বঙ্গবন্ধুর কারাগারের রোজনামচা

Posted on by 0 comment

aaমুনতাসীর মামুন

(শেষ অংশ)
ভিয়েতনাম সম্পর্কে একই সময় লিখেছেন-
“রাশিয়া উত্তর ভিয়েতনাম সরকারকে সামরিক সাহায্য প্রেরণের কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। রাশিয়া পূর্ব থেকেই অনেক সাহায্য দিয়াছে। আমেরিকানরা যতই নিজেকে শক্তিশালী মনে করুন, রাশিয়া যখন হ্যানয় সরকারকে সাহায্য করতে আরম্ভ করেছে তখন যুদ্ধে জয়লাভ কখনই করতে পারবে না। এর পরিণতিও ভয়াবহ হবে। একমাত্র সমাধান হলো তাদের ভিয়েতনাম থেকে চলে আসা। ভিয়েতনামের জনসাধারণ নিজেদের পথ নিজেরাই বেছে নিবে।” [পৃ. ১৬০]
পরবর্তী পাঁচ বছরের মধ্যেই তাঁর ভবিষ্যদ্বাণী সফল হয়েছিল।
এ প্রসঙ্গেই আলোচনা করা যেতে পারে রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার নিয়ে, যে কথা আগেও উল্লেখ করেছি। পাকিস্তান ইসলামিক রিপাবলিক। অনেক দেশ তা নয়। তাহলে পাকিস্তানে শান্তি নেই, অন্য দেশে আছে কেন? এই মৌলিক প্রশ্ন তিনি বারবার তুলেছেন। ডিআইজি ধর্মভীরু। তার সঙ্গে আলাপ করতে এসেছেন। তিনি ধর্মকথা আলোচনা শুরু করলেন। শেখ মুজিব বললেনÑ
“ইসলামের কথা আলোচনা করে কি লাভ? পাকিস্তানের নাম তো ইসলামিক রিপাবলিক রাখা হয়েছে। দেখুন না ‘ইসলামের’ আদর্শ চারিদিকে কায়েমের ধাক্কায় ঘুষ, অত্যাচার, জুলুম, বেইনসাফি, মিথ্যাচার, শোষণ এমনভাবে বেড়ে চলেছে যে যারা আল্লায় বিশ্বাস করে না, তারাও নিশ্চয় হাসবে আমাদের অবস্থা দেখে। দেখুন না রাশিয়ায় যেখানে ধর্ম বিশ্বাস করে না সেখানে সমাজতন্ত্র কায়েম করতে চেষ্টা করছে, ঘুষ, শোষণ, বন্ধ হয়ে গিয়েছে। মানুষের বাঁচবার অধিকার স্বীকার করেছে।”
“গ্রেট বৃটেনে দেখুন, ন্যায়ের রাজ্য কায়েম করেছে। বেকার থাকলে সরকার থেকে ভাতা দেয়া হয়Ñ যে পর্যন্ত কাজের বন্দোবস্ত না করতে পারে।… অন্যায়ভাবে কাহাকেও কারাগারে বন্দি করতে পারে না।” [পৃ. ১৬২]
বলাই বাহুল্য এসব মৌলিক প্রশ্নের উত্তর ধর্মভিরু পুলিশ অফিসার দিতে পারেন নি।
আওয়ামী লীগের দফতর সম্পাদক মোহাম্মদ মাহমুদউল্লাহকে গ্রেফতার করা হয়। মুজিব মন্তব্য করেছেন, মাহমুদউল্লাহ নিরীহ, খালি অফিসের কাজ করেন, রাজনৈতিক বাক-বিত-ায়ও অংশগ্রহণ করেন না। আফসোস করেছেন। অন্যদিকে ১৯৬৬-৬৭ সালের আমদানি নীতি ঘোষণা হয়েছে। এর ফলে “পূর্ব বাংলার ক্ষুদ্র শিল্পপতিরাও এবার চরম আঘাত খেতে বাধ্য করবে।” এই আমদানি নীতি তাকে ক্ষুব্ধ করে তোলে। তিনি লেখেন [১৬ জুলাই]Ñ
“জেলের মধ্যে বসে এ কথা চিন্তা করে লাভ কি? যার সারাটা শরীরে ঘা, তার আবার ব্যথা কিসের! গোলামের জাত গোলামি কর। আমি কারাগারে আমার বন্ধু-বান্ধব নিয়ে ‘আয়াসেই’ আছি! ভয় নাই, মাহমুদ আলি, জাকির হোসেন, মোনায়েম খান, আব্দুস সবুর খান, মহম্মদ আলী এরকম অনেকেই বাংলার মাটিতে পূর্বেও জন্মেছে, ভবিষ্যতেও জন্মাবে।” [পৃ. ১৬৪]
