বিভাগ: আন্তর্জাতিক

‘নেওয়াজ শরিফ ও কন্যা মরিয়ম নির্বাচনে অযোগ্য’

8-6-2018 7-32-05 PM

পাকিস্তানের রাজনীতিতে নতুন মাত্রা : নিশ্চিত কারাবাস জেনেও দেশে ফেরা

সাইদ আহমেদ বাবু: ব্রিটিশরা ১৯৪৭ সালে ভারতকে বিভক্ত করে ১৪ আগস্ট পাকিস্তানকে এবং ১৫ আগস্ট ভারতকে স্বাধীনতা প্রদান করেছিল। ১৯৪৮ সালে পাকিস্তানের স্থপতি মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর মৃত্যু হয় আর ১৯৫১ সালে রাওয়ালপিন্ডির জনসভায় প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান বক্তৃতা প্রদান করার সময় আততায়ীর গুলিতে নিহত হন। সেই থেকে আজ পর্যন্ত পাকিস্তানে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা সেনাবাহিনীর জেনারেলদের নিয়ন্ত্রণে এবং সে-দেশের মানুষ সামরিক এবং বেসামরিক দুর্নীতিবাজ আমলাদের হাতে বন্দী। দেশটির মানুষের ভাগ্য তাদের নিজের হাতে নয়।
বহুল আলোচিত পানামা পেপার কেলেঙ্কারিতে ফাঁস হওয়া দুর্নীতি মামলায় দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ ও তার কন্যা মরিয়ম নওয়াজ। ৬৭ বছর বয়সী নওয়াজ শরিফকে ২০১৭ সালের জুলাইয়ে দেশটির সুপ্রিমকোর্ট প্রধানমন্ত্রী হিসেবে অযোগ্য ঘোষণা করার পর তিনি পদত্যাগ করেন। তার বিরুদ্ধে জ্ঞাত-আয় বহির্ভূত হিসাব দেওয়ার অভিযোগ প্রমাণিত হয়।
এখন তিনি ও তার মেয়ে মরিয়ম জেলে বন্দী। অ্যাকাউন্টিবিলিটি কোর্ট তাকে ১০ বছরের সাজা প্রদান করেছে। একই সঙ্গে তাকে ১০ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলারও জরিমানা করা হয়। একই রায়ে তার মেয়ে মরিয়ম নওয়াজকে সাত বছর ও মরিয়মের স্বামী ক্যাপ্টেন সফদারকে এক বছর কারাদ- দেওয়া হয়েছে। অ্যাকাউন্টিবিলিটি কোর্ট রাজনীতিবিদদের শায়েস্তা করার জন্য সৃষ্টি করেছিল জেনারেল জিয়াউল হক। এই জেনারেল জিয়াউল হকই জুলফিকার আলী ভুট্টোকে ফাঁসিতে ঝুঁলিয়েছিলেন ১৯৭৯ সালে। পাকিস্তানের ইতিহাসে দীর্ঘ সময় সেনাশাসন থাকার ফলে সেখানে গড়ে উঠেছে একটি সেনা-অনুগত সিভিল-সমাজ এবং অনুগত জনগোষ্ঠী যারা রাজনৈতিক দলের চেয়ে সেনাশাসন পাকিস্তানের জন্য অধিক উপযুক্ত মনে করে। এছাড়া রয়েছে সেনা-অনুগত কিছু রাজনৈতিক দল।
আশা-নিরাশা, সফলতা-ব্যর্থতা উত্থান-পতন, সুখ-দুঃখ নিয়ে জীবনের গলিপথ। রাজনীতির এই মাঠে কেউ মহানায়ক হন আবার একই ব্যক্তি পরিণত হন খলনায়কে। পাকিস্তানের নওয়াজ শরিফ এমনই একজন। ২০১৭-এর ২৮ জুলাই নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফকে সুপ্রিমকোর্টের রায়ের মাধ্যমে দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত করে মেয়াদপূর্ণের ১০ মাস আগে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য করা হয়। তবে তিনিই পাকিস্তানের প্রথম প্রধানমন্ত্রী নন, যাকে কোর্টের রায়ে ক্ষমতা ছাড়তে হলো। পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) ইউসুফ রাজা গিলানি দেশটির ইতিহাসের প্রথম প্রধানমন্ত্রী, আদালতের আদেশে যাকে ক্ষমতা ছেড়ে দিতে হয়েছিল।
