বিভাগ: সংস্কৃতি

বইমেলায় শিশুদের আকর্ষণ ‘মুজিব’ গ্রাফিক নভেল

57উত্তরণ প্রতিবেদন: বইমেলার বাংলা একাডেমি অংশে ঢুকে হাতের ডান দিকে একটু এগিয়ে গেলে ১০০ নম্বর স্টলটি শিশুরা সহজেই খুঁজে পেয়েছে। ওটা সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড ইনফরমেশনের (সিআরআই) স্টল। সেখানে শিশুদের জন্য সাজিয়ে রাখা ছিল কার্টুনের বই। কিন্তু এ তো আর যেনতেন কার্টুন ছিল না। এ যে স্বয়ং জাতির জনকের ওপর কার্টুন। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কার্টুন। নাম ‘মুজিব’। আর এটি কিন্তু ¯্রফে কার্টুন বইও নয়। এটি একটি গ্রাফিক নভেল। এক কথায় চিত্রে চিত্রে তুলে ধরা একটি আস্ত উপন্যাস। যা প্রকাশিত হচ্ছে খ-ে খ-ে।
গত ২০ ফেব্রুয়ারি মেলায় পাওয়া গেছে কার্টুন বইটির প্রথম খ-। ২১ ফেব্রুয়ারি সকাল ১১টা থেকে পাওয়া গেছে দ্বিতীয় খ-টিও। কারণ ওই দিনই দ্বিতীয় খ-টি প্রকাশিত হয়ে মেলায় প্রথম আসে। সামান্য দামে শিশুরা কিনেছে। জাতির জনক হলে কী হবে একসময় তিনিও ছিলেন শিশুদের মতো ছোট্ট খোকাটি। তারও ছিল দুরন্ত সময়। খেলাধুলার শখ। এ ছাড়াও আছে ছোট্ট মুজিবটি কীভাবে ধীরে ধীরে বড় হয়ে ওঠার গল্প। আছে কীভাবে দেশ ও জাতিকে তার চেতনায় ধারণ করলেন। আর কী করেই বা তিনি জড়িয়ে গেলেন রাজনীতির সাথে সেসব নিয়ে ছবি আর কথা। ‘মুজিব’ যে একটি চেতনার নাম, তা শিশু বয়স থেকেই শিশুদের মাঝে প্রোথিত করে দিতে হবে। আর তার মধ্য দিয়েই গড়ে উঠবে আগামী দিনের যোগ্য নাগরিক, আগামী দিনের নেতৃত্ব, এটাই মত সিআরআই’র কর্তাব্যক্তিদের।
‘বঙ্গবন্ধু গ্রামের একজন সাধারণ ছেলে থেকে একটি জাতির আশা ও স্বপ্নের ধারক বাহক হয়ে উঠেছিলেন, অবশেষে মানুষের মুক্তি ও স্বাধীনতার পথপ্রদর্শক হয়েছিলেন। তার কাহিনি থেকে শিশুরা এটাই জানবে যে, কঠোর পরিশ্রম, ত্যাগ এবং সত্যের প্রতি বিশ্বাস থাকলে যে কোনো কিছু করা সম্ভব।’ এ কথাটি বলেছেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাতি এবং শেখ রেহানার পুত্র রাদওয়ান সিদ্দিক। তিনি হলেন গ্রাফিক নভেলের প্রকাশক।
প্রথম পর্বে রয়েছে, কীভাবে তরুণ মুজিব গ্রামে খেলাধুলা, পড়াশোনা, ডাক্তারের কাছ থেকে পালিয়ে যাওয়ার মতো দুঃসাহসিক, দুরন্তপনার কিছু কাজের মাধ্যমে গ্রামের বালকের জীবনযাপন করার কথা। তার বিশ্বস্ততার প্রমাণ তরুণ বয়স থেকেই স্পষ্ট ছিল এবং তিনি নিজের বিশ্বাসের পক্ষে দাঁড়াতে কখনও কুণ্ঠাবোধ করেন নি। তিনি তার বাবার অনেক প্রিয়পাত্র ছিলেন। তার বাবা একজন ¯েœহশীল পিতার পাশাপাশি ছিলেন ন্যায়-অন্যায় বোধসম্পন্ন একজন মানুষ। এত দুরন্তপনার মাঝেও তরুণ মুজিব নিজের কাজের দায়িত্ব নেওয়ার ব্যাপারেও শিক্ষা লাভ করেছিলেন।
দ্বিতীয় পর্বে বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক উত্থানের পাশাপাশি তার রাজনৈতিক গুরু হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সাথে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠার গল্প। আছে পিতা বনাম পুত্রের দলের মধ্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ফুটবল ম্যাচের ঘটনাটিও।