বর্তমান রাজনীতিবিদদের দেখলে এ কথা কত সত্য বলেই না মনে হয়।
ন্যাপ ও মওলানা ভাসানী সম্পর্কে প্রায়ই নানা নেতিবাচক মন্তব্য করেছেন বঙ্গবন্ধু। এবং সে সমালোচনা করেছেন নানা ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে। এসব সমালোচনার মাঝে তিনি একটি কথা বলেছেন, যা মনে করি, রাজনীতির মূলমন্ত্র হওয়া উচিত। যারা প্রগতিশীল রাজনীতি করেন অন্তত তাদের ক্ষেত্রে। হেফাজতের প্রতি বর্তমান আওয়ামী লীগের নমিত নীতির এ কারণেই আমরা সমালোচনা করি। মনে হয় বঙ্গবন্ধু থাকলে তিনিও করতেন। তিনি যা মনে করতেন (১৯৬৬) তা হলো, ৬-দফা মেনে নিলে সবার সঙ্গে ঐক্য করা যেতে পারে এবং শত বাধা-বিপত্তি সত্ত্বেও এক্ষেত্রে আপস করেন নি। এখন হয়েছে উল্টোটা। হেফাজতের নীতি মেনে রাজনীতি করতে হবে। হওয়া উচিত ছিল, হেফাজত যদি রাষ্ট্রীয় চার নীতি মানে তাহলেই তাদের দাবি বিবেচনা করা যাবে। বঙ্গবন্ধু লিখেছেনÑ
“মানুষকে আমি ধোঁকা দিতে চাই না। আদর্শে মিল না থাকলে ভবিষ্যতে আবার নিজেদের মধ্যে আত্মকলহ দেখা দিতে বাধ্য। সেদিকটা গভীরভাবে ভাবতে হবে।… যারা আন্দোলনের সময় এগিয়ে আসে নাই তাদের সঙ্গে আওয়ামী লীগ এক হয়ে কাজ করতে পারে না।” (পৃ. ১৬৮)
বাকশাল গঠনের সময় এ কথাই তিনি মনে করেছিলেন।
এখানে তিনি আওয়ামী লীগ ভেঙে ন্যাপ হওয়ার কারণ বলেছেন। বর্তমানে এ বিষয়ে যেসব ন্যারেটিভ এটি তার বিপরীত। প্রচলিত বিবরণ অনুযায়ী, আওয়ামী লীগের একগুঁয়েমির কারণে, বিশেষ করে বৈদেশিক নীতির প্রশ্নে ভাঙন দেখা দেয়। বঙ্গবন্ধু বলছেন, “ওয়ার্কিং কমিটির সভায় বৈদেশিক নীতি নিয়ে কোনো প্রস্তাব পাশ হয়নি। ভাসানী বললেন, না হয়েছে এবং তাকে ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। বঙ্গবন্ধু এ দাবিকে ‘অসত্য’ বলেছেন। গুলিস্তান ও নিউ পিকচার্স হাউসে যে সম্মেলন হয় সেখানে ‘স্বায়ত্তশাসনের কোনো প্রশ্নই ওঠেনি।’ ভাসানী ৮৩৪টি ভোটের মধ্যে ৪৩ ভোট পেয়েছিলেন।” মুজিব লিখেছেনÑ
“আওয়ামী লীগ ভেঙে যখন ন্যাপ করা হলো, তখন বৈদেশিক নীতির উপরই হয়েছিল বলে এতদিন মওলানা সাহেব বলতেন, এবার নতুন কথা শুনলাম। কিছুদিন বেঁচে থাকলে অনেক নতুন কথাই তিনি শোনাবেন। যেমন, তিনি কোনোদিনই মওলানা পাশ করেন নাই তবুও মওলানা সাহেব না বললে বেজার হন।
ন্যাপ কেন হয়েছিল? আদর্শের জন্য নয়। মওলানা সাহেবের মধ্যে পরশ্রীকাতরতা খুব বেশি। সোহরাওয়ার্দী সাহেবের জনপ্রিয়তা সহ্য করতে পারেন নাই এবং তাঁর মধ্যে এতো ঈর্ষা দেখা দেয় যে, গোপনে ইস্কান্দার মির্জার সঙ্গে হাত মিলাতেও তাঁর বিবেকে বাধে নাই। তিনি মির্জা সাহেবকে মিশরের নাসের করতে চেয়েছিলেন।”
এটি বঙ্গবন্ধুর ভাষ্য। ন্যাপ একেবারে আদর্শের কারণে হয়নি তা ঠিক নয়। আদর্শগত পার্থক্য কর্মীদের মধ্যে নিশ্চয় হয়েছিল। তবে, এ বিষয়টি আরও গবেষণার দাবি রাখে। কারণ, যারা ন্যাপ করেছেন তাদের ভাষ্য ভিন্ন।
