বিভাগ: যুদ্ধাপরাধ

নিজামীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর

‘মানবতাবিরোধী গণহত্যার মতো অপরাধের সাথে সম্পৃক্ত থাকার অপরাধে নিজামী দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। তার আইনজীবী শুধু গলা বাঁচাতে দ- কমানোর আবেদন করেছিলেন।’

33

ফাঁসির রশিতে বদর প্রধান

উত্তরণ প্রতিবেদন: একাত্তরে মাতৃভূমির সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করার পরও যুদ্ধাপরাধী কুখ্যাত আলবদর বাহিনীর প্রধান মতিউর রহমান নিজামী স্বাধীন দেশে আলো-বাতাসে নিঃশ্বাস নেওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন। কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশেও তিনি মৌলবাদ-সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প ছড়িয়েছেন। জামায়াতে ইসলামীর আমির হয়েছেন, জোট সরকারের মন্ত্রী হয়েছেন। সদর্পে মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধের কথা অস্বীকার করেছেন। সাড়ে চার দশক ধরে বুকভরা কষ্ট আর বেদনা নিয়ে সেই দর্প দেখেছে জাতির সূর্যসন্তান হাজারও মুক্তিযোদ্ধা, ন্যায়বিচার প্রত্যাশী স্বজন হারানো মানুষ ও নতুন প্রজন্মের তরুণরা। অবশেষে দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটল, জাতি কলঙ্কমুক্ত হলো, শহীদ স্বজন হারানো মানুষ ন্যায়বিচারের আস্বাদ পেল, বুদ্ধিজীবী হত্যার কলঙ্ক থেকে দায়মুক্তি ঘটল। গত ১০ মে দিবাগত রাত ১২টা ১০ মিনিটে মানবতাবিরোধী অপরাধে ফাঁসির দড়িতে ঝুলিয়ে যুদ্ধাপরাধী নিজামীর মৃত্যুদণ্ডাদেশ কার্যকর করা হলো। পুরান ঢাকার নাজিমুদ্দিন রোডের কেন্দ্রীয় কারাগারে নির্মিত স্থায়ী ফাঁসির মঞ্চে ণ্ড কার্যকর করে তাকে ২০ মিনিট ঝুলিয়ে রাখা হয়। ১২টা ৩০ মিনিটে ফাঁসির মঞ্চ থেকে নামানোর পর চিকিৎসক নিজামীর মৃত্যু নিশ্চিত করেন।
রিভিউর পূর্ণাঙ্গ রায় : নিজামীর দোষ স্বীকার
মানবতাবিরোধী গণহত্যার মতো অপরাধের সাথে সম্পৃক্ত থাকার অপরাধে নিজামী দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। তার আইনজীবী শুধু গলা বাঁচাতে ণ্ড কমানোর আবেদন করেছিলেন। এতেই প্রমাণিত হয়, নিজামী পরোক্ষভাবে নিজের দোষ স্বীকার করে নিয়েছেন। সুতরাং, নিজামী এসব অপরাধে তার সম্পৃক্ততার দায় এড়াতে পারেন না। আপিলের রায়ে মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে করা একাত্তরে আলবদর বাহিনীর প্রধান যুদ্ধাপরাধী মতিউর রহমান নিজামীর পুনর্বিবেচনার আবেদন খারিজ করে পূর্ণাঙ্গ রায়ে এমন পর্যবেক্ষণই উঠে এসেছে। গত ৯ মে ২২ পৃষ্ঠার এই পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়।
গত ৫ মে আপিলের রায়ের বিরুদ্ধে করা পুনর্বিবেচনা (রিভিউ) আবেদন খারিজ করে নিজামীর ফাঁসি বহাল রাখেন আপিল বিভাগ। প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বে চার সদস্যের বেঞ্চ এই রায় দেন। বেঞ্চের অন্য তিন সদস্য হলেনÑ বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা, বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন ও বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী।
একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় বুদ্ধিজীবী হত্যার পরিকল্পনা, নিজ এলাকায় গণহত্যা এবং ধর্ষণের দায়ে তাকে মৃত্যুণ্ড দেওয়া হয়েছিল। বিচার ও দণ্ড কার্যকরের সময় তিনি জামাতে ইসলামীর প্রধান বা আমির পদে ছিলেন। এই প্রথম এমন এক যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসি হতে যাচ্ছে, যিনি মুক্তিযুদ্ধের সময় ‘ডেথ স্কোয়াড’ হিসেবে কুখ্যাত আলবদর বাহিনীর প্রধান; কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ের একটি রাজনৈতিক দলেরও প্রধান। অবশ্য সেই রাজনৈতিক দল জামাতে ইসলামীও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের পর্যবেক্ষণে যুদ্ধাপরাধী দল হিসেবে চিহ্নিত। যুদ্ধাপরাধী কামারুজ্জামান ও কাদের মোল্লার শাস্তি ফাঁসি কার্যকরের সময় জামায়াতে ইসলামীর যথাক্রমে সেক্রেটারি জেনারেল ও সহকারী সেক্রেটারি জেনারেলের পদে ছিলেন।
৯ মে আপিল বিভাগে রিভিউ খারিজের পূর্ণাঙ্গ রায়ে বলা হয়েছে, ‘আলবদর প্রধান হিসেবে ওই বাহিনীর সাথে মতিউর রহমান নিজামী নিজেই শুধু অংশগ্রহণ করেন নি; বরং দলের নেতা-কর্মীদের উৎসাহিত করেছেন। আমরা অত্যন্ত সতর্কতার সাথে রিভিউর নথি পর্যালোচনা করেছি। কিন্তু রিভিউ আবেদন গ্রহণ করার মতো কোনো আইনি যুক্তি খুঁজে পাওয়া যায়নি।’
মতিউর রহমান নিজামী যে ৩টি অপরাধে মৃত্যুদ-াদেশ পেয়েছিলেন, সেই ৩টি অভিযোগেই শুধু রিভিউ করেছেন এবং দ- কমানোর আবেদন করেছেন। কিন্তু রিভিউ আবেদন গ্রহণ করার মতো ব্যতিক্রমী কোনো যুক্তি পাওয়া যায়নি; বরং বুদ্ধিজীবী হত্যার সাথে তার সরাসরি অংশগ্রহণের প্রমাণ পাওয়া গেছে। এ কারণে তাকে পূর্ণাঙ্গ রায়ে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে।
রায়ে বলা হয়েছে, নিজামী এমন কোনো আইনি যুক্তি দিতে পারেন নি, যাতে রায়টি পুনর্বিবেচনায় আসতে পারে। এতে আরও বলা হয়, আপিল বিভাগ নিজামীকে ৫টি অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করেন ও সাজা বহাল রাখেন। এর মধ্যে নিজামীর আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন ৩টি অভিযোগে (২, ৬ ও ১৬) আপিলের রায় পুনর্বিবেচনার আবেদন করেন।
রিভিউ খারিজের রায়ে আরও বলা হয়েছে, ওই সময় পাকিস্তান ইসলামী ছাত্র সংঘের সভাপতি হিসেবে নিজামী আলবদর বাহিনী গঠন করতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। তিনি নিজে ওই বাহিনীর নেতা ও কমান্ডার ছিলেন। নিজামী শুধু বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতাই করেন নি, পাকিস্তান সেনাবাহিনীকেও সহায়তা করেছেন। তিনি আলবদর বাহিনীর কার্যক্রমের প্রশংসা করেছেন এবং তাদের উৎসাহিত করেছেন। এসব বিষয় ট্রাইব্যুনাল ও আপিলের রায়েও উঠে এসেছে।
