নোবেল পুরস্কার

Posted on by 0 comment

22বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কারের নাম ‘নোবেল পুরস্কার’। উনিশ শতকের বিশ্ববিখ্যাত রসায়নবিদ, প্রকৌশলী ও বিজ্ঞানী আলফ্রেড নোবেল-এর নামে এই পুরস্কারটি প্রচলিত। প্রথম পুরস্কার প্রদান করা হয় ১৯০১ সালে। বর্তমানে প্রতিবছর মোট ৬টি বিষয়ে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়। মানব কল্যাণে বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবনা বা আবিষ্কার, সমাজ ও উন্নয়ন এবং বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে যাদের কৃতিত্বপূর্ণ বিশেষ অবদান রয়েছে, তাদেরই এই পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। পুরস্কারের ক্ষেত্রগুলো হলোÑ ১. পদার্থবিজ্ঞান ২. রসায়ন ৩. চিকিৎসাশাস্ত্র ৪. সাহিত্য ৫. শান্তি এবং ৬. অর্থনীতি। শুরু থেকে প্রথমোক্ত ৫টি বিষয়ের নোবেল পুরস্কার প্রদান করা হতো। ১৯৬৯ সাল থেকে অর্থশাস্ত্র বা অর্থনীতিতে বিশেষ মৌলিক অবদানের জন্য এই পুরস্কার দেওয়া হচ্ছে।
আলফ্রেড নোবেল সুইডেনের রাজধানী স্টকহোম-এ ১৮৩৩ সালের ২১ অক্টোবর জন্মগ্রহণ করেন। তিনি একাধারে রসায়নশাস্ত্র ও ইঞ্জিনিয়ারিং বিদ্যায় পড়াশোনা করেন। অসাধারণ প্রতিভাবান এই মানুষটি ১৮৮৪ সালে স্টকহোমের একটি লৌহ ও ইস্পাত কারখানা ক্রয় করেন। ইতোমধ্যে রসায়নশাস্ত্রে তার বহুসংখ্যক মৌলিক গবেষণা ও আবিষ্কার তাকে অর্থ ও খ্যাতি এনে দেয়। তিনি ধোঁয়াবিহীন বিস্ফোরক ‘ব্যালাস্টিক’ আবিষ্কার করে পৃথিবীজুড়ে খ্যাতি অর্জন করেন। তবে যে আবিষ্কারটি তাকে একাধারে খ্যাতি এবং বিপুল অর্থ এনে দেয় তা হলো ‘ডিনামাইট’। বস্তুত পারমাণবিক বোমা আবিষ্কারের পূর্ব পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি ধ্বংস ক্ষমতাসম্পন্ন বিস্ফোরক ছিল ডিনামাইট। আলফ্রেড নোবেল তার ক্রয়কৃত লৌহ ও ইস্পাত কারখানাটিকে একটি অস্ত্র উৎপাদন কারখানায় রূপান্তরিত করেন। বিজ্ঞানী নোবেল সুইডেনের প্রথমসারির শিল্পপতিতে পরিণত হন।
ডিনামাইট ও অন্যান্য মানব বিধ্বংসী অস্ত্রশস্ত্র বিপুল মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। মৃতদের দীর্ঘ তালিকায় নোবেলের এক সহোদর ভাইও ছিলেন। এই ধ্বংস ও মৃত্যু তার ওপর গভীর প্রভাব বিস্তার করে। তিনি বিজ্ঞানের এসব আবিষ্কারকে মানবকল্যাণে কাজে লাগাতে বিজ্ঞানীদের এবং মানবকল্যাণে নিয়োজিত প্রতিষ্ঠানকে অনুপ্রাণিত করতে তার সারা জীবনের অর্জিত অর্থ দিয়ে একটি পুরস্কার প্রবর্তনের চিন্তা করেন। ১৮৮৫ খ্রিস্টাব্দের ২৭ নভেম্বর তার সর্বশেষ উইলটি তিনি প্যারিসে সুইডিস-নরওয়ে ক্লাবে বসে প্রণয়ন করেন। এই উইলে তিনি তার পুরো সম্পদের ৯৪ শতাংশ, তৎকালীন মূল্যে ৩১ মিলিয়ন সুইডিশ ক্রোনা বা ৪.৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, চিকিৎসাশাস্ত্র, সাহিত্য ও শান্তিÑ এই ৫টি বিষয়ে পুরস্কার প্রদানের জন্য দান করেন।
