বিভাগ: প্রবন্ধ

‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধির অর্ধশতক পূর্তি

2-6-2019 8-19-12 PMনূহ-উল-আলম লেনিন: মানবেতিহাসে যুগন্ধর ব্যক্তিদের মহিমান্বিত করার লক্ষ্যে উপাধি প্রদান বা বিশেষ বিশেষণ সহযোগে তাদের নামোচ্চারণ এবং পরিচিতি তুলে ধরা একটা প্রাচীন ঐতিহ্য। ধর্ম, দর্শন, শিল্প, সাহিত্য, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি প্রভৃতি ক্ষেত্রে অবদান ছাড়াও রাজনীতি, স্বাধীনতা ও মুক্তি সংগ্রাম, যুদ্ধে বীরত্বব্যঞ্জক ভূমিকা এবং দুঃসাহসিক অভিযানে ঐতিহাসিক সাফল্য প্রভৃতির জন্য কখনও দেশবাসী এবং কখনওবা রাষ্ট্র এই বিশেষণ দিয়ে থাকে। এসব বিশেষণের মধ্য দিয়ে ব্যক্তিবিশেষের প্রতি জনগণের ভালোবাসা এবং গৌরববোধের অভিপ্রকাশ ঘটে। এমনকি লোকমুখের মিথও একসময় ব্যক্তিবিশেষের নামের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে।
৩২৮০ খ্রিষ্ট পূর্বাব্দে মেনেজ নামে এক রাজা সমগ্র মিসরের নগর রাষ্ট্রগুলোকে একীভূত করে একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি এই রাষ্ট্র বা সাম্রাজ্যের অধিশ্বর হওয়ার পর ‘ফারাও’ উপাধি ধারণ করেন, যার আভিধানিক অর্থ মহান নিবাস বা রাজপ্রাসাদের অধিবাসী।
জগৎজয়ী গ্রিক বীর আলেকজান্ডারের নামের সাথে যেমন ‘গ্রেট’ শব্দটি বিশেষণ হিসেবে উচ্চারিত হয়। প্রাচীন ভারতেও এ জাতীয় উপাধির প্রচলন ছিল। প্রাচীন ও মধ্যযুগে রাজ-রাজারা বিশেষ বিশেষণযুক্ত নাম ধারণ করে সিংহাসনে আরোহণ করতেন। ওইসব নাম কখনোই তার স্বদেশবাসীর স্বতঃস্ফূর্ত ভালোবাসা থেকে উৎসারিত হতো না। ধর্ম-সাধকরাও কোনো একটা পর্যায়ে সিদ্ধি অর্জন করলে নানা ধর্মীয় উপাধি বা বিশেষণে ভূষিত হতেন।
কিন্তু স্বদেশের কল্যাণে, স্বদেশবাসীর মুক্তি, স্বাধীনতা ও দেশপ্রেমের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শনের প্রেক্ষিতে দেশে দেশে কালে কালে বিশেষ কোনো নেতা, সংগঠক বা ব্যক্তিকে ভালোবেসে স্বতঃস্ফূর্তভাবে যে বিশেষণে আখ্যায়িত করা হয়ে থাকে, সেটি কোনো আরোপিত বিষয় না। এই উপমহাদেশেই তার অসংখ্য প্রমাণ আছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে ‘বিশ্ব কবি’ অথবা কাজী নজরুল ইসলামের নামের আগে ‘বিদ্রোহী কবি’ অভিধাÑ বাঙালির ভালোবাসা, গৌরববোধ ও আবেগের বহিঃপ্রকাশ। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের পুরোধা মোহন দাস করমচাঁদ গান্ধীকে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ‘মহাত্মা’ হিসেবে আখ্যায়িত করায় এখনও বিশেষণটি তার নামের অংশ হয়ে গেছে। তেমনি ‘দেশবন্ধু’, ‘চিত্তরঞ্জন দাস’, ‘শেরে বাংলা’ এ. কে. ফজলুল হক, ‘নেতাজী’ সুভাষ বসু প্রভৃতি অভিধাও দেশবাসীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার অভিপ্রকাশ। উপমহাদেশের বাইরে নব্য তুরস্কের প্রতিষ্ঠাতা কামাল পাশা সে-দেশের মানুষের কাছে আতাতুর্ক (তুর্কি জাতির মহান পথ প্রদর্শক) হিসেবে শ্রদ্ধার আসনে প্রতিষ্ঠিত। ইন্দোনেশিয়ার স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতা আহমেদ শোয়েকার্নো হয়ে উঠেছিলেন, তার দেশবাসীর বাং কার্নো বা ভাই কার্নো হিসেবে। ভিয়েতনামের স্বাধীনতা, জাতীয় মুক্তি এবং সমাজতান্ত্রিক সংগ্রামের মহান নেতা নগুয়েন থাট তান (১৮৯০-১৯৬৯) ভিয়েতনামের জনগণের কাছে হো-চি মিন অর্থাৎ আলোকিত মানুষ (ঐব যিড় যধং নববহ বহষরমযঃবহবফ) হিসেবে পরিচিত ছিলেন। যাকে আদর করে আনকল হো (চাচা হো) বলেও অভিহিত করা হতো। এরকম দৃষ্টান্তের দীর্ঘ তালিকা দেওয়া যেতে পারে।
