পোপ কাহিনি

12-6-2017 7-23-47 PMখ্রিস্টান ধর্মে রোমান ক্যাথলিক ধর্মগুরু পোপ-এর মর্যাদা বিশ্বজনীন। ইতালির রাজধানী রোমের কেন্দ্রস্থলে ক্যাথলিক খ্রিস্টানদের তীর্থকেন্দ্রটির নাম ভ্যাটিকান। মাত্র ১১০ একর জমির ওপর ক্যাথলিক জগতের আধ্যাত্মিক কেন্দ্র তথা রোমান চার্চটি একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের মর্যাদার অধিকারী। ভ্যাটিকানের জনসংখ্যা মাত্র ৯১০ জন। ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দের আগে ভ্যাটিকানের কোনো পৃথক রাষ্ট্রীয় বা প্রশাসনিক মর্যাদা ছিল না। ইতালির রাজতন্ত্রের অন্তিমকালে ভ্যাটিকানকে অবশিষ্ট ইতালি থেকে আলাদা করে একটি স্বতন্ত্র সার্বভৌম রাষ্ট্রের মর্যাদা দেওয়া হয়। এই রাষ্ট্রের কর্ণধার কিন্তু কেবল ভ্যাটিকানের ৯১০ জন অধিবাসীর নয়, সারাবিশ্বের ক্যাথলিকদের ধর্মগুরু হিসেবে স্বীকৃত। ভ্যাটিকান হচ্ছে পৃথিবীর ক্ষুদ্রতম রাষ্ট্র। তবে অন্য রাষ্ট্রের সাথে প্রকৃতগতভাবেই এটি আলাদা। এটি আসলে একটি বৃহৎ চার্চ ও খ্রিস্টান জগতের আধ্যাত্মিকতার কেন্দ্র। ভ্যাটিকানের প্রধান হচ্ছেন একজন পোপ।
পোপ শব্দটি গ্রিক জরৎধপ অর্থাৎ ‘ঋধঃযবৎ’ থেকে উৎসারিত। খ্রিস্টধর্মের শুরুতে কোনো একক ‘পোপ’ ছিল না। তথন মূলত খ্রিস্টান ধর্মযাজক বা সকল বিশপের ক্ষেত্রেই এই পোপ অথবা ফাদার টাইটেলটি ব্যবহৃত হতো। কেবল রোমের ‘বিশপ’কে একমাত্র ‘পোপ’ বলার প্রচলন শুরু হয় একাদশ শতাব্দী থেকে। এর আগে, খ্রিস্টধর্মের প্রাথমিক যুগে মিসরের আলেকজান্দ্রিয়ার প্যাট্রিয়ার্ক, পোপ হেরাক্লাস (ঐবৎধপষধং) অব আলেকজান্দ্রিয়া (২৩২-২৪৮ খ্রিস্টাব্দ) হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ইংরেজিতে চড়ঢ়ব টাইটেল বা শব্দটির ব্যবহার দেখা যায় দশম শতাব্দীর মাঝামাঝি থেকে। গ্রিক থেকে ইংরেজি অনুবাদে পোপ ভিটলিয়ান (চড়ঢ়ব ঠরঃধষরধহ) সম্পর্কে এই টাইটেল বা বিশেষণটি ব্যবহৃত হয়।
খ্রিস্ট ধর্মমতকে প্রথম দিকে ইহুদি ধর্মমতেরই একটি শাখা মনে করা হতো। ওর্ল্ড টেস্টামেন্টের সঙ্গে খ্রিস্টের জীবন ও বাণী হিসেবে প্রচারিত গসপেল বা খ- কাহিনিগুলোর ধারাবাহিকতা বলেও মনে করা হতো। রোমানদের মধ্যে বিশেষভাবে এই ধারণার অবসান ঘটে সাধু পলের প্রচার ও খ্রিস্টানদের সংঘশক্তি হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগের ভেতর দিয়ে। পল-ই প্রথম ইহুদিদের বাইরে খ্রিস্টের বাণী প্রচার করেন। পল ছিলেন গ্রিকভাষী। কলোসিয়ান এবং এফিসিয়াদের উদ্দেশে তার লেখা পত্রাবলি (ঞযব ঊঢ়রংঃষবং) থেকে স্পষ্টতই বোঝা যায় পল প্রাচীন গ্রিক ধর্মের রূপক ও মিস্টিসিজমের দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন। মধ্যপ্রাচ্য, ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল এবং ইউরোপের প্রবেশ পথে, স্যালনিকা, এথেন্স, কিরস্থ এবং রোমে যিশুর বাণী প্রচারের মাধ্যমে পল এক আধ্যাত্মিক আলোড়নের সৃষ্টি করেন। তবে শুরুতে রোমানদের কাছে খ্রিস্টধর্ম প্রতিরোধের সম্মুখিন হয়েছিল। রোম স¤্রাটের মূর্তিপূজা করতে অস্বীকৃতি জানানোর অপরাধে মৃত্যুদ- দেওয়া হতো। প্রচ- অত্যাচার-নির্যাতন সহ্য করেই খ্রিস্টধর্ম চতুর্থ শতকে রোমান-সা¤্রাজ্য, ইউরোপে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
