্র দৈনিক সংগ্রাম-এ নিজামীর লেখা ‘বদর দিবস : পাকিস্তান ও আল-বদর’ শীর্ষক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। এতে নিজামী লেখেন, ‘…পাক সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় এ দেশের ইসলামপ্রিয় তরুণ ছাত্রসমাজ বদরযুদ্ধের স্মৃতিকে সামনে রেখে আল-বদর বাহিনী গঠন করেছে।…’ ওই লেখায় মুক্তিযোদ্ধাদের নিশ্চিহ্ন করে পাকিস্তানের পতাকা ওড়ানোর জন্য আল-বদরদের উৎসাহ দেওয়া হয়। নিজামী মহান আল্লাহর নাম এবং পবিত্র ধর্ম ইসলামকে জেনেশুনে ও উদ্দেশ্যমূলকভাবে অপব্যবহার করেছিলেন বাঙালি জাতিকে নিশ্চিহ্ন ও নির্মূল করার জন্য।
ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়ার অভিযোগে করা এক মামলায় ২০১০ সালের ২৯ জুন নিজামীকে গ্রেফতার করা হয়। একই বছরের ২ আগস্ট তাকে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়। এখন তিনি কাশিমপুর কারাগারে আছেন।

সাঈদীর ফাঁসির রায় পুনর্বহাল চেয়ে আবেদন
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকালে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর আমৃত্যু কারাদ-ের রায় পুনর্বিবেচনা (রিভিউ) চেয়ে আবেদন করেছে রাষ্ট্রপক্ষ। এই আবেদনে সাঈদীকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দেওয়া ফাঁসির রায় পুনর্বহাল চাওয়া হয়েছে।
সুপ্রিমকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় গত ১২ জানুয়ারি এই আবেদন জমা দেয় রাষ্ট্রপক্ষ। এর মাধ্যমে প্রথমবারের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় রাষ্ট্রপক্ষ রায় পুনর্বিবেচনার আবেদন করল।
পুনর্বিবেচনার আবেদন জমা দেওয়ার পর অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের বিষয়টি জানিয়ে বলেন, ইব্রাহিম কুট্টি ও বিসাবালীকে হত্যার দায়ে ট্রাইব্যুনাল সাঈদীকে ফাঁসি দিয়েছিলেন। কিন্তু আপিল বিভাগ সাঈদীর ফাঁসির সাজা কমিয়ে তাকে আমৃত্যু কারাদ- দেন। আমরা পুনর্বিবেচনার আবেদনে বলেছি, সাঈদীকে দেওয়া ট্রাইব্যুনালের সাজা পুনর্বহাল করা হোক। অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, সাঈদীর বিরুদ্ধে ৪টি অভিযোগে ট্রাইব্যুনালের দেওয়া দ- পুনর্বহাল চেয়ে পুনর্বিবেচনার আবেদনটি করা হয়েছে। এতে ৫টি যুক্তি (গ্রাউন্ড) আনা হয়েছে।
ইব্রাহিম কুট্টি ও বিসাবালীকে হত্যার দায়ে ২০১৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি সাঈদীকে মৃত্যুদ-াদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল। ওই রায়ের বিরুদ্ধে সাঈদী আপিল করেন। ২০১৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর আপিল বিভাগের পাঁচ সদস্যের বেঞ্চ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে সাঈদীর ফাঁসির সাজা কমিয়ে আমৃত্যু কারাদ-ের আদেশ দেন। আপিল বিভাগের পাঁচ সদস্যের যে বেঞ্চে সাঈদীর আপিলের শুনানি হয়েছিল, ওই বেঞ্চের দুজন সদস্য ইতোমধ্যে অবসরে গেছেন। তারা হলেন সাবেক প্রধান বিচারপতি মো. মোজাম্মেল হোসেন ও আপিল বিভাগের বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী। তাদের মধ্যে বিচারপতি মোজাম্মেল হোসেন তার রায়ে সাঈদীকে আমৃত্যু কারাদ-াদেশ দেন, আর বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী ফাঁসির আদেশ দেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, পাঁচ সদস্যের বেঞ্চেই পুনর্বিবেচনার আবেদনের শুনানি হতে হবে। তবে বেঞ্চের অন্য সদস্যরা কে হবেনÑ তা প্রধান বিচারপতি নির্ধারণ করবেন।
সাঈদীর আপিল শুনানির বেঞ্চের অন্য তিন সদস্য ছিলেন বর্তমান প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা, বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞা ও বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী। এই তিনজনের মধ্যে বিচারপতি আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞা তার রায়ে সাঈদীকে খালাস দিয়েছিলেন। বাকি দুজন আমৃত্যু কারাদ-ের পক্ষে মত দেন।