এই গৌরচন্দ্রিকাটুকু দিলাম, আমাদের এক অকৃত্রিম বন্ধুর পবিত্র নাম উচ্চারণের পাদটীকা হিসেবে। শেখ মুজিবুর রহমান। একেবারে আটপৌরে নাম। বাংলাদেশে হাজার হাজার মুজিবুর রহমান আছে। অথচ একজন ‘মুজিবুর রহমান’ হয়ে উঠলেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি। আর তারও আগে, যখন তিনি নির্বাচিত জননায়ক নন, রাষ্ট্রনায়ক বা রাষ্ট্রের স্থপতি বা জাতির পিতা নন, দলীয় কর্মীদের কাছে কেবল প্রিয় ‘মুজিব ভাই’, সেই তিনি হয়ে উঠলেন সমগ্র বঙ্গবাসীর বন্ধুÑ ‘বঙ্গবন্ধু’ শেখ মুজিবুর রহমান। সত্য বটে বাঙালির দীর্ঘ জাতীয় জাগরণের অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমান আগরতলা মামলার নামে অনিবার্য মৃত্যুদুয়ার থেকে ফিরে আসার অব্যবহিত পর ১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানের অযুত লক্ষ মানুষের পক্ষ থেকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত হন। কিন্তু এই আনুষ্ঠানিক ঘোষণার আগেই এই মানুষটি বাঙালির হৃদয় জয় করে, তাদের অন্তরের গভীরে ‘বন্ধুর’ আসনে সমাসীন হয়েছিলেন। আর কালের বিবর্তনে এই আসনটি চিরস্থায়ী হয়ে গেছে। এখন পৈতৃক নাম ‘শেখ মুজিবুর রহমান’ উচ্চারণ না করে কেবল ‘বঙ্গবন্ধু’ শব্দবন্ধটি উচ্চারণ করলেই মহিমান্বিত সেই মহামানবের শালপ্রাংসু চেহারার সাথে বাংলাদেশের মানচিত্রটি দীপ্যমান হয়ে ওঠে। একটা অভূতপূর্ব রসায়ন বটে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং বাংলাদেশ যেন অভিন্ন সত্তা, অভিন্ন শব্দবন্ধ এবং অভিন্ন আইডেনটিটি হয়ে উঠেছে।
শেখ মুজিবুর রহমানের বঙ্গবন্ধু হয়ে ওঠা কোনো আকস্মিক ব্যাপার ছিল না। আনুষ্ঠানিক ঘোষণাটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব অনস্বীকার্য। কিন্তু কেবল এই ঘোষণার মাধ্যমেই তিনি প্রকৃত অর্থে বঙ্গবন্ধু হয়ে ওঠেন নি। বঙ্গবন্ধু হয়ে উঠতে তাকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়েছে। জীবন-মৃত্যুকে পায়ের ভৃত্য করে টুঙ্গিপাড়ায় শেখ লুৎফর রহমান ও সায়রা খাতুনের জ্যেষ্ঠ পুত্র, কলকাতার তৎকালীন ইসলামিয়া কলেজ ছাত্র সংসদের নেতা তরুণ শেখ মুজিবুর রহমানকে তার জীবনের শ্রেষ্ঠ দিনগুলো গরাদের আড়ালে কাটাতে হয়েছে। পাকিস্তান আন্দোলনের তুখোড় কর্মী হওয়া সত্ত্বেও দেশভাগের আগেই বুঝেছিলেন, এক কারাগার থেকে বাঙালি জাতি আরেক কারাগারে বন্দি হতে চলেছে। এই উপলব্ধি ছিল বলেই তার রাজনৈতিক গুরু হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী-আবুল হাশেম এবং শরৎবসুÑ কিরণ শঙ্কর রায়ের ফর্মুলা অনুযায়ী অভিন্ন স্বাধীন সমাজতান্ত্রিক বাংলার পক্ষে তিনি দাঁড়িয়েছিলেন। সাম্প্রদায়িক বর্ণ হিন্দুদের নেতৃত্বাধীন বেঙ্গল কংগ্রেস এবং সাম্প্রদায়িক অভিজাত মুসলমানদের নেতৃত্বাধীন মুসলিম লীগের বাংলা ভাগের ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন। কিন্তু সোহরাওয়ার্দী-শরৎবোসদের সেই অসময়োচিত ও বিলম্বিত উদ্যোগ সফল না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত দেশভাগ অনিবার্য হয়ে ওঠে।
দেশভাগ হলেও তরুণ শেখ মুজিবুর রহমান জন্মলগ্ন থেকেই কৃত্রিম রাষ্ট্র পাকিস্তানকে মেনে নিতে পারেন নি। স্বাধীনতার পর বিশ্বখ্যাত সাংবাদিক ডেভিড ফ্রস্ট এবং বিশিষ্ট ভারতীয় বুদ্ধিজীবী ও বাংলাদেশের অকৃত্রিম সৃহৃদ অন্নদা শঙ্কর রায় পৃথক পৃথকভাবে বঙ্গবন্ধুকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতার কথা আপনি কখন থেকে চিন্তা করেছেন।’ বঙ্গবন্ধুর উত্তর; ‘যেদিন থেকে পাকিস্তান হয়েছে, সেদিন থেকে।’