তা ছাড়া নিজামীকে যেসব অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়েছে, তার মধ্যে পাবনা জেলার দুটি থানার বেশ কয়েকটি গ্রামে গণহত্যার মতো ঘটনা রয়েছে। অন্য অভিযোগে রাজধানীর নাখালপাড়া এমপি হোস্টেলে বদি, রুমি, জুয়েল ও আজাদকে হত্যায় তিনি দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। কিন্তু এসবের বিরুদ্ধে রিভিউ আবেদনে কোনো যুক্তি দেখাতে পারেন নি বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে।
তাই আদালত এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন, নিজামী গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের সাথে নিজের সম্পৃক্ততার কথা পরোক্ষভাবে স্বীকার করে নিয়েছেন। আমরা রিভিউ আবেদনের পক্ষে কোনো উপযুক্ত যুক্তি খুঁজে পাইনি। তাই আবেদনটি খারিজ করা হলো।
দুই সহোদরসহ ৪ রাজাকারের মৃত্যুদ-, আমৃত্যু কারাদ- ১
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় হত্যা, অপহরণ, নির্যাতনের, মতো মানবতাবিরোধী অপরাধের সাত অভিযোগে কিশোরগঞ্জের দুই সহোদর অ্যাডভোকেট শামসুদ্দিন আহম্মেদ ও ক্যাপ্টেন (অব.) নাসির উদ্দিন আহম্মেদসহ চার রাজাকারকে মৃত্যুদ- ও এক রাজাকারকে আমৃত্যু কারাদ- প্রদান করেছেন ট্রাইব্যুনাল। চেয়ারম্যান বিচারপতি এম আনোয়ারুল হকের নেতৃত্বে তিন সদস্য বিশিষ্ট আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ গত ৩ মে এই রায় ঘোষণা করেছেন। ট্রাইব্যুনাল বলেন, মৃত্যুদ-প্রাপ্ত আসামিদের ফাঁসিতে ঝুলিয়ে অথবা গুলি করে (ফায়ারিং স্কোয়াড) দ- কার্যকর করা যাবে। পাশাপাশি পলাতকদের গ্রেফতারে ব্যবস্থা নিতে স্বরাষ্ট্র সচিব ও পুলিশ মহাপরিদর্শককে বলা হয়েছে। প্রয়োজনে ইন্টারপোলের সহযোগিতা নিতেও বলা হয়। প্রসিকিউশন পক্ষ জন্মদিনে শহীদ জননীকে উৎসর্গ করেছেন যুদ্ধাপরাধীর দ-ের রায়। পাঁচ যুদ্ধাপরাধীর মধ্যে ফাঁসির আসামি কিশোরগঞ্জের আইনজীবী শামসুদ্দিন আহম্মেদই কেবল রায়ের সময় কাঠগড়ায় উপস্থিত ছিলেন। শামসুদ্দিনের ভাই সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত ক্যাপ্টেন মো. নাসিরউদ্দিন আহমেদ, রাজাকার কমান্ডার গাজী আবদুল মান্নান, আজহারুল ইসলাম ও হাফিজউদ্দিন মামলার শুরু থেকেই পলাতক রয়েছেন। এদের মধ্যে পলাতক আজহারুলকে আমৃত্যু কারাদ- দিয়েছেন আদালত; বাকিদের দেওয়া হয়েছে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদ- অথবা গুলির মাধ্যমে মৃত্যুদ- কার্যকর করা। একাত্তরে এই পাঁচ আসামি বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে অবস্থান নেন এবং পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর সহযোগিতায় গঠিত রাজাকার বাহিনীতে যোগ দেন। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের এটি ২৩তম রায়।
যত অভিযোগ : কিশোরগজ্ঞের পাঁচ রাজাকারের বিরুদ্ধে ৭টি অভিযোগ আনা হয়। সেগুলো হলোÑ
অভিযোগ-১ : ১৯৭১ সালের ১২ নভেম্বর দুপুর ১টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ থানার বিদ্যানগর ও আয়লা গ্রামের মোট আটজনকে হত্যা ও একজনকে আহত করা।