রাজনীতিবিদদের মধ্যে ব্যক্তিত্বে দ্বন্দ্ব নতুন নয়। সোহরাওয়ার্দীকে মধ্য ডানের মতাদর্শীরা নেতা মনে করতেন। ভাসানীর মধ্যে পরস্পর বিরোধিতা ছিল প্রচুর। কখনও ডান, কখনও মধ্য ডান, কখনও বামপন্থার পক্ষে বলতেন। সোহরাওয়ার্দী, ফজলুল হক ও ভাসানী তখন বর্ষীয়ান নেতা। তাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব থাকা স্বাভাবিক এবং সেই দ্বন্দ্ব রাজনীতিতে অস্থিরতা সৃষ্টি করেছিল, অভিঘাত হেনেছিল তাও নয়। ১৯৭০ সালের আগে যখন শেখ মুজিবের উত্থান শুরু হয়েছে তখন তার অগ্রজ নেতারা আবুল মনসুর আহমদ, ইয়ার মোহাম্মদ খান বা আতোয়ার রহমান মেনে নিতে পারেন না। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে নিরঙ্কুশভাবে জয়লাভ করলে তিনি অপ্রতিদ্বন্দ্বী নেতায় পরিণত হন। কিন্তু তার একটি গুণ ছিলÑ তার সহকর্মী এবং সমাজের পেশাজীবীদের সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিল। তাতের মতামত নিতেন। সহায়তা নিতেন। রাজনৈতিক কর্মসূচি নিজের মতো নিতেন। এজন্য সমসাময়িককালে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে তার গ্রহণযোগ্যতা ছিল বেশি।
এরপর ১৯৬৭ সালের ৩১ মে পর্যন্ত লেখা রোজনামচা পাওয়া গেছে। এ রোজনামচায় দেখি, তিনি ক্রমেই অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। পরিবারে আর্থিক সমস্যা দেখা দিচ্ছে। কিন্তু তার স্ত্রী বলছেন, চিন্তা নেই। সব সমস্যার সমাধান হবে। ছেলে-মেয়েদের জন্য চিন্তা লাগছে। বিশেষ করে রাসেলের জন্যÑ
“ ‘৮ ফেব্রুয়ারি ২ বছরের ছেলেটা এসে বলে, আব্বা বালি চালো’। কি উত্তর ওকে আমি দিব। ওকে ভোলাতে চেষ্টা করলাম ও তা বোঝে না আমি কারাবন্দি। ওকে বললাম, ‘তোমার মার বাড়ি তুমি যাও। আমি আমার বাড়ি থাকি। আবার আমাকে দেখতে এসো।’ ও কি বুঝতে চায়! কি করে নিয়ে যাবে এই ছোট্ট ছেলেটা ওর দুর্বল হাত দিয়ে মুক্ত করে এই পাষাণ প্রাচীর থেকে। দুঃখ আমার লেগেছে। শত হলেও আমি তো মানুষ আর ওর জন্মদাতা।” [পৃ. ২৪৯]
বাইরে রাজনীতিতে পরিবর্তন আনার চেষ্টা চলছে বিডিএম করে। এর উদ্যোক্তারা চান আওয়ামী লীগ এতে যোগ দিক। বঙ্গবন্ধু রাজি নন। এরি মধ্যে তার মামলার শুনানি হয়। কিন্তু জামিন হয় না। অন্যান্য কারাগার থেকে তার ‘বন্ধু’ মোস্তাক ও অনুজ কর্মীরা ঢাকা জেলে স্থানান্তরিত হয়েছেন। তাদের অনেকে ২০ সেলে থাকে। ফলে তার সঙ্গে দেখা হয়। তাস খেলে, বই পড়ে, তাদের সঙ্গে গল্প করে দিন কাটান কিন্তু মন পড়ে থাকে ৬-দফার দিকে।
এদিকে আইয়ুব খান এসেছেন ঢাকায়। তাকে সংবর্ধনা দেয়া হয়েছে বিপুলভাবে। লেখেন বঙ্গবন্ধুÑ
“পূর্ব বাংলার মাটিতে বিশ্বাসঘাতক অনেক পয়দা হয়েছে, আরো হবে, এদের সংখ্যাও কম না। কিন্তু বিশ্বাসঘাতকদের স্থান কোথায় এরা দেখেও দেখে না! বিশেষ করে একদল বুদ্ধিজীবী যেভাবে পূর্ব বাংলার সঙ্গে বেঈমানী করছে তা দেখে আশ্চর্য হতে হয়।