আলফ্রেড নোবেল তার জীবিতাবস্থায় পুরস্কার প্রদান করে যেতে পারেন নি। ১৮৯৬ সালের ১০ ডিসেম্বর ইতালির ‘স্যানরিমো’ নামে নিজের গ্রামের বাসভবনে মাত্র ৬৩ বছর বয়সে তার জীবনাবসান ঘটে। তার মৃত্যুর পর নোবেলের উইলের দুই সমন্বয়কারী রুগনার সোলম্যান ও রুডলফ লিলজেকুইস্ট ‘নোবেল ফাউন্ডেশন’ প্রতিষ্ঠা করেন। নোবেলের সম্পদ সংরক্ষণ এবং অর্জিত আয় দিয়ে পুরস্কার প্রদান ও পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানের আয়োজন করাই ছিল এই ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দের পূর্ব পর্যন্ত সুইডেন ও নরওয়ে একটি ফেডারেল রাষ্ট্র-কাঠামোয় দুটি স্বতন্ত্র স্বশাসিত অঞ্চল হিসেবে ঐক্যবদ্ধ ছিল। ১৮৯৭ সালে নরওয়ে নোবেলের উইল অনুমোদন করার পর নরওয়েজীয় নোবেল কমিটি গঠিত হয়। ১৮৯৭ সালের ৭ জুন সুইডেনে প্রতিষ্ঠিত হয় ক্যারোলিংস্কা ইনস্টিটিউট, ৯ জুন সুইডিস একাডেমি এবং ১১ জুন রাজকীয় সুইডিস একাডেমি। এই প্রতিষ্ঠানগুলোই নোবেল পুরস্কার বাছাই ও প্রদানের সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী হিসেবে স্বীকৃতি অর্জন করে। ১৯০০ সালে একটি চূড়ান্ত বিধিমালা প্রণয়ন করা হয় এবং সুইডেনের রাজা অস্কার তা ফরমান বলে আইনে পরিণত করার ঘোষণা দেন। ১৯০১ সালে পূর্বোক্ত ৫টি (প্রতিটি ক্ষেত্রে এক বা একাধিক ব্যক্তিকে) পুরস্কার প্রদান করা হয়। ১৯০৫ সালে নরওয়ে সুইডেন থেকে পৃথক হয়ে যায়। তবে পৃথক হলেও নোবেল শান্তি পুরস্কার প্রদানের এখতিয়ারটি লাভ করে নরওয়েজীয় নোবেল কমিটি।
১৯৬৮ সালে সুইডিস কেন্দ্রীয় ব্যাংক ৩০০ বছর পূর্তিতে, ব্যাংক কর্তৃপক্ষ নোবেল ফাউন্ডেশনকে বিপুল পরিমাণ অর্থ দান করে। আলফ্রেড নোবেলের সম্মানে এই অর্থ থেকে ১৯৬৯ সাল হতে অর্থনীতিতে বিশেষ অবদানের জন্য নোবেল পুরস্কার প্রদানের প্রচলন হয়। ১৯৪০ থেকে ১৯৪২ সাল পর্যন্ত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে নোবেল পুরস্কার প্রদান বন্ধ থাকে। যুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত শান্তি ও সাহিত্যে পুরস্কার স্থগিত রাখা হয়।
নোবেল পুরস্কার প্রদানের প্রক্রিয়াটি দীর্ঘ এবং অত্যন্ত কঠোর। বিভিন্ন বিষয়ে নোবেল পুরস্কার প্রদানের মনোনয়ন দেওয়ার জন্য নির্ধারিত ফরমে সুপারিশ করার জন্য ৩ হাজার ব্যক্তিকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। এরা পুরস্কার সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে বিশেষজ্ঞ, বিজ্ঞানী, প-িত এবং অভিজ্ঞতাসম্পন্ন সম্মানিত ব্যক্তি। যে বছর পুরস্কার দেওয়া হবে, সে বছরের প্রথম মাসে অর্থাৎ জানুয়ারির ৩১ তারিখের মধ্যে যার যার সুপারিশ নোবেল কমিটির কাছে