অভিযোগ-২ : ১৩ নভেম্বর আয়লা গ্রামের মিয়া হোসেনকে হত্যা।
অভিযোগ-৩ : একই উপজেলার মো. আবদুল গফুরকে অপহরণ করে ২৬ সেপ্টেম্বর খুদির জঙ্গল ব্রিজে নিয়ে হত্যা।
অভিযোগ-৪ : ২৩ আগস্ট করিমগঞ্জ উপজেলা ডাকবাংলোতে শান্তি কমিটির কার্যালয়ে আতকাপাড়া গ্রামে মো. ফজলুর রহমান মাস্টারকে অপহরণ, নির্যাতন ও হত্যা।
অভিযোগ-৫ : ৭ সেপ্টেম্বর রামনগর গ্রামের পরেশ চন্দ্র সরকারকে হত্যা।
অভিযোগ-৬ : ২৫ আগস্ট পূর্ব নবাইদ কালিপুর গ্রামে আবু বক্কর সিদ্দিক ও রুপালিকে অপহরণ করে নির্যাতন ও হত্যা।
অভিযোগ-৭ : ১৫ সেপ্টেম্বর আতকাপাড়া গ্রামে আক্রমণ করে ২০-২৫টি বাড়িতে অগ্নিসংযোগ।
মহিবুরের মৃত্যুদ-, মজিবুর ও রাজ্জাকের আমৃত্যু কারাদ-
একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধকালে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে হবিগঞ্জের মহিবুর রহমানকে (৬৫) মৃত্যুদ-াদেশ দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। একই সাথে মহিবুরের সহোদর মজিবুর রহমান (৬০) এবং চাচাতো ভাই আবদুর রাজ্জাককে (৬৩) আমৃত্যু কারাদ-াদেশ দেওয়া হয়েছে।
বিচারপতি আনোয়ারুল হকের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল গত ১ জুন এই মামলার রায় ঘোষণা করেন। ট্রাইব্যুনালের অন্য দুই সদস্য হলেন বিচারপতি মো. শাহিনুর ইসলাম ও বিচারপতি মো. সোহরাওয়ারদী।
আসামির কাঠগড়ায় তিন আসামির উপস্থিতিতে রায় ঘোষণা করেন ট্রাইব্যুনাল। রায়ে বলা হয়, আসামিদের বিরুদ্ধে আনা ৪টি অভিযোগই সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। এর মধ্যে প্রথম অভিযোগ একাত্তরে হবিগঞ্জের বানিয়াচং উপজেলায় মুক্তিযোদ্ধা আকল আলী ও রজব আলীকে হত্যা করে লাশ গুম করার দায়ে মহিবুরকে মৃত্যুদ-াদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল। একই অপরাধে মজিবুর ও রাজ্জাককে আমৃত্যু কারাদ-াদেশ দেওয়া হয়।
বাকি ৩টি অভিযোগে তিন আসামিকে মোট ৩৭ বছরের কারাদ-াদেশ দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। এর মধ্যে দ্বিতীয় অভিযোগ ছিল, একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক মেজর জেনারেল এমএ রবের বাড়িতে হামলা চালিয়ে অগ্নিসংযোগ ও লুণ্ঠন চালান আসামিরা। এই অভিযোগে তাদের ১০ বছরের সশ্রম কারাদ- দেন ট্রাইব্যুনাল।
তৃতীয় অভিযোগ ছিল, হবিগঞ্জের খাগাউড়ার উত্তরপাড়ায় আসামিদের সহযোগিতায় পাকিস্তানি সেনারা দুই নারীকে ধর্ষণ করে। এই অভিযোগে তিনজনকে ২০ বছরের সশ্রম কারাদ- দেন ট্রাইব্যুনাল। আনছার আলী নামের এক ব্যক্তিকে বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে রাজাকার ক্যাম্পে আটক রেখে নির্যাতনের চতুর্থ অভিযোগে তিন আসামিকে সাত বছর করে সশ্রম কারাদ- দেওয়া হয়।

পাঠকের মন্তব্য:

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না। তারকাচিহ্নযুক্ত (*) ঘরগুলো আবশ্যক।

*