এই বিশ্বাস ও বোধই যে বঙ্গবন্ধুকে ১৯৪৭ থেকে ১৯৭২ সাল পর্যন্ত পরিচালিত করেছে, তার বর্ণাঢ্য, সংগ্রামমুখর রাজনৈতিক জীবনই তার শ্রেষ্ঠ প্রমাণ। ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠা, ১৯৪৮ সালের মার্চের ভাষা আন্দোলন, ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠা, ১৯৫২-এর ভাষা সংগ্রাম, ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট গঠন ও নির্বাচনে মুসলিম লীগের ভরাডুবি, আইউবের সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন, ১৯৬৪-এর ছাত্র আন্দোলন, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা প্রতিরোধ এবং ১৯৬৬ সালে বাঙালির মুক্তিসনদ ৬-দফা ঘোষণা এবং বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলন, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, ’৭০-এর নির্বাচন এবং ১৯৭১ সালের অসহযোগ আন্দোলন ও ৭ মার্চের ভাষণের পথ বেয়ে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীন সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের অভ্যুদয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের তরুণ বয়সের স্বপ্নেরই সার্থক রূপায়ণ।

দুই
শেখ মুজিবুর রহমানের আনুষ্ঠানিক ‘বঙ্গবন্ধু’ হয়ে ওঠার ৫০ বছর পূর্তি হতে চলেছে। জাতি হিসেবে এ ঘটনাটি আমাদের জন্য অত্যন্ত শ্লাঘার বিষয়। ১৯৬৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি লাহোরে বিরোধী দলগুলোর গোলটেবিল বৈঠকের বিষয় নির্বাচনী কমিটিতে শেখ মুজিবুর রহমান তার ঐতিহাসিক ৬-দফা দাবি পাঠ করেন। তিনি তার ৬-দফা দাবি পরের দিন অনুষ্ঠিতব্য গোলটেবিল বৈঠকের এজেন্ডার অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানান। পশ্চিম পাকিস্তানের অংশগ্রহণকারী সকল দল একযোগে এই দাবিকে এজেন্ডার অন্তর্ভুক্ত করার বিরোধিতা করেন। শেখ মুজিব তার দাবি আলোচ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত না করলে বৈঠক বয়কটের ঘোষণা দেন। ফলে পূর্ব নির্ধারিত ৭ ফেব্রুয়ারির  সর্বদলীয় বৈঠকটি ভেঙে যায়।
শেখ মুজিব লাহোরেই তার প্রস্তাব সাংবাদিকদের কাছে প্রকাশ করেন। শেখ মুজিব করাচি হয়ে ঢাকায় ফিরে আসেন। ঢাকা বিমানবন্দরেও তিনি ৬-দফা ব্যাখ্যা করেন।
৬-দফা আওয়ামী লীগ ওয়ার্কিং কমিটিতে আলোচনা এবং অনুমোদন না করেই শেখ মুজিব লাহোরের বৈঠকে উত্থাপন করেছিলেন। ফলে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বের একাংশ তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। ১৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৬, আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটির সভা আহ্বান করা হয়। অনুমোদন ছাড়া ৬-দফা উত্থাপনের প্রতিবাদে আওয়ামী লীগের সভাপতি মাওলানা আবদুর রশিদ তর্কবাগীশ তার কয়েকজন অনুসারীসহ ওয়ার্কিং কমিটির সভা ত্যাগ করেন। প্রবীণ নেতা অ্যাডভোকেট আবদুস সালাম খান প্রকাশ্যে সমালোচনা করেন। অনেকের মধ্যেই ছিল দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ও ভয়-ভীতি। শেষ পর্যন্ত সহ-সভাপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওয়ার্কিং কমিটির সভায় শেখ মুজিবের ৬-দফা প্রস্তাব গৃহীত হয়। সিদ্ধান্ত হয় ১৮ মার্চ হোটেল ইডেনে অনুষ্ঠিতব্য দলের কাউন্সিলে চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য ৬-দফা পেশ করা হবে।