সামান্য পদের বা অর্থের লোভে পূর্ব বাংলাকে যেভাবে শোষণ করার সুযোগ দিতেছে দুনিয়ার অন্য কোথাও এটা দেখা যায় না। ছয় কোটি লোক আজ আস্তে আস্তে ভিখিরি হতে চলেছে। এরা এদের ভবিষ্যৎ বংশধরদের কথাও চিন্তা করেন না।”
শেখ মুজিবের বড় গুণ ছিল তার অগ্রজ বা সমসাময়িকদের প্রকাশ্যে কখনও অপমান করেন নি। ভাসানীর বিরুদ্ধে অনেক তিক্ত কথা ডায়েরিতে লিখেছেন কিন্তু প্রকাশ্যে তাকে শুধু সম্মান নয় সহায়তাও করেছেন। ফজলুল হকের সঙ্গে তার দ্বন্দ্ব ছিল। কিন্তু ফজলুল হকের মৃত্যুবার্ষিকী উপলেক্ষে লিখেছেনÑ
“যখন তিনি ঢাকায় মারা যান সেদিনও আমি জেলে ছিলাম। হক সাহেব ছিলেন পূর্ব বাংলার মাটির মানুষ এবং পূর্ব বাংলার মনের মানুষ। মানুষ তাঁহাকে ভালোবাসতো ও ভালোবাসে। যতদিন বাংলার মাটি থাকবে বাঙালি তাঁকে ভালোবাসবে। শেরে বাংলার মতো নেতা যুগ যুগ পরে দুই একজন জন্মগ্রহণ করে।” [পৃ. ২৩১]
ফজলুল হকের আত্মবিশ্লেষণের তিনি উদ্ধৃতি দিয়েছেন। এটি খুব গুরুত্বপূর্ণ তাকে বোঝার জন্য। ফজলুল হক বলেছেন তিনি রোমান্টিক। স্বতঃস্ফূর্তভাবে সব সময় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন। এ কারণে ক্ষমতার শীর্ষে উঠেছেন, পতনও হয়েছে। কিন্তু কোনো আফসোস নেই। বঙ্গবন্ধু এই উদ্ধৃতি কোথায় পেয়েছেন তা উল্লেখ করেননি, কিন্তু আগে আমি এর উল্লেখ কখনও দেখিনি। তাই এর পুরোটা উল্লেখ করছি এ কারণে যে, ভারতবর্ষের একজন বড় মাপের রাজনীতিবিদের নিজের উক্তি নিজের সম্পর্কে। ফজলুল হক এর শিরোনাম দিয়েছেনÑ সেলফ অ্যানালাইসিস। লিখেছেন
“ÒIn my stormy and chequred life chance has played more than her fair part. The fault has been my own. Never at any time have I tried to be the complete master of my own fate. The strongest impulse of the moment has governed all my actions. When chance has raised me to dazzling height, I have received her gifts without stretched hands. When she has cast me down from my high pinnacle. I have accepted her buffets without complaint. I have my hours of pinnacle and regret. I am introspective enough to take an interest in the examination of my own conscience. But this self analysis has always been ditched. It has never been morbid. It has neither aided nor impeded the fluctuations of my varied career. It has availed me nothing in the external struggle which man wages on behalf of himself against himself. Disappointments have not cured me of ineradicable romanticism. If at times I am sorry for something I have done, remorsearails me only for the things I have left undone..”