কখনও গুপ্তহত্যা, কখনও গৃহবন্দি, কখনও মৃত্যুদ-, কখনও বিমান দুর্ঘটনা। পাক-রাজনীতিবিদদের জীবনটাই ঘটনাবহুল। মৃত্যুদ- হয়েছিল জুলফিকার আলি ভুট্টোর, রহস্যজনক বিমান দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়েছিল জেনারেল জিয়াউল হকের, আততায়ীর গুলি ঝাঁঝরা করে দিয়েছিল বেনজির ভুট্টোকে, এ মুহূর্তে দেশের বাইরে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন মুশাররফ। সেই অমোঘ নিয়তির শিকার সাবেক পাক-প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ এবং তার পরিবারও। তার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ উত্থান-পতন।
১৯৪৯ সালে লাহোর কাশ্মীরি শিল্পপতি পরিবারে জন্ম নওয়াজ শরিফের। পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ে আইনে স্নাতক, তারপরই পারিবারিক ইস্পাত ব্যবসায় যোগদান। ১৯৭৬ সালে পারিবারিক ব্যবসা নওয়াজের রাষ্ট্রায়ত্তকরণ করে জুলফিকার আলি ভুট্টো সরকার। তখনই তিনি যোগদান করেন পাকিস্তান মুসলিম লীগে। ভুট্টো ও শরিফ পরিবারের বিবাদের সেই শুরু। ১৯৮১ সালে পাক-পাঞ্জাবের অর্থমন্ত্রী হিসেবে কাজ শুরু। চার বছরের মধ্যে মুখ্যমন্ত্রী ও নিজের দল পাকিস্তান মুসলিম লীগ (নওয়াজ) প্রতিষ্ঠা। ১৯৯০ সালে প্রথমবারের জন্য পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত পাকিস্তানের দুর্নীতিবাজ প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ সেনবাহিনীর সঙ্গে ক্ষমতার দ্বন্দ্বে ১৯৯৯ সালে ক্ষমতাচ্যুত হন। সেনাবাহিনী কোর্ট ব্যবহার করে তাকে গ্রেফতার করে ছিনতাই ও সন্ত্রাসবাদের অভিযোগে যাবজ্জীবন কারাদ- দেয় এবং দুর্নীতির দায়ে আজীবন রাজনীতি থেকে নিষিদ্ধ করে। পরে সৌদি আরবের মধ্যস্থতায় কারাদ- থেকে বেঁচে গিয়ে নওয়াজ শরিফ পরিবারের ৪০ সদস্যসহ ১০ বছরের নির্বাসনে যান।
একই সঙ্গে ২০০৭ সালে সুচতুর নওয়াজ পাকিস্তানের অন্যতম ধনী ব্যক্তি হওয়ায় সেনাবাহিনীর কিছু সদস্যকে ম্যানেজ করে দেশে ফিরে আসতে সক্ষম হন। পরবর্তীতে তিনি ২০১৩ সালে আবার পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হলে সেনাবাহিনীর পক্ষে এটা মেনে নেওয়া কঠিন ছিল। ফলে অনেকে এটা মনে করতে শুরু করেন যে কোর্টকে ব্যবহার করে, সেনাবাহিনীই আসলে নওয়াজকে সরিয়ে দিয়েছে তাদের পছন্দের কাউকে অথবা নিজেরাই ক্ষমতায় আসার জন্য।