১৯৬৭ সাল থেকেই ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়ন (মতিয়া) ও ছাত্র ইউনিয়ন (মেনন)-এর মধ্যে শিক্ষা কমিশন রিপোর্টকে সামনে রেখে ঐক্যবদ্ধ ছাত্র আন্দোলন গড়ে তোলার প্রক্রিয়া শুরু হয়। ১৯৬৮ সালের মাঝামাঝি খোদ পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর ভেতরেই আইউব-বিরোধী শক্তি মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। ’৬৫-এর ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ এবং তাসখন্দ চুক্তিকে কেন্দ্র করে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টোর পেছনে পাকিস্তানের প্রকৃত শাসকগোষ্ঠীর একাংশ বিশেষত, সেনাবাহিনীর প্রচ্ছন্ন সমর্থন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর মধ্যেই মতপার্থক্য সৃষ্টি হয়। পাকিস্তানি সেনা ও আমলাতন্ত্রের একাংশের সমর্থনে জুলফিকার আলী ভুট্টো পিপলস পার্টি নামে নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করেন। সে-সময়ে বাংলাদেশেও ভুট্টো তার দল গঠনের ব্যর্থ চেষ্টা করেন। তবে সরকার সমর্থক ‘জাতীয় ছাত্র ফেডারেশন’ বা এনএসএফ-এর একটি অংশ আইউবের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। তৎকালীন পূর্ব বাংলায় ঐক্যবদ্ধ ছাত্র আন্দোলন গড়ে তোলার একটা অনুকূল বাতারণ সৃষ্টি হয়।
দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর ১ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় খোলে। বিশ্ববিদ্যালয়ে কালো পতাকা উত্তোলন করা হয়। ২ জানুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয়। প্রতিবাদ সভাকে কেন্দ্র করে পুলিশের সাথে ছাত্ররা সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। স্বতঃস্ফূর্তভাবে  আন্দোলন সূচিত হলেও তখন পর্যন্ত আন্দোলনের কোনো সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি প্রণীত হয় নি। ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়ন (মতিয়া), ছাত্র ইউনিয়ন (মেনন) গ্রুপের নেতৃবৃন্দ অবিলম্বে একটি কর্মসূচি প্রণয়নের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। ২ জানুয়ারি থেকে ৫ জানুয়ারি পর্যন্ত এ সংগঠনগুলোর মধ্যে দীর্ঘ আলাপ-আলোচনার পর একটি কর্মসূচি প্রণীত হয়। ৫ জানুয়ারি তিন ছাত্র সংগঠনের ছয় নেতার নামে এই কর্মসূচি সংবাদপত্রে প্রেরণ করা হয়। যা ৬ জানুয়ারি প্রকাশিত হয়। কিন্তু পরের দিন ছাত্র নেতৃবৃন্দ এই কর্মসূচিকে আরও সুনির্দিষ্ট করেন। এবার ওই তিন ছাত্র সংগঠন ছাড়াও ডাকসু ও এনএসএফ’কেও কর্মসূচির স্বাক্ষরদাতা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
ডাকসু, ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়ন (মতিয়া), ছাত্র ইউনিয়ন (মেনন) ও এনএসএফ ৬-দফাভিত্তিক ১১-দফা কর্মসূচি প্রণয়ন করেন। এতে ৬-দফার পূর্ণ বয়ান, শিক্ষার দাবি, শ্রমিক, কৃষকদের আশু দাবি, বৃহৎ শিল্প জাতীয়করণ, ভূমি সংস্কার এবং জোট নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতি প্রভৃতি দাবিসহ প্রণীত হয় ঐতিহাসিক ১১-দফা দাবি। তবে ওই দাবিনামায় আগরতলা মামলা প্রত্যাহার ও শেখ মুজিবসহ রাজবন্দির মুক্তির দাবিও গুরুত্বের সাথে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ১৯৬৯ সালের তৎকালীন ইকবাল হল ক্যান্টিনের দোতলায় ছাত্রসংসদ কার্যালয়ে ৬ জানুয়ারি চূড়ান্তভাবে ছাত্র নেতৃবৃন্দ ঐতিহাসিক ১১-দফা কর্মসূচিতে স্বাক্ষর দান করেন। গঠিত হয় সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ। প্রত্যেক ছাত্র সংগঠন থেকে দুজন, অর্থাৎ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে নিয়ে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। ঐতিহ্য অনুসারে ডাকসুর সহ-সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকও ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সদস্য বলে গণ্য হন। আর প্রথাগতভাবে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সভায় সভাপতির দায়িত্ব ছিল ডাকসুর ভিপিÑ তোফায়েল আহমদের। একইসঙ্গে তিনিই ছিলেন ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের মুখপাত্র ও সমন্বয়ক। সাকুল্যে ১০ সদস্য বিশিষ্ট ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ আন্দোলনের প্রাথমিক কর্মসূচি হিসেবে ১০ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনে সমাবেশ ও মিছিলের কর্মসূচি গ্রহণ করে। তোফায়েল আহমেদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সমাবেশে প্রথম ১১-দফা দাবি আনুষ্ঠানিকভাবে ছাত্রলীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক খালেদ মোহাম্মদ আলী পাঠ করেন। সরকার মিছিল নিষিদ্ধ করে। ১৪৪ ধারা জারি করে। প্রতিবাদে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ১৭ জানুয়ারি আবার বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সমাবেশের কর্মসূচি ঘোষণা করে।
১৭ জানুয়ারি ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে মিছিল করার ভেতর দিয়ে অগ্নি-স্ফুলিঙ্গের মতো ছাত্র আন্দোলন সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। মাত্র কয়েকদিনের মধ্যেই শান্তিপূর্ণ ছাত্র আন্দোলন অপ্রতিরোধ্য গণ-অভ্যুত্থানে পরিণত হয়। ২০ জানুয়ারি ছাত্রনেতা আসাদকে গুলি করে হত্যা, রাতে কারফিউ জারি, আর ২৪ জানুয়ারি নবকুমার ইনস্টিটিউটের ছাত্র কিশোর মতিউরকে হত্যাসহ একাধিক স্থানে গুলিবর্ষণ ও হত্যাকা-ের ফলে রাজধানী ঢাকায় সর্বস্তরের মানুষ রাস্তায় নেমে আসেন। সৃষ্টি হয় অভূতপূর্ব গণ-অভ্যুত্থান। আন্দোলনের মুখে সরকারকে পিছু হটতে হয়। কারফিউ ও ১৪৪ ধারা প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়।
১১-দফা আন্দোলন বাংলার মানুষের প্রাণের দাবিতে পরিণত হয়। তবে ৬-দফাভিত্তিক ১১-দফার প্রতি স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন থাকলে দেশবাসীর কাছে সবচেয়ে জনপ্রিয় দাবি হয়ে ওঠে, শেখ মুজিবের মুক্তি, আগরতলা মামলা প্রত্যাহার এবং আইউবের পতনের দাবি।
জাগো জাগো বাঙালি জাগো, তোমার আমার ঠিকানা পদ্মা মেঘনা যমুনা, পিন্ডি না ঢাকা-ঢাকা ঢাকা, তোমার নেতা আমার নেতা শেখ মুজিব শেখ মুজিব, জেলের তালা ভাঙবো, শেখ মুজিবকে আনবোÑ প্রভৃতি সেøাগান সর্বজনীন সেøাগানে পরিণত হয়।
বস্তুত, ১১-দফা দাবির ব্যানারে ৬-দফার মধ্য দিয়ে বাঙালির যে জাতীয় জাগরণ ও স্বাধীনতার আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল, সেই আন্দোলনই দেশব্যাপী ব্যাপক জাতীয় আন্দোলনে পরিণত হয়। বৈপ্লবিক মেজাজ নিয়ে আন্দোলনে শ্রমিক, কৃষক, ছাত্র, যুব, বুদ্ধিজীবী, নারীসমাজসহ সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণ বাড়তে বাড়তে কূলপ্লাবী হয়ে ওঠে।
কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রামের পাশাপাশি ওই সময়ে পাকিস্তানের বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোও আইউব শাসনের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়। ১১-দফার মতো জাতীয়তাবাদী চরিত্রের না হলেও বিরোধী দলগুলোর জোট একটা ৮-দফা দাবি প্রণয়ন করে। আওয়ামী লীগ, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ-ওয়ালী-মোজাফ্ফর) নবাবজাদা নসরুল্লাহ খানের পিডিএম ও জমিয়াতুল উলেমা-ই-ইসলাম প্রভৃতি দল মিলিত হয় ‘ডেমোক্রেটিক অ্যাকশন কমিটি’ সংক্ষেপে ‘ডাক’ গঠন করে। ডাক গঠনের ফলে জনমনে উৎসাহের সঞ্চার হয় এবং ছাত্র আন্দোলনে নতুন গতিবেগ সঞ্চারিত হয়।