রাজাকার তাহের ও ননীর ফাঁসির রায়
একাত্তরে হত্যা, ধর্ষণের মতো যুদ্ধাপরাধের দায়ে নেত্রকোনার রাজাকার মো. ওবায়দুল হক ওরফে আবু তাহের ও আতাউর রহমান ননীকে মৃতুদ- দিয়েছেন আদালত। বিচারপতি আনোয়ারুল হক নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গত ২ ফেব্রুয়ারি এই রায় ঘোষণা করেন। ট্রাইব্যুনালের অন্য দুই সদস্য হলেন বিচারপতি শাহিনুর ইসলাম ও বিচারপতি মো. সোহরাওয়ারদী। রায়ে বলা হয়, আসামি তাহের ও ননীর বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের আনা ৬টি অভিযোগের মধ্যে ৪টি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলিয়ে এই দুই যুদ্ধাপরাধীর দ- কার্যকর করতে বলেছে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় তাহের ছিলেন নেজামী ইসলামী পার্টির স্থানীয় নেতা। চার দশক পরে যুদ্ধাপরাধের দায়ে গ্রেফতার হওয়ার সময় বিএনপির রাজনীতিতে জড়িত ছিলেন তিনি। তাহের ও ননী একাত্তরে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে অবস্থান নেন এবং পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীকে সহযোগিতা করতে গঠিত রাজাকার বাহিনীতে যোগ দেন। সে সময় নেত্রকোনা জেলা সদর ও বারহাট্টা থানাসহ বিভিন্ন এলাকায় তারা মানবতাবিরোধী কর্মকা-ের জন্য তারা ‘কুখ্যাত রাজাকার’ হিসেবে পরিচিতি পান বলে এই মামলার বিচারে উঠে এসেছে। এ পর্যন্ত রায় আসা ২২টি মামলার ২৬ আসামির মধ্যে তাহের ও ননীকে নিয়ে মোট ১৮ যুদ্ধাপরাধীর সর্বোচ্চ সাজার আদেশ হলো।
নেত্রোকোনার মুক্তিযোদ্ধা আলী রেজা কাঞ্চন একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে ২০১০ সালে ননী ও তাহেরসহ ১২ জনকে আসামি করে থানায় মামলা করলে পরে বিষয়টি ট্রাইব্যুনালে আসে। ২০১৩ সালের ৬ জুন এ দুই আসামির বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করে প্রসিকিউশনের তদন্ত সংস্থা। এক বছর চার মাস ২৮ দিন তদন্তের পরে ২০১৪ সালের ৫ নভেম্বর দেওয়া হয় ৬৩ পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদন। প্রসিকিউশনের আবেদনে আদালত পরোয়ানা জারি করলে ওই বছর ১২ আগস্ট দুই আসামিকে গ্রেফতার করে নেত্রকোনার পুলিশ। পরদিন তাদের ট্রাইব্যুনালে হাজির করে পাঠানো হয় কারাগারে। প্রসিকিউশন এই মামলার আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিলের পর ২০১৪ সালের ১১ ডিসেম্বর দুই আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ আমলে নেন ট্রাইব্যুনাল।
এরপর গত বছর ২ মার্চ যুদ্ধাপরাধের ছয় ঘটনায় অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে তাহের ও ননীর যুদ্ধাপরাধের বিচার শুরু হয়।