‘শাহ আবদুল করিম সারাবিশ্বের’
গত ১৫ ফেব্রুয়ারি সিলেটের কবি নজরুল অডিটরিয়ামে শাহ আবদুল করিম জন্মশতবর্ষ উদযাপন পর্ষদের উদ্যোগে ‘শাহ আবদুল করিম জন্মশতবর্ষ উৎসব’ পালিত হয়েছে। উৎসবের উদ্বোধন করেন ভারতের আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও বিশিষ্ট লেখক তপোধীর ভট্টাচার্য। তিনি আলোচনা পর্বে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন।
উদযাপন পর্ষদের আহ্বায়ক কবি শুভেন্দু ইমামের সভাপতিত্বে আলোচনা পর্বে অংশ নেন সিলেট মেট্টোপলিটন ইউনিভার্সিটির উপাচার্য মো. সালেহ উদ্দিন, কথাসাহিত্যিক আনিসুল হক, ভারতের সাহিত্যিক স্বপ্না ভট্টাচার্য, কবি তুষার কর ও করিম-তনয় শাহ নূরজালাল। স্বাগত বক্তব্য দেন সুমনকুমার দাশ। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালন করেন আবৃত্তিকার নাজমা পারভীন।
উদ্বোধনী বক্তৃতায় তপোধীর ভট্টাচার্য বলেন, শাহ আবদুল করিমের গান শুনে শুধু মাথা নাড়লেই চলবে না, গানের অনেক গভীরে গিয়ে প্রবেশ করতে হবে। করিম তার গানে সমষ্টির কথা বলেছেন। দেশ-কাল করিমের কথা না ভাবলেও করিম দেশ-কালের কথা বলে গিয়েছেন। আর করিমের সৃষ্টির সার্থকতাই এখানে। স্বপ্না ভট্টাচার্য বক্তৃতায় বলেন, করিমের গান আমাদের মনোজগতকে নাড়া দেয়, আলোড়িত করে। মানুষের সংকটে মানুষকে বাঁচিয়ে দেয় সংস্কৃতি। আর করিমের গান সেই সংকট উত্তরণের আলোকজ্জ্বল সিঁড়ি। বক্তৃতায় শাহ নূরজালাল বলেন, শাহ আবদুল করিম আর কেবল আমার পরিবারের নন, তিনি এখন সারাদেশের, সারাজাতির, সারাবিশ্বের।
শুভেন্দু ইমাম সভাপতির বক্তৃতায় বলেন, করিমের গানের শুদ্ধ পাঠ ও শুদ্ধ সুর ছড়িয়ে দিতে পারলেই কেবল করিমের শতবর্ষ পালনের সার্থকতা হবে। ইদানীং করিমের জন্ম তারিখ থেকে শুরু করে নানা বিষয় নিয়ে কিছু সুবিধাবাদীরা বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে, এর প্রতিবাদও করিম অনুরাগীদের করা উচিত।
আলোচনার পর সন্ধ্যায় ১০০টি মোমবাতি প্রজ্বলন করে প্রয়াত বাউলের জন্মশতবর্ষ উদযাপন করা হয়। এরপর শুরু হয় সাংস্কৃতিক পর্ব। শুরুতেই ছিল কলকাতার প্রখ্যাত কণ্ঠশিল্পী মৌসুমী ভৌমিকের ‘গান ও গল্প’ শীর্ষক এক ঘণ্টার পরিবেশনা।