১৯৬৮ সালের ১৭ জানুয়ারি গভীর রাতে শেখ মুজিবকে জানানো হয় তিনি মুক্ত। এতে তিনি অবাক হয়েছিলেন কারণ তার বিরুদ্ধে বেশ কটি মামলা ছিল। তার মনে হয়েছিল এর মধ্যে কিছু একটা আছে। কারণ, ঈদের নামাজের সময় তার সঙ্গে কয়েকজনের দেখা হয়েছিল। তাদের একজন চট্টগ্রামের কর্মী তাকে জানিয়েছিলেন, পুলিশ তাকে ২১ আটকে রেখে অত্যাচার করেছে, পা ভেঙে দিয়েছে। তিনি বলেছিলেন, খালি মুজিবের নাম জড়াবার জন্য তার ওপর অত্যাচার করা হয়েছে। অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে যে কাগজ দিয়েছে তাতেই তিনি সই করে দিয়েছেন। আরেকদিন কামাল উদ্দিনও জানালেন, তাকে অসম্ভব অত্যাচার করেছে। “আমার শরীর পচাইয়া দিয়েছে। সোজাভাবে শুয়ে থাকতে পারি না। পায়খানার রাস্তায় কি ঢুকিয়ে দিয়েছে যন্ত্রণায় অস্থির। এই দেখুন জ্বলন্ত সিগারেট দিয়ে জায়গায় জায়গায় পোড়াইয়া দিয়েছে। আপনার নাম লেখাইয়া নিয়েছে আমার কাছ থেকে যদিও অনেক বলেছি, শেখ মুজিবের সঙ্গে আমার পরিচয় নাই।”
এই সময় কাগজে দেখেন রুহুল কুদ্দুস, আহমদ ফজলুর রহমানসহ ২৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সুতরাং, আন্দাজ করছিলেন তাকে আবার দেশদ্রোহের কোনো মামলায় জড়ানো হবে। দেখা গেল তার অনুমানই ঠিক। জেলগেট থেকে বেরুবার সঙ্গে সঙ্গেই সেনাবাহিনী তাকে গ্রেফতার করল, সেনা আইনের আওতায়। ক্যান্টনমেন্টে তাকে অফিসার্স মেসে এনে রাখা হলো।
শুরু হলো ‘শেখ মুজিবুর রহমান বনাম রাষ্ট্র’ মামলা। পাকিস্তানিরা নাম দিলÑ আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা। বঙ্গবন্ধু বলতেন, ইসলামাবাদ ষড়যন্ত্র মামলা।
এই সময় বেগম মুজিব তাকে ৩২০ পৃষ্ঠার একটি খাতা পাঠান। তিনি মাত্র ৫২ পৃষ্ঠা লেখেন। মামলা শুরু হওয়ার সময় খাতাটি তাকে দেয়া হয়েছিল। এটি তার লেখা শেষ খাতা।
এখানে শেখ মুজিবুর বন্দী জীবনের কথা লিখেছেন। এখানেও মিলিটারি কনফাইনমেন্ট। শুধু তাই নয় সঙ্গে সবসময় থাকতেন একজন পাকিস্তানি অফিসার। কথা বলা নিষেধ। খাবার ছিল সব সময় রুটি আর মাংস। শরীর ছিল তার অসুস্থ। তার ওপর এই খাবার। ঘরের দরজা জানালা বন্ধ। জানালার কাচ লাল রং করা। সন্ধ্যার পর আলো নিভিয়ে মেস এরিয়ার (যেখানে তাকে রাখা হয়েছিল) বাইরে একটা রাস্তায় হাঁটতে তাকে নেয়া হতো। সঙ্গে সেনা পাহারা। একসময় মনে হলো, তারা তাকে যে কোনো সময় গুলি করে মেরে ফেলতে পারে। অজুহাত দেয়া হবে, পালাবার সময় গুলি করা হয়েছে। তারপর থেকে তিনি বললেন, মেস এরিয়ার বাইরে তিনি হাঁটতে যাবেন না। পরবর্তীকালে সার্জেন্ট জহুরুল হককে এ অজুহাতে গুলি করে হত্যা করা হয়।
মাঝে মাঝে দু’একজন অফিসার তাকে ইন্টারগেশন করতে আসতেন। তাদের ভাবসাব দেখে বঙ্গবন্ধু লিখেছিলেনÑ