ব্রিটিশ সরকারের প্রতিবেদনে মন্তব্য
মওদুদিবাদ থেকে ‘উগ্রবাদী’ ধারণা নেয় ব্রাদারহুড
ব্রিটিশ শাসিত ভারতীয় উপমহাদেশে জামায়াতে ইসলামীর প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা আবুল আলা মওদুদি ও তার দলের তাকফিরি মতাদর্শ ইসলামি সমাজ প্রতিষ্ঠায় ‘সহিংসতার ব্যবহারকে উৎসাহিত করে’। আর ইসলামপন্থি সংগঠন মুসলিম ব্রাদারহুডের আদর্শিক গুরু সাইয়িদ কুতুব তার কাছ থেকেই গ্রহণ করেন এ মতাদর্শ। মিসরের ইসলামপন্থি সংগঠন ব্রাদারহুডের রাজনীতি যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বার্থ ও মূল্যবোধের বিরোধী এবং জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি। ব্রাদারহুডের আদর্শ এবং দেশ-বিদেশে এর কার্যক্রম পর্যালোচনার ভিত্তিতে তৈরি করা ব্রিটিশ সরকারের এক প্রতিবেদনে এসব মন্তব্য করা হয়েছে। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনের নির্দেশে ব্রাদারহুডের বিষয়ে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে। এর বেশির ভাগ অংশই গোপনীয় বিবেচনায় প্রকাশ করা হয়নি। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর তাত্ত্বিক গুরু মাওলানা আবুল আলা মওদুদি। ভারত ভাগের পর মাওলানা মওদুদি পাকিস্তান চলে যান এবং জামায়াতে ইসলামী, পাকিস্তান নামে দল গঠন করেন। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের পর বাংলাদেশে ওই দলটি ইসলামিক ডেমোক্রেটিক লীগ, পরে জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ এবং সর্বশেষ বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নামে তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। গত ১৭ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী ক্যামেরন এ প্রতিবেদনের কিছু অংশ যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টে প্রকাশ করেন। তিনি ব্রাদারহুডকে যুক্তরাজ্যে নিষিদ্ধ ঘোষণা না করলেও বলেছেন, এর সাথে সম্পৃক্ত ব্যক্তি ও সংগঠন ‘উগ্রবাদী’ হিসেবে চিহ্নিত হবে এবং যুক্তরাজ্য এদের ভিসার আবেদন প্রত্যাখ্যান করবে।
প্রতিবেদনটিকে স্পর্শকাতর উল্লেখ করে ক্যামেরন আরও বলেন, যুক্তরাজ্যে ব্রাদারহুডের কার্যক্রম পর্যালোচনা অব্যাহত থাকবে। সেই সাথে দাতব্য সংগঠনগুলোর ওপর বাড়তি নজরদারি করা হবে। তবে প্রতিবেদনের প্রকাশিত অংশে জামায়াতে ইসলামী সম্পর্কে কোনো সুপারিশ নেই।
সৌদি আরবে নিযুক্ত যুক্তরাজ্যের সাবেক দূত স্যার জন জেনকিন্স এবং যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিরাপত্তা ও সন্ত্রাসবাদ দমন বিভাগের ব্যবস্থাপনা পরিচালক চার্লস ফার প্রতিবেদনটি তৈরি করেন। ২০১৪ সালের জুলাই মাসে এটি প্রকাশের কথা ছিল। প্রকাশ বিলম্বিত হওয়ার কোনো কারণ ব্যাখ্যা করা হয়নি।
প্রতিবেদনে বলা হয়, মিসরকে একটি শরিয়াহভিত্তিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়তে হাসান আল বান্না ১৯২৮ সালে মুসলিম ব্রাদারহুড প্রতিষ্ঠা করেন। দলীয় ঐক্য আর কঠোর শৃঙ্খলাকে গুরুত্ব দিয়ে এর নেতাকর্মীরা গোপনে শিক্ষা প্রচার ও সদস্য সংগ্রহের মাধ্যমে নিজেদের আদর্শ প্রতিষ্ঠার কৌশল নেন। ধীরে ধীরে সংগঠনটির দৃষ্টি মিসরের বাইরে বিভিন্ন মুসলিম দেশের ওপর পড়ে। রাজনৈতিক সংঘাত বিদ্যমান এমন দেশগুলোর পরিস্থিতি মোকাবিলা করা নিয়ে দোটানায় পড়ে ব্রাদারহুড। সমাধান হিসেবে ১৯৪০-এর দশকে সংগঠনটির আদর্শিক গুরু সাইয়িদ কুতুব ভারতবর্ষে মাওলানা আবুল আলা মওদুদির প্রতিষ্ঠিত জামায়াতে ইসলামীর তাকফিরি মতাদর্শকে গ্রহণ করেন। তাকফিরি মতাদর্শ ব্যাখ্যা করে ব্রিটিশ প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, ‘এটি জামায়াত ছাড়া অন্য মুসলিমদের অবিশ্বাসী বা ধর্মত্যাগী বলে কলঙ্ক লেপন করে। বিদ্যমান রাষ্ট্রব্যবস্থাকে অনৈসলামিক ঘোষণা করে এবং পছন্দের সমাজ গড়তে সংঘাতের আশ্রয় নেয়।’ এতে বলা হয়, তাকফিরি মতাদর্শ গ্রহণের পর বিভিন্ন সময়ে সংঘাত ও রাজনৈতিক হত্যাকা-ে ব্রাদারহুডের জড়িত হওয়ার নজির রয়েছে।
যুক্তরাজ্যে ব্রাদারহুডের রাজনৈতিক অস্তিত্ব বর্ণনা করতে গিয়ে বলা হয়, এর সহযোগী বিভিন্ন সংগঠন দক্ষিণ এশিয়ার সমমনা রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলোর সাথে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে; যারা মূলত আবুল আলা মওদুদির দর্শন প্রচার ও জামায়াতে ইসলামীর প্রতিনিধিত্ব করে। সংগঠনগুলো নিজেদের একটি একক ইসলামি আন্দোলন হিসেবে গণ্য করে। ব্রাদারহুডের সহযোগী বিভিন্ন সংগঠন ও জামায়াতে ইসলামী যুক্তরাজ্যে সক্রিয় উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, ইউকে ইসলামিক মিশনের (ইউকেএমআই) অধীনে দেশটিতে প্রায় ৫০টি মসজিদ পরিচালনা করছে তারা। ইস্ট লন্ডন মসজিদ ও লন্ডন মুসলিম সেন্টারের ট্রাস্টিরা ইসলামিক ফোরাম অব ইউরোপের (আইএফই) সদস্য। স্থানীয় রাজনীতি, বিশেষত বাংলাদেশি-অধ্যুষিত টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলে সক্রিয় আইএফই। এসব সংগঠনের পাশাপাশি মুসলিম কাউন্সিল অব ব্রিটেন (এমসিবি), মুসলিম অ্যাসোসিয়েশন অব ব্রিটেন (এমএবি) ও ইসলামিক সোসাইটি অব ব্রিটেনের (আইএসবি) মতো সংগঠনগুলোর শিকড় ব্রাদারহুডের সাথে যুক্ত।

পাঠকের মন্তব্য:

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না। তারকাচিহ্নযুক্ত (*) ঘরগুলো আবশ্যক।

*