ঊনসত্তরের গণ-আন্দোলনে ‘ডাক’ ছিল সহযোগীর ভূমিকায়। বস্তুত আন্দোলন পরিচালিত হয়েছে ছাত্র সমাজের নেতৃত্বে। ঐ সময় পশ্চিম পাকিস্তানেও আইউববিরোধী আন্দোলন ব্যাপক আকার ধারণ করেছিল। ফলে সামগ্রিকভাবেই গোটা পাকিস্তানে আইউব-বিরোধী আন্দোলন প্রবল হয়ে ওঠে। আইউব সরকার কেবল বাংলাদেশের না, সমগ্র পাকিস্তানের জনগণের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল।
পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দিয়ে বিচার প্রহসনের নামে শেখ মুজিবকে ‘রাষ্ট্রদ্রোহী’ হিসেবে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝোলাবার ষড়যন্ত্র করেছিল। কিন্তু আগরতলা মামলা তাদের জন্য বুমেরাং হয়ে যায়। সামরিক আদালতের মামলার শুনানি প্রতিদিন সংবাদপত্রে প্রকাশিত হতে থাকে। শেখ মুজিবের জবানবন্দি এবং সওয়াল জবাব যখন সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয় তখন তা বাঙালির মনে গভীর আবেগের সঞ্চার করে। যা ছিল অজানাÑ অজ্ঞাত, মামলার সুবাদে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে শেখ মুজিবের অকুতোভয় আপসহীন সংগ্রামের কাহিনিÑ বাঙালির মনে দেশপ্রেম ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার প্রতিজ্ঞাকে আরও শাণিত করে। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সৃষ্টি হয় তীব্র ঘৃণা। কারাবন্দি শেখ মুজিব হয়ে ওঠেন বাঙালির নয়নমণিÑ মুক্তির দিশারী। তার জনপ্রিয়তা আকাশস্পর্শ করে। যে কোনো মূল্যে তাকে মুক্ত করাই হয়ে ওঠে  অপ্রতিরোধ্য গণদাবি।
দুটি ঘটনা এই আন্দোলনের অগ্নিতে ঘৃতাহুতি দেওয়ার কাজ করে। ১৫ ফেব্রুয়ারি ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে বন্দি অবস্থায় আগরতলা মামলার অন্যতম অভিযুক্ত সার্জেন্ট জহুরুল হককে সেনাবাহিনী গুলি করে হত্যা করে। ঢাকায় প্রায় নিয়ন্ত্রণহীন গণবিস্ফোরণের মতো পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। শেখ মুজিবের নিরাপত্তা নিয়ে সমগ্র জাতি উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। সংগ্রামী জনতা ক্যান্টনমেন্ট ঘেরাওয়ের জন্য ছাত্র নেতৃবৃন্দকে চাপ দিতে থাকে। ১৮ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ড. শামসুজ্জোহাকে পাকিস্তানি সেনারা বেয়োনেট চার্জ করে নির্মমভাবে হত্যা করে। সমগ্র পরিস্থিতি তখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাওয়ার উপক্রম হয়।
আন্দোলনের ব্যাপক বিস্তার, গণ-অভ্যুত্থানের বিপ্লবী মেজাজ এবং শেখ মুজিবের মুক্তির প্রশ্নে বাঙালির মনে গভীর আবেগ আইউব সরকারকে প্রমাদ গুনতে বাধ্য করে। আইউব সরকার উদ্ভূত রাজনৈতিক পরিস্থিতির সমাধানকল্পে ইসলামাবাদে দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠানের কথা ঘোষণা করে। এমনকি শেখ মুজিবকে প্যারোলে মুক্তি দিয়ে গোলটেবিলে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব দেয়।
ইতিহাসের এই বিশেষ মুহূর্তটিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার নিয়ামক ভূমিকা পালন করেন মহীয়সী বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিব। তার কাছে এটা স্পষ্ট হয়ে যায়, আইউবের পতন এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। আর শেখ মুজিব প্যারোলে মুক্তি নিয়ে গোলটেবিলে গেলেই বরং আন্দোলন ব্যর্থ হয়ে যেতে পারে। দেশবাসীর মনে শেখ মুজিবের যে অতিমানবিক বীরত্বব্যঞ্জক বিভূতি গড়ে উঠেছে, তা ভেঙে যাবে। বেগম মুজিব শেখ মুজিবকে বার্তা পাঠান কোনোক্রমেই তিনি যেন প্যারোলে মুক্তির প্রস্তাবে রাজি না হন। আগরতলা মামলা প্রত্যাহার করে বিনা শর্তে তাকে মুক্তি দিলেই কেবল ‘মুক্ত মানুষ’ হিসেবে তিনি গোলটেবিলে অংশ নিতে পারেন।
