বিভাগ: সম্পাদকীয়

পারমাণবিক যুগে বাংলাদেশ

2মানুষ স্বপ্নের চেয়ে বড়ো। কত বড়ো তা সাধারণের পক্ষে কল্পনা করাও সম্ভব নয়। পৃথিবীর পশ্চাৎপদ এবং দরিদ্রতম দেশগুলোর অন্যতম হিসেবে যে দেশটি ছিল পরনির্ভরশীলতা ও সাহায্য-নির্ভরতার প্রতীক; কেউ কি স্বপ্নেও ভেবেছে, বাংলাদেশ নামক সেই দেশটি এখন কেবল আত্মনির্ভরশীলতার গৌরবই অর্জন করছে না, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সর্বোচ্চ বিকাশের ব্যবহারও করতে চলেছে। পারমাণবিক যুগে প্রবেশ করছে বাংলাদেশ।
না, মানব ও সভ্যতাবিনাশী পরমাণু অস্ত্র প্রতিযোগিতার পথে নয়, বাংলাদেশ পা বাড়িয়েছে উন্নত-সমৃদ্ধ সভ্যতা নির্মাণ এবং মানুষের জীবনকে আরও উচ্চতর মানের দিকে নিয়ে যাওয়ার জন্য। আর এর অন্যতম পূর্বশর্তÑ বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উৎপাদনে পরমাণু শক্তিকে ব্যবহারের সক্ষমতা অর্জন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিজয়ের মাসের প্রথম দিন, ২০১৭ সালের ১ ডিসেম্বর পাবনার রূপপুরে নির্মীয়মাণ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মূল কাজের শুভ উদ্বোধন করেছেন।
অর্ধ শতাব্দীরও আগে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের আগে পাবনার রূপপুরে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের লক্ষ্যে জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছিল। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের বাস্তব কোনো পথ গ্রহণ না করে বাঙালিদের ধোঁকা দিয়ে বোকা বানানোর উদ্দেশে একটা মূলা ঝুলিয়ে রেখেছিল। অতঃপর স্বাধীনতার পর শুরু হয় নতুন করে চিন্তা-ভাবনা। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা রচনার কালে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের বিষয়কে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন কৌশলের অংশ হিসেবে গ্রহণ করেন। তিনি তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন সফরকালে প্রেসিডেন্ট পোদগর্নি, প্রধানমন্ত্রী কোসিগিন এবং কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্রেঝনেভের সঙ্গেও বিষয়টি আলোচনা করেছিলেন। সোভিয়েত নেতৃত্ব আশ্বস্ত করেছিলেন উপযুক্ত সময়ে এ ব্যাপারে সোভিয়েত ইউনিয়ন বাংলাদেশের পাশে দাঁড়াবে। কিন্তু ১৯৭৫ সালে জাতির পিতাকে হত্যার ভেতর দিয়ে সেই সম্ভাবনার অপমৃত্যু ঘটে। পঁচাত্তর-পরবর্তী কোনো শাসকগোষ্ঠীই ‘রূপপুর স্বপ্ন’ রূপায়ণের ব্যাপারে সামান্যতম উদ্যোগও গ্রহণ করেনি। সামরিক শাসকদের কথা বাদ দিলাম, এমন কীÑ দুই মেয়াদের ‘নির্বাচিত বিএনপি’ সরকারের প্রধান খালেদা জিয়াও এ ব্যাপারে পদক্ষেপ তো দূরের কথা, সামান্যতম চিন্তা-ভাবনাও গ্রহণ করেনি। নব্বইয়ের দশকে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে পড়ে। রাশিয়ান ফেডারেশন নামক নতুন রাষ্ট্রকে একটা সংকটকাল উত্তরণের ভেতর দিয়ে অগ্রসর হতে হয়। ফলে জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ১৯৯৬ সালের প্রথম আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আমাদের উদ্যোগ থাকা সত্ত্বেও রূপপুর পারমাণবিক কেন্দ্র নির্মাণের বিষয়ে খুব একটা অগ্রগতি হয়নি।
২০০৮ সালের নির্বাচনে জয়লাভের পরই বিজয়ী আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার জ্বালানি সংকট সমাধান ও বিদ্যুৎ উৎপাদনকে তাদের ৫টি অগ্রাধিকারের অন্যতম হিসেবে কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত করে। ২০২১ সালের মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রথমে ২০,০০০, পরে ২১,০০০ মেগাওয়াটে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু একইসঙ্গে সরকার অব্যাহতভাবে এই লক্ষ্যমাত্রা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদনের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রণয়ন করে।
কেবল জ্বালানি তেল, জলবিদ্যুৎ অথবা কয়লা-নির্ভরতায় সীমাবদ্ধ না থেকে দেশের ক্রমবর্দ্ধমান চাহিদা পূরণের কথা বিবেচনা করে পরমাণু শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহার এবং সৌরশক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে কাক্সিক্ষত বিদ্যুৎ উৎপাদনের কৌশল গ্রহণ করা হয়। শুরু হয় রাশিয়ার সাথে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের দীর্ঘ, জটিল ও বিপুল অর্থ ব্যয়সাপেক্ষ প্রকল্প গ্রহণের বিষয়ে সহযোগিতার সংলাপ। অবশেষে সংলাপেরও অবসান হয়। শুরু হয় বাস্তব নির্মাণকাজ।
২০১৪ সালে তৃতীয়বারের মতো নির্বাচিত হয়ে সরকার গঠন করেন জননেত্রী শেখ হাসিনা। শুরু হয় রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের প্রাথমিক কাজ। ইতোমধ্যে প্রাথমিক পর্যায়টিও অতিক্রান্ত হয়েছে। এবার বাস্তবে স্বপ্ন রূপায়নের কাজ। পারমাণবিক চুল্লি নির্মাণের লক্ষ্যে মূল বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র নির্মাণের কাজটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী। ১ ডিসেম্বর ২০১৭। পরিকল্পনামতো কাজ অগ্রসর হলে ২০২৩ সালে ১২৫০ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের প্রথম ইউনিটটি চালু হবে। দ্বিতীয় ইউনিট চালু হবে পরের বছর। এই মেগা প্রকল্পে প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ১ লাখ ১৪ হাজার কোটি টাকা। তার মধ্যে রাশিয়ার প্রকল্প সাহায্যের পরিমাণ ৯১ হাজার ৪০ কোটি টাকা। অবশিষ্ট অর্থ জোগাবে বাংলাদেশ।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাংলাদেশ নতুন নজির স্থাপন করতে যাচ্ছে। পরমাণু শক্তির শান্তিপূর্ণ এবং মানব কল্যাণে ব্যবহারে বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে পরমাণু শক্তিধর (বোমা নয়) নতুন উন্নয়ন মডেল হয়ে থাকবে। আমরা জননেত্রী শেখ হাসিনাকে এই দূরদর্শী কাজের জন্য গর্বিত বাঙালি জাতির পক্ষ থেকে অভিনন্দন জানাই। একইসঙ্গে বন্ধু-রাষ্ট্র রাশিয়াকে উদার সাহায্যের জন্য আমাদের শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন। বাংলাদেশ পারমাণবিক শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহারের যুগে প্রবেশ করতে যাচ্ছেÑ এটাই জাতি হিসেবে আমাদের জন্য নবতর মর্যাদা ও গৌরব এনে দেবে।

পাঠকের মন্তব্য:

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না। তারকাচিহ্নযুক্ত (*) ঘরগুলো আবশ্যক।

*