পাঠাতে হয়। নোবেল কমিটি প্রাপ্ত তালিকা থেকে ৩০০ জনের নাম ঠিক করে, সেই তালিকার বিষয়ে মতামত চেয়ে সংশ্লিষ্টদের কাছে পাঠায়। প্রত্যেক ক্ষেত্রেই সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামতের ভিত্তিতে চূড়ান্ত মনোনয়ন ঠিক করা হয়। চূড়ান্ত মনোনয়নের পরই কেবল নির্বাচিত ব্যক্তিকে তা জানানো হয়। এমন অনেকেই আছেন, যারা নোবেল পুরস্কার পাওয়ার দুদিন আগে না জেনেই মৃত্যুবরণ করেছেন। অথবা কেউ কেউ জানার ২-৪ দিন পর মারা গেছেন, আনুষ্ঠানিকভাবে পুরস্কার গ্রহণের সুযোগ পাননি। মরণোত্তর পুরস্কার দেওয়া হয় না।
নোবেল শান্তি পুরস্কার অবশ্য প্রদান করে নরওয়েজীয় নোবেল কমিটি। তবে এক্ষেত্রে নরওয়ের পার্লামেন্ট পাঁচজন সংসদ সদস্যকে গবেষণার দায়িত্ব দেয়। ওই পাঁচজনের কমিটি কারও কাছে জবাবদিহি করে না। এই পাঁচ সদস্যই তাদের মনোনীত ব্যক্তির নাম নরওয়েজীয় নোবেল কমিটির নিকট উত্থাপন করে। তাদের মনোনীত ব্যক্তিই শান্তি পুরস্কার লাভ করে। যারা নোবেল পুরস্কার লাভ করেন তাদের বলা হয় নোবেল লরিয়েট। পুরস্কারপ্রাপ্তরা একটি স্বর্ণপদক, একটি সনদ এবং নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ পেয়ে থাকেন। সময়ের ব্যবধানে অর্থের পরিমাণের পরিবর্তন হয়েছে।
নোবেল পুরস্কার বিতর্কের ঊর্ধ্বে না। ১৯০১ সালে প্রথম সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয় সুইডিস কবি সূলি প্রুধমকে। বিশ্বের ৪২ জন প্রথমসারির সাহিত্যিক এর বিরোধিতা করেছিলেন, তাদের মতে প্রুধম মধ্যমসারির কবি। পুরস্কার দেওয়া উচিত ছিল লিও তলস্তয়কে। সাহিত্য ও শান্তি পুরস্কার নিয়ে পরবর্তীকালেও ব্যাপক সমালোচনা হয়েছে। অনেক যুদ্ধবাজ ও বিতর্কিত ব্যক্তি নোবেল পুরস্কার লাভ করেছেন। ১৯৭৩ সালে ভিয়েতনামের লি ডাক থো-র সঙ্গে যুদ্ধবাজ হেনরি কিসিঞ্জার, ১৯৯৪ সালে ইয়াসির আরাফাতের সঙ্গে ইসরায়েলের যুদ্ধবাজ প্রধানমন্ত্রী সাইমন পেরেস ও আইজাক রবিনের মতো লোককে নোবেল পুরস্কার প্রদান করা হয়। লি ডাক থো নোবেল পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেন। মার্কিন রাষ্ট্রপতি বারাক ওবামাকে নোবেল পুরস্কার প্রদান নিয়েও বিশ্বব্যাপী বিতর্কের ঝড় ওঠে। শান্তিতে যার বিন্দুমাত্র কোনো অবদান নেই, বাংলাদেশের গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা অর্থনীতিবিদ ড. ইউনূসকে অর্থনীতিতে না দিয়ে শান্তি পুরস্কার দেওয়ায় বিস্ময়ের সৃষ্টি হয়। বিশেষত রাজনৈতিক বিবেচনা থেকে নোবেল শান্তি পুরস্কার প্রদান করায় এই পুরস্কারটির মর্যাদা বহুলাংশে ক্ষুণœ হয়েছে।
এশিয়ায় প্রথম এবং বাঙালিদের মধ্যেও প্রথম নোবেল পুরস্কার (সাহিত্যে) লাভ করেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯১৩ সালে।
নূহ-উল-আলম লেনিন

Category:

Leave a Reply