যথারীতি শেখ মুজিব প্যারোলে মুক্তির প্রস্তাব ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি আগরতলা মামলা প্রত্যাহার এবং তিনিসহ সকল রাজবন্দির নিঃশর্ত মুক্তি দাবি করেন। অন্যথায় সরকারের সঙ্গে কোনো ধরনের আলোচনার সম্ভাবনা তিনি নাকচ করে দেন।
১৯৬৯-এর ২১ ফেব্রুয়ারি পল্টন ময়দানে জনাব তোফায়েল আহমেদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয় বিশাল ছাত্র-জনসভা। এই জনসভা থেকে ছাত্রসমাজ আইউব সরকারের প্রতি ২৪ ঘণ্টার আল্টিমেটাম ঘোষণা করে। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আগরতলা মামলা প্রত্যাহার, নিঃশর্তভাবে শেখ মুজিব এবং সকল রাজবন্দির মুক্তি দাবি করা হয়। এই আল্টিমেটাম শাসকগোষ্ঠীর ভিত নাড়িয়ে দেয়। দাবি আদায়ে বাংলার মানুষ যে কোনো ত্যাগের জন্য প্রস্তুত হয়।
সমগ্র বাংলাদেশ তখন উর্মিল সাগরের মতো উত্তাল। শেখ মুজিবের আপসহীন বীরোচিত ভূমিকা, ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্বে ক্রমবর্ধমান গণ-অভ্যুত্থান এবং খোদ শাসকগোষ্ঠীর মধ্যে বিভেদের পটভূমিতে শেষ পর্যন্ত লৌহমানব আইউব খান মাথানত করতে বাধ্য হয়। ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি আগরতলা মামলা প্রত্যাহার এবং নিঃশর্তভাবে শেখ মুজিবের মুক্তি প্রদান করা হয়। একইসঙ্গে সারাদেশে অন্যান্য রাজনৈতিক নেতাদেরও নিঃশর্ত মুক্তি দেওয়া হয়।
আজ থেকে ৫০ বছর আগে এভাবেই বাঙালির সংগ্রামুখর ইতিহাসে একটি বড় অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে। আবেগে আপ্লুত বাঙালি শেখ মুজিবকে এক নজর দেখার জন্য পাগলপারা হয়ে ওঠে। কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে ২৩ ফেব্রুয়ারি শেখ মুজিবকে তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে (সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) গণসংবর্ধনা দেওয়া হবে।
১৯৭১-এর ৭ মার্চের আগে সর্ববৃহৎ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয় রেসকোর্স ময়দানে। লক্ষ লক্ষ মানুষের সমাবেশ ঘটে। ডাকসুর সহ-সভাপতি তোফায়েল আহমেদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বিশাল জনসমুদ্রে ছাত্রনেতাদের মধ্যে ভাষণ দেন ছাত্রলীগের সভাপতি আবদুর রৌফ, ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি সাইফউদ্দিন আহমেদ মানিক, ছাত্র ইউনিয়ন (মেনন) সভাপতি মোস্তফা জামাল হায়দার প্রমুখ।
সভাপতির ভাষণ দেন তোফায়েল আহমেদ। তোফায়েল আহমেদ তার ভাষণে শেখ মুজিবকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করেন। ছাত্র নেতৃবৃন্দ ও সমবেত জনগণ দু’হাত তুলে এই ঘোষণাকে সমর্থন জানায়। রেসকোর্স ময়দানে এক অভিনব আবেগঘন পরিবেশ সৃষ্টি হয়।
প্রসঙ্গত, একটা কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। শেখ মুজিবকে ২৩ ফেব্রুয়ারি এককভাবে গণসংবর্ধনা দেওয়ার প্রশ্নে প্রথমে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদে ঐকমত্য ছিল না। দুই ছাত্র ইউনিয়নই চেয়েছিল শেখ মুজিবসহ অন্যান্য রাজনৈতিক নেতাদের একসঙ্গে সংবর্ধনা দিতে। কিন্তু ছাত্রলীগ এই প্রস্তাব নাকচ করে দেয়। তারা শেখ মুজিবকে ২৩ ফেব্রুয়ারি এককভাবে সংবর্ধনা দেওয়ার প্রশ্নে অনড় ভূমিকা নেয়। তবে আলাদাভাবে অন্যান্য রাজনৈতিক নেতাকেও পল্টন ময়দানে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে সংবর্ধনা দেওয়ার ব্যাপারে তাদের সম্মতির কথা জানান। শেষ পর্যন্ত অন্যান্য ছাত্র সংগঠনও ছাত্রলীগের এই প্রস্তাব মেনে নেয় এবং ২৩ ফেব্রুয়ারি কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ঐক্যবদ্ধভাবে রেসকোর্স ময়দানের সংবর্ধনার আয়োজন করে।