“কিছু সংখ্যক অতি উৎসাহী সামরিক কর্মচারী একদম পাগল হয়ে গেছে বলে মনে হয়। বিরাট কিছু একটা হয়ে গেছে। দেশকে রক্ষা করার সমস্ত দায়িত্বই যেন তাদের ওপরই পড়েছে। একটু গন্ধ পেলেই হলো, আর যায় কোথায়Ñ একদম লাফাইয়া পড়ে অত্যাচার করার জন্য। তাদের ধারণা পূর্ব বাংলার জনসাধারণের সকলেই রাষ্ট্রদ্রোহী। বুদ্ধি আক্কেল সব কিছু পশ্চিম বাংলা থেকে চালান হয়ে ঢাকায় আসে। তাদের ভাবসাব দেখে মনে হয় পূর্ব বাংলার ব্যবসা-বাণিজ্য টাকা-পয়সা জমি-জমা হিন্দুদের দ্বারা পরিচালিত। দুই একজন আমাকে কথায় কথায় বলেছে, এখনো বাঙালিরা হিন্দুদের দ্বারা পরিচালিত এবং তাদের ওপরই নির্ভরশীল। কিন্তু কোথায় যে হিন্দুদের কর্তৃত্ব আমার জানা নেই। বর্ণ হিন্দুরা প্রায় সকলেই পূর্ব বাংলা ছেড়ে চলে গেছে, কিছু সংখ্যক নিম্নবর্ণের হিন্দু আছে। পশ্চিম পাকিস্তানের প্রায় প্রত্যেকটা কর্মচারীর ধারণা পূর্ব বাংলার লোক হিন্দুদের দ্বারা পরিচালিত।” (পৃ. ২৬৬)
এ মনোভাব থেকে পাকিস্তানিরা গত ৭০ বছর মুক্ত হয়নি। আসলে, আমরাই বেশি মোহগ্রস্ত ছিলাম ধর্মের নামে বাসভূমি করার এবং পাকিস্তানিদের সঙ্গে থাকার। বঙ্গবন্ধু পাকিস্তান আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন কিন্তু এক বছরের মাথায় তার সেই মোহ কেটে গিয়েছিল। তার সমসাময়িকদের সেই মোহ থেকে বেরুতে সময় লেগেছিল। ১৯৯৮-৯৯ সালে, পাকিস্তানের উচ্চপর্যায়ের নীতি-নির্ধারকদের সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম। সেখানে প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট লেঘারি, প্রধানমন্ত্রী বেনজীর ভুট্টো থেকে নিয়াজীও ছিলেন। উপর্যুক্ত ধারণা থেকে তারা তখনও মুক্ত হননি। বর্তমান রাজনীতি বিশ্লেষণ করলেও দেখব, বেশ কটি রাজনৈতিক দল এখনও বাংলাদেশে পাকিস্তানের প্রতি অনুরক্ত, যদিও পাকিস্তান তাদের বিবেচনা করে ভৃত্য হিসেবে।
বঙ্গবন্ধুর খাবারের প্রচ- অসুবিধা হচ্ছিল। জেলে থাকতেই আমাশয় আক্রান্ত হয়েছিলেন। একজন বাঙালি বাবুর্চির কথা বলেছিলেন। তারা রাজি হয়নি। “তাদের কথা, সিকিউরিটির জন্য বাঙালি বাবুর্চি রাখা যায় না। একটা আশ্চর্য ব্যাপার আমার চোখে পড়ল।… বাঙালিদের তারা ব্যবহার করতে প্রস্তুত, কিন্তু বিশ্বাস করতে রাজি নয়। আর বিশ্বাস করেও না। সকলকেই সন্দেহ করে। তাদের ধারণা প্রায় সকলেই নাকি আমার ভক্ত। মনে মনে সকলেই নাকি আলাদা হতে চায়।” (পৃ. ২৬৬)