পাকিস্তান মুসলিম লীগ-প্রধান নওয়াজ শরিফ তিনবার প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। নির্বাচনে জিতে কিন্তু কোনোবারই মেয়াদ পূর্ণ করতে পারেনি। এবারের মেয়াদ নিয়ে তিনি পাকিস্তানের ১৫তম প্রধানমন্ত্রী, যারা কেউ মেয়াদ শেষ করতে পারেন নি। তিনি সেনাবাহিনীর ইচ্ছের বিরুদ্ধে গিয়ে ভারতের সঙ্গে বিরোধ মিটাতে চেয়েছেন বারবার। এবার তাকে চিরজনমের মতো অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে। ৭০ বছর বয়সী রাষ্ট্রটি এ পর্যন্ত ৩৪ বছর শাসন করেছে রাজনীতিবিদরা আর ৩৬ বছর শাসন করেছে দেশটির জেনারেলরা। মাত্র দুবার নির্বাচিত দল সরকারের মেয়াদ পূর্ণ করতে পেরেছিল। পাকিস্তানের দেশরক্ষার বিষয় এবং পররাষ্ট্রবিষয়ক কর্মকা- প্রত্যক্ষভাবে নিয়ন্ত্রণ করে থাকে সেনাবাহিনী।
১৯৭১-পরবর্তী পাকিস্তানের ইতিহাসে কোনো সামরিক শাসকই আন্দোলনের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত হননি। পিপলস পার্টি, মুসলিম লীগসহ সবাই সেখানে সেনাশাসকদের দেখানো পথেই হেঁটেছেন এবং সেনাবাহিনীর সঙ্গে যতটা সম্ভব আপস করেই ক্ষমতায় থাকতে চেয়েছেন। যখনই আপসরফায় বনিবনা হয়নি তখনই সেনাবাহিনী সরাসরি রাষ্ট্রক্ষমতা নিয়ে নিয়েছে। ফলে, যখনই কোনো বেসামরিক শাসককে তারা পছন্দ করেনি নির্দ্বিধায় তাদের সরিয়ে দিয়েছে। জনগণ এবং সিভিল সমাজের একটা বড় অংশও তাদের এ কাজে সমর্থন জানিয়েছে।
পাকিস্তান জাতীয় সংসদে আসন সংখ্যা ৩৪২, যেখানে ২৭২টি সাধারণ এবং ৭০টি আসন নারী এবং জাতিগত সংখ্যালঘুদের জন্য রিজার্ভ রয়েছে। আসনের মধ্যে আবার পাঞ্জাব প্রদেশে ১৭৪টি, সিন্ধু প্রদেশে ৭৫টি, পাখতুনখাওয়া প্রদেশে ৪৮টি, বেলুচিস্তান প্রদেশে ১২টি আর কেন্দ্রীয় রাজধানীতে ৩টি। পাঞ্জাব সর্ববৃহত্তম প্রদেশ এবং এ প্রদেশে আসন সংখ্যাও বেশি। নওয়াজ শরিফ পাঞ্জাবের লোক। তিনি জেনারেল জিয়াউল হকের সময় পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। আসলে জেনারেল জিয়াউল হকই তাকে রাজনীতিতে এনেছিলেন। নওয়াজেরা পাকিস্তানের অন্যতম ধনাঢ্য পরিবার। ইত্তেফাক ফাউন্ডারির মালিক। তারা সারাবিশ্বে বিভিন্ন মেশিন সাপ্লাই করে থাকে।
বিবিসি জানিয়েছে, এর আগে নওয়াজ শরিফ বলেছেন, ‘একটা সময় ছিল যখন আমরা পাকিস্তানকে বলতাম একটি রাষ্ট্রের মধ্যে আরেকটি রাষ্ট্র, এখন বলা হয় একটি রাষ্ট্রের ওপরে আরেকটি রাষ্ট্র।’
এই রায়ের ফলে আসন্ন সাধারণ নির্বাচনের আগে পাকিস্তান মুসলিম লিগ (এন) বড় রকমের ধাক্কা খেল।
নওয়াজ শরিফের বিরুদ্ধে সুপ্রিমকোর্টের দেওয়া রায়টি কি কোর্টের স্বাধীন ইচ্ছার প্রতিফলন না-কি সেনাসদর দফতরের ইচ্ছার প্রতিফলন তা বলার সময় এখনও আসেনি।