কিন্তু রেসকোর্স ময়দানে শেখ মুজিবকে যে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি দেওয়া হবেÑ এ কথাটি ঘোষণার আগে পর্যন্ত ছাত্র সংগ্রাম পরিষদে আলোচিত হয়নি। আমরা তৎকালীন ছাত্রনেতাদের কাছ থেকেই জেনেছি, ডাকসুর সহ-সভাপতি ও রেসকোর্সের গণসংবর্ধনা সভার সভাপতি তোফায়েল আহমেদ এ কথা ঘোষণার আগে পর্যন্ত কাউকে বলেন নি। যদ্দুর জানি, তৎকালীন ছাত্রলীগ নেতৃবৃন্দের কারও কারও সাথে এবং সাবেক কোনো কোনো ছাত্রলীগ নেতার সাথে তোফায়েল আহমেদের এ ব্যাপারে পরামর্শ হয়। তাদের পরামর্শই তিনি ঘোষণার আগে পর্যন্ত বিষয়টি প্রকাশ করেন নি।
আশঙ্কা ছিল, ছাত্র সংগ্রাম পরিষদে আলোচনা করলে যদি ঐকমত্য না হয়, সেই ধারণা থেকেই ছাত্র সংগ্রাম পরিষদে পূর্বাহ্নে আলোচনা এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। তবে ঐতিহাসিক বাস্তবতা হচ্ছে, রেসকোর্স ময়দানে তোফায়েল আহমেদ যখন শেখ মুজিবকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করার ঘোষণা দেন তখন মঞ্চে উপস্থিত ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়ন (মতিয়া), ছাত্র ইউনিয়ন (মেনন) ও ডাকসুসহ সকল ছাত্র নেতৃবৃন্দ রেসকোর্সের লক্ষ জনতার সাথে দু-হাত তুলে এই ঘোষণার প্রতি সমর্থন জানান। বস্তুত, সর্বসম্মতিক্রমেই শেখ মুজিবকে বঙ্গবন্ধু উপাধিতে ভূষিত করা হয়।
কেউ কেউ কিছু না জেনেই ভিত্তিহীন মতদ্বৈধতার প্রশ্ন তুলতে চান, কেউ আবার ‘বঙ্গবন্ধু’ শব্দটি আগেই চয়ন ও ব্যবহারের কীর্তি দাবি করেনÑ যার কোনো ঐতিহাসিক মূল্য নেই।
আগরতলা মামলা প্রত্যাহারের ৫০ বছর পূর্তি এবং শেখ মুজিবকে বঙ্গবন্ধু উপাধিতে ভূষিত করার ৫০ বছর পূর্তিতে আমাদের মনে রাখতে হবেÑ এ দুটি ঘটনাই ছিল ইতিহাসের অনিবার্য পরিণতি এবং বাঙালি জাতির সম্মিলিত ইচ্ছার মহত্তম প্রকাশ। জয় বঙ্গবন্ধু।

পরিশিষ্ট
প্রসঙ্গটি শেষ করছিÑ ২৪ ফেব্রুয়ারি ইত্তেফাকে প্রকাশিত স্টাফ রিপোর্টার প্রদত্ত সংবাদ প্রতিবেদনটির হুবহু উদ্ধৃতি দিয়েÑ

‘বঙ্গবন্ধু’ শেখ মুজিব
(স্টাফ রিপোর্টার)
‘ঢাকার রেসকোর্স ময়দানের গণমহাসাগর গতকাল (রবিবার) পূর্ব বাংলার নির্যাতিত জন-নায়ক শেখ মুজিবর রহমানকে “বঙ্গবন্ধু” উপাধিতে ভূষিত করে।
কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক ও গতকল্যকার গণসম্বর্ধনা সভার সভাপতি জনাব তোফায়েল আহমদ শেখ মুজিবর রহমানের বাংলা ও বাংগালীর স্বার্থে অবিচল ও অবিরাম সংগ্রামের কথা স্মরণ করাইয়া দিয়া ঢাকার ইতিহাসে সর্বকালের সর্ববৃহৎ জনসমাবেশের উদ্দেশ্যে বলেন যে, আমরা বক্তৃতা-বিবৃতিতে শেখ মুজিবর রহমানকে নানা বিশেষণে বিশেষিত করার প্রয়াস পাই। কিন্তু তাঁর রাজনৈতিক জীবন বিশ্লেষণ করিলে যে সত্যটি সবচাইতে ভাস্বর হইয়া উঠে তা হইতেছে তিনি মানব দরদীÑ বিশেষ করিয়া বাংলা ও বাঙ্গালীর দরদী, প্রকৃত বন্ধু। তাই আজকের এই ঐতিহাসিক জনসমুদ্রের পক্ষ হইতে আমরা তাঁকে “বঙ্গবন্ধু” উপাধিতে ভূষিত করিতে চাই। রেসকোর্সের জনতার মহাসমুদ্র তখন একবাক্যে বিপুল করতালির মধ্য দিয়া এই প্রস্তাব সমর্থন করেন।’

পাঠকের মন্তব্য:

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না। তারকাচিহ্নযুক্ত (*) ঘরগুলো আবশ্যক।

*