এমতাবস্থায় চতুর্থ খ্রিস্টাব্দের প্রথম দিকে রোমের স¤্রাট কনস্টানটাইন নিজেই খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেন। স¤্রাট খিস্ট্রধর্ম গ্রহণ করায় অচিরেই এই ধর্ম রাষ্ট্রধর্মে পরিণত হয়। স¤্রাট কনস্টানটাইন সা¤্রাজ্যের রাজধানী রোম থেকে আজকের তুরস্কে স্থানান্তরিত করেন। তার নামে নতুন রাজধানী শহরের নামকরণ করা হয় কনস্টান্টিনোপল। মুসলিম বিজয়ের পূর্ব পর্যন্ত কনস্টান্টিনোপল ছিল বাইজেনস্টাইন সা¤্রাজ্য তথা খ্রিস্টান জগতের রাজনৈতিক, সামরিক ও আধ্যাত্মিক কেন্দ্র। যিশুখ্রিস্টের জন্ম প্যালেস্টাইনে। তার বাণী প্রথমে প্যালেস্টাইন অঞ্চলের হিব্রু ভাষায়ই প্রচারিত ছিল। কিন্তু স¤্রাট কনস্টাইনটাইন ও পল গ্রিকভাষী হওয়ায় তারাই প্রথম যিশুর ওপর প্রত্যাদেশ হিসেবে আসা বাণীসমূহকে সংগ্রহ ও গ্রিক ভাষায় সংকলিত করেন। অতএব, ঙষফ ঞবংঃধসবহঃ হিসেবে পরিচিত আসমানি কিতাব তাওরাত, যেমন হিব্রু ভাষার তেমনি ঘবি ঞবংঃধসবহঃ বা বাইবেল বা ইঞ্জিল শরিফ গ্রিক ভাষায় লিপিবদ্ধ করা হয়।
খ্রিস্টধর্মের প্রসারের পাশাপাশি খ্রিস্টানদের মধ্যে খোদ যিশুকে নিয়ে এবং ধর্মীয় অনুশাসন নিয়ে মতবিরোধ বাড়তে থাকে। গোঁড়ামি, মতান্ধতা, নিজ নিজ গোষ্ঠীর ধর্মবেত্তাদের মতের প্রতি অন্ধ আনুগত্য প্রভৃতি প্রবণতা খ্রিস্টীয় সমাজকে বিভিন্ন চার্চে বিভক্ত করে। শুরুতে এটা ছিল ট্রিনিটি বা ঈশ্বরের ত্রিত্ত্বভাব নিয়ে বিতর্ক। তৃতীয়-চতুর্থ শতক থেকে ষোড়শ শতকের মধ্যে খ্রিস্টান চার্চের প্রধান বিভক্তিগুলো সংঘটিত হয়। প্রাচীনপন্থি নেস্টেরীয় সিরিয়ান চার্চ, প্রথম দিকের কনস্টান্টিনোপল ও রোমের চার্চ, পূর্ব ইউরোপের বিশেষত রাশিয়ার অর্থডক্স চার্চ, ষোড়শ শতকে রিফর্মেশনের যুগে রোমান চার্চের বিভক্তির পটভূমিতে ক্যাথলিক চার্চের পাশাপাশি ইংল্যান্ডে প্রোটেস্টান্ট চার্চসহ ইউরোপ ও আমেরিকার একাধিক স্বাধীন চার্চ গড়ে ওঠে। এর ফলে রোমান চার্চের একাধিপত্যই কেবল খর্ব হয় না, রাষ্ট্র ও চার্চের পৃথকায়নেরও সূচনা হয়।
ষষ্ঠ ও সপ্তম শতকেও চার্চের ক্ষমতা সীমাবদ্ধ ছিল। জেরুজালেম, গ্রিস, কনস্টান্টিনোপল ও রোমের বিশপগণ বস্তুত স্বতন্ত্র অবস্থান থেকে খ্রিস্টান সমাজের আধ্যাত্মিক জীবন পরিচালনা করতেন। তখন পর্যন্ত কোনো শক্তিধর পোপের কথা জানা যায় না। কিন্তু বাইজাইনস্টাইন সা¤্রাজ্যের অবসান এবং ইতালিতে বর্বর টিউটোনিক আক্রমণের মুখে ইতালির স্বাধীনতা রক্ষায় অবতীর্ণ হন পোপ। স¤্রাটের দুর্বল ভূমিকা, দাস সমাজের ক্রমবর্ধমান অবক্ষয় এবং ইউরোপে ছোট ছোট খ্রিস্টান রাজ্যের অভ্যুদয় চার্চের বর্ধিত ভূমিকার সুযোগ দেয়। ফলে পোপের ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।
