বিভাগ: ইতিহাস : প্রবন্ধ

বঙ্গবন্ধুর কারাগারের রোজনামচা

(দ্বিতীয় অংশ)

4মুনতাসীর মামুন: সকালটা খবরের কাগজের জন্য হাপিত্যেশ করেন। বিশেষ করে ইত্তেফাক। কাগজ বা বই পড়ার ফাঁকে ফাঁকে বাগান করেন। সে বাগান এখন সংরক্ষণ করা হয়েছে। দুটি মুরগি ও একটি কবুতর পালেন। এই মুরগি, পায়রা ঘুরে বেড়ায়। দেখতে তার ভালো। একটি মুরগি রোগাক্রান্ত হলে নানারকম টোটকা দিয়ে তাকে বাঁচাবার চেষ্টা করেছেন, পারেন নি। খাবার খারাপ। মুখে খাবার রোচে না। তারপরও সময় যায় না। মনে হয় বিকেলে বসে রোজনামচা লিখতেন, আগেই লিখেছি যার কোনো উল্লেখ রোজনামচায় নেই। ১৮ জুন এ প্রসঙ্গে লিখছেনÑ “বহুদিন পর্যন্ত দুটি হলদে পাখিকে আমি খোঁজ করছি। ১৯৫৮-৫৯ সালে যখন ছিলাম এই জায়গাটিতে তখন প্রায়ই ১০টা-১১টার সময় আসত, আর আমগাছের এক শাখা হতে অন্য শাখায় ঘুরে বেড়াত। মাঝে মাঝে পোকা ধরে খেত। আজ ৪০ দিন এই জায়গায় আমি আছি। কিন্তু হলদে পাখি দুটি আসল না। ভাবলাম ওরা বোধহয় বেঁচে যে নেই অথবা অন্য কোথাও দূরে চলে গেছে। আর আসবে না। ওদের জন্য আমার খুব দুঃখই হলো। যখন ১৬ মাস এই ঘরটিতে একাকী থাকতাম তখন রোজই সকালবেলা লেখাপড়া বন্ধ করে বাইরে যেয়ে বসতাম ওদের দেখার জন্য। মনে হলো ওরা আমার ওপর অভিমান করে চলে গেছে।” [পৃ. ১০১-২]

এরি মধ্যে মানিক মিয়াকে জেলে আনা হয়েছে। ইত্তেফাক বন্ধ। এতে মুজিব ক্ষুব্ধ। তাঁর এই ক্ষোভ ক্রোধে পরিণত হচ্ছে ন্যাপ ও তার নেতাদের কথাবার্তার কারণে। মশিয়ুর রহমান বলছেন, সিআইএ পূর্ব পাকিস্তানে গ-গোল চালাচ্ছে। অর্থাৎ আওয়ামী লীগ সিআইএ-এর কথায় চলছে। মশিয়ুর ভুলে গেছেন ন্যাপ আইয়ুব খানকে সমর্থন করছে আর ফিল্ড মার্শাল [স্বঘোষিত] সিআইএ-এর ওপর নির্ভরশীল। বঙ্গবন্ধু লিখছেন মশিয়ুর রহমান সম্পর্কে- “তিনি যখন ১৯৪৭-৫৭ সাল পর্যন্ত মুসলিম লীগের সদস্য ছিলেন, প্রত্যেকটা গণআন্দোলনকে নস্যাৎ করার জন্য রংপুরে গু-া লেলাইয়া দিতেন। বাংলা ভাষার আন্দোলনকে ধ্বংস করার জন্য নিজে কর্মী ও ছাত্রদের উপর গু-ামি করার চেষ্টা করেছেন। ১৯৫৪ সালের মুসলিম লীগের টিকেট নিয়ে যখন জামানতের টাকা বাজেয়াপ্ত হয়েছিল তখন ১৯৫৬ সালে পৃথক নির্বাচন সমর্থন করে মুসলিম লীগের ঝা-া নিয়ে ঘুরে বেড়াতেন। সারাজীবন দলাদলির রাজনীতি করে বেড়াইয়াছেন, আবার রাতারাতি ১৯৫৭ সালে ‘প্রগতিবাদী’ হয়ে ন্যাপে যোগ দিয়াছেন। আর যারা এই স্বায়ত্তশাসন ও গণতন্ত্রের আন্দোলনের জন্য সারাজীবন অত্যাচার নির্যাতন সহ্য করেছে এবং মামলার আসামি এবং রাজবন্দি হিসেবে বছরের পর বছর কারাগারে কাটাইয়াছে, তাদের সম্বন্ধে এই সমস্ত নীচ কথা উচ্চারণ করা তার পক্ষেই সম্ভবপর…।”
স্ববিরোধী মনে হতে পারে, কিন্তু মার্ক্সবাদী বা কমিউনিস্টরা যেমন সমাজতন্ত্র চেয়েছেন বঙ্গবন্ধুও তা চেয়েছেন। অনেক ওজনদার প-িতরা বলেছেন, ভারত এবং সোভিয়েতের কারণে সংবিধানের মূল নীতিতে ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র যোগ হয়। গবেষণা না করা এইসব ওজনদাররা যদি জানতেন যে, বাংলাদেশের সংবিধানে যখন ধর্মনিরপেক্ষতা যুক্ত হয় তখন ভারতের সংবিধানে তা ছিল না। পৃথিবীর অন্য কোনো দেশের সংবিধানে ছিল কিনা সন্দেহ, তাহলে হয়ত এ ধরনের মন্তব্য করতেন না। সমাজতন্ত্রের কথা গত শতকের পঞ্চাশ দশক থেকেই বঙ্গবন্ধু বলছেন। তার অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে এ নিয়ে ভাষ্য আছে। ১৯৬৬ সালের ১৮ জুন তিনি লিখছেনÑ “একমাত্র সমাজতন্ত্র কায়েম করলে কারও কাছে এত হেয় হয়ে সাহায্য নিতে হতো না।” আমেরিকা থেকে পাকিস্তানের সাহায্য নেয়ার পরিপ্রেক্ষিতে এ মন্তব্য করেছিলেন। লিখেছেন তিনি, “পুঁজিপতিদের কাছে পাকিস্তানকে কি বন্ধক দেয়া হলো জীবনের তরে? মওলানা ভাসানী সাহেব কোথায়? কি বলেন? আইয়ুব সাহেবের হাতকে শক্তিশালী করে পুঁজিপতি ও সা¤্রাজ্যবাদীদের হাত থেকে বের করে এনে সোসালিস্ট ব্লকে যোগ দিতে তিনি নাকি সক্ষম হবেন! তাই তিনি আইয়ুব সাহেবের সমস্ত অগণতান্ত্রিক পন্থাকে সমর্থন করেছেন। আর আওয়ামী লীগ ও অন্যান্য দলকে সা¤্রাজ্যবাদীদের দালাল বলে গালি দিয়েছেন। এখন তো প্রমাণ হয়ে গেছে মওলানা সাহেব ও তাঁহার দলের কিছু সংখ্যক লোক সা¤্রাজ্যবাদীদের দালালের দালালি করছেন।” [পৃ. ১০৪] (চলবে)

পাঠকের মন্তব্য:

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না। তারকাচিহ্নযুক্ত (*) ঘরগুলো আবশ্যক।

*