এখানেই বিবরণ শেষ। যদি শেষ অবধি তিনি লিখতে পারতেন তাহলে আমাদের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের একটি ভাষ্য পেতাম। আগরতলা মামলা সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু কখনও কিছু বলেন নি। এটি ঠিক, এদের অনেকের সঙ্গে প্রথম দিকে তার যোগাযোগ হয়েছিল কিন্তু তিনি এদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন নি। শুধু সেনাদের দ্বারা গঠিত গ্রুপ সরকার উৎখাত করতে পারবে এটি তিনি বিশ্বাসও করেন নি এবং সেনাদের বিশ্বাসের কারণটাও পাননি। তবে, যারা যুক্ত ছিলেন ওই ধরনের পরিকল্পনায় তাদের অশ্রদ্ধা করার কোনো কারণ নেই; কিন্তু ওই ধরনের পরিকল্পনা ছিল অবাস্তব। পাকিস্তান সরকার বঙ্গবন্ধুকে জড়িয়েছিল রাজনৈতিক সুবিধা পাওয়ার আশায় কিন্তু তা বুমেরাং হয়ে গিয়েছিল। কারণ, অন্তিমে এই মামলা গণ-অভ্যুত্থানে ভেসে গিয়েছিল, শেখ মুজিবুর রহমান বঙ্গবন্ধুতে পরিণত হয়েছিলেন, তার কিছুদিন পর জাতির জনকে। বঙ্গবন্ধুর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ পড়ে আমরা মুগ্ধ হয়েছিলাম। ধরে নিতে পারি, ১৯২০ থেকে ১৯৫৪ প্রায় ৩৪ বছরের জীবন কাহিনি বর্ণিত হয়েছে। ‘কারাগারের রোজনামচা’ ১৯৬৬-১৯৬৮ সালের। মাঝখানের ১২ বছর বাদ। তারপরও বলা যাবে এ দুটি গ্রন্থ থেকে তার বেড়ে ওঠা, রাজনৈতিক জীবন, রাজনীতির দর্শন সম্পর্কে একটি ধারণা মেলে। কারণ, ১৯৬৯-১৯৭৫ সালে তিনি তার সেই রাজনীতির দর্শন বা বিশ্বাস অনুযায়ীই কাজ করেছিলেন।
কারাগারের রোজনামচায় তিনি পাকিস্তান সম্পর্কে তার ধারণা স্পষ্ট করেছেন। পাকিস্তান সম্পর্কে তার কোনো মোহ ছিল না। জালেমের শাসন হিসেবেই নিয়েছিলেন। এর বিপরীতে তার মনে হয়েছিল ৬-দফাই বাঙালির মুক্তির সনদ। ৬-দফা এবং একে কার্যকর করার প্রক্রিয়া ছাড়া আর কোনো চিন্তা তার ছিল না এবং অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকে এর পরিপ্রেক্ষিতেই বিচার করেছেন। তিনি তার সঙ্গেই জোটে আগ্রহী যিনি ৬-দফায় বিশ্বাস করেন। ন্যাপ তখন প্রধান বিরোধী দল। মওলানা ভাসানী এর নেতা। ভাসানী এবং ন্যাপ নেতাদের আইয়ুব তোষণনীতি তিনি পছন্দ করেন নি। এর সমালোচনা করেছেন বারবার।
পুরো রোজনামচায় গরিব বাঙালির প্রতি তার ভালোবাসাই প্রতিধ্বনিত হয়েছে। বাঙালি যারা ৬-দফা বিশ্বাস করে না তাদের প্রতি দুঃখিত হয়েছেন। গরিবদের প্রতি ভালোবাসার কারণেই সমাজতন্ত্রের প্রতি তার পক্ষপাত ছিল। আর অসাম্প্রদায়িক মনোভাব তার সব সময়ই ছিল।
১৯৬৬ সালে দেশে বসে খাবারের অভাবের কথা শুনছিলেন। জেলে এক রক্ষী বলছিলেন, দেশে বোধহয় কচু গাছও নেই। লিখেছেন তিনিÑ
“বললাম, এই তো আইয়ুব খান সাহেবের উন্নয়ন কাজের নমুনা, মোনায়েম খাঁ সাহেবের ভাষায় চাউলের অভাব হবে না, গুদামে যথেষ্ট আছে। যে দেশের মা ছেলে বিক্রি করে পেটের দায়ে, যে দেশের মেয়েরা ইজ্জত দিয়ে পেট বাঁচায়, সে দেশও স্বাধীন এবং সভ্য দেশ। গুটি কয়েক লোকের সম্পদ গড়লেই জাতীয় সম্পদ গড়া হয় বলে যারা গর্ব করে তাদের সম্বন্ধে কি-ই বা বলব!”