কনস্টান্টিনোপল ছিল ক্যাথলিক চার্চের বাইরে। এখানকার খ্রিস্টান-সমাজ ছিল সনাতন বা অর্থডক্স চার্চের অধীন। তারা ক্যাথলিক ধর্মমত ও পোপের কর্তৃত্ব মানতো না। ক্রুসেড বা ধর্মযুদ্ধের অজুহাতে পোপ দ্বিতীয় আরবানের উদ্দেশ্য ছিল ‘বিধর্মীদের আক্রমণচ্ছলে’ কনস্টান্টিনোপল দখল করা এবং তার লালিত দীর্ঘদিনের আকাক্সক্ষা, সেখানে ক্যাথলিক চার্চের কর্তৃত্ব ও প্রভূত্ব প্রতিষ্ঠা করা।
ক্রুসেডের ব্যর্থতার কারণে চার্চের প্রতি হতাশ মানুষ অন্যত্র প্রেরণা খুঁজতে শুরু করে। পোপ ও চার্চের একাধিপত্য, যাজকদের বিলাসী জীবনযাপন, ব্যভিচার এবং গোঁড়ামির বিরুদ্ধে মানুষ ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে খ্রিস্টধর্মের অনুসারীদের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন মত এবং সংস্কারপন্থি ধর্ম-সম্প্রদায় গড়ে উঠতে থাকে। ষোড়শ শতাব্দীতে জন্মসূত্রে জার্মান ধর্মযাজক মার্টিন লুথারের নেতৃত্বে শুরু হয় চার্চের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ বা ‘প্রোটেস্ট’। চার্চের দুর্নীতি এবং প্রভুত্ববাদের বিরুদ্ধে এই নবজাগ্রত ধর্মান্দোলনকে অভিহিত করা হয় ‘রিফর্মেশন’ বলে। সংস্কারপন্থি বা রিফর্মিস্টরা মার্টিন লুথারের নেতৃত্বে অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠার ফলে রোমান চার্চের ভাঙন অনিবার্য হয়ে ওঠে। প্রাচীনপন্থি গ্রিক চার্চের দলভুক্ত রাশিয়া এবং পূর্ব ইউরোপ এই বিভাজনের বাইরে রইল। সাধারণভাবে ১৫১৭ খ্রিস্টাব্দকে রিফর্মেশনের শুরুর বছর হিসেবে ধরা হয়। প্রোটেস্টাইন বিদ্রোহ বা রিফর্মেশনকে কেন্দ্র করে ক্যাথলিক জগৎ দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। ইউরোপের রাজন্যবর্গের একাংশ ক্যাথলিক চার্চের পক্ষে এবং অন্য অংশ প্রোটেস্টান্টদের পক্ষাবলম্বন করেন। ইংল্যান্ডের রাজা অষ্টম হেনরি ক্যাথলিক চার্চ থেকে বেরিয়ে গিয়ে ইংল্যান্ডে স্বতন্ত্র প্রোটেস্টান্ট চার্চ প্রতিষ্ঠা করে নিজেকে চার্চের প্রধান ঘোষণা করেন।
ইউরোপে রেনেসাঁ, চার্চ থেকে রাষ্ট্র এবং চার্চ থেকে শিক্ষাকে আলাদা করা, পুঁজিবাদের উদ্ভব, ফরাসি বিপ্লব, সেকুলার গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির বিকাশ এবং আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার উদ্ভব গত ২০০ বছরে ক্ষমতা ও কর্তৃত্বকে খর্ব করতে করতে ক্যাথলিক চার্চকে সংকোচিত করে ১১০ একরে সীমিত করেছে। তবে রাজনৈতিক ও সামরিক কর্তৃত্ব না থাকলেও ক্যাথলিক চার্চের আধ্যাত্মিক প্রভাব এবং পোপের আনুষ্ঠানিক মর্যাদা সর্বজন স্বীকৃত।
    

নূহ-উল-আলম লেনিন

Category:

Leave a Reply