ঢাকায় মসলিন উৎসব
ঢাকায় চলছে মাসব্যাপী মসলিন প্রদর্শনী ও মসলিন পুনরুজ্জীবন উৎসব। গত ৫ ফেব্রুয়ারি জাদুঘরের নিচতলায় নলিনী কান্ত ভট্টশালী হলে উৎসবের উদ্বোধন করেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত এমপি। এ উৎসব উপলক্ষে দুটি ডাকটিকিটও অবমুক্ত করেন মন্ত্রী। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর এমপি। স্বাগত বক্তব্য দেন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব আকতারী মমতাজ। বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর, দৃক পিকচার লিমিটেড ও ব্র্যাক যৌথভাবে এ আয়োজন করে।
অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত প্রধান অতিথির উদ্বোধনী ভাষণে বলেন, প্রাচীন বস্ত্র মসলিন বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্প। বাংলার মসলিনের সাথে আমার শৈশব-কৈশোরের স্মৃতি জড়িয়ে আছে। স্মৃতিচারণে তিনি বলেন, তরুণ বয়সে বলধা গার্ডেনের জাদুঘরে ও ঢাকা জাদুঘরে মসলিন দেখেছি এবং তখন বনেদি পরিবারের বিয়েতে বরকে মসলিনের পাগড়ি পরানো হতো। অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন, দৃক পিকচার লাইব্রেরি লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী সাইফুল ইসলাম, লন্ডনের ভিক্টোরিয়া অ্যালবার্ট মিউজিয়ামের সিনিয়র কিউরেটর মিস রোজ মেরি ক্রিল, ব্র্যাক এন্টারপ্রাইজের সিনিয়র পরিচালক তামারা আবেদ। ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের বোর্ড অব ট্রাস্টিজের সভাপতি এম আজিজুর রহমান।
ভিক্টোরিয়া অ্যান্ড এলবার্ট মিউজিয়ামের সিনিয়র কিউরেটর মসলিন বিশেষজ্ঞ রোজ মেরি ক্রিল মসলিন পুনরুজ্জীবনের এই আয়োজনে উপস্থিত ছিলেন। সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর এমপি বলেন, এই মাস ভাষার মাস, এই মাসেই আমাদের মসলিনের হারানো গৌরব পুনরুজ্জীবনের জন্য এই মাসে গুরুত্বপূর্ণ বেশ কিছু কাজের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। মসলিনকে বাংলাদেশের জাতীয় গৌরব হিসেবে ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার পদক্ষেপ হিসেবে মসলিন প্রদর্শনী ও মসলিন পুনরুজ্জীবন উৎসব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সচিব আকতারী মমতাজ তার স্বাগত ভাষণে বলেন, বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর, দৃক ও ব্র্যাকের যৌথ উদ্যোগে ঢাকাই মসলিনের ঐতিহ্য পুনরুদ্ধারে যে উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে তা আমাদের মসলিনকে বিশ্বের কাছে নতুন করে তুলে ধরবে। মসলিন পুনরুজ্জীবন কর্মসূচিতে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে যা কিছু প্রয়োজনীয় সহযোগিতা প্রদানে প্রস্তুত রয়েছে।
এদিকে ঐতিহাসিক স্থাপনা আহসান মঞ্জিলে ৫, ৬ ও ৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হয় মসলিন প্রদর্শনী। আর এই শিল্পকে পুনরুজ্জীবনে অনুষ্ঠিত হয় বর্ণিল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। ৬ ফেব্রুয়ারি শীতের রাতে শৈল্পিকভাবে তুলে ধরা হয়েছিল বিশেষ এই বস্ত্র শিল্পটির অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের কথা। মসলিন নাইট শীর্ষক হৃদয়গ্রাহী আয়োজনটি সাজানো হয় নৃত্যনাট্য ও ফ্যাশন শোর সম্মিলনে। আলো ও শব্দের প্রক্ষেপণে বর্ণিল অনুষ্ঠানটি যেন রূপ নেয় হারানো দিনের নতুন গল্পে। এতে অংশ নেন বাংলাদেশ, ভারত ও যুক্তরাজ্যের ১২ ডিজাইনার। মসলিনের নবজাগরণের প্রত্যাশায় অসাধারণ এই অনুষ্ঠানটি যৌথভাবে আয়োজন করে দৃক, জাতীয় জাদুঘর ও আড়ং। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বেসামরিক বিমান ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন। বিশেষ অতিথির বক্তৃতা করেন প্রধানমন্ত্রীর আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিষয়ক উপদেষ্টা ড. গওহর রিজভী ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র সাঈদ খোকন। আলোচনায় অংশ নেন দৃকের সিইও সাইফুল ইসলাম, ব্র্যাক এন্টারপ্রাইজের জ্যেষ্ঠ পরিচালক তামারা আবেদ ও জাতীয় জাদুঘরের মহাপরিচালক ফয়জুল লতিফ চৌধুরী। অনুষ্ঠানটি দর্শক সারিতে বসে উপভোগ করেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত এমপি, সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর এমপিসহ দেশি-বিদেশি অতিথিরা।

পাঠকের মন্তব্য:

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না। তারকাচিহ্নযুক্ত (*) ঘরগুলো আবশ্যক।

*