আমাদের দেশে উন্নয়নের মডেল সাধারণ এ রকমই মনে করা হয়। এখন উন্নয়ন দৃশ্যমান, দারিদ্র্য হ্রাস পাচ্ছে, কিন্তু একই সঙ্গে বলতে হয় সম্পদ গুটিকয় মানুষের হাতেই কেন্দ্রীভূত হচ্ছে এবং এই সম্পদের একটি বড় অংশ লুট করা। বাংলাদেশে যে পরিমাণ খেলাপি ঋণ তা পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে তা ভাগ করে নিয়েছে ৪০-৫০ জন। এই অবস্থা বেশিদিন চললে সামাজিক বিস্ফোরণ ঘটার সম্ভাবনা থেকে যায়।
এর বিপরীতে লিখেছেন বঙ্গবন্ধু “বাঙালি জাতটা এত নিরীহ, না খেয়ে মরে যায় কিন্তু খেতে আজও শিখে নাই। আর ভবিষ্যতেও খাবে সে আশা করা ভুল।” [২.১৫৩] ’৪২-এর মন্বন্তরের সময় মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ও তার গল্পে এ কথাই লিখেছিলেন। এ বৈশিষ্ট্যের জন্য এখনও এ দেশে দৃশ্যমান লুটেরারা সব সময় বেঁচে যায়, তাদের রক্ষা করা হয়।
স্বদেশী আন্দোলনকারী, আগেই লিখেছি এবং কমিউনিস্ট নেতা এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ছাড়া বাঙালি ও বাংলার [বাংলাদেশ] জন্য এত ত্যাগ কেউ করেন নি। কিন্তু, আশ্চর্য এই যে, এইসব ত্যাগী মানুষের স্মৃতি সবাই বিস্মৃত হয়। এই ত্যাগের বিনিময়ে যারা ক্ষমতায় আসেন তারাই তার (বা তাদের) স্মৃতি অবলেপনে মগ্ন থাকেন। ১৯৪৭ পর্যন্ত এ দেশে যত বিপ্লবী প্রাণ দিয়েছেন তাদের অধিকাংশের স্মৃতি আমরা ধরে রাখিনি। ১৯৪৭ সাল থেকে এ পর্যন্ত দেশ স্বাধীন ও জিয়া-এরশাদের মতো জোট আইয়ুব খাঁদের হাত থেকে দেশকে মুক্ত রাখার জন্য যারা আত্মত্যাগ করেছেন, তারা খুব কমই মূল্যায়িত হয়েছেন। ধরা যাক, ১৯৬৯ সালের শহীদ মতিউরের কথা। সেই কিশোর গুলি খাওয়াতে ১৯৬৯ সালের গণ-আন্দোলন নতুন মাত্রা লাভ করে। সাহিত্যিক সাংবাদিক ফয়েজ আহমদের উদ্যোগে গুলিস্তান থেকে বঙ্গভবন পর্যন্ত সবুজ চত্বরটির নামকরণ করা হয় ‘মতিউর শিশু পার্ক’। আজ সে সবুজ চত্বরটি ক্ষতবিক্ষত এবং সেই নামটিও উধাও। এমন কী বঙ্গবন্ধু পর্যন্ত ‘বন্ধু’ মোশতাককে যতটা গুরুত্ব বা মূল্যায়ন করেছেন, মুক্তিযুদ্ধ যারা চালিয়েছেন তাদের তেমন গুরুত্ব দেননি। মূল্যায়ন করেন নি এবং এর ফল কী হয়েছে তা সবারই জানা। জানি না, বাঙালি আদৌ তার এই বৈশিষ্ট্য থেকে মুক্ত হতে পারবে কি না। যেমন, লিখেছিলেন বঙ্গবন্ধু, পরশ্রীকাতরতা শব্দটি একমাত্র বাংলা ভাষার অভিধানেই আছে, অন্য কোনো ভাষায় নেই।
শেখ হাসিনা অত্যন্ত মমতায় এ পা-ুলিপিগুলো সংরক্ষণ করেছিলেন এবং প্রকাশের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কারাগারের রোজনামচায়, বঙ্গবন্ধুর পা-ুলিপির মূল ভাষা রক্ষা করা হয়েছে। তিনি বক্তৃতা যেমন মিশ্র ভাষায় দিতেন, পা-ুলিপিও রচিত হয়েছে সেই মিশ্র ভাষায়। এতে বরং বঙ্গবন্ধুকেÑ যাকে আমরা দেখেছি, তাকে খুঁজে পাওয়া যায়। শেখ হাসিনা ও তার সম্পাদকীয় টিমকে অভিনন্দনÑ এ রকম সুমুদ্রিত গ্রন্থটি বাঙালিদের উপহার দেয়ার জন্য।

Category:

Leave a Reply