রায়ের পরই সাংবাদিক বৈঠকে নওয়াজ বলেন, রাজনৈতিকভাবে আমাকে পঙ্গু করে দেওয়ার জন্যই এসব হচ্ছে। দুর্নীতির দায়ে ১০ বছরের সাজাপ্রাপ্ত হওয়ার পর লন্ডনে চিকিৎসাধীন ক্যানসারে আক্রান্ত স্ত্রীর থেকে বিদায় নিয়ে দেশে ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ। লন্ডনে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। এদিকে রায়ের পর এক প্রতিক্রিয়ায় দিনটিকে ‘কালোদিন’ বলে আখ্যা দিয়েছেন তার ভাই ও পাকিস্তান মুসলিম লীগ (এন) সভাপতি শাহবাজ শরিফ। পাকিস্তান মুসলিম লীগ (এন) এ রায় প্রত্যাখ্যান করেছে। অন্যদিকে এই রায়ের মধ্যদিয়ে নতুন পাকিস্তানের জন্ম হয়েছে বলে মন্তব্য করেছে পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ প্রধান ইমরান খান।
এদিকে, এই রায়কে আবারও চ্যালেঞ্জ জানানো হবে নওয়াজের পরিবারের পক্ষ থেকে। আগামী উচ্চ আদালতে এই রায়ের বিরুদ্ধে আবেদন করবে তারা।
দেশে ফিরে গ্রেফতার হলেন পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও মুসলিম লীগ (এন) নেতা নওয়াজ শরিফ। তার সাথে তার মেয়ে মরিয়ম নেওয়াজও গ্রেফতার হন। লন্ডন থেকে রওয়ানা দিয়ে আবুধাবী হয়ে ২ ঘণ্টা ৫৬ মিনিট দেরিতে লাহোরের আল্লামা ইকবাল বিমানবন্দরে তারা পৌঁছান। সেখানে পৌঁছানোর পরপরই দেশটির ‘ন্যাশনাল অ্যাকাউন্টিবিলিটি ব্যুরো (এনএবি)’ তাদের দুজনকে আটক করে এবং তাদের পাসপোর্ট জব্দ করা হয়। এরপর তাদের একটি ব্যক্তিগত বিমানে করে ইসলামাবাদ বিমানবন্দরে প্রেরণ করা হয়। দুজনেই দুর্নীতি মামলার সাজাপ্রাপ্ত আসামি।
নওয়াজ শরিফকে স্বাগত জানাতে বিমানবন্দরের সামনে জড়ো হয় নওয়াজের হাজারে সমর্থক। তারা নওয়াজকে সিংহ নামে সম্বোধন করে সেøাগান দিতে থাকে। তারা ঘোষণা দিয়ে রেখেছিল তারা নওয়াজকে সাথে নিয়ে শোভাযাত্রা করবেন। তবে নওয়াজ গ্রেফতার হওয়ায় তা সম্ভব হয়নি।
পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের কন্যা মরিয়ম নওয়াজ আবুধাবি বিমানবন্দর থেকে টুইটারে একটি ভিডিও পোস্ট করেছেন। ৪৮ সেকেন্ডে এই ভিডিও-তে দেখা যায় নওয়াজ শরিফ দেশবাসীর উদ্দেশ্যে বলছেন, সরাসরি জেলে চলে যাবেন জেনেও দেশের জনগণের জন্য তিনি পাকিস্তান ফিরে আসছেন। তিনি ভিডিও-তে উল্লেখ করেছেন, তার এই ত্যাগ স্বীকার পরবর্তী প্রজন্মের জন্য। এ ধরনের সুযোগ আগামীতে আর নাও আসতে পারে। তিনি বলেন, চলুন আমরা সবাই মিলে একসঙ্গে পাকিস্তানের ভাগ্য গড়ে তুলি। তিনি আরও বলেন, নওয়াজ শরিফ ইসলামাবাদ থেকে আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করবেন।
সত্যি কথা স্বীকার করলে তৃতীয় বিশ্বের মধ্যে পাকিস্তানই দুর্নীতির মহারাষ্ট্র তবুও জনগণের ভোটের রায়কে সম্মান জানিয়ে ইমরান খানের তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) রাজনৈতিক দলকে আর একবার বিশ্ববাসী দেখবে তারা কতখানি গণতন্ত্রমনা।

পাঠকের মন্তব্য:

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না। তারকাচিহ্নযুক্ত (*) ঘরগুলো আবশ্যক।

*